অন্নপূর্ণা (দেবী)
- এই নিবন্ধটি হিন্দু দেবী অন্নপূর্ণা সম্বন্ধীয়। একই নামের পর্বতশৃঙ্গটি সম্পর্কে জানতে দেখুন অন্নপূর্ণা (পর্বতশৃঙ্গ)
| অন্নপূর্ণা | |
|---|---|
দেবী অন্নপূর্ণা, রঙিন লিথোগ্রাফ, বঙ্গীয় চিত্রকলা, ১৮৯৫ |
|
| গোত্র | দেবী |
| অধিষ্ঠান | কাশী |
| মন্ত্র | "হ্রীং নমো ভগবতি মাহেশ্বরি অন্নপূর্ণে স্বাহা" "অন্নপূর্ণে সদা পূর্ণে শঙ্করপ্রাণবল্লভে। জ্ঞানবৈরাগ্যসিদ্ধ্যর্থং ভিক্ষাং দেহি নমোঽস্তু তে।।" |
| অস্ত্র | অন্নপাত্র, দর্বী |
| দাম্পত্যসঙ্গী | শিব |
অন্নপূর্ণা এক হিন্দু দেবী। তাঁর অপর নাম অন্নদা। তিনি শক্তির এক রূপ। অন্নপূর্ণা দ্বিভূজা, তাঁর দুই হাতে অন্নপাত্র ও দর্বী; তিনি রক্তবর্ণা, সফরাক্ষী, স্তনভারনম্রা, বিচিত্র বসনা, নিরত অন্নপ্রয়াদিনী ও ভবদুঃখহন্ত্রী; তাঁর মস্তকে নবচন্দ্র, একপাশে ভূমি ও অন্যপাশে শ্রী। নৃত্যপরায়ণ শিবকে দেখে তিনি সন্তুষ্ট হন।[১]
দেবী পার্বতী ভিক্ষারত শিবকে অন্নপ্রদান করে এই নাম প্রাপ্ত হন। চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণার পূজা করা হয়। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্নপূর্ণার পূজা করলে গৃহে অন্নাভাব থাকে না।[২] কোনো প্রাচীন গ্রন্থে অন্নপূর্ণা পূজার কথা উল্লিখিত হয়নি। দক্ষিণামূর্তি সংহিতা গ্রন্থে চতুর্ভূজা এবং পদ্ম, অভয়, অঙ্কুশ ও দান হস্তা অন্নপূর্ণার বর্ণনা রয়েছে। কৃষ্ণানন্দ রচিত তন্ত্রসার গ্রন্থে এই পূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। কাশীতে অন্নপূর্ণার একটি বিখ্যাত মন্দির আছে; এই মন্দিরে অন্নপূর্ণা পূজা ও অন্নকূট উৎসব প্রসিদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গে অন্নপূর্ণা পূজার বিশেষ প্রচলন রয়েছে।[৩] অন্নপূর্ণা পূজা কালী ও জগদ্ধাত্রী পূজার মতোই তান্ত্রিক পূজা।
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র দেবীর অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে:
| “ | অন্নদামঙ্গলকাব্য অষ্টাদশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের অন্যতম। ... মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র কর্তৃক অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষ্যে মহারাজের নিজ কীর্তি এবং তাঁহার পূর্বপুরুষ ভবানন্দ মজুমদারের রাজ্য ও রাজা উপাধি লাভের কাহিনী বর্ণনাই ছিল কবির প্রধান উদ্দেশ্য। দেবী অন্নদা (অন্নপূর্ণা) কীভাবে ভবানন্দ মজুমদারকে কৃপা করিলেন, এবং ভবানন্দ কীভাবে জাহাঙ্গীরের দ্বারা অন্নপূর্ণা পূজা করাইয়া রাজত্ব ও রাজা খেতাব লাভ করিলেন – ইহার বর্ণনাই ছিল কবির প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য। কিন্তু কবি পৌরাণিক অংশ বিশেষ ফলাও করিয়া বর্ণনা করিয়াছেন।[৪] | ” |
মাইকেল মধুসূদন দত্ত দেবী অন্নপূর্ণা ও অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রশস্তি করেছেন তাঁর "অন্নপূর্ণার ঝাঁপি" কবিতায়।
পরিচ্ছেদসমূহ |
পৌরাণিক উপাখ্যান [সম্পাদনা]
মার্কণ্ডেয় পুরাণের কাশীখণ্ড, ভাগবত পুরাণ ও অন্যান্য পুরাণ এবং কাশীপরিক্রমা ইত্যাদি গ্রন্থে দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত নানা কাহিনি প্রচারিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে দুটি কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – কাশীপ্রতিষ্ঠার উপাখ্যান ও ব্যাসকাশী প্রতিষ্ঠার উপাখ্যান। এছাড়া অন্নদামঙ্গল কাব্যেও অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত কয়েকটি লৌকিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
