বিষয়বস্তুতে চলুন

চুনারুঘাট উপজেলা

চুনারুঘাট
উপজেলা
মানচিত্রে চুনারুঘাট উপজেলা
মানচিত্রে চুনারুঘাট উপজেলা
স্থানাঙ্ক: ২৪°১২′৩৪″ উত্তর ৯১°৩১′১১″ পূর্ব / ২৪.২০৯৪৪° উত্তর ৯১.৫১৯৭২° পূর্ব / 24.20944; 91.51972 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশবাংলাদেশ
বিভাগসিলেট বিভাগ
জেলাহবিগঞ্জ জেলা
আয়তন
  মোট৪২৭ বর্গকিমি (১৬৫ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[]
  মোট২,৬৭,০২০
  জনঘনত্ব৬৩০/বর্গকিমি (১,৬০০/বর্গমাইল)
সাক্ষরতার হার
  মোট৪৮.৮০%
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
প্রশাসনিক
বিভাগের কোড
৬০ ৩৬ ২৬
ওয়েবসাইটদাপ্তরিক ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

চুনারুঘাট উপজেলা বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। চুনারুঘাটের প্রাচীন নাম ছিল 'তরফ'। তরফ রাজ্য নামেই বহুকাল আগে ডাকা হতো চুনারুঘাটকে। ধীরে ধীরে নাম পরিবর্তন হয়ে এখন চুনারুঘাট নামেই পরিচিত। ব্যবসায়িক কারণে ত্রিপুরা রাজ্যের বণিকরা তরফ রাজ্যে চুনাপাথর নিয়ে আসতেন (খোয়াই) নদীপথে। প্রচুর চুনাপাথর এই অঞ্চলে আসত। ব্যবসায়ীগণ এখানে এসে চুনাপাথর ক্রয়-বিক্রয় করতেন। যারা চুন তৈরী করেন তাদের ডাকা হয় চুনারু । প্রথমে লোকে বলত চুনারু-আট বা চুনারুহাট, বর্তমানে বই বা পত্রিকাতে চুনারুঘাট লিখলেও গ্রামীণ জনগণ চুনাআট বা চুনারঘাট নামেই ডাকেন। কালক্রমে এটি হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী জনপদ চুনারুঘাট। চুনারুঘাট আয়তনে হবিগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উদ্যাণ "সাতছড়ি জাতীয় উদ্যাণ", খোয়াইনদী তীরবর্তী এলাকায় আখের বাগানের গুড়, চা বাগান, রাবার বাগান, লিচু, লেবু, টক কমলার জন্য চুনারুঘাট বিখ্যাত।চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যাণে চাকলাপুঞ্জি নামক এলাকায় আদিমকালিন মানু্ষের পাথরের হাতিয়ার আবিষ্কার চুনারুঘাটকে করে তুলেছে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র!

অবস্থান ও আয়তন

[সম্পাদনা]

এই উপজেলার উত্তরে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলাবাহুবল উপজেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা, পূর্বে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলাভারতের ত্রিপুরা, পশ্চিমে মাধবপুর উপজেলা

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

নামকরণ

[সম্পাদনা]

তুঙ্গাচল থেকে তরফ, তরফ থেকে চুনারুঘাট। চুনারুঘাটের প্রচীন নাম ছিল তুঙ্গাচল পরবর্তীতে সিপাসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন তুঙ্গাচল বিজয় করে নাম রাখেন তরফ রাজ্য৷ এই তরফ রাজ্য নামেই বহুকাল আগে ডাকা হতো চুনারুঘাটকে । ধীরে ধীরে নাম পরিবর্তন হয়ে এখন চুনারুঘাট নামেই পরিচিত। ব্যবসায়িক কারণে ত্রিপুরা রাজ্যের বণিকরা তরফ রাজ্যে চুনাপাথর নিয়ে আসতেন (খোয়াই) নদীপথে। প্রচুর চুনাপাথর এই অঞ্চলে আসত। ব্যবসায়ীগণ এখানে এসে চুনাপাথর ক্রয়-বিক্রয় করতেন। প্রথমে লোকে বলত চুনের-আট বা চুনাহাট, বর্তমানে বই বা পত্রিকাতে চুনারুঘাট লিখলেও গ্রামীন জনগণ চুনাআট বা চুনারঘাট নামেই ডাকেন। কালক্রমে এটি হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী জনপদ চুনারুঘাট। চুনারুঘাটের একটি পত্রিকা তরফ বার্তা ও একটি ইটের ভাটা তরফ বিক্সস চুনারুঘাটের প্রাচীন নামকে এখনো ধারণ করে৷

