শান্তিগঞ্জ উপজেলা

স্থানাঙ্ক: ২৪°৫৬′২২.২৩৬″ উত্তর ৯১°২৪′৪৮.৯২৪″ পূর্ব / ২৪.৯৩৯৫১০০০° উত্তর ৯১.৪১৩৫৯০০০° পূর্ব / 24.93951000; 91.41359000
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শান্তিগঞ্জ
উপজেলা
বাংলাদেশে শান্তিগঞ্জ উপজেলার অবস্থান
বাংলাদেশে শান্তিগঞ্জ উপজেলার অবস্থান
শান্তিগঞ্জ সিলেট বিভাগ-এ অবস্থিত
শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ
বাংলাদেশে শান্তিগঞ্জ উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৪°৫৬′২২.২৩৬″ উত্তর ৯১°২৪′৪৮.৯২৪″ পূর্ব / ২৪.৯৩৯৫১০০০° উত্তর ৯১.৪১৩৫৯০০০° পূর্ব / 24.93951000; 91.41359000 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশবাংলাদেশ
বিভাগসিলেট বিভাগ
জেলাসুনামগঞ্জ জেলা
আয়তন
 • মোট২৮৬.২৫ বর্গকিমি (১১০.৫২ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[১]
 • মোট১,৮৩,৮৮১
 • জনঘনত্ব৬৪০/বর্গকিমি (১,৭০০/বর্গমাইল)
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
প্রশাসনিক
বিভাগের কোড
৬০ ৯০ ২৭
ওয়েবসাইটপ্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

শান্তিগঞ্জ উপজেলা (সিলেটি ভাষা: ꠡꠣꠘ꠆ꠔꠤꠉꠘ꠆ꠎ) বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২৭ জুলাই ২০০৬ তারিখে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে “দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা” নামক উপজেলা ঘোষণা করা হয়, এর ফলে ১৮ মে ২০০৮ তারিখ থেকে এ উপজেলাটি নবসৃষ্ট উপজেলা হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। ২০২১ সালের ২৬ জুলাই এ উপজেলার নাম পরিবর্তন করে “শান্তিগঞ্জ উপজেলা” রাখা হয়।[২]

ভৌগোলিক অবস্থান[সম্পাদনা]

এই উপজেলার উত্তরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, দক্ষিণে জগন্নাথপুর উপজেলা, পূর্বে ছাতক উপজেলাজগন্নাথপুর উপজেলা, পশ্চিমে দিরাই উপজেলাজামালগঞ্জ উপজেলা

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে ৮টি ইউনিয়ন রয়েছে। সম্পূর্ণ উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শান্তিগঞ্জ থানার আওতাধীন।[৩]

ইউনিয়নসমূহ:

ইতিহাস[সম্পাদনা]

দর্শনীয় স্থানসমূহ[সম্পাদনা]

  • পাগলা জামে মসজিদ
  • পাগলা সড়ক
  • জনপথ বিভাগের ডাকবাংলো
  • হিজল-করচ বাগ
  • দেখার হাওর
  • শান্তিগঞ্জ হ্যাচারি
  • সংহাই হাওর
  • রাধামাধব জিওর আখড়া–পাথারিয়া
  • শাহ আয়ুব আলীর মাজার
  • খেতা শাহের মাজার
  • বড় বিল মৎস প্রজনন কেন্দ্র

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০১ সালে ছাতক উপজেলার জনসংখ্যা ১,৮৩,৮৮১ জন। প্রতি বর্গ কি: মি: এ লোক সংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৬৪৩ জন।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  গড় হার ৩১.১৬%; পুরুষ ২৮.৪৫%, মহিলা ২৭.৫১%। কলেজ ১, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৩, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৯৫, মাদ্রাসা ৫। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ: পাগলা উচ্চ বিদ্যালয়, নোয়াখালী সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়, গণিনগর ষোলগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়, ডুংরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, জয়কলস উজানীগাঁও রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সুরমা উচ্চ বিদ্যালয়, পূর্ব পাগলা উচ্চ বিদ্যালয়, পাইকাাপন সরকারি

