কাজাকিস্তানের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আকস্মিকভাবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকা কাজাকিস্তানের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট নূর সুলতান নাজারবায়েভ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কাজাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি।

আটাত্তর বছরের নূর সুলতান নাজারবায়েভের জন্ম ১৯৪০ সালে। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই বিবেচনা করা হয় তাকে। দীর্ঘ দিন তিনি তেলসমৃদ্ধ কাজাকিস্তানের নেতৃত্ব দেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এটা সহজ ছিল না, কিন্তু নতুন প্রজন্মের নেতাদের সুযোগ করে দিতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।

দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকাকালীন তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। তার বিরুদ্ধে কোনো বিক্ষোভ বা ব্যাপক জন-অসন্তোষের খবরও পাওয়া যায়নি। পদত্যাগের আগে কাজাখদের জীবন-মান উন্নয়নে কল্যাণমূলক নানা পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পদত্যাগ করলেও তিনি দেশটির ক্ষমতাসীন দলের প্রধান থাকবেন। একই সাথে কাজাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। তা ছাড়া তিনি জাতীয় নেতা পদবিও ধারণ করবেন।

১৯ মার্চ বিদায়ী ভাষণে নাজারবায়েভ বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে নিরাপত্তা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশনীতির দেখাশোনা করব। আমি চাই নতুন প্রজন্ম থেকে কেউ দেশের হাল ধরতে শিখুক।’ তিনি ২০২০ সাল পর্যন্ত নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাশিম জমরাটের নাম ঘোষণা করেন। কাশিম জমরাট পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের স্পিকার।

ব্যক্তিগত জীবনে ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত নাজারবায়েভ প্রাথমিক জীবনে স্টিল কারখানায় কাজ করেছেন। কাজাকিস্তানে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টির হাত ধরে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব কাজাকিস্তানের প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন তিনি। সে সময় কাজাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও কাজাকিস্তান সর্বশেষ রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐক্যের পতাকা উড়িয়েছে। এরপর ১৯৯৯, ২০০৫, ২০১১ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনে নাজারবায়েভ বিপুল ভোটে জয় পান।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধীর হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। একই সাথে রাশিয়া ও এর প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে সব সময় সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন নাজারবায়েভ।

কাজাকিস্তান এশিয়ার একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম এবং বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। এর উত্তরে রাশিয়া, পূর্বে গণচীন, দক্ষিণে কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এবং পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর ও রাশিয়া। কাজাকিস্তানের প্রায় সম্পূর্ণ এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। কিছু অংশ উরাল নদীর পশ্চিমে ইউরোপ মহাদেশে পড়েছে। দেশের উত্তর অংশে অবস্থিত আস্তানা শহর দেশটির রাজধানী। বৃহত্তম শহর আলমাতি। ১৯৯৭ সালের আগে আলমাতিই ছিল কাজাকিস্তানের রাজধানী।

কাজাখ কাজাকিস্তানের সরকারি ভাষা। কাজাখ নামের তুর্কি জাতি এখানকার প্রধান জনগোষ্ঠী। ১৮৭০-১৮৭৬ সালের মধ্যে রাশিয়া কাজাখ দখলে নেয়। ১৯২২ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত কাজাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৯১ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিতে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বিদ্যমান। ১৯৯৫ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয়া হয়।

কাজাকিস্তানের মোট আয়তন ২৭ লাখ বর্গকিলোমিটার। এই আয়তন পশ্চিম ইউরোপের আয়তনের প্রায় সমান। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মুসলমান। বাকি ৩০ শতাংশ অন্য ধর্মাবলম্বী। মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ কাজাখ। ৩০ শতাংশ রুশ। বাকি ১০ শতাংশ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর।

কাজাকিস্তান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, এবং নিউজিল্যান্ডসহ ৪৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য স্থায়ী ভিসামুক্ত ভ্রমণের প্রচলন করেছে দেশটি।

