বিষয়বস্তুতে চলুন

যতীন সরকার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
যতীন সরকার
জন্ম(১৯৩৬-০৮-১৮)১৮ আগস্ট ১৯৩৬
ময়মনসিংহ জেলা, বঙ্গ প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে নেত্রকোণা জেলা, বাংলাদেশ)
মৃত্যু১৩ আগস্ট ২০২৫(2025-08-13) (বয়স ৮৮)[]
ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ
পেশাচিন্তাবিদ ও লেখক
জাতীয়তাবাংলাদেশী
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারস্বাধীনতা পদক পুরস্কার

যতীন সরকার (১৮ আগস্ট ১৯৩৬ – ১৩ আগস্ট ২০২৫)[] ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক।[][][][] জীবনের সিংহভাগ তিনি ময়মনসিংহে কাটিয়েছেন এবং প্রধানত নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তার রচিত গ্রন্থসমূহ তার গভীর মননশীলতা ও মুক্তচিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।[] ১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি ময়মনসিংহ শহরের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়।

১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ আগস্ট (বাংলা ১৩৪৩ সনের ২ ভাদ্র) তারিখে যতীন সরকারের জন্ম হয় নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে।

শিক্ষা ও জীবন

[সম্পাদনা]

আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয় রামপুর ফ্রি বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় পাস করেন। টিউশনি ক'রে টাকা জমিয়ে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে আইএ-তে ভর্তি হন নেত্রকোণা কলেজে। এ সময় নেত্রকোণা শহরে তিনি লজিং থাকতেন। এ সময় নেত্রকোণা কলেজের ছাত্রসংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। আইএ পাশের পর ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে বিএ ক্লাশে ভর্তি হন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বিএ পরীক্ষা দিয়েই জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতা শুরু করেন নেত্রকোণার আশুজিয়া হাইস্কুলে। এরপর তিনি শিক্ষকতা করেন বারহাট্টা সিকেপি পাইলট হাই স্কুলে। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়নের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এমএ পাস করেন তিনি ১৯৬৩-তে। এ বছরই তিনি যোগ দেন ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর হাই স্কুলে বাংলার মাস্টার হিসেবে। পরবর্তী বৎসরে, ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিষয়ে লেকচারার পদে চাকুরি লাভ করেন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে কানন আইচ-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যতীন সরকার এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।

দীর্ঘ ৪২ বছরেরও অধিক সময় শিক্ষকতার পর ২০০২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি নিজ জেলা নেত্রকোণায় ফিরে যান। জীবনের শেষভাগ তিনি তার পরিবারের সাথে সেখানেই অতিবাহিত করেন।[] তিনি ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই আগষ্ট ৮৯ বছর বয়সে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।[] তিনি দীর্ঘদিন ধরে পলিআর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছিলেন।

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক

[সম্পাদনা]

১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে, সরকার ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তার উপস্থিতি শহরে প্রতিটি সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রোগ্রামে অনিবার্য ছিল। তিনি দুই মেয়াদে সাংস্কৃতিক উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[] ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন জাতীয় সাংস্কৃতিক। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র নামে একটি পত্রিকা শুরু করেছিলেন।

যতীন সরকারের বাড়ি ‘বানপ্রস্থ’

রাজনৈতিক দর্শন

[সম্পাদনা]

তিনি সর্বদা মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক নিপীড়ন, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিহত করার জন্য কথা বলেছেন। ২৯ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে, তিনি জাতীয় নির্বাচন নীতি ও ময়মনসিংহের নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আঞ্চলিক সংলাপের সভাপতিত্ব করেন। ২০০৬ সালে বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ডে পালন করে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত একটি সভাপতিত্বের করেন, সভাপতিত্বকালে তিনি বলেন,

"এখন সবকিছুই টাকা দিয়ে করা হয় এবং ফলস্বরূপ, সংবাদপত্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের পর থেকে প্রেসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এত কঠিন। কর্পোরেশন এবং ব্যবসা চুম্বক যারা পুঁজিবাদের পক্ষে কাজ করে এবং পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ এবং বিশ্বায়নের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। অবশ্যই মিডিয়া এবং উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সমাজ থেকে দুর্নীতি, অবিচার, বৈষম্য ইত্যাদি দূর না হওয়া পর্যন্ত দারিদ্র্য কমিয়ে আনা যাবে না।"

