পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি পশ্চিমবঙ্গের বাংলা নাট্যচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি নাট্যগবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাট্যচর্চা কেন্দ্র। নাট্য আকাদেমির প্রতিষ্ঠা ১৯৮৭ সালে। এই আকাদেমির উপর বাংলার প্রতিটি জেলা ও মহকুমা শহরে নাট্য কর্মশালা ও নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজন, নাট্য গবেষণা এবং নাটক সংক্রান্ত পুস্তক ও নাট্য বিশ্বকোষ প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি প্রতি বছর বিভিন্ন নাট্যানুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন। এর মধ্যে নাট্যমেলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত নাট্য উৎসবের আয়োজনও আকাদেমি কর্তৃপক্ষ করেছেন। এগুলি মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় ১৯৯৯ সালে ব্রেশ্‌ট রচিত নাটকের মেলা। আকাদেমির উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা অশোক মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরকুমার সভা। এটি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় মঞ্চস্থ হয়েছিল। উৎপল দত্ত, হাবিব তানবীর, মনোজ মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, ব্রাত্য বসু প্রমুখ বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব নাট্য আকাদেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন। যদিও সম্প্রতি নন্দীগ্রামে সরকারি গুলিচালনার প্রতিবাদে অনেক নাট্যব্যক্তিত্ব সরকারিভাবে নাট্য আকাদেমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি চত্বরের অদূরে স্থিত নাট্য ভবনে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। ২০০৭ সালের ৬ মার্চ আকাদেমির বিংশতি বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে উদ্বোধিত এই ভবনে একটি সভাঘর, প্রেক্ষাগৃহ ও অন্যান্য বিভিন্ন সুযোগসুবিধা রয়েছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি স্থাপিত হয় ১৯৮৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরেই। এই আকাদেমি স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গে নাট্য গবেষণা ও নাট্যচর্চার সার্বিক উন্নতি ঘটানো। সেই লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অঙ্গ এই আকাদেমি পরবর্তী দুই দশক জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রকাশনা ও কর্মশালার মাধ্যমে বাংলা নাটকের সমৃদ্ধি সাধন করে চলেন।

২০০৭ সালে ন্যাশানাল স্কুল অফ ড্রামার সহযোগিতায় প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব নবম ভারত রঙ্গ মহোৎসব আয়োজিত হয় কলকাতায়। বিগত দুই বছর ধরে হ্যাপেনিংস নামে একটি কলকাতা-ভিত্তিক নাট্যসংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে আকাদেমি। এই নাট্যসংস্থা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক নিয়ে একটি বহুভাষিক জাতীয় উৎসবে আয়োজন করেছিল। যেখানে হাবিব তানবীর, কে এন পানিক্কর, এম কে রায়না, এইচ কানহাইলাল, চেতন দাতার, রাজাগোপাল, হ্যান দে ব্রুইন, সুমন মুখোপাধ্যায়কৌশিক সেন প্রমুখ বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বগণ অংশগ্রহণ করেন।

কর্মসূচি[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি স্থাপনের মুখ্য উদ্দেশ্য বাংলা নাট্যচর্চার সার্বিক সমৃদ্ধি। নাটকের উন্নতিকল্পে সরকারি অর্থসাহায্যে নাট্য আকাদেমি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে নাট্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন, তেমনই বাংলা নাটকের ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা ও গ্রন্থ-কোষগ্রন্থ প্রকাশনাও। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে আকাদেমি বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। আবার কলকাতার বাইরে পশ্চিমবঙ্গের জেলাশহর, মহকুমা শহর, সাধারণ মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের নাট্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্বও নাট্য আকাদেমি বিশেষ গুরুত্বসহকারে পালন করে থাকেন। এর ফলে নাট্যচর্চাকে সমাজের তৃণমূলস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

নাট্য প্রশিক্ষণ[সম্পাদনা]

সারা বছর ধরেই নাট্য আকাদেমি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে থাকেন। এই সব কর্মশালায় নাট্যকর্মীদের আধুনিক পদ্ধতিতে দৈহিক ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ বা ভয়েস মডিউলেশন, আবৃত্তি ও স্বরভঙ্গি, অভিনয়, ছন্দ ও সংগীত, মুখাভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জা, পোষাক ও সাজসজ্জা, নাট্যরচনা, থিয়েটার ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রযোজনার লক্ষ্যে যে কর্মশালাগুলি আয়োজিত হয় সেগুলিতে শিক্ষার্থীদের প্রযোজনা ও নাট্য-উপস্থাপনার প্রতিটি খুঁটিনাটি দিক শেখানো হয়ে থাকে। বাংলা বিভিন্ন স্বনামধন্য নাট্য ব্যক্তিত্বগণ এই সব কর্মশালায় প্রশিক্ষণের কাজে নিযুক্ত হন। এমনকি প্রয়াত বি ভি করন্থ, এইচ কানহাইলাল ও ডক্টর মোহন আগাসের মতো ভারতের বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্বগণও বাংলা আকাদেমির নাট্য প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন।

নাট্য উৎসব[সম্পাদনা]

