পথের পাঁচালী (চলচ্চিত্র)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পথের পাঁচালী
PatherDVD.jpg
ডিভিডি কাভার
পরিচালক সত্যজিৎ রায়
প্রযোজক পশ্চিমবঙ্গ সরকার
রচয়িতা সত্যজিৎ রায়
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে
অভিনেতা কানু বন্দ্যোপাধ্যায়
করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়
সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়
ঊমা দাশগুপ্ত
চুনীবালা দেবী
রেবা দেবী
সুরকার রবি শংকর
চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র
সম্পাদক দুলাল দত্ত
বণ্টনকারী এডওয়ার্ড হ্যারিসন (১৯৫৮)
মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকসন্স
সনি পিকচারস ক্লাসিকস (১৯৯৫)
মুক্তি ২৬..১৯৫৫
দৈর্ঘ্য ১১৫ মিনিট
১২২ মিনিট (পশ্চিমবঙ্গ)[১]
দেশ ভারত
ভাষা বাংলা
নির্মাণব্যয় Indian Rupee১,৫০,০০০[২]

পথের পাঁচালী ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলা চলচ্চিত্র। ছবিটির প্রযোজক পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং পরিচালক সত্যজিৎ রায়বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস পথের পাঁচালী অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র তথা তাঁর প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র-সিরিজ অপু ত্রয়ী-র প্রথম ছবি। ছবির মুখ্য চরিত্র অপু। বিশ শতকের বিশের দশকে বাংলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে অপুর বেড়ে ওঠার গল্পই এই ছবির প্রধান বিষয়।

পথের পাঁচালী ছবিটির নির্মাণকালীন বাজেট ছিল মাত্র দেড় লক্ষ টাকা (তিন হাজার মার্কিন ডলার)।[৩] ছবির অভিনেতারা সেই অর্থে জনপ্রিয় তারকা ছিলেন না। অন্যান্য কলাকুশলীরাও যথেষ্ট অনভিজ্ঞ ছিলেন।কিন্তু তা সত্ত্বেও পথের পাঁচালী সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়োতে সক্ষম হয়। ইতালিয়ান নিওরিয়ালিজম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যজিৎ রায় এই ছবিতে কাব্যিক বাস্তবতাবাদের নিজস্ব এক শৈলীর বিকাশ ঘটান। পথের পাঁচালী স্বাধীন ভারতে নির্মিত আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৫৬ কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি "বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট" পুরস্কার লাভ করে।[৪] এর ফলে সত্যজিৎ রায়ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। আজ পথের পাঁচালী ছবিটিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলির অন্যতম মনে করা হয়।

প্লট[সম্পাদনা]

বিশ শতকের বিশের দশকে বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অপু (সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়) ও তাঁর পরিবারবর্গের জীবনযাত্রার কথাই পথের পাঁচালী ছবির মুখ্য বিষয়। অপুর বাবা হরিহর রায় (কানু বন্দ্যোপাধ্যায়) নিশ্চিন্দিপুরের পৈত্রিক ভিটেয় তাঁর নাতিবৃহৎ পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তিনি পেশায় পুরোহিত। আয় সামান্য। লেখাপড়া জানেন। তাই কিছু ভাল যাত্রাপালা লিখে অধিক উপার্জনের স্বপ্ন দেখেন। বাস্তবে তিনি অত্যন্ত ভালমানুষ এবং লাজুক প্রকৃতির লোক। সকলে সহজেই তাকে ঠকিয়ে নেয়। পরিবারের তীব্র অর্থসংকটের সময়েও তিনি তাঁর প্রাপ্য বেতন আদায় করার জন্য নিয়োগকর্তাকে তাগাদা দিতে পারেন না। হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়া তাঁর দুই সন্তান দুর্গা (উমা দাশগুপ্ত) ও অপু এবং হরিহরের দূর সম্পর্কের বিধবা পিসি ইন্দির ঠাকরুনের (চুনীবালা দেবী) দেখাশোনা করেন। দরিদ্রের সংসার বলে নিজের সংসারে বৃদ্ধ ন্যূজদেহ ইন্দির ঠাকরুনের ভাগ বসানোটা ভাল চোখে দেখেন না সর্বজয়া। সর্বজয়ার অত্যাচার অসহ্য বোধ হলে ইন্দির মাঝে মাঝে অন্য এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। দুর্গা পড়শির বাগান থেকে ফলমূল চুরি করে আনে ও ইন্দির ঠাকরুনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায়। পড়শিরা এসে সর্বজয়াকে গঞ্জনা দেয়। একবার তো পড়শিরা এসে দুর্গাকে একটি পুতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করে। তবে দুর্গাই যে চোর, সেকথা তারা প্রমাণ করতে পারেনি।

