বিষয়বস্তুতে চলুন

সালাহউদ্দিন মমতাজ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শহীদ ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ বীর উত্তম
জন্ম২৩ আগস্ট, ১৯৪৫
মৃত্যু৩১ জুলাই, ১৯৭১
ধানুয়া কামালপুর, বকশীগঞ্জ, জামালপুর
জাতীয়তাবাংলাদেশী
নাগরিকত্ব ব্রিটিশ ভারত (১৯৪৭ সাল পর্যন্ত)
 পাকিস্তান (১৯৭১ সালের পূর্বে)
 বাংলাদেশ
পরিচিতির কারণ শহীদ, বীর উত্তম

শহীদ ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ বীর উত্তম (জন্ম: ২৩ আগস্ট, ১৯৪৫ - মৃত্যু: ৩১ জুলাই, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন দুর্ধর্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে 'বীর উত্তম' খেতাবে ভূষিত করে। []

প্রারম্ভিক জীবন

[সম্পাদনা]

মুমতাজ ১৯৪৫ সালে ফেনী জেলার উত্তর চরিপুরের মুক্তারবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ ছিলেন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার)-এর আকিয়াব অঞ্চলের মুসলিম জমিদার। তাঁর মাতামহ মৌলভী আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গীয় আইনসভার একজন বিধানসভা সদস্য (এমএলএ)। তাঁর বাবা, শামসুদ্দিন আহমেদান, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কলকাতায় আইন পেশা শুরু করেন। ছোটবেলায় সালাউদ্দিন কলকাতায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাসের সময় পড়াশোনা শুরু করেন।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর তাঁদের পরিবার ফেনীতে ফিরে আসে। সেখানে সালাউদ্দিন দেবীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে দশম শ্রেণির ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করেন। দ্বাদশ শ্রেণির ভারতীয় স্কুল সার্টিফিকেট (আইএসসি) পরীক্ষার জন্য তিনি প্রথমে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, পরে দয়াল সিং কলেজ এবং শেষে ফেনী সরকারি কলেজে পড়াশোনা করে পাস করেন।

ফেনী কলেজে বিজ্ঞান স্নাতক পড়ার সময় তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন;[] পরে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর (পদাতিক বিভাগ) সঙ্গে যুক্ত হন এবং ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন।

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

সালাহউদ্দিন মমতাজ ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্লাইট ক্যাডেট হিসাবে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে ২৭শে আগস্ট কাকুলের পাকিস্তানি মিলিটারি একাডেমী থেকে ১২৪ জন ক্যাডেটের মধ্যে তিনি তৃতীয় স্থান দখল করে কমিশন পেয়েছিলেন। এরপর তাঁর পোস্টিং দেয়া হয় ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৬৭ সালের ২৭শে আগস্ট থেকে ১৯৭১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর পাকিস্তানের মারিতে স্কুল অব মিলিটারি ইনটেলিজেন্সে কোর্স শেষ করার পরে ১৯৭১ এর ৩রা মে ৪৩ বেলুচ রেজিমেন্টে বদলি করা হয়।    

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে সালাউদ্দিন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে কর্মরত ছিলেন। ৩ জুলাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে পাকিস্তান ছাড়ার উদ্দেশ্যে তিনি মারাল এলাকার মোনাওয়ারা তাবি নদী পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, শাহরিয়ার ও আনাম। এই ঘটনা সে সময় বিশ্ব গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়।[] তিনি কলকাতায় নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারের হাইকমিশনে উপস্থিত হয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যোগ দেন। ফেনীতে মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ না পেয়ে তাঁকে সরাসরি ভারতের মেঘালয়র তেলঢলা ক্যাম্পে পাঠানো হয়, যেখানে তাঁর রেজিমেন্ট অবস্থান করছিল।

