সৃষ্টিকর্তা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হাবল টেলিস্কোপে তোলা চার কোটি আলোকবর্ষ দূরের আনতেননাই ছায়াপথ। এসব কিছু এক শক্তিশালী সত্ত্বার সৃৃষ্টি বলে ধার্মিকদের বিশ্বাস। অনেক সময় সৃৃষ্টিকর্তার শক্তির নিদর্শন হিসাবে এধরণের চিত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সৃষ্টিকর্তা একটি বাংলা শব্দ (ইংরেজি: Creator) যিনি সৃষ্টি করেন তাকেইই সৃষ্টিকর্তা বলা হয়। বিভিন্ন ধর্মের বিশ্বাসীরা যে মহান অস্তিত্ব সময়, স্থান, জীব, মহাকাশসহ সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন তাকে সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা নামে সম্বোধন করে। বিশ্বাসীরা এই মহাবিশ্বের জীবজড় সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক আছে বলে বিশ্বাস করে; এদেরকে আস্তিক বলা হয়। আবার অনেকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তাদের বলা হয় নাস্তিক। সৃষ্টিকর্তা একটি অধিক ব্যবহৃত বাংলা শব্দ যা মুলত বিধাতা,ভগবান, ঈশ্বর, ইলাহি, আল্লাহ প্রভৃতি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভাবা হয়, তিনি জাগতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে অবস্থানকারী কোন অস্তিত্ব।

ব্যবহারিক ভাবে ব্যক্তিগত কীর্তি ব্যাখা দিতেও সৃষ্টিকর্তা শদটি রূপক অর্থে ব্যক্তিক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সৃষ্টিকর্তার স্বরুপ[সম্পাদনা]

ইব্রাহিমীয় ধর্মতে সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন এক শক্তিশালী, সতন্ত্র ও দয়াবান সত্বা যিনি এই মহাবিশ্বের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ অনুযায়ী ঈশ্বর (সৃষ্টিকর্তা) এই জগতের পিতা। মুসলমানদের কাছে আল্লাহ (সৃষ্টিকর্তা) হলেন এক ও অদ্বিতীয় সত্বা, যিনি লা- শারিক (যার সাথে কারো তুলনা করা যায় না)। এক্ষেত্রে ইহুদিদের বিশ্বাসও মুসলমানদের অনুরুপ। বাহাই বিশ্বাসীদের মতে, সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন অদ্বিতীয় ও মহাপরাক্রমশালী যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। আর জরথুস্ত্রবাদ অনুযায়ী, অহুরা মাজদা (সৃষ্টিকর্তা) এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন এবং অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন।

হিন্দুদের নিকট ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা) হচ্ছেন এক পরমাত্মা যিনি সকল জিনিসে বিদ্যমান এবং সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।

কিছু ধর্ম এক সৃষ্টিকারী সত্ত্বার উপরে বিশ্বাস করে না। যেমন - ইনকা ধর্ম, গ্রিক ধর্ম, চীনাআফ্রিকার লৌকিক ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি।

বৌদ্ধধর্মজৈনধর্ম সৃষ্টিকর্তা নামক কোনো সত্ত্বার অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করে না। তাদের মতে, জগতের সবকিছু চিরকাল ছিলো, আছে আর থাকবে।

বিভিন্ন ধর্মে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

বিভিন্ন ধর্মে সৃষ্টিকর্তাকে বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক ধর্মে সৃষ্টিকর্তাকে এই বিশ্বজগতের এক ও অদ্বিতীয় স্বত্বা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যেমন- ইসলাম,ইহুদি, খ্রিস্টান, জরথুস্ত্রবাদ, মানিবাদ, ইয়াজেদিবাদ, বাহাই বিশ্বাস ইত্যাদি ধর্মে। আবার অনেক ধর্মে একের অধিক সৃষ্টিকর্তার কথা বলা হয়েছে। যেমন- প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম। কিছু ধর্মমত অনুসারে, সৃষ্টির সব কিছুর মধ্যেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। যেমন- হিন্দু ধর্ম। অন্যদিকে অনেক ধর্ম সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে। এসব ধর্মমত অনুসারে, সৃষ্টির সবকিছু আপনাআপনি সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা বলে কোনো স্বত্বার এতে কোনো হাত নেই। যেমন- বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, কনফুসীয়বাদ , তাওবাদ,শিন্তৌ ইত্যাদি। বিজ্ঞান এসব ধর্মমতকে সমর্থন দিয়েছে। কারণ বিজ্ঞানের দৃশটিতেও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বহুসত্ত্বাবাদী ধর্মসমূহে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