ভাইবোন অপু ও দুর্গার মধ্যে খুব ভাব। দুর্গা দিদি। সেও মায়ের মতোই অপুকে ভালবাসে। তবে মাঝেমধ্যে তাকে খেপিয়ে তুলতেও ছাড়ে না। তারা কখনও কখনও চুপচাপ গাছতলায় বসে থাকে, কখনও মিঠাইওয়ালার পিছু পিছু ছোটে, কখনও ভ্রাম্যমান বায়োস্কোপ-ওয়ালার বায়োস্কোপ দেখে বা যাত্রাপালা দেখে। সন্ধ্যাবেলা দু'জনে দূরাগত ট্রেনের বাঁশি শুনতে পায়। একদিন তারা বাড়িতে না বলে অনেক দূরে চলে আসে ট্রেন দেখবে বলে। কাশের বনে ট্রেন দেখার জন্য অপু-দুর্গার ছোটাছুটির দৃশ্যটি এই ছবি এক স্মরণীয় ক্ষণ। আবার একদিন জঙ্গলের মধ্যে খেলা করতে গিয়ে তারা ইন্দির ঠাকরুনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়।

গ্রামে ভাল উপার্জন করতে সক্ষম না হয়ে হরিহর একটা ভাল কাজের আশায় শহরে যায়। সর্বজয়াকে সে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায় যে, ভাল উপার্জন হলে ফিরে এসে ভাঙা বসতবাড়িটা সে সারাবে। হরিহরের অনুপস্তিতিতে বাড়ির অর্থসংকট তীব্রতর হয়। সর্বজয়া অত্যন্ত একা বোধ করতে থাকেন। বর্ষাকাল আসে। একদিন দুর্গা অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধায়। ওষুধের অভাবে তার জ্বর বেড়েই চলে। শেষে এক ঝড়ের রাতে দুর্গা মারা যায়। এরপর একদিন হরিহর ফিরে আসে। শহর থেকে যা কিছু এনেছে, তা সর্বজয়াকে বের করে দেখাতে থাকে। সর্বজয়া প্রথমে চুপ করে থাকে। পরে স্বামীর পায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। হরিহর বুঝতে পারে যে, সে তার একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছে। তারা ঠিক করে গ্রাম ও পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে জীবিকার সন্ধানে। যাত্রার তোড়জোড় শুরু হলে, অপু দুর্গার চুরি করা পুতির মালাটা আবিষ্কার করে। সে মালাটা ডোবার জলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, অপু বাবামায়ের সঙ্গে গোরুর গাড়িতে চড়ে নতুন এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলেছে।

শ্রেষ্ঠাংশে[সম্পাদনা]

প্রযোজনা[সম্পাদনা]

উপন্যাস[সম্পাদনা]

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী বাংলা সাহিত্যের একটি ধ্রুপদি জীবনীমূলক উপন্যাস (বিলডুংসরোমান)। ১৯২৮ সালে একটি সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে শুরু করে। বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে।[৫] উপন্যাসখানি অনেকাংশে লেখকের আত্মজীবনীমূলক। এতে একটি দরিদ্র পরিবারের নিজের ভিটেমাটিতে টিকে থাকার লড়াই এবং সেই পরিবারের শিশুপুত্র অপুর বেড়ে ওঠা দেখানো হয়েছে। উপন্যাসের শেষাংশে রয়েছে বাবামায়ের সঙ্গে অপুর কাশীযাত্রা ও কাশীবাসের গল্প। এই অংশটুকু সিরিজের পরবর্তী ছবি অপরাজিত-এ প্রদর্শিত হয়েছে।

১৯৪৩ সালে পথের পাঁচালী উপন্যাসের একটি নতুন সংস্করণের অলংকরণ করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেই সময় তিনি উপন্যাসটি প্রথমবার পড়েন। সম্ভবত ১৯৪৭-৪৮ সাল নাগাদ তিনি এই ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেন।[৬] সত্যজিৎ রায় কেন এই উপন্যাসটিকেও বেছে নিলেন তাঁর প্রথম ছবির জন্য? তাঁর মতে, এই উপন্যাসের এমন কিছু গুণ ছিল যা এটিকে একটি মহান বই করেছিল: এর মানবতাবোধ, এর কাব্যসুষমা, এবং এর সত্যবলয়। লেখকের বিধবা পত্নী এই উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়কে ছবি করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে এই অনুমতি নীতিগত। এর জন্য কোনো রকম আর্থিক আদানপ্রদান হয়নি।

