ইসলামে নিয়তি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search

নিয়তি (আরবি: قدر‎‎,নিয়তি, অর্থ অদৃষ্ট, বিধিলিপি, ভাগ্যের লিখন, কপাল, বরাত, কিসমত)[১] বলতে বুঝায় আল্লাহ কর্তৃক লিখিত ভাগ্যইসলাম অনুযায়ী কদর বা নিয়তি হলো, আল্লাহর অনন্ত জ্ঞান ও হিকমাত অনুযায়ী সৃষ্টিকুলের সকল কিছু নির্ধারণ। আর তা আল্লাহর কুদরতের ওপর নির্ভরশীল, কারণ তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল, তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন।

আর নিয়তি বা তাকদীরের ওপর ঈমান আনা আল্লাহ তা‘আলার রবুবিয়াত বা প্রভুত্বের ওপর ঈমান আনার অন্তর্ভুক্ত এবং তা ঈমানের ছয়টি রুকনের অন্যতম একটি রুকন। এর ওপর ঈমান আনা ছাড়া এই ছয়টি রুকনের ওপর ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“নিশ্চয় আমরা প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত: ৪৯]

নবী (সা.) বলেন,

“প্রত্যেক জিনিসই পরিমিত, এমনকি অপারগতা ও অলসতা অথবা অলসতা ও অপারগতাও।” (সহীহ মুসলিম)

তাকদীরের স্তর[সম্পাদনা]

ইসলাম অনুসারে চারটি স্তর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাকদীরের ওপর ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে:

প্রথমত: আল্লাহর অনন্ত জ্ঞানের ওপর ঈমান আনা, যা সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“তুমি কি জাননা যে, নিশ্চয় আল্লাহ অবগত যা কিছু আসমান ও জমিনে রয়েছে, নিশ্চয় তা কিতাবে লিখিত আছে আর নিশ্চয় তা আল্লাহর নিকট সহজ।” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৭০]

দ্বিতীয়ত: লাওহে মাহফুযে আল্লাহর জানা মোতাবেক ভাগ্যসমূহ লিখে রাখার ওপর ঈমান আনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আমরা কিতাবে কোনো কিছু লিখতে ছাড়ি নি।” [সূরা আন‘আম আয়াত: ৩৮]

নবী (সা.) বলেন,

“আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি জীবের তাকদীরসমূহ লিখে রেখেছেন।” (সহীহ মুসলিম)

তৃতীয়ত: আল্লাহর কার্যকরী ইচ্ছা ও তাঁর ব্যাপক শক্তির ওপর ঈমান আনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে অন্য কিছুই তোমরা ইচ্ছা করতে পার না।” [সূরা আত-তাকওয়ীর, আয়াত: ২৯]

নবী (সা.) ঐ ব্যক্তিকে বলেন, যে ব্যক্তি তাঁকে (সা.) লক্ষ্য করে বলেছিলেন ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন’

“তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে? বরং তিনি একাই চেয়েছেন।” (আহমদ)

চতুর্থত: নিশ্চয় আল্লাহ সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা; এর ওপর ঈমান আনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর অভিভাবক।” [সূরা-আয-যুমার, আয়াত: ৬২]

তিনি আরো বলেন,

“আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমাদের কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আস-সাফফাত আয়াত: ৯৬]

নবী (সা.) বলেন,

“নিশ্চয় আল্লাহ সকল আবিস্কারক ও তার আবিস্কারকে সৃষ্টি করেন।” (সহীহ বুখারী)

তাকদীরের প্রকার[সম্পাদনা]

(ক) সকল সৃষ্টজীবের সাধারণ তাকদীর লিপিবদ্ধকরণ। আর সেটাই আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বৎসর আগে লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

(খ) সারা জীবনের তাকদীর লিপিবদ্ধকরণ। আর তা হলো বান্দার মাঝে রুহ্ বা আত্মা ফুঁকে দেওয়ার সময় থেকে তার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যা কিছু সংঘটিত হবে তা নির্ধারণ করা।