মুক্তিযুদ্ধে চুনারুঘাট

[সম্পাদনা]

মুক্তিযুদ্ধে চুনারুঘাট উপজেলা ৪নং সেক্টরের অধীনে ছিল। এই অঞ্চলের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর কমান্ডার (অবঃ) সি আর দত্ত (বীরউত্তম)। এছাড়াও আর অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধা চুনারুঘাটের হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন৷

প্রাচীন ইতিহাস

[সম্পাদনা]

চুনারুঘাটের রাজাপুর (টেকরঘাট) ছিল হিন্দু রাজ্য তুঙ্গাচলের রাজধানী। রাজা আছক নারায়ণ ছিলেন এর শেষ হিন্দু শাসক৷ যিনি ১৩০৪ সালে তরফ দখলে পরাজিত হন এবং তুঙ্গাচলের নাম পরিবর্তন করে তরফ রাখা হয় তরফের প্রথম মুসলিম শাসক ছিলেন সৈয়দ নাসিরুদ্দিন, যিনি বিখ্যাত মুরারবন্দ দরগাহ শরীফে সমাহিত হন।

১৫৮১ সালে চুনারুঘাটে তরফ ও (টুইপ্রা) ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্যে জিলকুয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। খোয়াই নদী ছিল অন্যান্য স্থানের সাথে যাতায়াত ও যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। বোড়াইল বা বড়াইল মৌজায় নদীর পশ্চিম তীরে একটি ঘাট ছিল। ব্যাবসায়িক কারণে ত্রিপুরা রাজ্যের বনিকরা তরফ রাজ্যে চুনাপাথর নিয়ে আসতেন (খোয়াই) নদীপথে। প্রচুর চুনাপাথর এই অঞ্চলে আসত। ব্যবসায়ীগণ এখানে এসে চুনাপাথর ক্রয়-বিক্রয় করতেন। প্রথমে লোকে বলত চুনের-আট বা চুনাহাট, বর্তমানে বই বা পত্রিকাতে চুনারুঘাট লিখলেও গ্রামীন জনগন চুনাআট বা চুনারঘাট নামেই ডাকেন। কালক্রমে এটি হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী জনপদ চুনারুঘাট।  ১৯১৪ সালে চুনারুঘাট থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। যা চুনারুঘাটের মুছিকান্দি গ্রামের নালমুখ  বাজারে। পরবর্তীতে নদী ভাঙনের শংকায় থানা বিলীন হতে পারে ভেবে বর্তমান বড়াইল মৌজায় চুনারুঘাট থানা স্থানান্তর করা করা হয়।

ভৌগোলিক উপাত্ত

[সম্পাদনা]

ভূপ্রকৃতি

[সম্পাদনা]

নদী- পাহাড়- বন - চা বাগান ঘেরা একটি উপজেলা চুনারুঘাট৷ ছোট বড় অসংখ্য বিল ও হাওর ঘেরা অঞ্চল ছিল চুনারুঘাট। ১০ টি বিশাল হাওর নিয়ে এই তরফ অঞ্চল ছিল। যদিও চুনারুঘাট উপজেলাতে বড় কোন হাওর নেই। নদী নালা মারা যাওয়ার ফলে তেমন পানি আর কোথাও দেখা মিলেনা। এই অঞ্চলের ছোট বড় অসংখ্য টিলা রয়েছে।

মৃত্তিকা

[সম্পাদনা]

নদ-নদী- খাল- বিল

[সম্পাদনা]