তিনি সকলকে স্বাধীনতা অর্জনের আহ্বান জানান এবং ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ভিত্তিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। তিনি মনে করতেন সংসদ সদস্যগণ আইন ছাড়া অন্য কার্যক্রম জড়িত হওয়া উচিত নয়।

জাতীয় পর্যায়ে উত্থান

[সম্পাদনা]

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ময়মনসিংহেই তাঁর পরিচিতি ছিলো। উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব ও নিভৃতচারী মনোভাবই ছিল মূলত তাঁর জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধক। তারপর থেকে তিনি একজন চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী, যুক্তিবাদী এবং নিবেদিতপ্রাণ প্রাবন্ধিক হিসাবে জাতীয় গুরুত্ব অর্জন করতে শুরু করেন। তিনি ক্রমবর্ধমান বিবেকের একটি স্বর হিসাবে স্বীকৃত । ২০০৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

পুরস্কার

[সম্পাদনা]

২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, তিনি গবেষণা ও প্রবন্ধের জন্য বাংলা একাডেমী হতে পুরস্কার লাভ করেন। তার পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়া যতীন সরকার বলেন যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্তি তার জন্য একটি মহান অনুভূতি ছিল। এর আগে বাংলা একাডেমী তাঁকে "'ডাক্তার মোহাম্মদ এনামুল হক স্বর্ণ পদক" প্রদান করেছিলেন। ২৪ জানুয়ারি ২০০৬ তারিখে, তিনি পাকিস্তানের জন্ম মৃত্যু-দর্শন' শিরোনামের বইয়ের জন্য 'প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১১' পান। প্রথম আলো ১৪১০ সালে (২০০৪ খ্রি।) বাংলাদেশি লেখকদের সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি দিতে এই পুরস্কারটি চালু করা হয়। তার প্রাপ্ত অন্যান্য পুরস্কারগুলো হলো নারায়ণগঞ্জ শ্রুতি স্বর্ণপদক, ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাব লিটারারি অ্যাওয়ার্ড, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার এবং মনিরুদ্দিন ইউসুফ সাহিত্য অ্যাওয়ার্ড

তথ্যচিত্র

[সম্পাদনা]

চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল ১৯৭১ সালে যতীন সরকারের জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। এটি মার্চ ২০০৬ সালে মুক্তি পায়।

প্রকাশনা

[সম্পাদনা]

এ পর্যন্ত তিনি ১৭টি শিরোনামে বই প্রকাশ করেছেন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানের জন্ম মৃতু-দর্শন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশী কাবি গান আরেকটি বই। তার আরো কিছু বই, সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা, বাঙ্গালী সমাজতন্ত্র ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, মানব মন, মানব স্বপ্ন এবং সমাজ বিপ্লব, আমাদের সাংস্কৃতিক দিগ-দিগন্ত, সিরাজউদ্দিন কাশিমপুর, গল্পে গল্পে বয়ান এবং দিগন্ত নতুনবাধ ও বিজন্মচেতনা

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "চলে গেলেন শিক্ষাবিদ যতীন সরকার"প্রথম আলো। ১৩ আগস্ট ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৫
  2. বরেণ্য বুদ্ধিজীবী যতীন সরকারের ৮৫তম জন্মদিন আজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ আগস্ট ২০২০
  3. "'শ্রীজ্ঞান' যতীন সরকার"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯
  4. "যতীন সরকার : সাঁকো বাঁধার নিপুণ কারিগর"কালি ও কলম। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯
  5. "যতীন সরকার :: দৈনিক ইত্তেফাক"archive.ittefaq.com.bd। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯
  6. "যতীন সরকার: এক অনন্য বাঙালি মনীষা"চ্যানেল আই। ১৮ আগস্ট ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯
  7. 1 2 3 প্রতিবেদক, নিজস্ব (১৩ আগস্ট ২০২৫)। "চলে গেলেন শিক্ষাবিদ যতীন সরকার"Prothomalo। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৫
  8. "লেখক শিক্ষাবিদ যতীন সরকার আর নেই"Jugantor। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৫