(গ) বাৎসরিক তাকদীর নির্ধারণ। আর তা হলো, প্রত্যেক বৎসর যা কিছু সংঘটিত হবে তা নির্ধারণ করা। সেটা প্রত্যেক বৎসরের লাইলাতুল কদর তথা মহিমান্বিত রজনীতে হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।” [সূরা-আদ-দুখান আয়াত: ৪]

(ঘ) দৈনন্দিন তাকদীর নির্ধারণ, আর তা হলো সম্মান, অপমান, (কিছু) দেওয়া না দেওয়া জীবিত করা, মৃত্যু দান ইত্যাদি যা দৈনন্দিন সংঘটিত হবে, তা নির্ধারণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আসমান ও জমিনে বিচরণশীল সকলেই তাঁর কাছে প্রার্থী, প্রত্যেক দিন কোনো না কোনো মহৎকর্মে রত রয়েছেন।” [সূরা আর-রহমান আয়াত: ২৯]

বান্দাদের কর্মসমূহ[সম্পাদনা]

ইসলাম অনুসারে যে সকল কাজ আল্লাহ তা‘আলা এই নিখিল বিশ্বে পরিচালনা করেন তা দু’ভাগে বিভক্ত:

এক: আল্লাহ তা‘আলার কর্মসমূহের মধ্যে যে সকল কর্ম তাঁর সৃষ্টি জীবের মাঝে পরিচালনা করেন, তাতে কারো কোনো প্রকার ইচ্ছা ও ইখতিয়ার নেই। বস্তুর সকল ইচ্ছা আল্লাহর জন্য। যেমন জীবিত করা মৃত্যু দান করা সুস্থ ও অসুস্থ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আর আল্লাহই তোমাদের ও তোমাদের কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ৯৬]

তিনি আরো বলেন,

“যিনি জীবন ও মরণ সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ?” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ২]

দুই: আর যে সকল কর্ম সৃষ্টিজীব সম্পাদন করে থাকে, তা সবই ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত। আর তা সম্পাদনকারীর ইখতিয়ার ও ইচ্ছায় সংঘটিত হয়, কারণ আল্লাহ তাদের ওপর সেটা করার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“যে তোমাদের মধ্যে সোজা পথে চলতে চায়।” [সূরা আল-তাকওয়ীর, আয়াত: ২৫]

তিনি আরো বলেন,

“অতএব যার ইচ্ছা হয় ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফরী করুক।” [সূরা আল-ক্বাহাফ, আয়াত: ২৯]

ভাল কাজ সম্পাদনের জন্য তারা প্রশংসার হক্বদার, আর খারাপ কাজ করার জন্য তারা অপমানের হক্বদার। আল্লাহ শুধুমাত্র ঐ কাজ করার জন্য শাস্তি দিবেন, যাতে বান্দার পূর্ণ ইখতিয়ার রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আর না আমি বান্দাদের ওপর যুলুমকারী।” [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ২৯]

আর মানুষ ইচ্ছা ও নিরুপায়ের পার্থক্য জানে। যেরূপ কেউ ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিজ ইচ্ছায় অবতরণ করেন, আর কখনো কেউ তাকে ছাদ থেকে ফেলে দিতে পারে। প্রথম উদাহরণ হলো ইচ্ছার, আর দ্বিতীয় উদাহরণ হলো নিরুপায়ের।

তাকদীরের ব্যাপারে বান্দার করণীয়[সম্পাদনা]

ইসলাম অনুসারে তাকদীরের ব্যাপারে বান্দার করণীয় কাজ হলো দু’টি:

প্রথম: সম্ভাব্য কাজ সম্পাদন ও সতর্ককৃত কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। আল্লাহর কাছে আরো চাইতে হবে যেন তিনি তার জন্য সহজ কাজকে করার তাওফীক দেন, আর কঠিন সাধ্য কাজ থেকে তাকে বিরত রাখেন। আর তাঁর ওপর ভরসা করা ও তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া। অতঃপর কল্যাণ অর্জনের জন্য ও অকল্যাণ বর্জনের জন্য তাঁরই মুখাপেক্ষী হওয়া। তিনি (সা.) বলেন,