প্রতিবছর ছোটো-বড় পেশাদার-অপেশাদার মিলিয়ে ৭৫-১০০টি শ্রেষ্ঠ নাট্যপ্রযোজনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি নাট্যমেলার আয়োজন করে। নন্দন-রবীন্দ্রসদন-বাংলা আকাদেমি চত্বরে আয়োজিত এই মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলি হল আলোচনাসভা, সেমিনার, নাট্যমঞ্চায়ণ, নাটক পাঠ ইত্যাদি। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন শহরে বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় এবং পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় বাংলা নাট্য উৎসবের আয়োজন করে থাকে নাট্য আকাদেমি। এছাড়াও বেশ কিছু বিশেষায়িত নাট্য উৎসব যেমন ছোটোদের নাটক, মহিলা নির্দেশকদের নাটক, পথনাটক, পুতুলনাচ প্রভৃতির আয়োজন করে থাকে।

প্রযোজনা[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি ধ্রুপদী বাংলা নাটকের প্রযোজনা করে থাকে। আকাদেমির কয়েকটি সুবিখ্যাত প্রযোজনা হল প্রয়াত উৎপল দত্ত নির্দেশিত চৈতালী রাতের স্বপ্ন (উইলিয়াম শেক্‌স্‌পিয়ার বিরচিত আ মিডসামার নাইটস ড্রিম অবলম্বনে), বিভাস চক্রবর্তী নির্দেশিত গিরিশচন্দ্র ঘোষের বলিদান এবং অশোক মুখোপাধ্যায় নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরকুমার সভা ইত্যাদি।

প্রকাশনা[সম্পাদনা]

আকাদেমি প্রকাশিত বার্ষিক নাট্য আকাদেমি পত্রিকা নিবন্ধ, শ্রদ্ধালেখ, ভাষণ, নাটকের স্ক্রিপ্ট, পুরনো লেখার পুনর্মুদ্রণ, সংবাদ ইত্যাদি প্রকাশ করে। এছাড়া নাট্য আকাদেমি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে যোগেশ চৌধুরী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, কুমার রায়, খালেদ চৌধুরী, তুলসী লাহিড়ী প্রমুখের জীবনী; কলকাতার নাটক, গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও বিজন ভট্টাচার্যের নাটকের চিত্র-অ্যালবাম; বিভিন্ন নাট্যকারের নির্বাচিত নাটক এবং বাংলা নাটক ও নাট্যশালার ইতিহাস ও অন্যান্য গবেষণা গ্রন্থ।

অভিলেখাগার ও গ্রন্থাগার[সম্পাদনা]

নাট্য আকাদেমির অভিলেখাগারে সংগৃহীত রয়েছে বিভিন্ন স্বনামধন্য নাট্য ব্যক্তিত্বের ৩৬টি ভিডিও সাক্ষাৎকার, ১৬টি অসামান্য নাট্যপ্রযোজনার ভিডিও রেকর্ডিং, বহু পুরনো ও নতুন নাটক, নাট্যশালা ও নাট্য প্রশিক্ষণের ফটোগ্রাফ ইত্যাদি।

গ্রন্থাগারটি এখনও নির্মীয়মান। যদিও এই গ্রন্থাগারের জন্য অনেক নাট্যকর্মী তাঁদের সংগ্রহ দান করেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেবনারায়ণ গুপ্ত, বর্ধমানের প্রশান্ত চক্রবর্তী প্রমুখ। গ্রন্থাগারটি নতুন ভবনে (নাট্য ভবন) চালু হবে।

সেমিনার ও বক্তৃতা[সম্পাদনা]

নাট্য আকাদেমি সারাবছরই বিভিন্ন সেমিনার ও সাধারণ বক্তৃতার আয়োজন করে থাকে। শম্ভু মিত্রউৎপল দত্তের নামাঙ্কিত দুটি স্মারক বক্তৃতা আকাদেমিতে প্রতিবছর আয়োজিত হয়। এই বক্তৃতাগুলি দিয়েছেন উৎপল দত্ত, হাবিব তানবীর, দীনা পাঠক, কে এন পানিক্কর, জি পি দেশপাণ্ডে, সুমিত সরকার, এম কে রায়না, বি ভি করন্থ, এইচ এস শিবপ্রকাশ, রতন থিয়াম, পবিত্র সরকার, বিভাস চক্রবর্তী, সত্যদেব দুবে, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, মনোজ মিত্র, অরুণ মুখোপাধ্যায়, শিশিরকুমার দাশ, অশোক মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এই বক্তৃতাগুলি রেকর্ড করে রাখা হয়েছে।

সহযোগ প্রকল্প[সম্পাদনা]

নাট্যচর্চা প্রসার প্রকল্প নামক একটি প্রকল্পের শিরোনামে নাট্য আকাদেমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে আলোচনা চক্র, সেমিনার, বক্তৃতা, কর্মশালা প্রভৃতি আয়োজন করে থাকে। যৌথ উদ্যোগে নাট্য প্রযোজনাও চলে।

সম্মাননা ও অনুদান[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গের সর্বাপেক্ষা সম্মানজনক তিন নাট্য পুরস্কার পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি কর্তৃক প্রদত্ত হয়। এগুলি হল:

  • নাট্য আকাদেমি পুরস্কার – প্রযোজনা, নাট্যরচনা, অভিনয়, নির্দেশনা, মঞ্চসজ্জা, নকশা ও সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রদত্ত
  • দীনবন্ধু পুরস্কার – সারাজীবনের কৃতিত্বের জন্য
  • গিরিশ পুরস্কার – সারা জীবনের কৃতিত্বের জন্য

এই পুরস্কারগুলি ছাড়াও দুঃস্থ নাট্যকর্মীদের সাহায্যার্থে, বিশেষ প্রকল্পে বা নতুন প্রযোজনার জন্য বিভিন্ন অনুদান নাট্য আকাদেমি দিয়ে থাকে।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]