মমতাজুর রহমান তরফদার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অধ্যাপক ডক্টর

মমতাজুর রহমান তরফদার
মমতাজুর রহমান তরফদার.jpg
জন্ম১ আগস্ট ১৯২৮
মৃত্যু৩১ জুলাই ১৯৯৭
নাগরিকত্বব্রিটিশ ভারত (১৯৪৭ সাল পর্যন্ত)
পাকিস্তান (১৯৭১ সালের পূর্বে)
বাংলাদেশ
মাতৃশিক্ষায়তনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি আজিজুল হক কলেজ
পরিচিতির কারণইতিহাসবিদ
পুরস্কারবাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৭)

মমতাজুর রহমান তরফদার (১ আগস্ট ১৯২৮ – ৩১ জুলাই ১৯৯৭) ছিলেন একজন বাংলাদেশী পণ্ডিত এবং ইতিহাসবিদ। তিনি সাহিত্য, ধর্ম ও বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ছাড়াও সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক ইতিহাস ও ইতিহাস চর্চার সমস্যা নিয়ে একাধিক রচনা লিখেছেন।[১][২][৩]

তিনি ব্রিটেনের নুফিল্ড ফাউন্ডেশন (১৯৭২-১৯৭৪), আমেরিকার ডারহামস্থ ডিউক ইউনিভার্সিটি (১৯৯৬) এবং বাংলা একাডেমি (১৯৯৭) ও বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (১৯৯৭) ফেলোশিপ লাভ করেন।[৪][৫]

ইতিহাসবিদ হিসেবে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান।[৬][৭]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

মমতাজুর রহমান তরফদার ১ আগস্ট ১৯২৮ সালে বগুড়া জেলার মেঘগাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজ জেলাতেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশুনা সম্পন্ন করেন। উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করেন বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৪৯ সালে বিএ ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ১৯৫১ সালে এমএ পাস করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৬১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।[৪][৫]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

মমতাজুর রহমান তরফদার ১৯৫২ সালে মুন্সিগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজে প্রভাসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে অধ্যাপনা করেছেন মৃত্যু পর্যন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উচ্চতর মানব বিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের’ তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।[৮] তিনি ব্রিটেনের নুফিল্ড ফাউন্ডেশন (১৯৭২-১৯৭৪), আমেরিকার ডারহামস্থ ডিউক ইউনিভার্সিটি (১৯৯৬) এবং ঢাকাস্থ বাংলা একাডেমি (১৯৯৭) ও বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (১৯৯৭) ফেলোশিপ লাভ করেন।[৪][৫]

ইতিহাসবিদ হিসেবে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান।[৬]

তিনি সাহিত্য, ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন। সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক ইতিহাস ও ইতিহাস চর্চার সমস্যা নিয়েও নিয়মিত লিখতেন। তিনি কবিতা লেখার পাশাপাশি বাংলা রোমান্টিক কাব্যের ঠিকুজিও অনুসন্ধান করেছেন। তিনি হোসেন শাহী রাজবংশ সম্পর্কে লিখেছেন. তিনি হিন্দি ও বাংলা মধ্যযুগীয় কবিতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিফলিত বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রবন্ধে তিনি বাংলায় ইসলামের আগমন এবং জনগণের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি ছিলেন কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। তিনি বিশ্বাস করতেন ইতিহাসকে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ভাগ করা উচিত। তিনি তার সমসাময়িকদের বিরুদ্ধে ছিলেন যারা ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের ধর্মের দ্বারা যুগকে ভাগ করেছেন, যেমন খ্রিস্টান যুগ, মুসলিম যুগ, হিন্দু যুগ ইত্যাদি।[৫][৯]

ভাষা আন্দোলনে ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা[সম্পাদনা]

মমতাজুর রহমান তরফদার ভাষা আন্দোলনের উষালগ্ন তার সম্পাদনায় বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ বার্ষিকীতে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে একটি লেখা ছাপা হয়। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অধ্যক্ষ সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন উপদেষ্টা। যে কারণে বার্ষিকীটি বাজেয়াপ্ত করে সেই সময়ের পাকিস্তানি সরকার। পুলিশের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য তিনি আত্মগোপন করেন। এই প্রেরণায় পরবর্তীকালে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন।[৮]

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তার ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পুরো নয়মাস তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। রাতে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্ররা আসত তার কাছে। তিনি গোপনে অর্থ, শীতকালে গরম কাপড়, সোয়েটার সংগ্রহ করে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি একদিন ইংরেজিতে টাইপ করা তাকে জীবনের হুমকি দিয়ে একটি চিরকুট পেলেন। ১৪ ডিসেম্বরের ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকদের তুলে নিল পাকিস্তান বাহিনী। তাকে পুরোনো ফ্ল্যাটে খুঁজে না পেয়ে চলে গেল। ধরে নিয়ে গেল কয়েকজন শিক্ষক আর ডাক্তার মোর্তজাকে। স্বাধীনতার পরে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় তাদের লাশ। বাসা বদল করায় তিনি বেঁচে গেলেন।[৮]

গ্রন্থ[সম্পাদনা]

মমতাজুর রহমান তরফদারের উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:-[১০]

  • হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮
  • সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা (১৯৬৫)
  • বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (১৯৭১)
  • Trade, Technology and Society in Medieval Bengal (১৯৯৫)
  • ইতিহাস ও ঐতিহাসিক[১১]

পুরস্কার ও সম্মাননা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Uddin, Sufia M. (২০০৬)। Constructing Bangladesh: Religion, Ethnicity, and Language in an Islamic Nation (ইংরেজি ভাষায়)। Univ of North Carolina Press। পৃষ্ঠা 19। আইএসবিএন 9780807877333 
  2. Oddie, Geoffrey A. (১৯৯৮)। Religious Traditions in South Asia: Interaction and Change (ইংরেজি ভাষায়)। Psychology Press। পৃষ্ঠা 35। আইএসবিএন 9780700704217 
  3. Yamin, Mohammed। Impact of Islam on Orissan Culture (ইংরেজি ভাষায়)। Readworthy। পৃষ্ঠা 61। আইএসবিএন 9789350181027 
  4. সলিমুল্লাহ খান (১ আগস্ট ২০১৮)। "চতুষ্কের কবি"এনটিভি। ১৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 
  5. হাসান, পারভীন (৯ জুলাই ২০২১)। "তরফদার, মমতাজুর রহমান"বাংলাপিডিয়া। ১৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 
  6. "বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 
  7. "যোগ্য লোকের হাতে উঠুক বাংলা একাডেমি পুরস্কার"জাগোনিউজ২৪.কম। ৯ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জানুয়ারি ২০২২ 
  8. মমতাজ, খুররম (৩১ জুলাই ২০১৭)। "শ্রদ্ধাঞ্জলি, অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার একজন জ্ঞান সাধক"এনটিভি। ১৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 
  9. স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪)। "ইতিহাসকে বিভক্ত করার বিপক্ষে ছিলেন মমতাজুর রহমান"বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। ১৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 
  10. "মমতাজুর রহমান তরফদার এর বই সমূহ"রকমারি ডট কম। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 
  11. মমতাজুর রহমান তরফদার। ইতিহাস ও ঐতিহাসিকবাংলাদেশ: বাংলা একাডেমি। ১৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০২২ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]