“তোমার জন্য কল্যাণকর কাজের প্রতি যত্নবান হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর, আর অপারগতা প্রকাশ করিও না। আর তুমি যদি কোনো কষ্টের সম্মুখীন হও তবে এইরূপ বলিও না যে আমি যদি এ কাজ করতাম তাহলে এই হত; বরং বল যে, ‘এটা আল্লাহর নির্ধারণ, আর তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন’। কারণ, ‘যদি’ কথাটি শয়তানের কর্ম খুলে দেয়।”

দ্বিতীয়: বান্দা তার ওপর নির্ধারিত বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করবে, ঘাবড়াবে না। অতঃপর জানবে যে, নিশ্চয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। সুতরাং সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নিবে। নবী (সা.) বলেন,

“আরো জ্ঞাত হবে- যে বিপদ তোমাকে আক্রমণ করেছে তা তোমাকে ভুল করে অতিক্রম করে চলে যাবার নয়। আর যে বিপদ তোমাকে আক্রমণ করেনি তা তোমাকে স্পর্শ করার ছিল না।”

তাকদীর ও ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা[সম্পাদনা]

তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অপরিহার্য, কেননা তা আল্লাহর রুবুবিয়াত বা প্রভুত্বের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম অনুসারে, আল্লাহর সকল কর্ম ও ফায়সালাই ভালো (ন্যায়পূর্ণ) ইনসাফভিত্তিক, হিকমাতপূর্ণ। সুতরাং যার আস্থা থাকবে যে, নিশ্চয় যে সুখ বা দুঃখ তাকে স্পর্শ করেছে তা তাকে ভুল করে অতিক্রম করে চলে যাবার ছিল না আর যা তাকে ছেড়ে গেছে বা স্পর্শ করে নি তা তার নিকট পৌঁছার ছিল না, সে ব্যক্তি পেরেশানী ও সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকতে সক্ষম হবে। আর তার জীবন হতে ব্যাকুলতা ও দোদুল্যমানতা দূর হবে। চলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া বস্তুর ওপর চিন্তিত হবে না। আর তার ভবিষ্যৎকে ভয় পাবে না।

আর যে জানতে পারবে যে, তার বয়স সীমিত, রুযী পরিমিত, সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, কাপুরুষতা বয়স বাড়াতে পারে না, কার্পণ্যতা রুযী বাড়াতে পারে না, সবই লিখিত রয়েছে, তখন সে বিপদের ওপর ধৈর্য ধারণ করবে, পাপ ও ত্রুটিপূর্ণ কর্ম সম্পাদন করার কারণে ক্ষমা চাইবে। আর আল্লাহ যা (তার জন্য) নির্ধারণ করেছেন তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। তবেই আদেশের আনুগত্য আর বিপদের ওপর ধৈর্য ধারণের মাঝে সমন্বয় গড়তে সক্ষম হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো প্রকার বিপদ আসে না এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে, আল্লাহ তার অন্তরকে পথ প্রদর্শন করাবেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।” [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১১]

তিনি আরো বলেন,

“অতএব, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আপনি আপনার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৫৫]

হিদায়াত দু’ প্রকার[সম্পাদনা]

প্রথম হিদায়াত অর্থ, সত্যের সন্ধান দেওয়া, সৎপথ প্রদর্শন করা। আর সকল সৃষ্টজীবই এর মালিক। আর সকল রাসূল ও তাদের অনুসারীগণ এরই মালিক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“নিশ্চয় আপনি সরলপথ প্রদর্শন করেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৫২]

দ্বিতীয় হিদায়াত এর অর্থ, আল্লাহ কর্তৃক বান্দাদেরকে (ভালো কাজের) তাওফীক প্রদান করা ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠা বা অটল রাখা, (আর তা) তাঁর মুত্তাকী বান্দাদের জন্য দয়া ও অনুগ্রহস্বরূপ। আর এ হিদায়াতের একমাত্র মালিক হলেন আল্লাহ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা‘আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন।” [সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত: ৫৬]

