ভোলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ভোলা
পূর্বনাম :দক্ষিণ শাহবাজপুর
শহর
ভোলা বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
ভোলা
ভোলা
বাংলাদেশে ভোলা শহরের অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২২°৪১′০৯″ উত্তর ৯০°৩৮′৪৬″ পূর্ব / ২২.৬৮৫৯০০° উত্তর ৯০.৬৪৬১১৯° পূর্ব / 22.685900; 90.646119স্থানাঙ্ক: ২২°৪১′০৯″ উত্তর ৯০°৩৮′৪৬″ পূর্ব / ২২.৬৮৫৯০০° উত্তর ৯০.৬৪৬১১৯° পূর্ব / 22.685900; 90.646119
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগঢাকা বিভাগ
জেলাভোলা জেলা
উপজেলাভোলা সদর উপজেলা
সরকার
 • ধরনপৌরসভা
 • শাসকভোলা পৌরসভা
আয়তন
 • মোট৪৫.৪০ কিমি (১৭.৫৩ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা
 • মোট৮৭,২৪৩
 • জনঘনত্ব১৯০০/কিমি (৫০০০/বর্গমাইল)
সময় অঞ্চলবাংলাদেশ সময় (ইউটিসি+৬)

ভোলা বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার সদরদপ্তর ও জেলা শহর। ভোলা শহর ঢাকা থেকে নদী পথে দূরত্ব ১৯৫ কি.মি.। ভোলা শহর ভোলা সদর উপজেলারও প্রশাসনিক সদরদপ্তর। ৪৫.৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং ৭১,৬৯৮ জন জনসংখ্যা বিশিষ্ট শহরটি ভোলা পৌরসভা দ্বারা শাসিত হয়। শহরটি নদীপথেই মূলত অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যুক্ত।

নামকরণ[সম্পাদনা]

ভোলার আদি নাম ছিল দক্ষিণ শাহবাজপুর। ভোলার নামকরণের পেছনে স্থানীয়ভাবে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে । ভোলা শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে বেতুয়া নামক একটি খাল। খালটি এখনকার মত এত অপ্রশস্ত ছিলনা । একসময় এটা প্রশস্ত ছিল যে খালটি পরিচিত ছিল বেতুয়া নদী নামে। খেয়া নৌকার সাহায্যে নদীতে পারাপার করা হতো। ভোলা গাজি পাটনি নামে এক বৃদ্ধ মাঝি খেয়া নৌকার নৌকার সাহায্যে লোকজনকে পারাপারের কাজ করতো। বর্তমান যোগীর ঘোলের কাছেই তার আস্তানা ছিল । এই ভোলা গাজির নামানুসারেই একসময় এ অঞ্চলের নামকরণ হয় ভোলা । [১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

এলাকার প্রাকৃতিক ও অন্যান্য প্রাচুর্যে প্রলুব্ধ হয়ে একের পর এক বিদেশী শাসক ও পর্তুগীজ জলদস্যুরা এসেছে এখানে। ১৫০০ সালে, পর্তুগিজ এবং মগ জলদস্যুরা এই দ্বীপে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৫১৭ সালে জন ডি সিলবেরা নামক জনৈক পর্তুগীজ জলদস্যু দ্বীপটি দখল করে। পর্তুগীজদের রেখে যাওয়া ভীম দর্শন কিছু রোমশ কুকুর আজও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে সেসব লোমহর্ষক অত্যাচারের কাহীনি স্মরণ করিয়ে দেয়। বলা বাহুল্য মনপুরা ছিল এদের দস্যুবৃত্তির লীলাক্ষেত্র। আরাকান ও মগ জলদস্যুরা শাহবাজপুরের দক্ষিণ অংশেও তাদের ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। এছাড়াও আরাকানের বর্গি ও মগরা দক্ষিণ শাহবাজপুরসহ আশেপাশের দ্বীপকে ঘাটি বানিয়ে লুটপাট চালিয়ে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করে রাখত। এরই প্রেক্ষাপটে সম্ভবত রচিত হয়েছিল -

 ‘‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিব কিসে ?

ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কি ? আর কটা দিন সবুর কর রসূন বুনেছি’’-

বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে ভোলা শহর ভোলা জেলার প্রশাসনিক দপ্তর এবং সর্ববৃহৎ শহর। এর পূর্বের নাম ছিল দক্ষিণ শাহবাজপুর। ১৮২২ অবধি শাহবাজপুর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার একটি অংশ ছিল। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে মেঘনা নদীর সম্প্রপ্রসারণের কারণে জেলা সদর থেকে দক্ষিণ শাহবাজপুরের সাথে সংযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপরে সরকার দক্ষিণ শাহবাজপুর এবং হাতিয়াকে নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৮৪৫ সালে ভোলা নোয়াখালী জেলার অধীনে মহকুমা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তখন এর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল বর্তমান দৌলতখান। পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে ভোলা মহকুমা বৃহত্তর বরিশাল জেলার মহকুমায় উন্নীত হয় এবং ১৮৭৬ সালে এর সদর দপ্তর দৌলতখান হতে ভোলা শহরে স্থানান্তরিত করা হয়। মূলত তখন হতেই ভোলা শহরাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৮৪ সালে ভোলা মহকুমা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে উন্নীত হয় এবং ভোলা জেলা শহর হিসেবে মর্যাদা পায়। এলাকার কিংবদন্তী, মসজিদ মন্দিরের স্থাপত্য ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শণ বিশ্লেষণ করলে অনুমিত হয় এ জনপদ মাত্র ৭/৮ শত বছর আগে সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত হয়েছে। মহারাজা কন্দর্প নারায়ণের কণ্যা বিদ্যাসুন্দরী ও কমলা রাণীর দিঘির ইতিহাস এ অঞ্চলের লোক সংস্কৃতির একটি অংশ। এ দিঘির কাহিনী নিয়ে সুদুর তামিলনাড়ুর নিম্নাঞ্চলে এখনও গান পরিবেশিত হয়। [২]

[৩] পরবর্তীতে ১৯২০ সালে এবং পুনরায় ১৯৭২ সালে শহর পরিচালনার উদ্দেশ্যে ভোলা পৌরসভা গঠিত হলে ভোলা পৌরশহরের মর্যাদা লাভ করে।

ভূগোল[সম্পাদনা]

শহরটির অবস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হল ২২°৪১′০৯″ উত্তর ৯০°৩৮′৪৬″ পূর্ব / ২২.৬৮৫৯০০° উত্তর ৯০.৬৪৬১১৯° পূর্ব / 22.685900; 90.646119। যেহেতু শহরটি মূলত একটি দ্বীপে অবস্থিত তাই সমুদ্র সমতল থেকে শহরটির গড় উচ্চতা ১ মিটার। ভোলা বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাচীন গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ এবং একমাত্র দ্বীপ জেলা। জে. সি. জ্যাক তার "Bakerganj Gazetier" এ বর্ণনা করেছেন যে দ্বীপটি ১২৩৫ সালে তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল এবং ১৩০০ সালে এই অঞ্চলে চাষাবাদ শুরু হয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা ৩টি প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র বাহিত পলি দিয়ে মোহনায় গড়ে উঠেছে এ দ্বীপ। সমুদ্র সমতল থেকে এর গড় উচ্চতা ১২ ফুটের মতো। নৃ-তত্ত্ব ও ভূ-তত্ত্ববিদরা মনে করেন ‘‘পূর্ব দিকে মেঘনা ও পশ্চিম দিকে তেঁতুলিয়া নদী বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসে গতিবেগ হারিয়ে ফেলে। ফলে এ স্থানটিতে কালক্রমে পলিমাটি জমা হয়ে আজকের ভোলা নামক দ্বীপটির জন্ম।’’ মেঘনা, তেঁতুলিয়া বিধৌত বঙ্গোপসাগরের উপকুলে জেগে ওঠা এ ভূখন্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যেদিকে চোখ যায় সব দিকে শুধু সমতল ভূমি।  ফসলের দোলায়মান দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, হরেক রকমের গাছ-গাছালী, পাখীর কুজন, বারমাসী ফলমূল সত্যিই উল্লেখযোগ্য। নৈস্বর্গিক দ্বীপ ভোলায় মূল্যবান প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর।

জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের আদমশুমারি ও গৃহগণনা-২০১১ অনুযায়ী ভোলা শহরের মোট জনসংখ্যা ৮৭,২৪৩ জন যার মধ্যে ৪৪,০১৫ জন পুরুষ এবং ৪৩,২২৮ জন নারী। এ শহরের পুরুষ এবং নারী অনুপাত ১০২:১০০। [৪]

প্রশাসন[সম্পাদনা]