শিক্ষা ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সফল কাজাকিস্তান। নার্সারি স্কুল থেকে শুরু করে শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা কাজাকিস্তানের বৈশিষ্ট্য। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত এ দেশটি শিক্ষার পেছনে ব্যয় করছে আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সরকারের অন্যান্য সব ক্ষেত্রে খরচের ব্যাপারে বিরাট কাটছাট সত্ত্বেও শিক্ষাকে কৃচ্ছ্র থেকে বাদ রাখা হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে তিনটি ক্ষেত্রের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হতোÑ সেনাবাহিনী, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও শিক্ষা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর স্বাধীন রাষ্ট্র কাজাকিস্তান ওই নীতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছিল। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টে গেছে। জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন প্রকল্পের শিক্ষার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দেখা গেছে, দেশটির র্যাংকিং এখন ৬৮। তার মানে তারা আছে হাই স্ট্যান্ডার্ড ও মিডিয়াম স্তরের মাঝখানে। ২০১১ সাল থেকে সরকার শিক্ষা খাতে ব্যয় ক্রমাগত বাড়িয়েছে। স্কুলগামী ২৪ লাখ শিশুর সবাই স্কুলে যাচ্ছে। ৯০০ সেকেন্ডারি স্কুল ও কলেজে ছয় লাখ ছাত্রছাত্রী সম্পন্ন করছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। সমসংখ্যক ছাত্রছাত্রী সম্পন্ন করছে উচ্চশিক্ষা। ২০১৫ সালে সরকারি অনুদান নিয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেছে প্রায় ৩৬ হাজার ছাত্রছাত্রী। কাজাকিস্তানে বৈজ্ঞানিক শিক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে বর্তমানে ৪২৪টি প্রতিষ্ঠান। গত ১০ বছরে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

এত কিছুর পরও সমস্যা আছে অন্যখানে। নূর সুলতান নাজারবায়েভের দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিশ্ব রাজনীতির প্রায় সব পরাশক্তিকে তুষ্ট রেখে এগিয়ে চলছে দেশটি। সেই তিনিই আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বসলেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সংস্কার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বহাল রাখতেই তিনি বিদায় নিচ্ছেন। কিন্তু কাজাকিস্তানের এই স্থপতির প্রস্থানে আসলেই কি সংস্কার হবে দেশটির? নাকি আরো বড় হুমকির মুখে পড়তে হবে তাদের?

মধ্য এশিয়ার ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ দেশ কাজাকিস্তানের একেবারে পাশের দেশ হলো রাশিয়া। রুশদের কাছ থেকেই স্বাধীনতা লাভ করেছিল তারা। স্বাধীনতার পর থেকে শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করে আসছেন নাজারবায়েভ। তার প্রস্থানে প্রতিবেশী রাশিয়াও হয়ে উঠতে পারে আস্তানার বড় হুমকি। ক্রিমিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পাঁচ মাস পর ২০১৪ সালে আস্তানার জন্য এক কঠিন বার্তা দিয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। সে সময় তিনি কাজাকিস্তানের স্বাধীনতার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন।

আদি ইতিহাস[সম্পাদনা]

ইস্যিক কুরগানের শক রাজপুরুষের ব্যবহৃত বর্ম

বর্তমান কাজাকিস্তান এলাকায় আদি প্রস্তর যুগ থেকেই মানুষের বসবাস শুরু হয়। তখন থেকে এখানকার অধিবাসীরা যাযাবর ও পশুপালক হিসাবে জীবন অতিবাহিত করে আসছে। আদি ব্রোঞ্জ যুগে কাজাখ এলাকায় বেশ কিছু প্রাচীন সংস্কৃতির উদ্ভব হয়, যার মধ্যে রয়েছে স্রুবনা সংস্কৃতি, আফানাসেভো সংস্কৃতি, এবং আন্দ্রোনোভ সংস্কৃতি। ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে ৫০০ খ্রিষ্টাব্দ অবধি কাজাকিস্তানে যাযাবর যোদ্ধা সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে যার মধ্যে প্রধান ছিলো শকহুন