ভাষা আন্দোলন দিবস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভাষা আন্দোলন দিবস
ভাষা আন্দোলন দিবস
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতে বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহীদদের সম্মানে নির্মিত শহীদ মিনার
আনুষ্ঠানিক নাম ভাষা আন্দোলন দিবস
অন্য নাম শহীদ দিবস
পালনকারী  বাংলাদেশ
উদযাপন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে উত্তোলন, প্যারেড, জাতীয় সঙ্গীতআমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গান গাওয়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
তারিখ ২১শে ফেব্রুয়ারী
সংঘ্টন বার্ষিক
সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ভাষা আন্দোলন দিবস বা শহীদ দিবস, বাংলাদেশে পালিত একটি জাতীয় দিবস। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে আন্দোলনরত শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য এই জাতীয় দিবসটি পালন করা হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: বাংলা ভাষা আন্দোলন

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর, বাংলা ভাষার ৪ কোটি ৪০ লাখ জনগণ পূর্ব বাংলার অংশ হয়ে যায় এবং পাকিস্তান অধিরাজ্য হিসাবে ব্যবহৃত হইতে থাকে।[১] পাকিস্তানের সরকার, প্রসাশন, সামরকি বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য দেখা দেয়।[২] ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা এবং স্কুল ও মিডিয়াতে ব্যবহার করার প্রস্তাব করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ করা হয়।[৩][৪] ঢাকায় ছাত্ররা [[তমদ্দুন মজলিস|তমদ্দুন মজলিসের] প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ব্যালি বের করে। বৈঠকে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারী ভাষা এবং পূর্ব বাংলার শিক্ষার মাধ্যম করার সিদ্ধান্ত হয়। [৫] তবে, পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন অনুমোদিত বিষয় তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেয় এবং একই সঙ্গে কারেন্সি নোট এবং স্ট্যাম্প থেকে বাংলা মুছে ফেলা হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেন।[৬] এতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয় এবং বাঙালি ছাত্রদের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে একটি সরকারী ভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জমায়েত হয়। এজন্য ছাত্ররা ঢাকায় মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে।

প্রতিবাদ[সম্পাদনা]

ঢাকায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী প্রতিবাদ মিছিল।

১৯৫২ সালে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী ছাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু ঘোষণা করার প্রতিবাদে জন্য পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাঙালী ,মোট নাগরিকের (১৯৫২ এর হিসাবে) প্রায় ৫৪%। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন ছাত্র নিজেদের জন্য এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য জীবন দান করেন। সকাল নয়টায়, ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জড়ো হতে শুরু করে। সশস্ত্র পুলিশ বেষ্টিত ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সোয়া এগারোটার দিকে, ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় গেট জড়ো হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভাঙার চেষ্টা করে[১]। ছাত্রদের একটি দল ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে দৌড় দেয় এবং বাকিরা পুলিশ পরিবেষ্টিত ক্যাম্পাসে মিছিল করে। উপাচার্য পুলিশকে গুলি চালানো বন্ধ এবং ছাত্রদেরকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার আদেশ দেন। যাইহোক, ছাত্ররা চলে যাবার সময়, পুলিশ ১৪৪ ধারা লঙ্ঘনের জন্য কিছু ছাত্রকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সংবাদ পেয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা পূর্ব বাংলা গণপরিষদ অবরোধ করে এবং গণপরিষদে তাদের প্রস্তাব উপস্থাপনের দাবি জানায়। ছাত্রদের একটি দল বিল্ডিং মধ্যে দ্রুত ঢোকার চেষ্টাকালে পুলিশ গুলি চালায় এবং তাতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার সহ অনেক ছাত্র নিহত হয়[১][৭]। হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে, সারা শহর জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট, অফিস ও গনপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ধর্মঘট শুরু হয়। আইনসভায়, মনোরঞ্জন ধর, বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমেদ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সহ ছয় বিধায়ক মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে আহত ছাত্রদের দেখতে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার দাবি জানান এবং শোকের চিহ্ন হিসেবে গণপরিষদ মুলতবির দাবি করেন।[৮] মাওলানা আবদূর রশীদ তর্কবাগীশ, শরফুদ্দীন আহমেদ, শামসুদ্দীন আহমেদ খন্দকার এবং মশিউদ্দিন আহমেদ সহ সরকারি দলের কিছু সদস্য সমর্থন দেন।[৮] তবে নুরুল আমিন এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।[১][৮]