প্রাথমিক বিদ্যালয়, উজানীগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আক্তাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডুংরিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মানিকপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাথারিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, গনীগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বীরগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, রনসী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিকারকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামেয়া ইস. হাজী আক্রাম আলী দাখিল মাদ্রাসা, আমরিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান লাইব্রেরি ১, মহিলা সংগঠন ১, খেলার  মাঠ ৩৮।

জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৭০.৩৯%, অকৃষি শ্রমিক ৩.৬৯%, শিল্প ০.৪৯%, ব্যবসা ৭.১৫%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ০.৫২%, চাকরি ২.৭৫%, নির্মাণ ০.৪২%, ধর্মীয় সেবা ০.৩৭%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ৩.৫৪% এবং    অন্যান্য ১০.৬৮%।

কৃষিভূমির মালিকানা ভূমিমালিক ৪৩.৭২%, ভূমিহীন ৫৬.২৮%।

প্রধান কৃষি ফসল ধান, গম, সরিষা, শাকসবজি।

বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় ফসলাদি তিল, কাউন, অড়হর, তামাক।

প্রধান ফল-ফলাদি  আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পেয়ারা, আনারস।

মৎস্য, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার  মৎস্য ১৭৫, হাঁস-মুরগি ৬০, গবাদিপশু ৭।

যোগাযোগ বিশেষত্ব পাকারাস্তা ৪০.৩৩ কিমি, আধা-পাকারাস্তা ১০ কিমি, কাঁচারাস্তা ২৫৫ কিমি; নৌপথ ১৫ নটিক্যাল মাইল।

বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় সনাতন বাহন পাল্কি, গরুর গাড়ি।

শিল্প ও কলকারখানা আটাকল, বরফকল, কোল্ডস্টোরেজ ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ওয়েলডিং কারখানা,

টেক্সটাইল কারখানা, খাদ্যগুদাম,

কুটিরশিল্প লৌহশিল্প, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতের কাজ।

হাটবাজার ও মেলা হাটবাজার ২০। টুকের বাজার, বীরগাঁও বাজার, বাংলা বাজার, পাথারিয়া বাজার, মিনা বাজার, জয়কলস বাজার, নোয়াখালী বাজার, গনিগঞ্জ বাজার উল্লেখযোগ্য।

প্রধান রপ্তানিদ্রব্য মাছ,  ধান, শাকসবজি।

বিদ্যুৎ ব্যবহার :

শতভাগ বিদ্যুতায়ীত উপজেলা শান্তিগঞ্জ।

পানীয়জলের উৎস নলকূপ ৭২.৪৮%, পুকুর ১৩.৬৪%, ট্যাপ ০.৯২% এবং অন্যান্য ১২.৯৬%।

স্যানিটেশন ব্যবস্থা এ উপজেলার ১৪.৫৩% পরিবার স্বাস্থ্যকর এবং ৭৩.৬৪% পরিবার অস্বাস্থাকর ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। ১১.৮৩% পরিবারের কোনো ল্যাট্রিন সুবিধা নেই।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৫, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ২, ক্লিনিক ১৭।

এনজিও ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা।  [রাজীব মন্ডল]

তথ্যসূত্র আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মাছ ধরা কাজের উপর নির্ভরশীল। কৃষিপণ্যের মধ্যে ধান আর পাটের বিপুল আবাদ রয়েছে। এছাড়া আছে হাওর ভরা মাছ। পাশাপাশি উপজেলার প্রচুর লোক বহির্দেশে বসবাস করায় তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপরও এলাকার অর্থনীতি নির্ভরশীল।

বিবিধ[সম্পাদনা]

সাহিত্য:

'চণ্ড্রীডহর ও বটবৃক্ষ'

ওবায়দুল মুন্সী।

'চণ্ড্রীডহর' নামের উৎপত্তি:

শ্ৰীহট্টের ইতিবৃত্তে বলা আছে যে, আদিদেবের সময় হইতেই প্রাকৃতিক নিয়মে বরবক্রের গতি পরিবর্তিত হইতে থাকে, এবং এই সময়েই তাহা সুসম্পন্ন হয়। ফলতঃ বরবক্রের পরিত্যক্ত সেই ভূভাগই বরগঙ্গা নামে খ্যাতি লাভ করে। পরে চণ্ডীদেবীকে তদীয় পিতা কর্তৃক সেই ভূমিই প্রদত্ত হইয়াছিল। মধুকর পত্নীসহ বরগঙ্গাবাসী হইলেন। নদীর মধ্যে মধ্যে আবৰ্ত্তময় গভীর স্থানকে এদেশে “ডহর” বলা হয়। কথিত আছে তত্ৰত একটি ডহরেই চণ্ডীদেবী প্রথমে গঙ্গার দর্শন বা কৃপা নিদর্শন ও প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন। এবং সেই জন্য তাহা “চণ্ডীডহর” নামেই খ্যাত আছে। চণ্ডীডহরের পশ্চিম “চণ্ডীপুর” গ্রামে হিরণ্যগর্ভ এই গ্রাম কন্যাকে দিয়াছিলেন। কিন্তু চণ্ডীদেবী চণ্ডীপুরে অবস্থিতি না করিয়া স্বামীর সহিত নিজ বরুঙ্গাতেই বসতি করেন। বংশ বিস্তার কাল সহকারে চণ্ডীর গর্ভে মধুকরের চারিপুত্রের জন্ম হয়। ইহাদের নাম কীৰ্ত্তিদ, রঙ্গদ, উপেন্দ্র ও কৃত্তিবাস এই চারি পুত্রের জন্মের পর চণ্ডী পুনৰ্ব্বার গর্ভবতী হন, কিন্তু সেবার মনুষ্য শিশুর পরিবৰ্ত্তে একটি সপশিশু জাত হয়। ধাৰ্ম্মিক জননী ইহাকে ফেলিয়া না দিয়া দুগ্ধ দানে প্রতিপালন করিতেন । মধুকর মিশ্রের পুত্ৰগণ যখন প্রাপ্তবয়স্ক হইয়া উঠিলেন, তখন তিনি তাহদের বিবাহাদি দিয়া সাংসারিক সমস্ত ভার তাহদের উপর ন্যস্ত করতঃ ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মে রত হইলেন। কথিত আছে যে এই সময় একদা কীৰ্ত্তিদ-পত্নী শাশুড়ীর আজ্ঞায় সপকে দুগ্ধ দিতে গিয়া তৎপ্রতি অত্যাচার করায় ফণী ক্রুদ্ধ হইয়া বনে চলিয়া যান, এই ঘটনার পব মধুকর মিশ্র ও চণ্ডীদেবী কাশীধামে গমন করেন।১° ৭ “রামণের বসতি স্থান বড়গঙ্গা গ্রামে। বিয়া কবি মধু মিশ্র বৈল সেই গ্রামে। —প্রেমবিলাস গ্রন্থ । ৮ শ্ৰীমন্মধুকর মিশ্রের বংশাবলী তালিকা ক খ পবিশিষ্টে দ্রষ্টব্য। শ্রীচৈতন্য চবিতামৃত ও চৈতন্য ভাগবতাদি গ্রন্থের ও প্রাচীন বংশ তালিকা মতে উপেন্দ্র মিশ্রের ও তৎ পিতাব নাম আমবা লিপিবদ্ধ করিলাম। উপেন্দ্র মিশ্রের পুত্ৰই জগন্নাথ মিশ্র কিন্তু অন্যান্য লেখকগণ ইহাদের নাম বিভিন্ন রূপে লিখিয়াছেন। বৈদিক কুলমঞ্জুরী ও কুলপঞ্জিকা মতে উপেন্দ্র মিশ্রের পিতার নাম মধুকর স্থলে যদুনাথ লিখিত হইয়াছে তাহাব দশম পুরুষ উদ্ধে কনোজা বমানাথের পুত্র শ্রীমানকে ইহার পূৰ্ব্বপুরুষ বলা গিয়াছে। কিন্তু গোপীনাথ কষ্ঠাভবণ মতে উপেন্দ্র নামের স্থলে রমাপতি ও তৎপিতা মধুকবের নাম শিবরাম বলা হইযাছে এবং তাহাকে পূৰ্ব্বোক্ত শ্রীমান বংশ্য না বলিয়া, শ্রীমানেব ভ্রাতা জিতামিশ্রেব বংশীয় বলিযা প্রকাশ করা হইয়াছে ! আবাব কবি জয়ানদেব মতে উপেন্দ্র মিশ্রের নাম জনাৰ্দ্দন ও তৎপিতা মধুকব ধনঞ্জয় হইয়া গিযাছেন!!! এরূপ বৈষম্যের কাবণ কি ? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ সম্বন্ধেই যখন এরূপ, তখন বঙ্গের সামাজিক ইতিহাসে সত্য প্রকটন কিরূপ দুরূহ যে, মধুকর মিশ্র ইহাই বোধ হয় যে, মধুকর মিশ্র শ্রীহট্টে নবাগত; স্থানান্তরে তাহার অন্য নাম থাকা অসম্ভব নহে এবং শ্রীহট্টে তিনি মধুকর নামেই পবিচিত হন। পক্ষান্তরে অন্যান্য কুলগ্রন্থ রচয়িতাদের ভ্রম হওয়াও বিচিত্র নহে;ত্রম না হইলে বিভিন্ন কুলগ্রন্থে বিভিন্ন নাম থাকা অসম্ভব হইত। জয়ানন্দের ভ্রম স্পষ্টতঃ দেখা যায়। তিনি উপেন্দ্র নামই উল্লেখ করেন নাই। এস্থলে উপেন্দ্র মিশ্রের পৌত্র প্রদ্যুম্ন মিশ্র, ও গৌরপার্ষদ মুরারি গুপ্তের মত এবং প্রেমবিলাসাদি অন্যান্য প্রামাণ্য বৈষ্ণব গ্রন্থের বিবরণ গ্রহণ করাই সঙ্গত। বংশ তালিকায়ও তাহার সহিত ঐক্য হয়। পরবর্তী ৩য় অধ্যায়ে উপেন্দ্র মিশ্রের বংশ কথা দ্রষ্টব্য। ১০. "তবে মধুকর মিশ্র চণ্ডিকা সহিতে। পুত্ৰগণে রাজ্য দিয়া গেলেন কাশীতে।"- শ্রীচৈতন্যরত্নাবলী।