কুরআনে বর্ণিত (আল্লাহর) ইরাদা দু’ প্রকার[সম্পাদনা]

প্রথম: ইরাদা কাউনিয়া ক্বাদারিয়া বা সৃষ্টিগত ও প্রাকৃতিক ইচ্ছা, আর তা হচ্ছে, সকল সৃষ্টিকূলের জন্য নির্ধারিত ইচ্ছা। সুতরাং আল্লাহ যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। এ সৃষ্টিগত ও প্রাকৃতিক ইচ্ছা বা ইরাদা (কাউনিয়া ও ক্বাদারিয়া) অবশ্যই সংঘটিত হবে; কিন্তু শরী‘আতগত ইচ্ছা বা ইরাদা শর‘ঈয়াহ’র সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত সেটাকে তার পক্ষ থেকে ভালোবাসা কিংবা সেটার প্রতি তাঁর সন্তুষ্ট হওয়া জরুরি নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আল্লাহ যাকে হিদায়াত করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২৫]

দ্বিতীয়: ইরাদা দীনিয়া শর‘ঈয়াহ, (দীন হিসেবে আল্লাহর ইচ্ছা) তা হল, দীনী নির্দেশ বা উদ্দেশ্য, আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে সেটার অনুসারীকে ভালোবাসা ও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। তবে ইরাদা দীনিয়া শর‘ঈয়াহ ততক্ষণ বাস্তবায়িত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে ইরাদা কাউনিয়া (সৃষ্টিগত ইচ্ছা) সংযুক্ত না হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫]

সুতরাং কখনও আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা ও শর‘ঈ উভয়টিই বাস্তবায়িত হয়। যেমন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঈমানের মাঝে উভয় প্রকার ইরাদা বা ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়েছিল। আবার কখনও কখনও কেবল আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়, সেখানে শরী‘আতগত ইচ্ছা থাকে না। যেমন, আবু জাহল এর কুফুরী। তাতে শুধুমাত্র আল্লাহর ইরাদা কাওনিয়া বা সৃষ্টিগত ইচ্ছা ছিল। আবার কখনও কখনও কোনো কিছুতে আল্লাহর ইরাদা কাউনিয়া বা সৃষ্টিগত ইচ্ছা থাকে না, যদিও তা ইরাদা শর‘ইয়াহ বা শারী‘আতের দিক থেকে প্রত্যাশিত ছিল। যেমন, আবু জাহেলের ঈমান।

সুতরাং যদিও আল্লাহ নাফরমানী সংঘটিত হওয়ার ইচ্ছা করেন ঘটে যাওয়ার দিক থেকে এবং সৃষ্টিগত দিক থেকে তা চান কিন্তু তিনি তা দীন হিসাবে পছন্দ করেন না, ভালোবাসেন না ও তার প্রতি নির্দেশও দেন না। বরং তার প্রতি বিদ্বেষ রাখেন, অপছন্দ করেন, তা থেকে বান্দাদেরকে নিষেধ করেন ও তা সম্পাদনকারীকে সাবধান করেন। যদিও আর এসব কিছু তাঁরই নির্ধারণ। পক্ষান্তরে আনুগত্যপূর্ণ কর্ম ও ঈমান আনয়ন করাকে আল্লাহ তা‘আলা ভালোবাসেন, সেটার নির্দেশ দিয়েছেন, তার সম্পাদনকারীকে নেকী ও সুন্দর প্রতিদানের ওয়াদা দিয়েছেন। যদিও তাঁর ইরাদা ছাড়া তাঁর নাফরমানী করা যায় না। আর আল্লাহ তা‘আলা যা চান শুধু তাই সংঘটিত হয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আর (আল্লাহ) তাঁর বান্দাদের কুফুরী পছন্দ করেন না।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬]

তিনি আরো বলেন,

“আল্লাহ ফাসাদ (অশান্তি) পছন্দ করেন না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২০৫]

