পথের পাঁচালী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পথের পাঁচালী
লেখকবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
দেশভারত
ভাষাবাংলা
ধরনবিয়োগান্তক, পারিবারিক কাহিনী
প্রকাশকরঞ্জন প্রকাশলয়
প্রকাশনার তারিখ
১৩৩৬ বঙ্গাব্দ (১৯২৯ খ্রি)
পৃষ্ঠাসংখ্যা২৫
পরবর্তী বইঅপরাজিত 

পথের পাঁচালী[১] হলো প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস। বাংলার গ্রামে দুই ভাইবোন অপু আর দুর্গার বেড়ে ওঠা নিয়েই বিখ্যাত এই উপন্যাস। এই উপন্যাসের ছোটদের জন্য সংস্করণটির নাম আম আঁটির ভেঁপু। পরবর্তীকালে বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাসটি অবলম্বনে পথের পাঁচালী (চলচ্চিত্র) নির্মাণ করেন যা পৃথিবী-বিখ্যাত হয়।[২]

সমগ্র উপন্যাসটি তিনটি খণ্ড ও মোট পঁয়ত্রিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। খণ্ড তিনটি যথাক্রমে বল্লালী বালাই (পরিচ্ছেদ ১-৬; ইন্দির ঠাকরূনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে), আম-আঁটির ভেঁপু (পরিচ্ছেদ ৭-২৯; অপু-দুর্গার একসাথে বেড়ে ওঠা, চঞ্চল শৈশব, দুর্গার মৃত্যু, অপুর সপরিবারে কাশীযাত্রা চিত্রিত হয়েছে) এবং অক্রূর সংবাদ (পরিচ্ছেদ ৩০-৩৫; অপুদের কাশীজীবন, হরিহরের মৃত্যু, সর্বজয়ার কাজের জন্য কাশীত্যাগ এবং পরিশেষে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে আসার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে)।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

এটি প্রথমে ১৯২৮ সালে কলকাতার একটি পত্রিকায় ধারাবাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়[৩] এবং পরের বছর একটি বই হিসেবে প্রকাশিত হয়; এটি ছিল লেখকের লেখা প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস।[৪]

কাহিনী[সম্পাদনা]

হরিহর রায়, খুব ভাল ব্রাহ্মণ নন, নিশিন্দিপুর গ্রামে থাকেন। ইন্দিরা ঠাকুর, একজন বৃদ্ধা বিধবা মহিলা, যার দেখাশোনা করার জন্য কেউ ছিল না। তিনি হরিহরের বাড়িতে আশ্রয় নেয়, যে তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কিন্তু হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়া, একজন খারাপ মেজাজের মহিলা, তিনি বৃদ্ধাকে দেখতে পারেন না। তাই বৃদ্ধাকে বসবাসের জন্য একটি কুঁড়েঘর দেওয়া হয়। তবে, সর্বজয়ার ছয় বছরের মেয়ে দুর্গা, ইন্দিরা ঠাকুরকে খুব ভালবাসে এবং রূপকথা শোনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সাথে বসে থাকে।

কিছুদিন পর সর্বজয়ার একটি পুত্র হয়। সর্বজয়া, ইন্দিরা ঠাকুরকে হিংসা করতে থাকে কারণ তিনি মনে করেন যে দুর্গা তার মায়ের চেয়ে বৃদ্ধাকেই বেশি ভালবাসে। তাই ইন্দিরা ঠাকুরকে সামান্য কারণে নির্মমভাবে কুঁড়েঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। অসহায় বৃদ্ধা তার মৃত্যুর মুহূর্তে আশ্রয়ের জন্য অনুরোধ করে, কিন্তু সর্বজয়া হৃদয়হীনভাবে না করে এবং বৃদ্ধা চালের গুদামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

