ম্যানিলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ম্যানিলা,দাপ্তরিকভাবে "দি সিটি অফ ম্যানিলা" হলো ফিলিপাইনের রাজধানী।এটি বিশ্বের একটি অন্যতম প্রাচীনতম শহর এবং ২০১৮ সালের এক হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর।৩১ জুলাই ১৯০১ সালে "ফিলিপাইন কমিশন আইন "এর বলে শহরটিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং এটি ১৮ জুলাই ১৯৪৯ সালে প্রজাতন্ত্র ধারার ৪০৯ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে সায়ত্বশাসন লাভ করে।মেক্সিকো ও মাদ্রিদ শহরের মতই ম্যানিলা কে বিশ্বের অন্যতম বৈশ্বিক শহর বলা হয়।এটির প্রশান্ত মহাসাগরের সংগে সংযোগ থাকার কারনে,এটির মাধ্যমে স্পেনীয় আমেরিকান দেশগুলোর সাথে এশিয়ার দেশ গুলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।বিখ্যাত নগরী ট্রয় এর থেকেও সংখ্যার দিক থেকে ম্যানিলা শহর সবচেয়ে বেশিবার যুদ্ধবিদ্ধস্ত হয়েছে এবং পুনর্নিমিত হয়েছে।টোকিওর পরেই সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ শহর হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ম্যানিলা,যদিও এটি দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এং সবচেয়ে ধনী শহরগুলোর একটি।

২৪ জুন ১৫৭১ সালে স্পেনীয় অভিযাত্রী মিগুইল লোপেয ডি লেগাজপি দ্বারা এটি "স্পেনীশ সিটি অফ ম্যানিলা" নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।ম্যানিলা অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাক্ষী।ফিলিপাইন এর প্রথম বিশ্ব্বিদ্যালয় (১৫৯০),লাইট স্টেশন(১৬৪২),লাইটহাউস টাওয়ার(১৮৪৬),পয়ঃনিশকাশন ব্যাবস্থা(১৮৭৮),র্যাপিড ট্রানজিট ব্যাবস্থা(১৯৮৪,যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই প্রথম) ইত্যাদি ফিলিপাইন এই অবস্থিত।

শহরটি ম্যানিলা উপসাগরের পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত।পেগিস নদী ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।এটি শহরটিকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে।১৬ টি প্রশাসনিক জেলা নিয়ে ম্যানিলা গঠিত যেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিনোন্দা,এরমিটা,ইনট্রামুরাস,পোর্ট এরিয়া,সান্টা আনা ইত্যাদি।

ব্যাকরণ[সম্পাদনা]

ম্যানিলা নামটি মেয়-নিলা এই শব্দাংশ থেকে এসেছে।নীলা শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে যার অর্থ হচ্ছে নীল।শহরটি একসময় মূলত নীল গাছ চাষ করার জন্য এই নামে পরিচিত হয়েছিলো।নীল হছে এমন একটি গাছ যার থেকে প্রাকৃতিক রং করার পদার্থ পাওয়া যায়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]


১৪০৫ সালে,যেং হে এর সেনাপতিত্বে একদল চৈনিক অনুপ্রবেশকারী ম্যানিলা আক্রমণ করে।যেং হে,মিং সাম্রাজ্যের লুযন এর সাথে একাত্নতা ঘোষণা করেছিলেন।যদিও তীব্র আক্রমণের ফলে নগরীটি মারাত্নক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবুও স্থানীয় রাজ্যগুলোর মিত্রবাহিনী অনুপ্রবেশকারীদের হঠিয়ে দেয়।

আরব আমির শরীফ আলীর উত্তরসূরী,সুলতান বলকিয়াহ(১৪৮৫-১৫২১,ব্রুনেই এর সুলতান)যিনি হিন্দু রাজা মাজাপাহিত এর কাছ থেকে ক্ষমতা লাভ করেন এবং পরে মুসলিম হন,তিনি এই এলাকাটিকে আক্রমণ করেন।ব্রুনেই এর শাসকেরা ম্যানিলার কৌশলগত অবস্থান কে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন যাতে করে তারা চীন এবং ইন্দোনেশিয়ার সংগে ভালো বাণিজ্যিক ব্যাবস্থা বজায় রাখতে পারে।তারা এই এলাকায় "মুসলিম সাম্রাজ্য" স্থাপন করে।করদ রাজ্য হিসেবে এই অঞ্চল ব্রুনেই এর শাসকগোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হতো এবং বাৎসরিক কর প্রদান করতে হতো।

এই ঘটনা একটি নতুন রাজত্ব তৈরী করে।এর শাসক ছিলেন স্থানীয় নেতা যিনি পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাজা সালাইলা বা সুলাইমান নামেই পরিগণিত হতেন।

ভৌগোলিক অবস্থান[সম্পাদনা]

এশিয়ার মূল ভূখণ্ড হতে ১৩০০ কিলোমিটার দূরে লুযন এর পশ্চিম প্রান্তে ম্যানিলা উপসাগরের পূর্ব উপকূলে ম্যানিলা শহরটি অবস্থিত।

ম্যানিলার অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হচ্ছে তার রক্ষিত আশ্রয় যার উপরে এর অবস্থান যেটিকে কিনা পুরো এশিয়ার মধ্যে সেরা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্যাগিস নদী শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে যা কিনা শহরটিকে উত্তর এবং দক্ষিণ এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।

জলবায়ু[সম্পাদনা]