কাশীপ্রতিষ্ঠার উপাখ্যান [সম্পাদনা]
শিব ও পার্বতীর বিবাহের পর উভয়ে কৈলাস শিখরে দাম্পত্যজীবন অতিবাহিত করতে থাকেন। শিব ছিলেন দরিদ্র। তাঁর দারিদ্র্য যুগলের সংসারে দাম্পত্য কলহের কারণ হল। পার্বতীর তিরষ্কারে লাঞ্ছিত হয়ে শিব ভিক্ষায় বাহির হলেন। কিন্তু পার্বতীর মায়ায় তিনি কোথায় ভিক্ষা পেলেন না। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন কৈলাসে। অতঃপর শিব দেবী অন্নপূর্ণার নিকট ‘সঘৃত পলান্ন’ পায়স, পিঠে ইত্যাদি ভোজন করেন। এরপর শিব দেবীর মহিমাবৃদ্ধির জন্য কাশী নির্মাণ করে সেখানে অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। চৈত্রমাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে দেবী অন্নপূর্ণা কাশীতে অবতীর্ণা হলেন। তদাবধি এই তিথিতে দেবীর পূজা প্রচারিত হল।
ব্যাসকাশী প্রতিষ্ঠার উপাখ্যান [সম্পাদনা]
দেবী অন্নপূর্ণা কর্তৃক ব্যাসকাশী প্রতিষ্ঠার উপাখ্যানটি কাশীখণ্ডে নেই। এটি অর্বাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ কাশীপরিক্রমা থেকে গৃহীত।[৫] কাহিনিটি নিম্নরূপ:
পরম বৈষ্ণব ব্যাসদেব বিষ্ণুর নিকট শিবের নিন্দা করায় বিষ্ণু কর্তৃক তিরস্কৃত হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি শিবের নিকট গিয়ে বিষ্ণুর নিন্দা করেন। তখন শিবও তাঁকে তিরস্কার করেন। এরপর শিব তাঁকে পর্ব ব্যতীত কাশী পরিক্রমা করতে নিষেধ করলে অপমানিত ব্যাসদেব দ্বিতীয় কাশী নির্মাণ করতে উদ্যত হন। কিন্তু কোনো দেবতাই তাঁর এই গর্হিত কর্মের ভাগীদার হতে চাইলেন না। শেষে ব্যাসদেব দেবী অন্নপূর্ণার ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। অন্নপূর্ণা এক জরতীর ছদ্মবেশে উপস্থিত হয়ে বারংবার তাঁকে প্রশ্ন করতে থাকেন, “কি হইবে এখানে মরিলে?” ব্যাসদেব বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেন, “গর্দভ হইবে বুড়ি এখানে মরিলে।” দেবীর ছলনা সফল হল। তিনি ‘তথাস্তু’ বলে অন্তর্হিত হলেন। কাশীমহিমা রক্ষিত হল। ব্যাসকাশী গর্দভ-বারাণসী নামে উপহাসিত হল।
আরও দেখুন [সম্পাদনা]
তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]
- ↑ অন্নপূর্ণার ধ্যান ও প্রণাম, স্তবকবচমালা ও ধ্যানমালা, পণ্ডিত বামদেব ভট্টাচার্য সম্পাদিত, অক্ষয় লাইব্রেরী, কলকাতা, পৃ. ৩০৬-০৭
- ↑ Hindu Gods and Goddesses, Swami Harshananda, Sri Ramakrishna Math, Chennai, 2005, pp. 122
- ↑ পৌরাণিকা: বিশ্বকোষ হিন্দুধর্ম, অমলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ফার্মা কেএলএম প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ৫৯
- ↑ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, তৃতীয় খণ্ড: দ্বিতীয় পর্ব, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ন বুক এজেন্সি প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ২০০১ সংস্করণ, পৃ. ১৪৭-৪৯
- ↑ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, তৃতীয় খণ্ড: দ্বিতীয় পর্ব, পৃ. ১৫১