তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী
জমিয়তের আলোচনা সভায় তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী.jpeg
লন্ডনে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের স্বরণসভায় হবিগঞ্জী (২০১৯)
সহ-সভাপতি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
অফিসে
২০১০ – ২০২০
সহ-সভাপতি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ
আচার্য, জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া উমেদনগর
অফিসে
১৯৭১ – ২০২০
ব্যক্তিগত
জন্ম১৯৩৮
কাটাখালী, হবিগঞ্জ, সিলেট
মৃত্যু৫ জানুয়ারী ২০২০
সমাধিস্থলজামিয়া উমেদনগরের কবরস্থান
ধর্মইসলাম
জাতীয়তাবাংলাদেশী
পিতামাতা
  • আব্দুন নূর (পিতা)
জাতিসত্তাবাঙালি
যুগআধুনিক
আখ্যাসুন্নি
ব্যবহারশাস্ত্রহানাফি
আন্দোলনদেওবন্দি
প্রধান আগ্রহরাজনীতি, ওয়াজ-নসীহত, কুরআন-হাদীস চর্চা, তাফসির
যেখানের শিক্ষার্থী
ঊর্ধ্বতন পদ

তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী (১৯৩৮ — ২০২০) ছিলেন একজন বাংলাদেশি দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত, রাজনীতিবিদ। তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশজমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া উমেদনগরের মুহতামিম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।[১] তার সম্মানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার মেইন রোড থেকে দক্ষিণমুখী বিরামচর-সাবাজপুর এলাকার রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে “হাফেজ তাফাজ্জল হক (রহ.) সড়ক ”

জন্ম ও বংশ[সম্পাদনা]

তাফাজ্জুল হক ১৯৩৮ সালে হবিগঞ্জ শহরের অদূরে কাটাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুন নূর ছিলেন একজন আলেম। তার নানার নাম আল্লামা আসাদুল্লাহ, যিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ৫ ভাইয়ের মধ্যে তাফাজ্জুল হক বড়।[১][২]

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

তিনি হবিগঞ্জের অদূরে রায়ধর গ্রামের জামিয়া সা’দিয়্যায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। সেখানে তাঁর মামা আল্লামা মুখলিসুর রহমানের নিকট আরবি ব্যাকরণ ও আরবি ভাষা রপ্ত করেন। তাঁর মামা হুসাইন আহমদ মাদানির ছাত্র ছিলেন।[১]

প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে তিনি দারুল উলুম হাটহাজারীতে গমন করেন। সেখানে তিনি ফিকহ, উসূলে ফিকহ, তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীস ও উসূলে হাদীস, মানতেক-ফালসাফাসহ ইসলামের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান অর্জন করেন। এখান থেকে ১৯৬১ সনে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।

তারপর তিনি পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে জামিয়া আশরাফিয়া, লাহোরে দ্বিতীয়বার দাওরায়ে হাদীসে ভর্তি হন। লাহোরে থাকাকালীন তিনি ‘খানকায়ে রায়পুরের’ (সাহারানপুর) প্রসিদ্ধ আলেম আব্দুল কাদের রায়পুরীর ইসলাহী মজলিসে উপস্থিত হতেন। তাঁর খানকায় এক সপ্তাহ অবস্থানও করেছেন। তাঁর জানাযায়ও উপস্থিত হয়েছিলেন।

এরপর তিনি খানপুরে গমন করেন। সেখানে হাফিযুল হাদীস আব্দুল্লাহ দরখাস্তীর নিকট তাফসীরের বিশেষ পাঠ গ্রহণ করেন।

এরপর তিনি জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ার হাদীস বিশারদ আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরীর নিকট গমন করেন। সেখানে কয়েক মাস অবস্থান করে সহীহ বুখারী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, তাফসীরুল কুরআনিল কারীমের দরস গ্রহণ করেন।

এরপর তিনি ভারতের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। দেওবন্দ গমনের পথে তিনি তাবলীগ জামাতের আমীর আল্লামা ইউসুফ কান্ধলভির সাক্ষাত লাভ করেন। আল্লামা ইউসুফ কান্ধলভি তাকে সাহারানপুরে আল্লামা জাকারিয়া কান্ধলভির কাছে পৌঁছিয়ে দেন। তৎকালীন সময়ে দারুল উলুম দেওবন্দে পাকিস্তানি কোন ছাত্র ভর্তি হওয়ার নিয়ম না থাকায় কারী মুহাম্মদ তৈয়বের অনুমতিতে তিনি খুসূসী দরস (বিশেষ পাঠ) গ্রহণ করেন। সুনান আত-তিরমিজী পড়েন শাইখ ইবরাহীম বলিয়াভীর নিকট। তাফসীরে বায়যাবী পড়েন আল্লামা ফখরুল হাসান মুরাদাবাদীর নিকট। কারী মুহাম্মদ তৈয়বের হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার দরসেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।। ১৯৬৩ সনে তিনি দেশে ফিরে আসেন।[১]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

পাকিস্তানভারতে পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরে প্রথমে কুমিল্লার দারুল উলুম বরুড়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। তিন বছর এ মাদ্রাসায় হাদীস, তাফসীর ও ফুনূনাতের বিভিন্ন কিতাবের দরস দেন।