খোয়াই নদীর প্রাচীন নাম৷ প্রচীন নাম খোয়াই নামের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি প্রবাদ আছে : খোয়াই নদীর প্রাচীন নাম ক্ষমা বা ক্ষেমা । ক্ষেমা নাম করণের পেছনে একটি জনপ্রবাদ রয়েছে। একবার এক ভিনদেশী বণিক তার পানসী নৌকা নিয়ে এই নদীর তীরে নোঙ্গর করে ফেলে খাসিয়াদের একটি পূজা উৎসব উপভোগ করছিল। যুবকের রূপে মুগ্ধ হয়ে অভিজাত এক খাসিয়া কন্যা তাকে ভালবেসে বিয়ে করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করে । কিন্তু খাসিয়া সম্প্রদায় তাকে নিজেদের সম্প্রদায়ের একজন যুবকের সাথে ঐ কন্যার বিবাহ দিলে ক্ষেমা বা ক্ষাম নামের ঐ খাসিয়া কন্যা নদীতে আত্মাহুতি দেন । সেই থেকে এই নদীর নাম ক্ষেমা বা ক্ষমা৷ তবে প্রবাহমান খোয়াই নদী বাংলাদেশের অন্য সব নদী পথের মতো উত্তর থেকে দক্ষিণে নয় বরং দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হয়৷

করাঙ্গী ও সুতাং নদী এখনো প্রবাহমান। তাছাড়াও চন্দনা নামের একটি খাল যা দূত নগরায়নের ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে। চন্নার ডর নামে কিছু অংশ এখনো দৃশ্যমান তবে সেখানে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য।

রেলপথ

[সম্পাদনা]

হবিগঞ্জ বাজার–শায়েস্তাগঞ্জ–বাল্লা রেলপথ

উপনবেশিক ব্রিটিশ শাসন আমলে তৎকালীন (অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতের) আসাম প্রভেন্সির সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহুকুমায় রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ব্রিটিশ সরকার ১৯২৮ সালে হবিগঞ্জ বাজার-শায়েস্তাগঞ্জ-বাল্লা রেলপথ নির্মাণ করে গড়ে তুলে অবকাঠামো।[] ২০০৩ সালে এ লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।[]

শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ রেলপথ সেকশনে চারটি রেলওয়ে স্টেশন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৮ সালে।

শায়েস্তাগঞ্জ জংশন

বি.দ্র.: শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন ১৯০৩ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৮-২৯ সালে হবিগঞ্জ বাজার-শায়েস্তাগঞ্জ-বাল্লা রেলপথ সংযোগ ফাঁড়ি যোগাযোগ চালু হলে এটি জংশন রেলওয়ে স্টেশনে পরিণত হয়।

শায়েস্তাগঞ্জ-চুনারুঘাট রেলপথ সেকশনে সাতটি রেলওয়ে স্টেশন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে।

প্রশাসনিক এলাকা

[সম্পাদনা]
চুনারুঘাট উপজেলার মৌজা জিওকোড ম্যাপ

চুনারুঘাট উপজেলায় বর্তমানে ১টি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন রয়েছে। সম্পূর্ণ উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম চুনারুঘাট থানার আওতাধীন।[]

পৌরসভা:
ইউনিয়নসমূহ:

জনসংখ্যার উপাত্ত

[সম্পাদনা]

এই উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২,৬৭,০২০ জন (প্রায়), এর মধ্যে পুরুষ ১,৩৫,১২০ জন এবং মহিলা ১,৩১,৯০০ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৪৭২ জন/বর্গকিমি।

শিক্ষা

[সম্পাদনা]

শিক্ষার হার ৪৮%

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

[সম্পাদনা]

প্রাথমিক বিদ্যালয়

[সম্পাদনা]
প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থান স্থাপিত তারিখ
পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়পাইকপাড়া, পাইকপাড়া ইউনিয়ন
সতং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সতংবাজার, পাইকপাড়া ইউনিয়ন
মাঝিশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মাঝিশাল, পাইকপাড়া ইউনিয়ন
পীরেরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
হাজী ইছাদউল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দক্ষিণ নরপতি, চুনারুঘাট ইউনিয়ন
রানীগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রানীগাঁও, চুনারুঘাট

মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়

[সম্পাদনা]
উচ্চ বিদ্যালয় স্থান স্থাপিত তারিখ
আলহাজ্ব মোজাফফর উদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়পাইকপাড়া,পাইকপাড়া ইউনিয়ন১৯৮৪
শানখলা উচ্চ বিদ্যালয়শানখলা, শানখলা ইউনিয়ন১৯৮৯
তাহের শামসুন্নহার জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়চান্দপুর চা বাগান,
দক্ষিণা চরণ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়চুনারুঘাট, চুনারুঘাট উপজেলা১৯২৮
অগ্রণী উচ্চ বিদ্যালয়চান্দপুর,পাইকপাড়া ইউনিয়ন১৯৭০
আলোর পথে উচ্চ বিদ্যালয়চুনারুঘাট, চুনারুঘাট উপজেলা
আমুরোড হাই স্কুল এন্ড কলেজগোছাপারা১৯৬৬
রাজার বাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়রাজারবাজার, চুনারুঘাট উপজেলা
একডালা উচ্চ বিদ্যালয় (চুনারুঘাট)সোনাচং বাজার, চুনারুঘাট১৯৭৩
চুনারুঘাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
শাকির মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়
সাটিয়াজুরী উচ্চ বিদ্যালয়
শ্রীকুটা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় শ্রীকুটা বাজার,চুনারুঘাট ইউনিয়ন
আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ উত্তর বাজার,চুনারুঘাট ২০০৯
ছুবহে ছাদেক উচ্চ বিদ্যালয় ডেউয়াতলি,চুনারুঘাট

দাখিল মাদ্রাসা

[সম্পাদনা]
দাখিল মাদ্রাসা স্থান স্থাপিত তারিখ
পাইকপাড়া আজগর আহম্মদ দাখিল মাদ্রাসা, পাইকপাড়া ইউনিয়ন১৯৮১
সায়্যেদ কুতুবুল আউলিয়া দাখিল মাদ্রাসা নরপতি

ইবতেদায়ী মাদ্রাসা - স্থান - স্থাপিত তারিখ:

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী সুন্নীয়া মাদ্রাসা। হলদিউড়া।

স্থাপিত ১৯৮৬ ইংরেজি।

সরকারি কলেজ

[সম্পাদনা]
কলেজের নাম স্থান স্থাপিত তারিখ
চুনারুঘাট সরকারি কলেজচুনারুঘাট উপজেলা ১৯৭৩

সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

চুনারুঘাট উপজেলার মানুষের মূল ভাষা বাংলা। প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও গণমাধ্যমে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়। তবে কথ্য ভাষায় **সিলেটি উপভাষা** ব্যাপকভাবে প্রচলিত, যা সিলেট অঞ্চলের সাথে মিল রেখেই স্থানীয় উচ্চারণ, শব্দচয়ন ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্যে কিছুটা পার্থক্য রাখে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিলেটি ভাষার প্রভাব বেশি দেখা যায়।

উপজেলায় বসবাসকারী **আদিবাসী সম্প্রদায়** যেমন মণিপুরী, ত্রিপুরা, খাসিয়া ও সাঁওতালরা নিজেদের নিজস্ব ভাষা ও উপভাষা ব্যবহার করে থাকে:[]

  • **মণিপুরীরা** মৈতৈলোন বা মণিপুরী ভাষায় কথা বলেন, যা তিব্বত-বার্মান ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত।
  • **ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী** কোকবরক ভাষায় কথা বলেন।
  • **সাঁওতালরা** সাধারণত সাঁওতালি ভাষা ব্যবহার করেন, যা মুন্ডা ভাষার অন্তর্গত। কিছু কিছু মানুষ খাড়িয়া ভাষায় কথা বলে থাকেন যা একেবারেই দুর্লভ।
  • **খাসিয়ারা** খাসি ভাষায় কথা বলেন, যদিও অনেকেই এখন সিলেটি বাংলা ও বাংলা ভাষায় দক্ষ।

শিক্ষার প্রসার এবং শহরায়নের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে লোকসংস্কৃতি, গান ও পারিবারিক আলাপে উপভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রভাব এখনও টিকে আছে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  • বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০২৩
  • চুনারুঘাট উপজেলা প্রশাসন
  • সিলেটপিডিয়া: স্থানীয় ভাষা ও জাতিগোষ্ঠী
  • Manipur Language Resource Centre (MLRC), বাংলাদেশ শাখা রিপোর্ট

সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

চুনারুঘাট উপজেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এর জনজাতি, লোকাচার, ধর্মীয় উৎসব এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ আচার-আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। উপজেলায় বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মণিপুরী, ত্রিপুরা, খাসিয়া ও সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, সংগীত ও নৃত্য এই অঞ্চলের সংস্কৃতিকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।

ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান

[সম্পাদনা]

