রাগ (সংগীত)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

প্রাচীন সঙ্গীত শাস্ত্রে স্বর ও বর্ণ দ্বারা ভূষিত ধ্বনিবিশেষকে রাগ বলা হয়। এটি মানবচিত্তে এক ধরণের রঞ্জক ধ্বনির আবহ সৃষ্টি করে। ধাতুগত অর্থ করতে হলে, যে স্বর লহরী মনকে রঞ্জিত করে তাকে রাগ বলা হয়। রাগসঙ্গীত, সংগীতের মূলধারার অংশ।[১]

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

রাগ সঙ্গীতের চারটি প্রধান রীতি আছে। এগুলো হচ্ছে: ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পাঠুমরী। সংগীতে রাগ সমাহার-১) রাগ বিলাবল ২) রাগ আলাহিয়া বিলাবল ৩) রাগ ইমন ৪) রাগ ইমন কল্যাণ ৫) রাগ ভূপালী ৬) রাগ বিহাগ ৭) রাগ কাফি ৮) রাগ বাগেশ্রী ৯) রাগ ভীমপলশ্রী ১০) রাগ বৃন্দবনী সারং ১১) রাগ আশাবরী ১২) রাগ জৌনপুরী ১৩) রাগ খাম্বাজ ১৪) রাগ রাগেশ্রী ১৫) রাগ দেশ ১৬) রাগ কলাবতী ১৭) রাগ ভৈরব ১৮) রাগ নট ভৈরব ১৯) রাগ আহীয় ভৈরব ২০) রাগ আনন্দ ভৈরব ২১) রাগ বাঙ্গাল ভৈরব ২২) রাগ বিভাস ২৩) রাগ গুণকেলী ২৪) রাগ বৈরাগী ২৫) রাগ নিত্যকলি ২৬) রাগ ভৈরবী ২৭) রাগ মালকোষ ২৮) রাগ চন্দ্রকোষ ২৯) রাগ মারওয়া ৩০) রাগ পুরিয়া ৩১) রাগ জেতাশ্রী ৩২) রাগ জয়েৎ ৩৩) রাগ পুরিয়াকল্যাণ ৩৪) রাগ পূরবী ৩৫) রাগ পুরিয়াধানেশ্রী ৩৬) রাগ গৌরাঞ্জনী ৩৭) রাগ ত্রিবেণী ৩৮) রাগ টোড়ী ৩৯) রাগ গুর্জরী টোড়ী ৪০) রাগ ভূপাল টোড়ী ৪১) রাগ বিলাসখানী ৪২) রাগ আশাবরী ( কোমল ) ৪৩) রাগ মূলতানী ৪৪) রাগ মধুবন্তী ৪৫) রাগ কেদারা ৪৬) রাগ মারু বিহাগ ৪৭) রাগ হংসধ্বনি ৪৮) রাগ কৌশধ্বনি ৪৯) রাগ দুর্গা ৫০) রাগ দেশকার ৫১) রাগ শিবরঞ্জনী ৫২) রাগ আভেগী কানাড়া ৫৩) রাগ শ্রীরঞ্জনী ৫৪) রাগ পট্দীপ ৫৫) রাগ যোগ ৫৬) রাগ চন্দ্রঘোষ ৫৭) রাগ তিলং ৫৮) রাগ জয়জন্তী ৫৯) রাগ গোখর কল্যান ৬০) রাগ দরবারী ৬১) রাগ মধুমতি ৬২) রাগ মিয়া -কি -মাল্হার ৬৩) রাগ মেঘ ৬৪ ) রাগ বাহার ।[২]

পরিচয়মূলক লক্ষণ[সম্পাদনা]

  • নাম: * আরোহঃ * অবরোহ: * ঠাট: * অংশস্বর: * গ্রহাদি: * স্থান: * জাতি: * শ্রেণী: * চলন: * কাল: * পকড়: * অঙ্গ:

রাগ শ্রী-কল্যান[সম্পাদনা]

শ্রী ও কল্যাণ —এই দুই পৃথক রাগের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে শ্রী-কল্যাণ। মিশ্ররাগের নিয়ম অনুযায়ী শেষে যে রাগের নাম থাকে, রাগে তারই প্রাধান্য হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কল্যাণের প্রাধান্যই বেশি। কল্যাণ ঠাটের রাগ কল্যাণ। স্বরের বিচারে ইমনের খুব কাছাকাছি। ইমনে নিরেগ, কল্যাণে সারেগ —এই অঙ্গ ব্যবহার করা হয়। সন্ধের প্রসন্নতা এই রাগে স্পষ্ট। অন্যদিকে শ্রী রাগ বিকেল শেষ হয়ে সন্ধেয় প্রবেশের সময়কার রাগ। গোধূলির বিষণ্ণতা এই রাগে প্রকট। শ্রী শুনলে শূন্যতার অনুভূতি জাগে। এরই সঙ্গে যোগ হচ্ছে কল্যাণের প্রসন্নতা। এই দুইয়ে মিলে অপরূপ মাধুর্য শ্রীকল্যাণ রাগের মধ্যে। একই সঙ্গে দুরকম স্রোতের খেলা।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] কণ্ঠ ও যন্ত্র, দুই মাধ্যমেই এই রাগ শুনতে পাওয়া যায়. তবে কণ্ঠে শুনতেই বেশি ভালো লাগে.