বহুসত্ত্বাবাদ বলতে একের অধিক ঈশ্বর বা দেবতার প্রতি বিশ্বাসকে বোঝায়। বহুসত্ত্বাবাদে কোনো এক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বার প্রতি বিশ্বাস অনুপস্থিত। প্রকৃৃতির প্রত্যেকটা ঘটনার জন্য এসকল ধর্মে একেক জন স্বতন্ত্র সত্ত্বা বিদ্যমান। বর্তমানে এধরনের ধর্ম বিশ্বাস তেমন একটা দেখা যায় না। এদের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কয়েকটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বহুসত্ত্বাবাদী ধর্ম হলো- প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম, প্রাচীন গ্রিক ধর্ম, প্রাচীন রোমান ধর্ম, ইনকা ধর্ম, আজটেক ধর্ম ইত্যাদি। বর্তমানে টিকে থাকা বহুসত্ত্বাবাদী ধর্মের মধ্যে রয়েছে- চীনা লৌকিক ধর্মবিশ্বাস, আফ্রিকার আদিবাসী ধর্মবিশ্বাস

বহুসত্ত্বাবাদী ধর্মসমূহে সাধারণত একজন প্রধান ও কেন্দ্রীয় দেবতা থাকেন। তিনিই হন সকল দেবতাদের রাজা। যেমন গ্রিকদের জিউস (Zeus), রোমানদের যুপিতার (Jupiter), ইনকাদের ইন্তি (Inti) ইত্যাদি। এরা প্রধান দেবতা হলেও সৃৃষ্টিকর্তা না। বেশিরভাগ বহুসত্ত্বাবাদী ধর্মেই সৃৃষ্টিকর্তা ও প্রধান দেবতাকে ভিন্ন সত্ত্বা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন- প্রাচীন গ্রিকদের পুরাণে প্রমিথিউস (Prometheus) মানুষের স্রষ্টা। ইনকাদের পুরাণে ভিরাকোচা (Viracocha) দেবতা ইন্তির কথায় দক্ষিণ আমেরিকার তিতিকাকা হ্রদ এর পানি থেকে উঠে পৃৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার করেন।

ইহুদি ধর্মে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

ইহুদি ধর্মে সৃষ্টিকর্তাকে যিহোবা (Yahweh/Jehovah) বা এলোহিম (Elohim) বলা হয়ে থাকে, যা হিব্রু ভাষার শব্দ। ইহুদিদের মাঝে সৃষ্টিকর্তাকে যারা 'এলোহিম' নামে ডাকে তাদের এলোহীয় (Elohist) বলা হয়। আর যারা যিহোবা নামে ডাকে তাদের যিহোবীয় (Yahwist) বলে ডাকা হয়ে থাকে। ইহুদিরা খ্রিস্টানদের মতো ত্রিত্ববাদ এ বিশ্বাস করে না। সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিশ্বাস মুসলমানদের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের সমার্থক বলা যেতেই পারে।