প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

সংবিধান সংশোধন[সম্পাদনা]

৭ মে ১৯৫৪ সালে, গণপরিষদে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলা আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১৪ (১) পুর্নলিখিত হয় এভাবে "পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু এবং বাংলা"।

তবে, আইয়ুব খানের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক সরকার একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু পুনরায় স্থাপন করার চেষ্টা চালায়। ৬ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে, সামরিক সরকার একটি সরকারী বিবৃতি জারি করে এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানের নীতি " দুই রাষ্ট্র ভাষা" সমর্থন সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বহাল করে।[৯]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

যদিও সরকারী ভাষার প্রশ্ন ১৯৫৬ সালে নিষ্পত্তি হয়, আইয়ুব খানের সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ব্যয় পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থে খরচ হতে থাকে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতার বন্টন পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূল হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তান "এক ইউনিট তত্ত্ব" নামে এক অভিনব ধারণার সূত্রপাত করে, যেখানে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের এই অনৈতিক ক্ষমতা দখল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েই চলে। যার ফলে অধিকতর স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ছয় দফা আন্দোলন শুরু হয়। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রুপ নেয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

স্মৃতিরক্ষা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

এই আন্দোলন স্মৃতিরক্ষায় গনহত্যার স্থানে একটি আনুষ্ঠানিক এবং প্রতীক ভাস্কর্য শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে। দিনটি বাংলাদেশে এবং পরে পশ্চিম বঙ্গে শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হয়। এই দিনটি বাংলাদেশে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউনেস্কোর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরের সাধারণ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশের জমা দেয়া এবং অন্যান্য ২৮ টি দেশের সমর্থনে জমা দেওয়া খসড়া প্রস্তাবটি গ্রহণ করে।

আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারত[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: বাংলা ভাষা আন্দোলন (বরাক উপত্যকা)

১৯শে মে, ১৯৬১ সালে ভারতের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে ১১ জন মারা যায়, যখন আসামে অসমীয়া ভাষাকে বাধ্যতামুলক করার প্রতিবাদ করছিল।[১০]

আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালিরা শিলচর রেল স্টেশনে পুলিশের আগুনে দিনে নিহত ১১ জন বাঙালি স্মরনে ১৯শে মে ভাষা আন্দোলন দিবস হিসেবে পালন করে।[১১]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ "Language Movement" (PHP)। Banglapedia - The National Encyclopedia of Bangladesh। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত 2007-02-06 
  2. Oldenburg, Philip (August 1985)। ""A Place Insufficiently Imagined": Language, Belief, and the Pakistan Crisis of 1971"। The Journal of Asian Studies (The Journal of Asian Studies, Vol. 44, No. 4) 44 (4): 711–733। আইএসএসএন 0021-9118জেএসটিওআর 2056443ডিওআই:10.2307/2056443 
  3. Morning News। 7 December 1947। 
  4. The Azad (a daily newspaper) (Bengali ভাষায়) (Abul Kalam Shamsuddin, Dhaka)। 11 December 1948। 
  5. (Umar 1979, পৃ. 35)
  6. (Al Helal 2003, পৃ. 227–28)
  7. "Dhaka Medical College Hostel Prangone Chatro Shomabesher Upor Policer Guliborshon. Bishwabidyalayer Tinjon Chatroshoho Char Bekti Nihoto O Shotero Bekti Ahoto"। The Azad (Bengali ভাষায়)। 22 February 1952। 
  8. ৮.০ ৮.১ ৮.২ (Al Helal 2003, পৃ. 377–393)
  9. Lambert, Richard D. (April 1959)। "Factors in Bengali Regionalism in Pakistan"। Far Eastern Survey 28 (4): 49–58। আইএসএসএন 0362-8949ডিওআই:10.1525/as.1959.28.4.01p1259x 
  10. "No alliance with BJP, says AGP chief"। The Telegraph। 27 December 2003। সংগৃহীত 2006-11-19 
  11. Subir Bhaumik (2009-12-22)। "Bengali 'should be UN language'"BBC News। সংগৃহীত 2010-01-25 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]