চুনারুঘাটে মুসলিম, হিন্দু ও বিভিন্ন আদিবাসী ধর্মাবলম্বীরা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিনীতিমতো উৎসব পালন করে থাকেন। ২০২৩ সালে উপজেলায় একটি মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।[]

আদিবাসী সংস্কৃতি ও জীবনধারা

[সম্পাদনা]

ত্রিপুরা, খাসিয়া, সাঁওতাল ও মণিপুরী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জীবনধারা, লোকাচার, ধর্মীয় আচার এবং ভাষা সংরক্ষিত রয়েছে। জুম চাষ, বাঁশের নৃত্য, ধর্মীয় নৈবেদ্য প্রদান ও ঐতিহ্যবাহী গানে তাঁদের সংস্কৃতি প্রকাশ পায়। বৈসাবি উৎসব সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দিন পালিত হয়।

লোকজ উৎসব ও মেলা

[সম্পাদনা]
  • **বৈশাখী মেলা (পীরের বাজার)**
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে চুনারুঘাটের পীরের বাজারে শতবর্ষী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কৃষি উপকরণ, হস্তশিল্প, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা এবং গ্রামীণ পণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে এটি একটি কৃষি ও লোকসংস্কৃতিনির্ভর বিশাল আয়োজন। বিভিন্ন জেলার দোকানিরা এতে অংশ নেন।  
_তথ্যসূত্র: সমকাল, এপ্রিল ২০২৫_
  • **হাতুন্ডা গ্রামের তিন-দিনব্যাপী উৎসব**
চুনারুঘাট উপজেলার হাতুন্ডা গ্রামে প্রতিবছর তিন-দিনব্যাপী একটি গ্রামীণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যাতে লোকনৃত্য, পল্লীসংগীত, গ্রামীণ খেলাধুলা, হস্তশিল্প ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত থাকে। এটি স্থানীয়দের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মিলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

** নরপতি গ্রামের ঐতিয্যবাহি মেলা **

চুনারুঘাট উপজেলার মুরারবন (১২০ আউলিয়ার মাজার) নামক স্থানে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিন দিন ব্যাপি একটি ঐতিয্যবাহি মেলা অনুষ্টিত হয়। উক্ত মেলায় দেশেল বিভন্ন স্থানের মানুষ অংশগ্রহন করে এবং মেলায় নাগর দৌলনা থেকে শুরু করে সকল প্রকার বাহারি খাবার ও বিভিন্ন প্রকার ছুট বাচ্চাদের খেলনা পাওয়া যায়। এছাড়াও, একই দিনে উক্ত মেলার পাশা-পাশি মাজার সংলগ্ন এলাকায় ওরস এর আয়োজন করা হয়, এবং ওরসে বিভিন্ন কাফেলা, মিলাদ, ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন হয়ে থাকে (ALN)।[]

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান

[সম্পাদনা]

উপজেলায় ১৯৬৮ সালে প্রথম পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর “সাহিত্য নিকেতন” নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী গঠিত হয়, যা স্থানীয় কলেজ-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নেয়। ১৯৮৯ সালে 'চুনারুঘাট সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ' প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিষদের মাধ্যমে কবিতা, নাটক, সংগীত, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়। ২০১৯ সালে পরিষদের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বৃহৎ উৎসব পালিত হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা অংশগ্রহণ করেন।া

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  • বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, উপজেলা প্রতিবেদন ২০২৩
  • সমকাল: “চুনারুঘাটের বৈশাখী মেলা”, ১৫ এপ্রিল ২০২৫
  • উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশনা
  • স্থানীয় ইতিহাস সংকলন ও সাহিত্য পরিষদের প্রতিবেদন

অর্থনীতি

[সম্পাদনা]

== অর্থনীতি ==

চুনারুঘাট উপজেলার অর্থনীতি প্রধানত কৃষিভিত্তিক। উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত এবং ধান, পাট, সরিষা, আলু ও শাকসবজি এখানকার প্রধান কৃষিপণ্য। এছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে আখ, আদা ও হলুদের চাষও লক্ষ্য করা যায়।[]

উপজেলাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো চা শিল্প ও বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা। চুনারুঘাট ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় একাধিক চা-বাগান রয়েছে, যার মধ্যে রেমা চা বাগান, কালেঙ্গা চা বাগান ও চৌধুরী চা বাগান উল্লেখযোগ্য। এই চা শিল্প শুধু স্থানীয় কর্মসংস্থানই তৈরি করে না, বরং জাতীয় চা উৎপাদনেও অবদান রাখে।

বনজ সম্পদের মধ্যে রেমা–কালেঙ্গা বনাঞ্চল উল্লেখযোগ্য, যা থেকে কাঠ, বাঁশ, গাছের ছাল ও ওষুধি গাছ সংগ্রহ করা হয়। বনভিত্তিক জীবিকা যেমন গাছচাষ, মৌমাছি পালন ও গাইডিং-ভিত্তিক পর্যটনও অর্থনীতিতে প্রভাব রাখে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুনারুঘাটে একটি ক্ষুদ্র রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ) গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও, চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান এবং রেমা–কালেঙ্গা বনের কারণে পর্যটন খাতও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি করছে।

== তথ্যসূত্র ==

* বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, উপজেলা প্রতিবেদন ২০২৩

* চুনারুঘাট উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

* [শেয়ার বিজ: চুনারুঘাটে চা শিল্প](https://sharebiz.net/চুনারুঘাট-ও-চা-শিল্প/)

* [সময়ের আলো: সীমান্ত বন্দর ও পর্যটন সম্ভাবনা](https://www.shomoyeralo.com/news/53677)

খেলাধুলা

[সম্পাদনা]

চুনারুঘাট উপজেলায় সব ধরনের খেলাধুলা প্রচলিত থাকলেও এই অঞ্চলে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ফুটবল খেলাটি ছোট বড় সকল মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে ।পাশাপাশি ক্রিকেট খেলাও বেশ জনপ্রিয়।

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ত্ব

[সম্পাদনা]
সৈয়দ নাসির উদ্দীনের মাজার
  • চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত): বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, সেক্টর নং ৪ (৪নং সেক্টর)। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত।[১]
  • ড. এম এ রশীদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ও সাবেক মন্ত্রী।
  • এনামুল হক মোস্তফা শহীদ:- মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী।
  • হেমাঙ্গ বিশ্বাস (জন্ম: ১৪ ডিসেম্বর ১৯১২ - মৃত্যূ: ২২ নভেম্বর ১৯৮৭[১]), একজন বাঙালি অসমীয়া সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার। মূলত লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
  • সৈয়দ নাসির উদ্দীন, সিলেট বিজেতা হযরত শাহ জালালের অন্যতম সঙ্গী অনুসারী ও সিলেট অভিযানে প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন
  • বিচারপতি মোঃ আব্দুল হাই, চুনারুঘাট উপজেলার ১ম বিচারপতি ও ১ম জেলা ও দায়রা জজ। তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবও ছিলেন।
  • সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন, ব্যারিস্টার, আইনজীবী এবং সাবেক সংসদ সদস্য, হবিগঞ্জ-৪।
  • সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান , গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, বাংলাদেশ সরকারের 'বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের 'পরিবেশ পুরস্কার ' জয়ী প্রথম নারী। তাছাড়ও ২০২২ সালে অন্তর্জাতিক সাহসী নারী পুরস্কার পান তিনি।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন ২০১৪)। "এক নজরে চুনারুঘাট"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ১২ জুলাই ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৫
  2. 1 2 "হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ লুট"mzamin.com। ৩১ অক্টোবর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ২৫ অক্টোবর ২০২২
  3. "ইউনিয়নসমূহ - চুনারুঘাট উপজেলা"chunarughat.habiganj.gov.bd। জাতীয় তথ্য বাতায়ন। ২৭ জুলাই ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২০
  4. ফাহাদ, মো (৬/৭/২০২৫)। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য); |url= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য); |তারিখ= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  5. মো, ফাহাদ (৬/৭/২০২৫)। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য); |url= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য); |তারিখ= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  6. আলম, রাফাত (2025-10)। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩: উদ যাপন, সাহিত্যসৃজন ও রাজনীতি। Center for Advanced Research in Arts and Social Sciences (CARASS), University of Dhaka। পৃ. ৪৭–৬৬। {{বই উদ্ধৃতি}}: |তারিখ= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  7. ফাহাদ, মো। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য); |url= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]