আনিসুজ্জামান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
আনিসুজ্জামান
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ২০১৬
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ২০১৬
জন্ম (1937-02-18) ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ (বয়স ৮২)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ব্রিটিশ ভারত
পেশালেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী
জাতীয়তাবাংলাদেশী
নাগরিকত্ববাংলাদেশ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়কাল১৯৫৬-বর্তমান
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারপূর্ণ তালিকা

আনিসুজ্জামান (জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭)[১] একজন বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক[২] তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ডঃ কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন।[৩] বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

আনিসুজ্জামান শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদক প্রদান করা হয়। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।[৪]

এছাড়া তিনি ১৯৯৩ ও ২০১৭ সালে দুইবার আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার, ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট. ডিগ্রি এবং ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।[৫]

জন্ম[সম্পাদনা]

আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন।[৬] তার পিতার নাম এ টি এম মোয়াজ্জেম। তিনি ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিনী হলেও লেখালেখির অভ্যাস ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। তিন বোনের ছোট আনিসুজ্জামান, তারপর আরেকটি ভাই। বড় বোনও নিয়মিত কবিতা লিখতেন।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করছেন আনিসুজ্জামান।

আনিসুজ্জামান কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এখানে তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বাংলাদেশে চলে আসেন এবং খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এক বছর পর পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময় বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও শিক্ষক ছিলেন মুনীর চৌধুরী

১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলা একাডেমির গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারায ১৭৫৭-১৯১৮ বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।[৭]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

আনিসুজ্জামান, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে পদ্মভূষণ পদক গ্রহণ করছেন।

আনিসুজ্জামান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে ভারত গম করে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন 'বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি'র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ - ৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন।

১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন।[৮] ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে আবার যুক্ত হন। তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। এছাড়াও তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটবাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে তিনি শিল্পকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা যামিনী এবং বাংলা মাসিকপত্র কালি ও কলম-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

প্রকাশিত গ্রন্থাবলি[সম্পাদনা]

গবেষণা গ্রন্থ[সম্পাদনা]

  • মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪)
  • মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯)
  • মুনীর চৌধুরী (১৯৭৫)
  • স্বরূপের সন্ধানে (১৯৭৬)
  • Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity (1979)
  • Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Official Library and Records (1981)
  • আঠারো শতকের বাংলা চিঠি (১৯৮৩)
  • মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৯৮৩)
  • পুরোনো বাংলা গদ্য (১৯৮৪)
  • মোতাহার হোসেন চৌধুরী (১৯৮৮)
  • Creativity, Reality and Identity (1993)
  • Cultural Pluralism (1993)
  • Identity, Religion and Recent History (1995)
  • আমার একাত্তর (১৯৯৭)
  • মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর (১৯৯৮)
  • আমার চোখে (১৯৯৯)

বাঙালি নারী[সম্পাদনা]

  • সাহিত্যে ও সমাজে (২০০০)
  • পূর্বগামী (২০০১)
  • কাল নিরবধি (২০০৩)

বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ[সম্পাদনা]

  • অস্কার ওয়াইল্ডের An Ideal Husband এর বাংলা নাট্যরূপ 'আদর্শ স্বামী' (১৯৮২)
  • আলেক্সেই আরবুঝুভের An Old World Comedy -র বাংলা নাট্যরূপ 'পুরনো পালা' (১৯৮৮)

গ্রন্থ একক ও যৌথ সম্পাদনা[সম্পাদনা]

  • রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৮)
  • বিদ্যাসাগর-রচনা সংগ্রহ (যৌথ, ১৯৬৮)
  • Culture and Thought (যৌথ, ১৯৮৩)
  • মুনীর চৌধুরী রচনাবলী ১-৪ খণ্ড (১৯৮২-১৯৮৬)
  • বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড (যৌথ, ১৯৮৭)
  • অজিত গুহ স্মারকগ্রন্থ (১৯৯০)
  • স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন (১৯৯২)
  • শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৩)
  • নজরুল রচনাবলী ১-৪ খণ্ড (যৌথ, ১৯৯৩)
  • SAARC : A People's Perspective (১৯৯৩)
  • শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা (১৯৯৫)
  • মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী (১ ও ৩ খণ্ড, ১৯৯৪-১৯৯৫)
  • নারীর কথা (যৌথ, ১৯৯৪)
  • ফতোয়া (যৌথ, ১৯৯৭)
  • মধুদা (যৌথ, ১৯৯৭)
  • আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলী (১ম খণ্ড, যৌথ ২০০১)
  • ওগুস্তে ওসাঁর বাংলা-ফরাসি শব্দসংগ্রহ (যৌথ ২০০৩)
  • আইন-শব্দকোষ (যৌথ, ২০০৬)

পুরস্কার ও সম্মাননা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Professor Anisuzzaman: The man and the academic"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ১৩ নভেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
  2. "3 educationists become national professors"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৮-০৬-২০। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৬-২০ 
  3. "Prof. Anisuzzaman"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
  4. "ড. আনিসুজ্জামান হাসপাতালে"। বাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
  5. "জাতীয় অধ্যাপক হলেন আনিসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম ও জামিলুর রেজা চৌধুরী"বাংলা টিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৬-১৯ 
  6. "The Pundit's Tale"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৪-০২-১৪। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-১২-০৪ 
  7. ড. আনিসুজ্জামান : একজন সফল শিক্ষাবিদের প্রতিকৃতি দৈনিক কালের কন্ঠ
  8. "অধ্যাপক আনিসুজ্জামান"। ভোরের কাগজ। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
  9. রবীন্দ্রভারতী সম্মানসূচক ডি.লিট.[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  10. "পদ্মভূষণ গ্রহণ করলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান"দৈনিক প্রথম আলো। ১ এপ্রিল ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ 
  11. "সাতজন পেলেন স্বাধীনতা পুরস্কার"দৈনিক সমকাল। ২৫ মার্চ ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ 
  12. "আনন্দ পুরস্কার পেলেন আনিসুজ্জামান"দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০১৭ 
  13. "জগত্তারিণী পদক পেলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান"বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ১২ জানুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ 
  14. "সার্ক সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত আনিসুজ্জামান"দৈনিক প্রথম আলো। ৩ মে ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০১৯ 
  15. "আহছানউল্লা স্বর্ণপদক পেলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান"দৈনিক প্রথম আলো। ৩০ নভেম্বর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০১৯ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]