এই ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়,চণ্ড্রী দেবীর নামেই এই 'চণ্ড্রীডহর' নামকরণ হয়েছে। পূর্বে এই অঞ্চলগুলো যে সনাতনধর্মালম্বী ছিলেন দিরাই চণ্ড্রীপুর তার সাক্ষ্য বহন করছে।কামারখাল নদী, মহাসিং নদী এবং নলজুরি নদীর ত্রিমুখী এই গভীর তলদেশ তাই 'ডহর' এবং চণ্ডীদেবীর নামেই হয়েছে। এই চণ্ড্রিডহর নিয়ে আমার একটি কবিতা :

"ছোট্র একটি গ্রাম

পাইকাপন  যার  নাম

সেই  গ্রামের একটি  নদি

তিনটি  থানার অধিপতি"।

অষ্টম শ্রেণী'তে থাকাকালে এই

কবিতাটি লিখেছিলাম। সম্ভত

দৈনিক কাজীরবাজার

পত্রিকায়-২০০৩ সালে  প্রকাশিত  হয়েছিলো। অধিপতি

বলতে আমি 'চণ্ড্রডহর'কেই বুঝিয়েছি। সুরমা নদির শাখানদী মহাসিং'এর উপশাখা

হচ্ছে চণ্ড্রীডহর। তার আবার তিনটি নালামুখ আছে।মহাসিং'এ আছে একটি,

আরেকটি বয়ে গেছে বাউল  সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কালনি  নদী'তে এবং অপরটি

আজমিরীগঞ্জের কুশিয়ারায়।

চণ্ড্রীডহরে'র তিনপাড়ে, তিন থানার তিনটি গ্রাম। একটি আমার গ্রাম পাইকাপন থানা

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ।আরেকটি তেলিকোণা, জগন্নাথপুর এবং

সিকন্দরপুর গ্রামটি হচ্ছে দিরাই

থানার।প্রতিবছর চৈত্রমাসে চণ্ড্রীডহরে মাছধরার প্রতিযোগিতা হতো। অনেক দুর

দুরান্ত থেকে হরেক রকম জাল

নিয়ে জেলে'রা আসতো। আমার ছেলেবেলার সাথী -কিরণ,সাদিক,জাহাজ্ঞীর,মঞ্জু,

আকতার, মতিন সহ সব্বাই মিলে এই মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করতাম। কতো বড়ো