তেলঢলায় মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্স সক্রিয় ছিল। সালাউদ্দিন এই বাহিনীতে যোগ দিয়ে ডেল্টা কোম্পানির অধিনায়ক হন।[] তিনি কামালপুর সীমান্ত চৌকি (বিওপি) আক্রমণের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনায় অংশ নেন। ২৮ জুলাই তিনি একটি টহল অভিযানের নেতৃত্ব দেন, যেখানে তারা দুইজন পাকিস্তানি সৈন্যের মুখোমুখি হন। সালাউদ্দিন একজনের সঙ্গে লড়াই করে, সুবেদার হাইয়ের সহায়তায় তাকে হত্যা করেন এবং রাইফেল দখল করেন। এসময় পাকিস্তানি বাহিনীর দিক থেকে গুলি শুরু হয়। সুবেদার হাই অপর সৈন্যের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নেন এবং নায়েক শফি তাকে হত্যা করেন। সালাউদ্দিন ও তাঁর দল দুটি রাইফেল নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসেন।

কামালপুর বিওপি আক্রমণ শুরু হয় ৩০ জুলাই রাত থেকে ৩১ জুলাই ভোর পর্যন্ত, মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে। উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ডেল্টা ও ব্রাভো — এই দুই কোম্পানি আক্রমণে অংশ নেয়। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ডেল্টা কোম্পানির নেতৃত্ব দেন বাম দিকে, আর ক্যাপ্টেন হাফিজ ব্রাভো কোম্পানির নেতৃত্ব দেন ডান দিকে। মেজর মইনের অধীনে ‘আর’ গ্রুপ ছিল রিজার্ভ বাহিনী, যেখানে মেজর জিয়াও উপস্থিত ছিলেন। বাহিনী শত্রুপোস্টের দিকে অগ্রসর হলে পাকিস্তানি আর্টিলারি প্রবল গোলাবর্ষণ শুরু করে। এতে দুই কোম্পানির অগ্রগতি ধীর হয় এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবুও সালাউদ্দিনের দল এগিয়ে গিয়ে শত্রুর বাইরের প্রতিরক্ষা ভেদ করে, ফলে শত্রুপক্ষ সামনের অবস্থান ছাড়তে বাধ্য হয়। ডেল্টা কোম্পানি পাকিস্তানি বাঙ্কার এলাকা পেরিয়ে বিওপির কাছে কমিউনিটি সেন্টারে প্রবেশ করে কাছাকাছি লড়াই শুরু করে। সুবেদার হাই ও তাঁর দল পাকিস্তানি মাইনফিল্ডের খুব কাছাকাছি পৌঁছান। সালাউদ্দিন ছিলেন তাঁদের ডান পাশে। হাইয়ের সামনে একটি বোমা বিস্ফোরিত হলে তিনি হাত হারান। সালাউদ্দিন এগিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের ধাওয়া করেন। ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধারা মাইনফিল্ড অতিক্রম করতে থাকেন।

৩১ জুলাই ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মুমতাজের দিকে দুটি মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করে, এতে তিনি শহীদ হন।[]

পুরস্কার ও সম্মাননা

[সম্পাদনা]
  • বীর উত্তম
  • বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঘাটাইলস্থ সেনানিবাসটির নামকরণ করা হয় "শহীদ সালাউদ্দিন সেনানিবাস (ঘাটাইল)"।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "দৈনিক কালের কন্ঠ,ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী "একজন সৈনিকের কাহিনী"| তারিখ: ২৬-০৩-২০১২"। ৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ মার্চ ২০১৩
  2. Glimpses into The History of the Burmese and Chinese Muslims: Shamsuddin Ahmed, 1978.
  3. বীরশ্রেষ্ঠ : জাহানারা ইমাম, গণপ্রকাশনী, ২০০৮।
  4. রক্তে ভেজা ৭১ : মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৬।
  5. কামালপুর ১৯৭১ : সম্পাদনা- মুহাম্মদ লুতফুল হক, প্রথমা প্রকাশন, ২০১২।