সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপ
মূল যুদ্ধ: স্নায়ুযুদ্ধ এবং আফগান গৃহযুদ্ধ
Mortar attack on Shigal Tarna garrison, Kunar Province, 87.jpg
মুজাহিদীন, ১৯৮৭
তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৯ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ (৯ বছর, ১ মাস, ২০ দিন)
অবস্থান আফগানিস্তান, পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহ
ফলাফল

সামরিক অচলাবস্থা

  • জেনেভা চুক্তি (১৯৮৮)
  • মুজাহিদদের রাজনৈতিক বিজয়
  • সোভিয়েত সৈন্যদল প্রত্যাহার
  • আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ চলমান[১]
বিবদমান পক্ষ
সোভিয়েত ইউনিয়ন
আফগানিস্তান আফগানিস্তান

মুজাহিদীন

  • হেজব-ই-ইসলামি
  • হেজবে ওয়াহদাত
  • হারাকাত-ই-ইসলামি
  • আফগান হিজবুল্লাহ
  • জামায়াত-এ-ইসলামি
  • মক্তব আল-খেদমাত
  • নর্দার্ন অ্যালায়েন্স
  • শুরা-ইনক্বিলাবি
  • শাযমার-এ-নসর

পাকিস্তান

সমর্থনকারী দেশ:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
সৌদি আরব সউদি আরব
যুক্তরাজ্য
নেতৃত্ব প্রদানকারী
সোভিয়েত ইউনিয়ন লিওনিদ ব্রেজনেভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরি আন্দ্রোপভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন কনস্ট্যান্টিন চের্নেঙ্কো
সোভিয়েত ইউনিয়ন মিখাইল গর্বাচেভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন দিমিত্রি উস্তিনভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন সের্গেই সকোলভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্যালেন্টিন ভ্যারেন্নিকভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন ইগর রোদিওনোভ
সোভিয়েত ইউনিয়ন বোরিস গ্রোমোভ
আফগানিস্তান বাবরাক কারমাল
আফগানিস্তান মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ
আফগানিস্তান আব্দুল রাশিদ দোস্তাম
আফগানিস্তান শাহনওয়াজ তানাই
আফগানিস্তান মোহাম্মদ রাফি
Flag of Jihad.svg আহমদ শাহ মাসুদ
Flag of Jihad.svg আব্দুল হক
Flag of Jihad.svg ইসমাইল খান
Flag of Jihad.svg গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার
Flag of Jihad.svg জালালউদ্দিন হাক্কানী
Flag of Jihad.svg ওসামা বিন লাদেন
Flag of Jihad.svg মোল্লা নকীব
Flag of Jihad.svg আব্দুল রহিম ওয়ারদাক
শক্তিমত্তা
সোভিয়েত ইউনিয়ন ১১৫,০০০[২]
আফগানিস্তান ৪০,০০০
Flag of Jihad.svg ২০ লক্ষাধিক
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি

সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৪,৪৫৩ সৈন্য নিহত (সর্বমোট)

  • ৯,৫১১ সৈন্য সম্মুখযুদ্ধে নিহত
  • ২,৩৮৬ সৈন্য আঘাতপ্রাপ্তির ফলে নিহত
  • ২,৫৫৬ সৈন্য রোগাক্রান্ত হয়ে এবং দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত

৫৩,৭৫৩ সৈন্য আহত
৩১১ সৈন্য নিখোঁজ

আফগানিস্তান প্রায় ১৮,০০০ সৈন্য নিহত[৩]
Flag of Jihad.svg ১০ লক্ষের বেশি[৪]
৬০০,০০০–২,০০০,০০০ আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত[৫]
১০০ জনের বেশি সোভিয়েত বেসামরিক নাগরিক নিহত

সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের সশস্ত্রবাহিনী ও আফগান সরকারি বাহিনী এবং আফগানিস্তানের কমিউনিজম-বিরোধী মুজাহিদদের মধ্যে। যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে, আর শেষ হয়েছে ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে। যুদ্ধের শুরুতে আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৫ লক্ষ। যুদ্ধে আনুমানিক ১০ লক্ষ আফগান প্রাণ হারিয়েছে যার সিংহভাগই ছিল বেসামরিক জনতা। সোভিয়েত বিমানগুলো নির্বিচারে আফগানিস্তানের গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য করে দিয়েছে, বৃষ্টির মত বোমাবর্ষণ করেছে সাধারণ মানুষের ওপর।

সোভিয়েত বাহিনী প্রথম আফগানিস্তানে (তদানীন্তন গণপ্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তান) প্রবেশ করেছিল ১৯৭৯ সালের ২৭শে ডিসেম্বর। এই প্রবেশের পেছনেও অবশ্য কার্যকারণ আছে। সোভিয়েত অনুপ্রবেশের আগে আগে ক্ষমতাসীন “পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান” (পিডিপিএ) দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। দুই গ্রুপের মধ্যে রীতিমত সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে সামরিক বাহিনীর বামপন্থী কর্মকর্তাদের ক্যু-র মাধ্যমেই পিডিপিএ ক্ষমতা দখল করেছিল। পার্টির দুই ভাগের নাম “খালক” (জনতা) ও “পারচাম” (পতাকা)। খালক ছিল কট্টরপন্থীদের দল, অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থীরা গঠন করেছিল পারচাম।

সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান কমিউনিস্টদের খালক অংশের নেতা হাফিজুল্লাহ আমিনকে হত্যা করে পারচাম অংশের নেতা বাবরাক কারমালের নেতৃত্বে একটি নতুন সরকার গঠন করে। বাবরাক সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্বাসন জীবন ত্যাগ করে আফগানিস্তানে ফিরে এলেই দেশের সব অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর হবে বলে আশা করেছিলেন সোভিয়েত নেতারা। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ এর মাধ্যমেই কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব। আফগানিস্তান যেহেতু তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী দেশ ছিল সেহেতু এ অঞ্চলে একটি ব্রিজহেড (অগ্রসর বাহিনী শত্রুপক্ষের যে এলাকা দখল করে পশ্চাৎ বাহিনীকে সামনে এগুনোর সুযোগ করে দেয়) স্থাপনের মাধ্যমে আমেরিকানরা অনায়াসেই সোভিয়েতদের সাথে সরাসরি সীমান্ত সংস্পর্শ তৈরি করতে পারতো। তাছাড়া অতি সম্প্রতি ইরানে ইসলামি বিপ্লবের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারিয়েছিল। খোমেনির আগে ইরানের ক্ষমতায় আসীন শাহের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক ছিল। এই নাজুক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র সংকটে ভুগছিল। স্নায়ুযুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাই প্রথম চালটা চেলেছিল সোভিয়েতরাই।

সোভিয়েত আগ্রাসন যথারীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিদ্রোহী হয়ে ওঠে অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার আফগানিস্তানের কমিউনিজম-বিরোধী মুজাহিদ বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য একটি নতুন প্রোগ্রাম হাতে নেন যা “অপারেশন সাইক্লোন” নামে সুপরিচিত। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১-এ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই প্রোগ্রামের অধীনে আফগানিস্তানকে আনুমানিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য দেয়- অস্ত্রশস্ত্রসহ বিভিন্ন উপায়ে।

সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল “জেনেভা চুক্তি” এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত ছিল, ১৯৮৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে সকল সোভিয়েত সৈন্যকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। আসলে সোভিয়েত বাহিনী তাদের ১১৫,০০০ বেশি সৈন্য নিয়ে কখনই আফগান ইসলামপন্থী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এই বাহিনীকে সাহায্য করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব, চীন, ইরান, ইসরায়েল এবং আরও কিছু দেশ। এছাড়া পারস্য উপসাগরের ধনকুবের ব্যবসায়ীরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।

১৩,০০০ সৈন্য হারানোর পর সোভিয়েত বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়, সোভিয়েত রাষ্ট্রের সংস্কারবাদী নেতা মিখাইল গর্বাচেভ খানিকটা লজ্জার সাথেই তাঁদের প্রচণ্ড ব্যয়বহুল ভুলটা শুধরে নেয়ার চেষ্টা শুরু করেন। এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় গর্বাচেভের সিদ্ধান্তের যে একটা বড় ভূমিকা আছে এটা বোঝা যায় এভাবে: জেনেভা চুক্তির পরও আমেরিকান সরকার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে মুজাহিদদের অস্ত্র সাহায্য দিতে থাকে। কিন্তু এই সাহায্যে ভয় পেয়ে সোভিয়েতরা পিছু হটেনি, পিছু হটেছে নিজেদের ইচ্ছায়। চুক্তি পরবর্তী এই অস্ত্র সাহায্য উল্টো যে কাজটা করেছে তা হল, চরমপন্থী মুজাহিদ গোষ্ঠী গঠনের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। এই সাহায্যের মাধ্যমেই আফগানিস্তানে সবচেয়ে চরমপন্থী মুজাহিদ দলগুলো বিকশিত হতে শুরু করে, সেই সাথে আরব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের সাহায্য আসার পথটাও কুসুমাস্তীর্ণ হয়। উল্লেখ্য সেই সময় গঠিত এসব ইসলামি মৌলবাদী দলগুলোর মধ্যে “আল-কায়েদা” ও ছিল। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তানের মুজাহিদিন শিবিরেই আল-কায়েদা গঠিত হয়। তাই এ কথা অনায়াসে বলা যায়, আফগানিস্তানে সোভিয়েত পতনের বীজ বপন হয়েছিল। এই সংঘাত সোভিয়েত জোটের প্রতি পুঁজিবাদ রাষ্ট্রের চাল ছিল, আর এর সাথে ছিল আরেক সমাজতন্ত্রধারী চীন। আসলে এর লক্ষ্য ছিল আফগানদের মুক্তির পক্ষে নয়, বরং মার্কিনিদের নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করা।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Borer, Douglas A. (১৯৯৯)। Superpowers defeated: Vietnam and Afghanistan compared। London: Cass। পৃ: ২১৬। আইএসবিএন 0714648515 
  2. Nyrop, Richard F.; Donald M. Seekins (জানুয়ারি ১৯৮৬)। Afghanistan: A Country Study। Washington, DC: United States Government Printing Office। পৃ: XVIII–XXV।  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  3. David C. Isby (১৯৮৬-০৬-১৫)। Russia's War in Afghanistan। Books.google.es। আইএসবিএন 978-0-85045-691-2। সংগৃহীত ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১২ 
  4. Andrew North (১৮ নভেম্বর ২০০৯)। "Soviet lessons from Afghanistan"। BBC। "Soviet deaths - estimated at 15,000 Afghan deaths - estimated at one million" 
  5. Death Tolls for the Major Wars and Atrocities of the Twentieth Century

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:USSR conflicts টেমপ্লেট:Russian Conflicts

টেমপ্লেট:Soviet occupation টেমপ্লেট:Brezhnev era