বড়ো রুই, কাতলা, ইলিশ, বোয়ালসহ ছোট ছোট অনেক

প্রজাতি'র মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়তো। আর তাড়া

খেয়ে তীরে লাফিয়ে উঠতো ছোট -বড়ো অনেক মাছ! হাজার-হাজার মানুষ হতো এই

মাছধরার প্রতিযোগিতায়।কেউ

খালি হাতে ফিরতোনা।আমার

এখনো ঠিক মনে আছে, চণ্ড্রীর

চরথেকে একটি বোয়াল মাছ

ধরেছিলাম। তখন সে কী আনন্দ! তা বলে বুঝাতে পারবো না।এখন আগের মত

চণ্ড্রীডহরে সেই মাছ আর নেই।

আস্তে-আস্তে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে এই চণ্ড্রীডহর!এবং সাথে তার

একমাত্র সুখ-দুখের সাথী বটবৃক্ষটিও।

ধারণা করা যায়, কোন এক সময় এখানে চণ্ড্রীপূজো হতো

বলে হয়তো------- এর নামকরণ

হয়েছে 'চণ্ড্রীডহর'।আর-বটবৃক্ষটি তারই সাক্ষ্য বহণ করছে। কতো কাহিনী গাথাঁ

আছে আমার এই চণ্ড্রী'কে নিয়ে।শুনেছি -অনেক দৈত্য-দানবের বসবাস ছিলো চণ্ড্রীডহরে।কতো মানুষ,গরু,ছাগল,মহিষ খেয়েছে

চণ্ড্রী! পাইকাপন গ্রামের জৈনিক

পীরসাহেব শাহ আয়ূব আলী ও

হুসেনপুর গ্রামের সৈয়দ বাড়ি'র

সৈয়দ আনাস আলী পীরসাহেব দু'জন মিলে নাকি তাড়িয়ে ছিলেন  এই দৈত্য-দানবদের।

আমার দাদা হযরত ঈমানী মুন্সী।তিনিও একজন কামিল

মানুষ ছিলেন। দাদা'কে আমি

দেখিনি,দাদীর মুখে শুনেছি-

আমার দাদার সাথে নাকি রাত্রিবেলা যেখানে যেতেন দুটি

অজগর সাঁপ থাকতো।দাদা

এসে ঘুমিয়ে গেলে সারারাত আমাদের বাড়ি পাহাড়া দিত।

বাড়ির পাশে পুকুরে বড়ো একটি চিতল মাছ বাস করতো।

কিন্তু কেউ থাকে ধরতে পারতো না! আকারে ছিলো একজন মানুষের মতোই। দুপুর ১২টার

সময় একবার তাকে দেখা যেতো আবার ঠিক রাত্রি ১২টায় লাফিয়ে উঠতো। দাদার

হাতেও অনেক অলৌকিল ক্ষমতা ছিলো! কিন্তু, তিনি তা

জাহির করেন নি। শাহ আয়ূব

আলী পীরসাহেবও দাদা'কে-

সম্মান করতেন।দাদাজী মারা

যাওয়ার পরে,সেই সাঁপ দুটি এবং চিতল মাছটি'কে আর

দেখা যায়নি। এরপরে বাড়ির

পুকুর প্রতিবছর চৈত্রমাসে অনেক মাছে ভরে যেতো।

মলা,চিংড়ি,পুঁটি,খলসা মাছসহ

একেক বছরে একেক ধরনের

মাছে ভরে যেতো পুকুরটি! আমি ও সেজু আপা মিলে, কতো মাছ ধরেছি এই পুকুরে!

বাড়ির পুকুরটিও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাইতো আমার গানের

ভাষায় বলি- "উত্থান-পতনের

কতো খেলা, খেলিছে মহাকাল!

কতো সভ্যতা এসেছে -গেছে

উড়ায়ে যুগের পাল"। আজ-

চণ্ড্রীডহর ও বটবৃক্ষটি কেমন

যেনো- বিলিন হয়ে যাচ্ছে!