ঐ সকল আসবাব বা কারণসমূহ যা তাকদীর পরিবর্তন করে[সম্পাদনা]

আল্লাহ কিছু কারণ তৈরি করে রেখেছেন যা তকদীরকে পরিবর্তন ও প্রতিরোধ করে। যেমন, দো‘আ, সাদাকাহ্, ঔষধ, সতর্কতা অবলম্বন, (নিজের) কর্মদক্ষতা ব্যবহার করা; কেননা, বিষয় ও কারণ সবই আল্লাহর ফায়সালা ও তাঁরই নির্ধারণ, এমনকি অপারগতা- অক্ষমতা ও বিজ্ঞতা-বুদ্ধিমত্তা।

তবে এ পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে এটা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান বা পূর্বলিখনকে পরিবর্তন করে বরং এর দু‘টি অর্থ হতে পারে।

এক. এ কারণগুলো তাকদীরেই উল্লেখ করা আছে, সেখানে আছে যে, সে অমুক কাজটি করবে, সে কারণে তাকে এ জিনিসটি দেওয়া হলো।

দুই. ফিরেশতাদের কাগজে যা লিখা হয় তাতে পরির্বতন ও পরিবর্ধন করা হয়, সেটাতেই পরিবর্তন করা হয়। এর সমর্থনে সূরা আর-রা‘দ এর ৩৯ নং আয়াতটি পেশ করা যায়,

“আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছে তা ঠিক রাখেন, আর তার কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (লাওহে মাহফুয) (অর্থাৎ সেখানে কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না)।”

তাকদীরের বিষয়টি সৃষ্ট জীবের মাঝে আল্লাহর একটি রহস্যময় বিষয়[সম্পাদনা]

তাকদীর নির্ধারণ আল্লাহর গোপন রহস্য, তাঁর সৃষ্টজীবের মাঝে এ কথাটি শুধুমাত্র তাকদীরের গোপন দিকের জন্য প্রযোজ্য। কারণ সকল জিনিসের হাকীকত শুধুমাত্র আল্লাহ জানেন। মানুষ তা অবগত হতে পারে না। যেমন, আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন, হিদায়াত করেন, মৃত্যু দান করেন, জীবিত করেন, নিষেধ করেন ও কিছু প্রদান করেন। তাই তো নবী (সা.) বলেন,

“যখন তাকদীরের কথা স্মরণ হবে তখন তোমরা তা নিয়ে তর্ক বির্তকে লিপ্ত না হয়ে চুপ থাকবে।” (সহীহ মুসলিম)

তবে তাকদীরের অন্যান্য দিক ও তাঁর মহা হিকমাত স্তর, মর্যাদা ও তাঁর প্রভাব মানুষের নিকট বর্ণনা করা ও তা মানুষদেরকে জানানো বৈধ রয়েছে। কারণ তাকদীরের ওপর ঈমান আনা ঈমানের রুকনসমূহের একটি অন্যতম রুকন, যা শিক্ষা করা ও জানা একান্ত কর্তব্য। যেমন, রাসূল (সা.) যখন জিবরীল আলাইহিস সালামের নিকট ঈমানের রুকনসমূহ উল্লেখ করেন, তখন বলেন,

“উনি হলেন জিবরীল, তোমাদেরকে তোমাদের দীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য আগমন করেছেন।”

তাকদীরের দ্বারা দলীল দেওয়া[সম্পাদনা]

কিছু কিছু সাহাবী যখন তাকদীরের হাদীসসমূহ শুনতেন তখন বলতেন, এখন তুমি আমার চাইতে বেশি প্রচেষ্টাকারী নও। (অর্থাৎ আমি তাকদীরের ওপর নির্ভর করে বসে থাকার মত লোক নই, তাকদীরকে বাহানা করে কর্ম ছেড়ে দেওয়ার লোক আমি নই)। নবী (সা.)কে আত্মপক্ষ সমর্থনে তাকদীরের দ্বারা দলীল দেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

