দক্ষিণরায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দক্ষিণরায়ের মূর্তি, ধপধোপি

দক্ষিণ রায় হলেন বাংলাদেশভারতের সুন্দরবন অঞ্চলে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পূজিত এক লোকদেবতা। তাঁকে পশু ও দানবদের নিয়ন্ত্রক বা বাঘের রাজা মনে করা হয়। সুন্দরবনের অধিবাসীরা দক্ষিণরায়কে সুন্দরবনের ভাটি অঞ্চলের অধিপতি মনে করেন।[১][২][৩] অপর এক লোকদেবী বনবিবিপীর বড়খাঁ গাজীর সাথে দক্ষিণ রায়ের বিরোধের কথা সুন্দরবনের লোককাহিনী, সংস্কৃতি, পালাগানের অঙ্গ।

লোকসংস্কৃতিতে[সম্পাদনা]

স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, দক্ষিণরায়ের রাজত্বের সীমা দক্ষিণে কাকদ্বীপ, উত্তরে ভাগীরথী নদী, পশ্চিমে ঘাটাল ও পূর্বে বাকলা জেলা। প্রত্যেক অমাবস্যায় দক্ষিণরায় মন্দিরে পশুবলি হয়। লোকবিশ্বাস অনুসারে দক্ষিণরায় গানবাজনা পছন্দ করেন। তাই স্থানীয় লোকেরা রাতে তার মন্দিরে নাচগানের আসর বসান। দক্ষিণ রায়ের বার্ষিক পূজা উপলক্ষে গায়েনরা পালাক্রমে কবি কৃষ্ণরাম দাস রচিত রায়মঙ্গল পরিবেশন করে এবং বাউল্যা, মউল্যা, মলঙ্গি প্রভৃতি শ্রমজীবী মানুষেরা হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এ গান ভক্তিভরে শ্রবণ করেন[৪]। সুন্দরবনের অধিবাসীরা ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে মাছধরা, কাষ্ঠ বা মধু আহরণের মতো কোনো কাজে যাওয়ার আগে দক্ষিণরায়ের মন্দিরে পূজা দেন। কেউ কেউ মাথার পিছন দিকে দক্ষিণরায়ের মুখোশ পরে জঙ্গলে ঢোকেন যাতে বাঘ সেই মুখোশ দেখে ভয় পেয়ে তার কাছে না আসে।[২]

মন্দির[সম্পাদনা]

কলকাতার গড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে লক্ষ্মীকান্তপুর ও ধপধপির কয়েক মেইল দূরে একটি দক্ষিণরায় মন্দির আছে। এই অঞ্চলটি এক সময়ে সুন্দরবনের অন্তর্গত ছিল। এখনও এই অঞ্চলের অধিবাসীরা দক্ষিণরায় মন্দিরে পূজা দেন। দক্ষিণরায়ের মূর্তিতে একটি বিরাট গোঁফ দেখা যায়। তার শরীর শীর্ণ, চকচকে এবং হলদেটে। গায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ দেখা যায়। মুখের দুদিক থেকেই লালা ঝরে। তার একটি ছয় মিটার দীর্ঘ লেজও আছে।

দক্ষিণ রায়ের পুজো[সম্পাদনা]

দক্ষিণ রায়ের বাহন কোথাও বাঘ, কোথাও ঘোড়া। বারুইপুর থানার অন্তর্গত ধপধপি গ্রামে দক্ষিণ রায়ের মূর্তিটি এক সুপুরুষ রাজযোদ্ধার মতো, তাঁর হাতে বন্দুক, কোমরে তরবারি। মূর্তির পিছনে দেখা যায় ত্রিশয়ল, তীর-ধনুক, কুঠার, ঢাল ইত্যাদি অস্ত্র। সাদা ওড়না কাঁধে, সাদা ধুতি আর পায়ে নাগরা জুতো পরে দক্ষিণ রায় পূজিত হন। তবে মূলত দুই রকমের মূর্তি দেখা যায় দক্ষিণ রায়ের – একটিকে বলে দিব্যমূর্তি আর অন্যটি হল বারামূর্তি। বারামূর্তিতে একটি তিন কোনা মুকুট দেখা যায় দক্ষিণ রায়ের মাথায় আর চোখের টানা ভ্রু, টানা গোঁফ আর দু পাটি লম্বা লম্বা দাঁত মুখ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সাধারণভাবে লোকসংস্কৃতির গবেষকরা মনে করেন গোঁফযুক্ত পুরুষমূর্তিটিই আসলে দক্ষিণ রায়ের বারামূর্তি। তাঁর পূজা মূলত মাঘ মাসে হয়ে থাকে। দিনের বেলায় পুজোর সময় লম্বা বাঁশের মাথায় আগুন জ্বেলে চারদিকে ঘোরানো হয়। লোকের বিশ্বাস যে সেই আগুন যতদূর পর্যন্ত দেখা যাবে ততদূর পর্যন্ত হিংস্র প্রাণী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব কেউই প্রবেশ করতে পারে না। দক্ষিণ রায়ের পূজায় ফলমূলের পাশাপাশি পোড়া মাছ, মাংস দেওয়া হয় নৈবেদ্য হিসেবে। হিন্দুরা এর পুজোয় ছাগল বলি দেয় আর মুসলমানরা হাঁস-মুরগি বলি দেয়।[৫]

সাহিত্যে[সম্পাদনা]

কবি কৃষ্ণরাম দাসের রায়মঙ্গল, ছাড়াও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সেন, নীহাররঞ্জন রায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণরায় সম্পর্কে লিখেছেন।[৬] রাজশেখর বসু (পরশুরাম)র বিখ্যাত ছোটগল্পে এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর কিশোর রহস্য উপন্যাস 'জংগলের মধ্যে গম্বুজ' বইতে দক্ষিণরায়ের কথা আছে।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "Protection from the Gods:"। lairweb.org.nz/। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০১২ 
  2. Valmik Thapar (১৯৯৭)। Land of the Tiger: A Natural History of the Indian Subcontinent। University of California Press। পৃষ্ঠা 117–। আইএসবিএন 978-0-520-21470-5। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০১২ 
  3. Swati Mitra (২০১১)। Wild Trail in Bengal: Travel Guide। Goodearth Publications। পৃষ্ঠা 18–। আইএসবিএন 978-93-80262-16-1। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০১২ 
  4. বাঙলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ। "রায়মঙ্গল"। বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২৫.০১.২০১৭  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  5. "দক্ষিণ রায়"সববাংলায়। ২০২১-০৯-১৬। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-২৪ 
  6. গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু (২০১৫)। বাংলার লৌকিক দেবতা। কলকাতা: দেজ পাবলিশিং। পৃষ্ঠা ১৫০।