রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

গাঢ় লেখা'''মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম

মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম - জন্ম-১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, পেশা-মুক্তিযোদ্ধা, ১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার, জাতীয়তা- বাংলাদেশী

মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম (জন্ম ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩) হচ্ছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা,লেখক ও রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশের

স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করে। তিনি ১নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ

করেন।পরবর্তীতে তিনি জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুর-৫ আসনের চাঁদপুর জেলার ( হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা) সংসদ সদস্য

নির্বাচিত হন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

রফিকুল ইসলাম ১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি পৌরসভায় নাওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আশরাফ

উল্লাহ এবং মায়ের নাম রহিমা বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম রুবি ইসলাম। তাঁদের এক ছেলে এ এক মেয়ে। তিন ভাই ছয় বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়।

বাবার চাকুরীসূত্রে শৈশবকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার কারনে তাঁকে লেখাপড়া করতে হয় ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে। নিজ গ্রাম নাওড়াতেই

প্রাথমিক স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পরে লেখাপড়া করেন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া, গোপালগঞ্জ, শরিয়তপুরের পালং, কুমিল্লার চান্দিনা,

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে। ১৯৫৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা মডেল হাই স্কুল হতে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ

করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ( আই, এস, সি ) পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা

করেন। ১৯৮১ সালে তিনি আমেরিকার হার্ভাড বিজনেস স্কুলে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম কোর্স সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন সময়েই রফিকুল ইসলাম সরাসরি জড়িত হয়ে পড়েন ছাত্র আন্দোলনে। আগ্রহ ছিল সাংবাদিকতার প্রতি। সেকারণেই ছাত্রাবস্থাতেই কাজ

শুরু করেন 'ইউপিপি' সংবাদ সংস্থায়। ১৯৬৩ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। পাকিস্তানের কাকুল মিলিটারী একাডেমী থেকে প্রশিক্ষণ লাভের পর ১৯৬৫

সালে বি এস সি পাশ করেন এবং সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন পান। পরে তাকে আর্টিলারী কোরে নেয়া হয়। ১৯৬৮ সালে ক্যাপ্টেন হিসাবে লাহোরের ২৪

ফিল্ড রেজিমেন্ট (আর্টিলারী) এর অ্যাডজুট্যান্ট পদে লাহোর ক্যান্টনমেন্ট হতে তাঁর রেজিমেন্ট সহ চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে)

যশোহর ক্যান্টনমেন্টে। যশোহর ক্যান্টনমেন্টে রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন পর তাকে ডেপুটেশনে বদলি করা হয় দিনাজপুরে

ইপিআর এর ৮ নং উইংয়ের অ্যাসিসটেন্ট উইং কমান্ডার পদে। সেখান থেকে ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্-এর চট্টগ্রাম সেক্টর হেডকোয়ার্টারে

অ্যাডজুট্যান্ট পদে পোষ্টিং দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান ও পরবর্তী কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে রফিকুল ইসলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে চট্টগ্রামে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে প্রেষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। সে

সময় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেনা সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি পর্যবেক্ষন করে তিনি প্রয়োজনে

বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন। তদনুযায়ী পহেলা মার্চ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন। তিনি তার অধীনস্থ বাঙালি অফিসার ও

কয়েকজন বিশ্বস্ত জেসিও,এনসিও কে তাঁর যুদ্ধ পরিকল্পনায় যুক্ত করেন, এবং সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের সাথে গোপন বৈঠক করে প্রয়োজনে

বিদ্রোহের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন।

১৯৭১ এর ২৪শে মার্চ রাতেই ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম কার্যত বিদ্রোহ শুরু করেন।গোপন সাংকেতিক বার্তার মাধ্যমে তার আদেশ পেয়ে সীমান্ত ফাঁড়িতে বাঙালি

সৈন্যরা অবাঙালি সিপাহিদের নিরস্ত্র ও নিষ্ক্রিয় করে চট্টগ্রামে এসে প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগদানের জন্যে প্রস্তুত হয়। কর্নেল এম. আর. চৌধুরী ও মেজর জিয়াউর রহমান

সেদিন যুদ্ধের জন্য সম্মত না হওয়ায় রফিকুল ইসলাম তাঁর ইপিআর এর সৈন্যদের সব সীমান্ত ফাড়িঁ দখল করে যুদ্ধ শুরু এবং চট্রগ্রাম শহরে এসে পরিকল্পনা

মোতাবেক শহর দখল দেয়া নির্দেশ স্থগিত করেন। কিন্তু পরদিন ২৫শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য অনুধাবন করে ক্যাপ্টেন রফিক সরাসরি যুদ্ধ শুরু করে

দেন এবং ইপিআরের অবাঙালি সৈন্য ও অফিসারদের জীবিত অবস্থায় বন্দী করে রেলওয়ে হিলে তার হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেন।

পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য "সোয়াত" জাহাজে আনা প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাসে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে বন্দরের বাঙালি শ্রমিকদের

সাথে মিলিত হয়ে তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সৈন্যদের দ্বারা অস্ত্র, গোলাবারুদ খালাস সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। ২৫শে মার্চ রাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল চৌধুরী ও মেজর

জিয়াউর রহমান সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে না পারায় ২০ বালুচ রেজিমেন্ট-এর অবাঙ্গালী সৈন্যরা চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার-এর সহস্রাধিক

বাঙালি সৈনিক ও অফিসারকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা ষোলশহর এলাকায় তাঁদের ইউনিট লাইন ছেড়ে কালুরঘাট ব্রিজের

অপর পাড়ে অবস্থান নেয়। চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আগত ক্যাপ্টেন রফিকের অধীনস্থ ইপিআর সৈনিকদের মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন

রফিকের ইপিআর বাহিনীর সাথে চট্রগ্রাম শহর দখলে রাখার যুদ্ধে যোগ দিতে না দিয়ে ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের সাথে কালুরঘাট ব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিতে বলেন। এ

কারণে ক্যাপ্টেন রফিক সেনাবলের অভাবে চট্টগ্রামে যথাযথ দখল বজায় রাখতে সমস্যার সম্মুখীন হন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রচুর ক্ষতি সাধন করে

মূল প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে সরতে বাধ্যহন।।

পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন রফিক তার বাহিনী নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ করতে থাকেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারী, ট্যাংক ও বিমান আক্রমন মারাত্মক

বেড়ে যাওয়ায় পুরো এপ্রিল মাস যুদ্ধ করতে করতে ১৯৭১ সালের ২রা মে তার হেডকোয়ার্টার সীমান্তের ওপারে হরিণায় স্থাপন করতে বাধ্য হন। এখানেই থেকেই তিনি

মেজর হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে ১ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে চট্টগ্রাম এলাকায় যুদ্ধ চালিয়ে যান।[১] যুদ্ধের পুরো প্রায় ন' মাস চট্রগ্রাম অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিচালনা

করেন। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান বাহিনী পরাজিত হয়ে ঢাকা ও চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মসমপর্ণ করলে ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে

মেজর রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।[২]

১৯৭২ সালের ২৯ এপ্রিল সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর কিছুকাল তিনি চট্রগ্রামে সে সময়কার বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক ' দি পিপলস ভিউ -র সহযোগী

সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।

'ঢাকা ওয়াসা 'র চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়ে ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্তব্যরত ছিলেন। তারপর হ্যাণ্ডলুম বোর্ড- এর

চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ বি আই ডব্লিউ টি সি এর চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৯০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

সামরিক শাসক এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯০ সালে দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি মন্ত্রী পদমর্যদায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান

পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ শাহরাস্তি নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুর-৫

থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাজিগঞ্জ শাহরাস্তি এলাকা থেকে ২য় বার আবারও সংসদ সদস্য

নির্বাচিত হন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে

একই আসন থেকে তিনি তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।[৩] এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বিষয়ক জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির

দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে চতুর্থ বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আবারো মতো নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির

দায়িত্ব পান।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা[সম্পাদনা]

  • বীর উত্তম- ( জীবিত যোদ্ধাদের জন্য সাহসিকতার সর্বোচ্চ পুরস্কার)
  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০১৯)। [৪]
  • মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রচিত তাঁর মূল গ্রন্থ " এ টেল অব মিলিয়নস " বইটি ১৯৭৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৮১ সালে " এ টেল অব মিলিয়নস " বইটি পরিবর্তিত আকারে এবং একই সময়ে বইটির বাংলা অনুবাদ " লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে " প্রকাশিত হয়।
  • মুক্তিযুদ্ধের সময়কার করুণ ও বেদনাময় কাহিনী নিয়ে রচিত তাঁর আরেকটি বই " মুক্তির সোপানতলে " প্রকাশিত হয় ২০০১ সালের জুলাই মাসে । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সমকালীন বিষয়াদির ওপর তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. একাত্তরের বীরযোদ্ধা, খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা (দ্বিতীয় খন্ড)। প্রথমা প্রকাশন। মার্চ ২০১৩। পৃষ্ঠা ৬০। আইএসবিএন 9789849025375 
  2. রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম (২০০৬)। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। অনন্যা প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-412-033-0 
  3. "১৫৩ আসনে জয়ী যারা"দৈনিক সমকাল। ৪ জানুয়ারি ২০১৪। ৬ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৬ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  4. "বাংলা-একাডেমি-সাহিত্য-পুরস্কার-২০১৯-ঘোষণা"। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০২০ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]