চার-পাঁচ বছর পর, ছেলে অপু প্রকৃতির সৌন্দর্য ও রহস্যের প্রতি অত্যন্ত কৌতূহলী এবং সংবেদনশীল হতে থাকে। সে এবং তার বোন দুর্গা সর্বদা নতুন কিছু দু:সাহসিক কাজের জন্য বাইরে ঘুরতে বের হতে থাকে, যেমন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, আদিবাসী খেলায় অংশগ্রহণ এবং গোপনে ফুল ও ফল পাড়া। অপু গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হয়, যেখানে গ্রামের অনেক প্রবীণ জড়ো হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে সময় কাটাত। অপুকে একদিন তার বাবা এক মক্কেলের বাড়িতে নিয়ে যায়। অপু এই প্রথম বাইরের জগতের ঝলক দেখতে পায় যা তার মনকে আনন্দ ও উত্তেজনায় ভরিয়ে তোলে। গ্রাম্য উৎসব, মেলা, এবং যাত্রা ইত্যাদি গ্রাম্য জীবনের একচেটিয়া প্রবাহে বৈচিত্র্য এবং রোমাঞ্চ নিয়ে আসে। দুর্গা, অস্থির কিন্তু অতি নির্দোষ এক মেয়ে, হঠাৎ করে মারা যায়, যা পুরো পরিবারকে শোকে ডুবিয়ে দেয় এবং তার ছোট ভাইকে একা করে দেয়। হরিহর দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যায় ও জীবিকা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে সংগ্রাম করতে থাকে। বাড়ি ফেরার পর হরিহর নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা সব গোছগাছ করে রেলওয়ে স্টেশনে যায়। ট্রেন চাড়লে, নিশ্চিন্দিপুরের যাওয়া জন্য তারা ট্রেনে উঠে ও পিছনে চিরকালের মত তাঁদের সুখ-দুঃখের স্মৃতি রেখে যায়।

অন্তর্ভুক্তি[সম্পাদনা]

উপন্যাসের ৮ম পরিচ্ছেদটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এর নবম-দশম শ্রেণির 'মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য' সংকলনে 'আম-আঁটির ভেঁপু' শিরোনামে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

অনুবাদ[সম্পাদনা]

পথের পাঁচালী ১৯৬০ সালে একই নামে তেলুগু ভাষায় প্রথম অনূদিত এবং প্রকাশিত হয়। এটি অনুবাদ করেন মাদিপাতলা সুরি। পরে এটি চিন্থা লক্ষ্মী সিংহরাচি কর্তৃক মাওয়াতে গীতা নামে সিংহলী ভাষায় অনূদিত হয় এবং ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। এটি শ্রীলঙ্কায় অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় এবং একই অনুবাদক অপু ত্রয়ীর অন্য দুটি বইয়ের অনুবাদও সম্পন্ন করেন।

'পথের পাঁচালী' মালয়ালম ভাষায় 'পথের পাঁচালী - পাথায়ুউদয় সঙ্গীতম' নামে অনূদিত হয়, যা ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে গ্রীন বুকস প্রাইভেট লিমিটেড, ত্রিচুর কর্তৃক প্রকাশিত হয়।

ইউনেস্কোর প্রতিনিধিত্বমূলক কাজের অংশ হিসেবে টি ডব্লিউ ক্লার্ক ও তারাপদ মুখোপাধ্যায় উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যা ১৯৬৮ সালে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত হয়।[৫] ১৯৭৬ সালে কে রায় ও মার্গারেট চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসটির একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি এবং ৩ মার্চ ২০১৩ সালে উপন্যাসটির একটি অভিযোজন বিবিসি রেডিও ৪-এ একটি "ধ্রুপদী ধারাবাহিক" হিসাবে সম্প্রচার করা হয়।[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. পথের পাঁচালী, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, আইএসবিএন ০-১৯-৫৬৫৭০৯-৮
  2. সৌমিত্র শেখর (২০১২)। "পথের পাঁচালী"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন 9843205901ওএল 30677644Mওসিএলসি 883871743 
  3. রবিনসন, অ্যান্ড্রু (১৯৮৯)। Satyajit Ray: The Inner Eyeবিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। পৃষ্ঠা ৭৪আইএসবিএন 978-0-520-06946-6 
  4. Encyclopaedia of Indian literature। সাহিত্য আকাদেমি। ১৯৮৭। পৃষ্ঠা ৩৬৫। আইএসবিএন 81-260-1803-8। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-১১-২৭ 
  5. "Pather Panchali. Song of the Road"। অ্যালেন এবং আনউইন - ইউনেস্কো (এবং ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ব্লুমিংটন এবং লন্ডন)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-০৯-১৩ 
  6. "Pather Panchali--Song of the Road"। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন। সংগ্রহের তারিখ ৩ মার্চ ২০১৩ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]