"কোপেন জলবায়ু শ্রেণীবিভক্তিকরণ "পদ্ধতি অনুসারে ম্যানিলা ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত।ফিলিপাইনের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ম্যানিলা পুরোপুরিভাবে ক্রান্তীয় অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত।গড় তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রী হতে ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়ায় এর মধ্যেই অবস্থান করে।

সারা বছরব্যাপী আদ্রতার পরিমাণ অনেক বেশিই থাকে।নভেম্বরের শেষ থেকে মার্চ এর শুরুর এই সময়টাতে ম্যানিলাতে শুষ্ক মৌসুম বজায় থাকে যা একদম অনন্য।আপেক্ষিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষাকাল এখানে।জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই সময়টাতে প্রায় প্রায়ই এখানে ঘূর্ণিঝড় টাইফুন সংঘঠিত হয়।

প্রাকৃতিক দূর্যোগ[সম্পাদনা]

"সুইস রে" এক জরিপের মাধ্যমে বসবাসের জন্য ম্যানিলাকে দ্বিতীয় ঝুকিপুর্ণ শহর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।এটি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন ভূমিকম্প,সুনামি,টাইফুন,বন্যা এবং ভূমিধস এর জন্য অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ।ম্যারিকানা উপত্যকরার ত্রুটির কারণে এটি ভূমিধস এবং ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা।

প্রত্যেক বছর ম্যানিলা তে পাচ থেকে সাতটি বড় ধরনের টাইফুন আঘাত হানে।২০০৯ সালে টাইফুন কেটসানা ফিলিপাইনে আঘাত হানে।এটির প্রভাবে ম্যানিলায় অন্যতম বড় একটি বন্যা সংঘটিত হয়,এবং লুযন রাজ্যের বিভিন্ন অংশে টাকার হিসেবে প্রায় ২৪ কোটি মার্কিন ডলার এর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

শুধুমাত্র শহরতলিতেই প্রায় ৪৪৮ জনের মৃত্যু হয়।

দূষণ[সম্পাদনা]

কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ এবং যানবাহনের আধিক্যের কারণে ম্যানিলার ৯৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী বায়ু দূষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার।শুধুমাত্র বায়ু দূষণের কারণেই প্রতিবছর প্রায় ৪০০০ জন মারা যায়.১৯৯৫ সালের এক রিপোর্টে এরমিটা জেলাকে ম্যানিলার সবচেয়ে বায়ু দূষণ প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০৩ এর এক রিপোর্টে বলা হয় যে ম্যানিলার প্যাগিস নদী বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে একটি।

শহরতলীর কাঠমো[সম্পাদনা]

ম্যানিলা একটি পরিকল্পিত শহর.১৯০৫ সালে আমেরিকান স্থপতি এবং নগর পরিকল্পনাবিদ ড্যানিয়েল বার্নহাম কে নতুন রাজধানী হিসেবে ম্যানিলার নকশা করার দ্বায়িত্ত্ব দেয়া হয়।শহরতলীতে ১৪ টির মতো জেলা রয়েছে।

ম্যানিলা শহরের গঠনশৈলী এবং স্থাপত্যশৈলী শহরটির ইতিহাস এবং নিজ দেশকেই প্রতিফলিত করে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সৈন্যদের দ্বারা এবং আমেরিকান সৈন্যদের গোলাবর্ষনের ফলে ম্যানিলা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো।

স্বাধীনতার পর ১৯ শতকের দিকে ঐতিহাসিক ভবনগুলোর আবার পুন;র্নিমাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।ম্যানিলার বর্তমান অবকাঠামো বিশ্বের অন্যতম আধুনিক গঠনশৈলীর একটি

জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

২০১৫ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী অনুযায়ী শহরটিতে প্রায় ১,৭৮০,১৪৮ জন লোকের বাস,যা ম্যানিলা কে ফিলিপাইনের মধ্যে দ্বিতীয় জনবহুল শহর হিসেবে পরিগণিত করেছে।শহরটির জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৪১,৫১৫/কিমি,যা সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে প্রথম।

অপরাধ[সম্পাদনা]

ম্যানিলাতে মূলত দারিদ্রতা,মাদক গ্রহণ এবং গ্যাংগুলোর কারণে বেশি অপরাধ সাধিত হয়।শহরটিতে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জনসংখ্যার ঘনত্ত্ব এবং একদম আলাদা একটি অপরাধ বিচার ব্যাবস্থা।বেআইনি মাদক ব্যাবসা শহরটির প্রধানতম সমস্যা।

ধর্ম[সম্পাদনা]

স্পেনীয় সংস্কৃতির প্রভাব থাকার কারণে ম্যানিলা খ্রিস্টীয় শহর হিসেবেই পরিগণিত হয়। ২০১০ সালের এক হিসেবে রোমান ক্যাথলিকদের সংখ্যা প্রায় ৯৩.৫ শতাংশ।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

ম্যানিলা প্রধানত ব্যাবসা-বাণিজ্য,ব্যাংক-বিমা সহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের শহর।শহরটির অর্থনীতি মূলত ব্যাবসা-বাণিজ্য,পর্যটন,বীমা,নাট্যমঞ্চ,ফ্যাশন এগুলোর উপর মোটামোটিভাবে নির্ভরশীল।

ম্যানিলা সমুদ্রবন্দর,ফিলিপাইনের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর,যা ম্যানিলাকে দেশটির প্রধানতম বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।