এরপর ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত ময়মনসিংহের আশরাফুল উলুম বালিয়া মাদ্রাসার শাইখুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত ময়মনসিংহ জামেয়া ইসলামিয়ায় হাদীসের শিক্ষক ছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া উমেদনগরে যোগদান করেন। মৃত্যু পর্যন্ত এই মাদ্রাসার আচার্য ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি মহিলাদের জন্য জামিয়া শারইয়্যাহ মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।[১]

পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

তিনি ১৯৬৭ সালে ময়মনসিংহের মাওলানা আরিফ রব্বানীর কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার ৫ ছেলে ও ৪ মেয়ে।[৩]

তাসাউফ[সম্পাদনা]

হবিগঞ্জী প্রথমে মুফতি ফয়জুল্লাহর নিকট বায়আত হন। তার মৃত্যুবরণের পর সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বৃহত্তর রেঙ্গা এলাকার আল্লামা বদরুল আলম (শায়খে রেঙ্গার) নিকট বায়আত হন। তিনি হুসাইন আহমদ মাদানির ছাত্র ও খলীফা ছিলেন। দীর্ঘদিন রিয়াযত-মুজাহাদার পর শায়খে রেঙ্গা তাকে ইজাযত ও খেলাফত দান করেন।[৪]

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও হবিগঞ্জ জেলার সভাপতি ছিলেন। ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গঠিত হলে এর সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[৫]

প্রকাশনা[সম্পাদনা]

ছাত্র জীবন থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে।

  1. تحذير الإخوان عن صحبة الأمارد والصبيان (ছোট বাচ্চাদের সাথে মিলামিশা করা থেকে সতর্কিকরণ): পুস্তিকার উপর মুফতি ফয়জুল্লাহ ও শাইখ কুরবান আলীর অভিমত লেখা আছে। মূল গ্রন্থটি উর্দূতে লেখা।
  2. جواهر الأدب في لسان العرب : এটি আরবী ভাষায় কাছাকাছি বিভিন্ন শব্দের আভিধানিক পার্থক্যের উপর লিখিত গ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রায় আড়াইশ পৃষ্ঠার। মাওলানা তাহমিদুল মাওলার টীকা ও সম্পাদনায় গ্রন্থটি ছেপেছে মাকতাবাতুল আযহার
  3. হয়রত লোকমান আ. এর সতর্কবাণী।
  4. হাফিযুল হাদীস আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তী রহ.এর জীবনী।
  5. দরসে হুজ্জাতুল্লাহ : হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা কিতাবের দরসের সংকলন। (অপ্রকাশিত)
  6. মনীষীদের স্মৃতিচারণ।
  7. تحرير الأسانيد: এটি হবিগঞ্জীর বিভিন্ন হাদীসের গ্রন্থের সনদ ও ইজাযতের উপর লিখিত। গ্রন্থটি সংকলন করেছেন মাওলানা তাহমিদুল মাওলা। (অপ্রকাশিত)

মৃত্যু[সম্পাদনা]

শ্বাসকষ্টজনিত কারণে তিনি ৫ জানুয়ারী ২০২০ মৃত্যুবরণ করেন। একদিন পর উমেদনগর মাদ্রাসায় তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন তার বড় ছেলে মাসরুরুল হক। তার জানাযায় কয়েক লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।[৫][৬][৭][৮][৯][১০][১১][১২][১৩]

তার সম্মানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার মেইন রোড থেকে দক্ষিণমুখী বিরামচর-সাবাজপুর এলাকার রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে “হাফেজ তাফাজ্জল হক (রহ.) সড়ক ”[১৪][১৫]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. উবাইদুল্লাহ, মুনশি মুহাম্মদ। "আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী (রহ.)"DailyInqilabOnline। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  2. "শায়খুল হাদীস আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী রাহ. এর সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম"দৈনিক জালালাবাদ (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২০-০১-০৬। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-০৭ 
  3. "আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী আর নেই"The Sunrise Today। ২০২০-০১-০৫। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  4. উবাইদুল্লাহ, মুনশি মুহাম্মদ। "আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী (রহ.)"DailyInqilabOnline। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  5. "শায়খুল হাদিস আল্লামা তোফাজ্জল হক হবিগঞ্জীর ইন্তেকাল"wwww.jagonews24.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  6. "তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জীর জানাযায় লাখো মানুষের ঢল"www.shomoyeralo.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  7. "আল্লামা তাফাজ্জুল হকের জানাজায় লাখো মানুষ"বাংলাদেশ প্রতিদিন। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  8. "আল্লামা তাফাজ্জুল হকের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল | দেশ রূপান্তর"Desh Rupantor। ২০২০-০১-০৬। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  9. "শীর্ষ তিন আলেমের সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল"প্রথম আলো। ২০১৯-১০-১১। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  10. "প্রখ্যাত আলেম মাওলানা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী আর নেই"যুগান্তর। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  11. "প্রখ্যাত আলেম আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী আর নেই"www.m.mzamin.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  12. "আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জীর ইন্তেকাল"দৈনিক নয়াদিগন্ত। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  13. "আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জীর ইন্তেকাল"www.amadershomoy.com। ২০২০-০১-০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  14. "শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় ৬ প্রকল্পের উদ্বোধনে এমপি আবু জাহির"www.m.mzamin.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-০৬ 
  15. "আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জীর নামে হবিগঞ্জে সড়ক উদ্বোধন করলেন এমপি আবু জাহির"Sylhet Report | সিলেট রিপোর্ট (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-০৬ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]