সম্মামনা[সম্পাদনা]

’পথের পাঁচালী’ দেশী বিদেশী অনেক পুরষ্কার অর্জন করে ।

সাল পুরুষ্কার চলচ্চিত্র উৎসব দেশ
১৯৫৫
  • ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেষ্ট ফিচার ফিল্ম (গোল্ডেন লোটাস অ্যাওয়ার্ড)
  • ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেষ্ট ফিচার ফিল্ম বাংলা (সিলভার লোটাস অ্যাওয়ার্ড)
৩য় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (ভারত)  ভারত
১৯৫৬
  • পামি ডি’আর প্রতিযোগিতা[৭]
  • শ্রেষ্ঠ মানব ডকুমেন্ট
  • ওসিআইসি পুরষ্কার - বিশেষ উল্লেখ
১৯৫৬ ৯ম কান চলচ্চিত্র উৎসব  ফ্রান্স
১৯৫৬ ভ্যাটিকান পুরস্কার, রোম --  ইতালি
১৯৫৬ গোল্ডেন কারবাও, ম্যানিলা --  ফিলিপাইন
১৯৫৬ মেধার ডিপ্লোমা এডিনবরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব  স্কটল্যান্ড
১৯৫৭ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ‘সাজনিক গোল্ডেন লরেল’ বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব  জার্মানি
১৯৫৭
  • শ্রেষ্ঠ পরিচালক জন্য গোল্ডেন গেট
  • শ্রেষ্ঠ ছবি জন্য গোল্ডেন গেট
সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব  যুক্তরাষ্ট্র
১৯৫৮ শ্রেষ্ঠ ছায়াছবি ভ্যানকুভার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব  কানাডা
১৯৫৮ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড[৮] স্ট্র্যাটফোর্ড ফিল্ম ফেস্টিভাল  কানাডা
১৯৫৮ সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র, জাতীয় বোর্ড পর্যালোচনা পুরস্কার ১৯৫৮[৯] --  যুক্তরাষ্ট্র
১৯৫৯ সেরা বিদেশী চলচ্চিত্র নিউইয়র্ক চলচ্চিত্র উত্সব  যুক্তরাষ্ট্র
১৯৬৬ কিনেমা জাম্পু পুরস্কার সেরা বিদেশী চলচ্চিত্র জন্য --  জাপান
১৯৬৯ শ্রেষ্ঠ অইউরোপীয় ছায়াছবির জন্য বদিল পুরস্কার[১০] --  ডেনমার্ক

উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

পথের পাঁচালী ছবিটি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র তথা তাঁর প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র-সিরিজ অপু ত্রয়ী-র প্রথম ছবি। অপর দুটি ছবি হল অপরাজিত (১৯৫৬) ও অপুর সংসার (১৯৫৯) । তিনটি ছবি একত্রে অপু ত্রয়ী হিসাবে পরিচিত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Pather Panchali"Media Resource Center FilmFinder। University of North Carolina at Chapel Hill। সংগৃহীত 2008-06-19 
  2. Satyajit Ray: interviews। University Press of Mississippi। আইএসবিএন 978-1-57806-936-1। সংগৃহীত 10 February 2012 
  3. Pradip Biswas (16 September 2005)। "50 years of Pather Panchali"Screen Weekly। সংগৃহীত 2009-04-23 
  4. "Festival de Cannes: Pather Panchali"festival-cannes.com। সংগৃহীত 2009-02-05 
  5. Swekhar, Saumitra। "Pather Panchali"BanglapediaAsiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত 2008-08-02 
  6. Micciollo, Henry। "Entrevista con Satyajit Ray a propósito de la Trilogía de Apu" (Spanish ভাষায়)। La Fábula Ciencia। সংগৃহীত 2008-05-31 
  7. "Festival de Cannes: Pather Panchali"festival-cannes.com 
  8. "Indian Film Honored; Pather Panchali Wins Prize at Stratford, Ont., Fete"New York Times। 1958-07-14। পৃ: 16। 
  9. "Awards 1958, National Board of Review Awards" 
  10. "Awards 1969, Bodil Awards"