“তোমরা কর্ম সম্পাদন করতে থাকো, যাকে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা তার জন্য সহজসাধ্য হবে। সুতরাং যে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত তার জন্য সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের যে কাজ সেটা করা সহজ করে দেওয়া হবে। আর যে দূর্ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত, তার জন্য দূর্ভাগ্যবান ব্যক্তিদের যে কাজ সে কাজ সহজ করে দেওয়া হবে।”

অতঃপর নিম্নের আয়াত পাঠ করলেন,

“অতএব, যে দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে, আমরা তাকে সুখের বিষয়ের জন্য সহজ পথ দান করব। আর যে কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয় এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে, আমরা তাকে কষ্টের বিষয়ের জন্য সহজ পথ দান করব।” [সূরা আল-লাইল, আয়াত: ৫-১০]

আসবাব বা (মাধ্যমসমূহ) গ্রহণ করা[সম্পাদনা]

বান্দা কোনো বিপদ পড়ার পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলা সে বিপদ সম্পর্কে জানেন। ‘আল্লাহর বিপদ সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে’ এর অর্থ এই নয় যে, তিনিই বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিপদে পতিত করেছেন, বরং এ বিপদ পতিত হয়েছে এর নির্ধারিত কারণসমূহের দ্বারাই।

যদি বিপদ থেকে রক্ষাকারী মাধ্যম যা ব্যবহার ও গ্রহণ করার জন্য ইসলামী শরী‘আত অনুমতি দিয়েছেন তা পরিত্যাগ করার কারণে সে বিপদে পতিত হয়, তবে সে নিজেকে হিফাযত না করার কারণে ও তাঁকে বিপদ থেকে রক্ষাকারী মাধ্যম গ্রহণ না করার কারণে দোষী হবে। আর যদি এই বিপদ প্রতিরোধ করার তার ক্ষমতা না থাকে তবে সে সাওয়াবের অধিকারী হবে। সুতরাং মাধ্যম গ্রহণ করা তাকদীর ও তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয় বরং তা (মাধ্যম) গ্রহণ করা এরই (তাকদীর ও তাওয়াক্কুলেরই) অন্তর্ভুক্ত।

আর যখন তাকদীর অনুযায়ী কর্ম শুরু হয়ে যায়, তখন তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ও তা মেনে নেওয়া কর্তব্য হয়ে যায় ও এই কথার দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করবে - “আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন আর তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন।” তবে ভাগ্য পতিত হওয়ার পূর্বে মানুষের দায়িত্ব হলো বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করা ও তাকদীরের দ্বারা তাকদীরকে প্রতিরোধ করা। নবীগণ নিজেদেরকে নিজেদের শত্রু থেকে হিফাযত করার জন্য বিবিধ পদ্ধতি ও মাধ্যম গ্রহণ করেছিলেন, অথচ তারা আল্লাহর অহী ও নিরাপত্তা দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) সকল ভরসাকারীদের নেতা ছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি মাধ্যম গ্রহণ করতেন, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা থাকার পরও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য, যা-ই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের ওপর এবং তোমাদের শত্রুদের ওপর।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৬০]

তিনি আরো বলেন,

“তিনি তোমাদের জন্য যমীনকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তার কাঁধে বিচরণ কর এবং তাঁর দেওয়া রিযিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।” [সূরা-আল-মূলক, আয়াত: ১৫]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আর যারা আমাদের পথে সংগ্রাম করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে আমাদের পথসমূহে পরিচালিত করি।” [সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৬৯]

নবী (সা.) বলেন,

“কি আশ্চর্য! নিশ্চয় মুমিনের সকল কর্মই ভালো, আর তা শুধু মুমিনের জন্য নির্দিষ্ট, যদি তাকে কোনো আনন্দ স্পর্শ করে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তাঁর জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি তাকে কোনো বিপদ স্পর্শ করে তবে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়।” (সহীহ মুসলিম)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ ইসলামের আলোকে তকদীর ও তদবীর"। দৈনিক জনকন্ঠ। দৈনিক জনকন্ঠ। সংগ্রহের তারিখ 17/04/2017  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]