পাইকাপন,সুনামগঞ্জ

সোমবার,২৬ মাঘ ১৪২২ বাংলা।


ত্রিনামে পরিচিত যে গ্রাম

           ওবায়দুল মুন্সী

ত্রিনামে যে গ্রামখানি তিন মুখের ডহর

হাওর-নদীর কূলঘেঁষে আছে দাঁড়িয়ে

ছমাস জলে ভাসে ছমাস ডাঙায় হাসে

আপন করে বুকে টানে হাত বাড়িয়ে।

মহাসিং-কামারখাল দুদিকে দুই নদী

জন্ম থেকেই চলছে বয়ে নিরবধি।

নৈগাঙ-হোসেনপুর, পাইকাপন নামে

ডাক শুনেছি, শুনি এখন ডানে-বামে।

মায়াময়ী জন্মভিটা দেখতে লাগে ভালো

সবার কালো দূর করেছে জ্বেলে তারই আলো।

শিশুবেলা পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর, কাদিপুর, আসামপুর,পুরানবাড়ি, নোয়াগাঁও, ইসলামপুর ইত্যাদি গ্রামগুলোতে প্রায় আসতাম। কৈশোরে তারও বেশি! এর কারণ হিসেবে আমি যা বুঝেছি, সেটা হলো- আমাদের পূর্বপুরুষরা আর উক্ত গ্রামগুলোর মানুষের মধ্যে বিয়ের দেওয়া নেওয়ার বেশ প্রচলন ছিল। আমার দাদার বাবার বাবা সবাই নাকি এই পাগলাতেই বিয়ে করেছেন এবং তাদের বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ের বিয়েও এখানে দিয়েছেন। কিন্তু আমার বাবা গোলাম মোস্তফা-ই শুধু ব্যতিক্রম ছিলেন। দাদা, বাবাকে বিয়ে করিয়েছেন দিরাই থানার দিকন্দরপুর গ্রামের ছদরিবাড়ি (একসময় হুসেন খাঁ জমিদারের স্নানঘাট ছিল) চৌধুরী বাড়ি নামেই লোকেরা জানে এবং ডাকেও। আমার মা ফিরোজা বেগম নানার খুবই আদরের মেয়ে ছিলেন। দাদা, মাকে পড়াতেন তাই পছন্দ করে বাবার জন্য এনেছিলেন। আমি যখন ক্লাস থ্রী তে পড়ি প্রথমবার পাগলায়  গিয়েছিলাম। এক বৃদ্ধলোক আমায় জিঙ্গেস করছিলেন যে, বাড়ি কই? তখন আমার এক ফুফাতো বোন বলেছিল- নৈগাঙ! অন্যরা কেউ কেউ হোসেনপুরও বলতো। আমাদের সমবয়সী যারা এঁরা পাইকাপন নামেই চিনতো।কিন্তু নৈগাঙ ও হোসেনপুর এই দুটি নাম নিয়ে সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ভাবতাম।সেই ভাবনা, জনস্রোতী ও আমার অভিজ্ঞতার আলোকে যা বুঝেছি, যেমন- নৈগাঙ।

এটা উপজাতিক ভাষা। একসময় আমার গ্রাম সহ অন্যান্য এলাকা খাশিয়া রাজার দখলে ছিল। তাদের দেওয়া নামটি হয়তো এই নৈগাঙ। তাছাড়া, নৈগাঙ নামে পরগণাও এই এলাকায় ছিল জমিদারি আমলে। তাই নৈগাঙ- হয়েছে। সম্প্রতি সিলেটের বহুল প্রচলিত একটি লোকগান বা বিয়ের গীত নিয়ে খুব জোরেসোরে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে বিজ্ঞজনদের মাধ্যে। অনেকেই বিভিন্নভাবে নানান যুক্তি দিয়ে গানের প্রকৃতি উপস্থাপন করেছেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমিও যদি বলি যে, 'নুয়া' শব্দটি প্রাচীন উপজাতিক ভাষা। যা খাশিয়া রাজার সময়ে নৈগাঙ পরগণার অজ্ঞাত এক খাশিয়া মহিল লোক কবির রচিত বিয়ের গীত। কিন্তু কোনো ভাবেই এটা যে পুরুষ কবির রচনা নয় সেটা গানের কথাগুলোই প্রমাণ করে। 'নুয়া শব্দের পরিবর্তনীয় রূপই হচ্ছে-'নয়া' অর্থাৎ নতুন। 'আইলারে নয়া দামান' এগুলো আমার এলাকারই শব্দ। যেমন- আইয়ার, যাইয়ার খাইয়ার, আইলা, যাইলা,খাইলা,তেরা, হাইল,মুড়া, গাইল,  ইত্যাদি শব্দগুলোও প্রমাণ করে এটা আমার অঞ্চলেরই গান। যেহেতু এই অঞ্চলটি খাশিয়ারা শাসন করে গেছেন। সেই হিসেবে মনে করি, আমার যুক্তিটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। আশাকরি, গবেষকবৃন্দ আমার এই বিষয়টি গুরুতসহকারে ভেবে দেখবেন। প্রয়োজনে, এখনো এলায়কায় গিয়ে এই শব্দগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেন।