রাগ বিলাবল[সম্পাদনা]

রাগ বিলাবল, বিলাবল ঠাটের অর্ন্তগত একটি রাগ।এই রাগের বৈশিষ্ট্য এবং রুপ ঠাটের সঙ্গে বেশী মিল সম্পন্ন বলে রাগটি বিলাবলের ঠাট রাগ হিসেবে পরিচিত্। কথিত আছে হযরত বেলাল (র:) একটি বিশেষ সুরে আযান দিতেন এবং তাঁর সেই সুরের প্রতিফলনকে ভিত্তি করেই বিলাবল রাগের সৃষ্টি ও নাম করন । এ রাগে সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়। নিম্নে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হল:-

পরিচয়: সব স্বর শুদ্ধ ব্যবহৃত হয় এবং এর চলন বক্রগতি সম্পন্ন।এ রাগের সাথে কল্যাণ ঠাটের প্রচুর সাদৃশ্য থাকায় কখনো কখনো একে প্রাত:কালের কল্যাণও বলা হয়।এই রাগের আরোহে যখন মধ্যম বর্জিত হয় এবং অবরোহে অল্প মাত্রায় কোমল নিষাদ প্রযুক্ত হয়,তখন তাকে আলহিয়া বিলাবল বলা হয়,এই রাগটিই বেশী প্রচলিত।

ঠাট: বিলাবল। জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ। আরোহী: সা রা গা মা পা ধা না র্সা। অবরোহী: র্সা না ধা পা মা গা রা সা। চলন: স, গা, রা, সা, ন্ ধ্, ন্ ধ্ পা, প্ ধ্ ন্ ধ্ ন্ সা, গ র গম গ প, মগ, মর স। পকড়: স গর গ,মগ প,মধপমপ, মগ,মর,স। বাদী স্বর: ধা। সমবাদী স্বর: গা। অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ। সময়: প্রাত:কাল।[৩]


রাগ ইমন[সম্পাদনা]

আলাউদ্দিন খিলজীর সভাসদ কবি ও দার্শনিক হযরত আমির খসরু এই রাগটির শ্রষ্টা। এই রাগে সাধারণত: সা স্বরটি বর্জন করে আরোহ গতিতে ন্ র গ এই ভাবে সরল গতিতে যাওয়া যায়। এছাড়াও মধ্যম সপ্তকের পঞ্চমকে বর্জন করে ক্ষ ধ ন, ক্ষ ধ র্স ন র্র র্স, ন র্র ন ধ ক্ষ গ এই সমস্ত স্বরসঙ্গতি বিশেষ বৈচিত্র আনয়ন করে।

পরিচয়: মা কড়ি এবং বাকি সব স্বর শুদ্ধ ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ বিলাবলের শুদ্ধ মা এর পরিবর্তে কড়ি মা এর আগমন।এর চলন বক্রগতি সম্পন্ন।এ রাগের সাথে বিলাবল ঠাটের প্রচুর সাদৃশ্য আছে। এই রাগের সমপ্রকৃতির ইমন কল্যান নামে আরো একটি রাগ আছে যেখানে শুদ্ধ মধ্যম প্রয়োগ করা হয় এবং ইমন অপেক্ষা ঋষভ এর প্রাধান্যও এতে বেশী থাকে। তবে শুদ্ধ মধ্যম এর ব্যবহার গুরুর নিকট শিখেই প্রয়োগ করা উচিৎ, অন্যান্য স্বরের ব্যবহার ইমন এর মতই। সৌন্দর্য বা বৈচিত্র আনয়ন কল্পে প স্বরটিকে এড়িয়ে ব্যবহার করা হলেও মনে রাখতে হবে পা স্বরটি ইমন রাগে গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ন্যস স্বর।

ঠাট: কল্যান। জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ। আরোহী: ( ন্ )সা রা গা ক্ষা পা ধা না র্সা। অবরোহী: র্সা না ধা পা ক্ষা গা রা সা। চলন: ন্ র গ র ,গ ক্ষ ধ ন, র্স ন ধ প ক্ষ গ, প র গ র ন র স। পকড়: ন্ র গ র ন্ র সা, বা ন্ র গ র স , প ক্ষ গ র স। বাদী স্বর: গ। সমবাদী স্বর: ন। অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ। প্রকৃতি: শান্ত। সময়: সন্ধিপ্রকাশ রাগ (গোধুলীলগ্ন থেকে রাত ০৯ টা)।[৪]


রাগ ভৈরব[সম্পাদনা]