এ শহরটি ভোলা পৌরসভা নামক একটি স্থানীয় সরকার সংস্থা(পৌরসভা) দ্বারা পরিচালিত হয় যা ৯টি ওয়ার্ড এবং ১৯টি মহল্লায় বিভক্ত। ৪৫.৪০ বর্গ কি.মি. আয়তনের ভোলা শহরের ২২.৬৬ বর্গ কি.মি. ভোলা পৌরসভা দ্বারা শাসিত হয়। এ পৌর শহরের নাগরিকদের পৌরসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করাই এ সংস্থার কাজ। [৫]

সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

ভোলা একটি বৃহত্তম গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ হলেও এখানকার সংস্কৃতি বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের মতই। বরিশাল, লহ্মীপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলের মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব আছে এখানে। তবে ভাষার ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে শুদ্ধ বাংলা ভাষা চলমান; আঞ্চলিকতার কোন টান নেই। ভোলার পশ্চিমের কিছু এলাকায় বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব আছে।তবে ভোলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রাচীন। পঞ্চাশের দশক থেকে বিভিন্ন গবেষণাধর্মী লেখায় ভোলায় সংস্কৃতি চর্চায় যাত্রা ও নাটকের প্রাধান্য বেশী দেখা যায়। পঞ্চাশের দশকে ভোলায় বিদ্যুৎ ছিলনা। হ্যাজাক জ্বালিয়ে গ্রামে-গঞ্জে যাত্রা, পালাগান ও নাটক হতো। ভোলার প্রথম সঙ্গীতভিত্তিক সংগঠন শিল্পী নিকেতন। নাট্যভিত্তিক সংগঠন মেঘনা শিল্পী সংসদ। এরপর রয়েছে সৃজনী সংসদ। এখানে বর্তমানে বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠী, আবৃত্তি সংসদ, ভোলা থিয়েটার এবং উদীচিসহ বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম রয়েছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমী ও শিশু একাডেমী বেশ বেগবান। জনাব আফসার উদ্দিন বাবুল একাধারে শিল্পী, সুরকার, গীতিকার, সাংবাদিক ও ফাতেমা খানম কলেজের অধ্যক্ষ । শিল্পীদের মধ্যে মনজুর আহমেদ, সাথী করঞ্জাই, রেহানা ফেরদৌস, মৃদুল দে, উত্তম ঘোষ, অতুনু করঞ্জাই, জিয়া, শামস-উল আলম মিঠু, নেয়ামত উল্লাহ, মসিউর রহমান, পিংকু, ভাস্কর মজুমদার, প্রদীপ নাগ, আশীষ ঘোষ, মনিরুল ইসলাম, অমি দে প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। শিশু শিল্পীদের মধ্যে ১৯৮৭ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সঙ্গীতের ৫টি শাখায় জাতীয় পর্যায়ে ৫টি স্বর্ণ পদক পেয়ে আলোচনায় আছেন ফারজানা আফসার লিয়ানা।জেলায় দু’জন ওস্তাদ সঙ্গীত শিল্পী গুরুদাস নাগ ও মন্টু তালুকদার এবং সঙ্গীত শিল্পী ও সংগঠক হেলাল উদ্দিন আহমেদ (ফেলু মিয়া) মৃত্যুবরণ করার পরও তাদের সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অবদান সবাই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোশারেফ হোসেন শাজাহান একজন সাহিত্যিক, নাট্যকার ও অভিনেতা হিসেবে ষাট দশকে আলোচিত ছিলেন। বর্তমানে তার প্রকাশনা রয়েছে বেশ কিছু। ষাটের দশকের অভিনয় শিল্পী হিসেবে অধ্যক্ষ ফারুকুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, কালীপদ দে, রতন চৌধুরী,আবদুল লতিফ, মাখন ঘোষ, শামিত্ব ঘোষ, সাবেরুল করিম চৌধুরী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

আগেরকার সময় হতেই ভোলায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠে। এইসব সামাজিক সংগঠন গুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান করে থাকে।

[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "ভোলা জেলার পটভূমি"। bhola.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-০৩ 
  2. "ভোলা জেলার পটভূমি"। bhola.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-০৩ 
  3. "ভোলা জেলার পটভূমি"। bhola.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-০৩ 
  4. "Urban Centers in Bangladesh"। Population & Housing Census-2011 [আদমশুমারি ও গৃহগণনা-২০১১] (PDF) (প্রতিবেদন)। জাতীয় প্রতিবেদন (ইংরেজি ভাষায়)। ভলিউম ৫: Urban Area Rport, 2011। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। মার্চ ২০১৪। পৃষ্ঠা ১৭৩। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-০৩ 
  5. "এক নজরে পৌরসভা"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-০৪ 
  6. "ভাষা ও সংস্কৃতি"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-০৪