এবার আসি হুসেনপুর নাম প্রসঙ্গে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অচ্যুত চরণ তত্তনিধির শ্রীহট্রের ইতিহাস উত্তর-পূর্ব খণ্ডে উল্লেখ আছে যে, হুসেন খাঁ নামে বিখ্যাত এক জমিদারের নামে হুসেনপুর গ্রামের উতপত্তি লাভ করেছিল। বর্তমান দিরাই থানার জগদল ইউনিয়নের হুসেনপুর গ্রামটি তারই সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু ধিরে ধিরে যখন নতুন নতুন গ্রামের সৃষ্টি হতে থাকে সেগুলোও নৈগাঙ-হোসেনপুর নামে পরিচিত থাকে। কালের বিবর্তনে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নবসৃষ্ট গ্রামগুলোও তার নিজ পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। আজকের, পাইকাপন, আসামপুর, কামারখাল, তেলিকোনা, দিকন্দরপুর, দৌলতপুর ইত্যাদি গ্রামগুলোই প্রমাণ করছে।

এবার শোনাবো পাইকাপন নামটি কীভাবে হলো। জনস্রোতী আছে যে,পাইকাপন গ্রামের কোনো এক স্থানে জমিদারদের খাজনার 'পাই' বা সিক্কা/সিকি গণনা করা হতো। 'পাই','কাহন','পণ' এই শব্দগুলোর পরিবর্তন রূপই হলো পাইকাপন। কাহন মানে ১৬ পণ অর্থাৎ ১২৮০ টি বা বহুসংখ্যক বা অসংখ্য। ১ পণ মানে ৮০ টি তাই ১৬ পণ=১৬×৮০=১২৮০ টি। এই হিসাবের সূত্র থেকেই যে পাইকাপন নামের সূচনা হয়েছে সেটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না! আমার গ্রামটি বর্তমান দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউপির ৯ নং ওয়ার্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমার প্রিয় গ্রামটি খুবই সুন্দর। বর্ষাকালে চারিদিকে পানিবেষ্টিত হয়ে গেলে একমাত্র বাহন নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। ভাটি রত্ন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শতভাগ বিদ্যুতায়ীত এবং  বর্তমান যোগাযোগব্যবস্থা আস্তে আস্তে উন্নত হচ্ছে। এখন খেয়া পাড়ি দিয়ে চণ্ড্রিডহর পূর্বপারে, জগন্নাথপুর উপজেলার তেলিকোনা গ্রামের রাস্তা দিয়ে সহজেই অল্প সময়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। যখন প্রস্তাবিত দিকন্দরপুর-পাইকাপন ও পাইকাপন জামখলা-তেলিকোনা ব্রিজ কমপ্লিট হয়ে যাবে, তখন সারাদেশের সাথে আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠবে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়!

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন ২০১৪)। "আঞ্চলিক পরিচিতি"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. "দেশে নতুন উপজেলা হচ্ছে ৩টি"রাইজিংবিডি.কম। ২৬ জুলাই ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুলাই ২০২১ 
  3. "ইউনিয়নসমূহ - দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা"southsunamganj.sunamganj.gov.bd। জাতীয় তথ্য বাতায়ন। ৩১ অক্টোবর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০২০ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]