অতি প্রাচীন এই রাগটি ভৈরো, ভ্যায়রো, মালব, ভৈরব ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পরিচিত।প্রাচীন হলেও বর্তমান প্রচলিত ভৈরবের সাথে আগের ভৈরবের কোন মিল নেই। এটি একটি ঠাট রাগ। রে,ধা কোমল- গাওয়ার সময় আন্দোলিত হয় এবং বিশেষ মহত্বপূর্ণ ভাবে ফুটে উঠে। ভৈরবী ঠাটের কোমল গা ও নি এর স্থলে শুদ্ধ গা নি ব্যবহার করলেই ভৈরব ঠাটের স্বর সপ্তক পাওয়া যায়। রাগটি প্রাত:কালীন সন্ধি প্রকাশ রাগ। ধৈবতের আন্দোলন কালে কোমল নি ঈষৎ প্রয়োগ হয় এবং রে স্বরটি অতি কোমল ও অবরোহে বেশী প্রাধান্য পায়। কুশলতার সাথে অবরোহ গতিতে কোমল নি ব্যবহার করা যায়। গমঋ, দমপ, দমপ দনর্স এই স্বর সংগতি মীড় যুক্ত হয়ে বেশী প্রয়োগ হয়। আরোহে সঋগম/ন্ সগম/সগম এ রকম বিভিন্ন ভাবে স্বর প্রয়োগ হয়ে থাকে। ম র মীড় হলেও এর সাথে প র সংযোগ হয়ে একটি বিশেষ রূপ ফুটে উঠে যা সঠিক তালিম প্রাপ্ত গায়ক গণের পক্ষেই কেবল গেয়ে দেখানো সম্ভব। ভৈরবের সমপ্রকৃতির রাগ হচ্ছে কলিংড়া এবং রামকেলী।

পরিচয়: রে ধা কোমল বাকী সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়। রে ও ধা এর ব্যবহার শিখে নেয়ার মত একটি বিষয়। ঠাট: ভৈরব। জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ। আরোহী: স ঋ গ ম প দ ন র্স। অবরোহী: র্স ন দ প ম গ ঋ স। চলন: সঋস, নৃসদ,নৃদৃপ্,পৃদৃসঋ গঋ গমপ গমঋ স। পকড়: স গ ম প দ প, ম প গমঋ স। বাদী: দ। সমবাদী: ঋ। অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ । প্রকৃতি: শান্ত,গম্ভীর। ন্যাস স্বর: ঋ, ম, প ও দ। সময়: দিবা প্রথম প্রহর(সাধারণত: সকাল ৫-৮ টা)।[৫]

রাগ কাফি[সম্পাদনা]

বেশকিছু জনপ্রিয় রাগের জন্মদাতা এই কাফি ঠাট। কর্ণাটকী সঙ্গীতে এই রাগটির নাম ‍খরহর প্রিয়া। কাফি রাগটি ঠাটের সাথে বেশী মিল সম্পন্ন বলে এটি ঠাট রাগ হিসেবে পরিচিত। ধ্রুপদ, ঠুমরি, ভজন ইত্যাদি এই রাগে বেশি শোনা যায়।

পরিচয়: গা নি কোমল এবং বাকী স্বর শুদ্ধ ব্যবহার হয়।আরোহে তীব্র গান্ধার ও নি সুকৌশলে বার বার ব্যবহৃত হয়।নিপুন গায়ক রাগ হানি না করেও কোমল ধৈবত ব্যবহার করে থাকেন। তবে মনে রাখতে হবে এই স্বর গুলি রাগের নিয়মিত স্বর নয়।

ঠাট: কাফি। জাতি: সম্পূণ-সম্পূর্ণ। আরোহী: স র জ্ঞ ম প ধ ণ র্স । অবরোহী: র্স ণ ধ প ম জ্ঞ র স। বাদী স্বর: পন্চম (প)। সমবাদী: ষড়জ (স)।(কোন কোন গুনিজন গ এবং নি কে বাদী- সমবাদী মনে করেন)। চলন: ণৃসমজ্ঞরস, সররজ্ঞ, রপ,মপ,ধপ, মপধমপ, জ্ঞ.. , র, স , সস রর জ্ঞজ্ঞ মম প ধমপ জ্ঞ.. র, স। পকড়: সস রর জ্ঞজ্ঞ মম প। অঙ্গ: উত্তরাংগ। সময়: মধ্যরাত্রি (তবে কেউ কেউ মনে করেন সন্ধাবেলাও রাগটি গাওয়া যেতে পারে)।[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সংগীতকোষ: করুণাময় গোস্বামী, বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত।
  2. http://www.sunamganjerdak.com/?p=3721
  3. http://www.gunjanmusicschool.com/raga/raga-bilabwala
  4. http://www.gunjanmusicschool.com/raga/raga-bhairaba-raga-bhairav/raga-yaman-iman
  5. http://www.gunjanmusicschool.com/raga/raga-bhairaba-raga-bhairav
  6. http://www.gunjanmusicschool.com/raga/raga-kafi

আরও দেখুন[সম্পাদনা]