খ্রিষ্টান ধর্মে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

খ্রিস্ট ধর্মমত অনুযায়ী, ঈশ্বরের তিনটি রুপ বা সত্ত্বা বিদ্যমান। খ্রিস্টানরা যাকে ত্রিত্ববাদ (Trinity) বলে থাকে। তিনটি রুপ হলো, পিতা (The Father), পুত্র (The Son) ও পবিত্র আত্মা (The Holy Spirit)। সে হিসাবে, পিতা হলেন স্বযং ঈশ্বর, পুত্র হলেন যিশু এবং পবিত্র আত্মা হলেন গ্যাব্রিয়েল (ইসলাম ধর্মতে যিনি জিবরায়েল আ.)। অনেকেই এই বিষয় নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে। খ্রিস্টানরা এক্ষেত্রে গাছের উপমা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে। একটা গাছে যেমন ফলমূল, লতাপাতা বিদ্যমান, তেমনি ঈশ্বরেরও তিনটি রূপ বিদ্যমান। একই গাছ অথচ এরই মধ্যে কতো কিছু রয়েছে। তেমনি একই ঈশ্বর, কিন্তু তার ৩টি রূপ রয়েছে। যিশু ঈশ্বরের পুত্র হলেও তাকে ঈশ্বরের মর্যাদা দেয়া হয়ে থাকে। খ্রিস্টানদের মতে, যিশু খ্রিস্ট বিশ্বে খ্রিস্ট ধর্মের শান্তির বাণী পৌঁছে দিতে ঈশ্বর পুত্র রুপে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন। দুনিয়া ধ্বংসের আগে মশীহ (Messiah) রুপে তিনি পুনরায় আগমন করবেন। খ্রিস্ট ধর্মে ঈশ্বরের ধারনা অনেকটা সর্বেশ্বরবাদী।

ইসলাম ধর্মে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

ইসলামি বিশ্বাস মতে, আল্লাহ হলেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী, চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, চিরবিরাজমান, অমূক্ষাপেক্ষি। তিনি দয়াময়-পরম দয়ালু। তিনি এই বিশ্বজগতের এক মাত্র পালনকর্তা। মুসলিমদের মতে, আল্লাহর কোনো শুরু বা শেষ নেই। তিনিই হবেন শেষ বিচারের দিন এর এক মাত্র বিচারক। তিনি চিরকাল ছিলেন, আছেন আর থাকবেন। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,

"আল্লাহ যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মানুযায়ী ফল দেওয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।"[কুরআন 45:22]

আল-কুরআনে আরো বলা হয়েছে,

"তিনি আকাশমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’; ফলে তা হয়ে যায়।"[কুরআন 2:117]

মুসলমানদের বিশ্বাস মতে, আল্লার কোনো গুনাবলীই সৃষ্টজীবের মতো না। সৃষ্টজীবেরা যেভাবে দেখে, আল্লাহ সেভাবে দেখেন না। সৃষ্টজীব যেভাবে শোনে, আল্লাহ সেভাবে শোনেন না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর গুনাবলীর আসল ধরন মানুষের অজানা। কুরআনে আছে,

"... কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।"[কুরআন 42:11]

হিন্দু ধর্মে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

চিণ্ময়বাদ, অদ্বিতীয়বাদ, সর্বেশ্বরবাদ, আস্তিক্যবাদ সকল বিশ্বাসের সমারোহ দেখা যায় হিন্দু ধর্মে। তাই হিন্দুধর্মে সৃৃষ্টিকর্তা অত্যন্ত সত্য। এ ধারণাকে বেদান্তবাদ বলে। অর্থাৎ, এক দেবতার স্বীকারের পাশাপাশি অদ্বিতীয় বিশ্বাসী ধর্মব্যবস্থা।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, আত্মা শাশ্বত। অদ্বিতীয়বাদ অনুসারে, আত্মা সর্বশেষ কৃৃষ্ণে বিলীন হয়। অদ্বিতীয় দর্শন মতে, জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আত্মাপরমাত্মার অভিন্নতাকে অনুভব করা। যিনি এতে সক্ষম হন, তিনি মোক্ষ বা মহামুক্তি লাভ করেন।

অচিন্ত্যবাদ ও ভক্তিবাদের দর্শনে ব্রহ্মার উপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই মতবাদ অনুসারে সম্প্রদায়বিশেষে তাকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, পরমাত্মা রূপে পূজা করা হয়। উল্লেখ্য, আত্মা এখানে স্রষ্টার উপর নির্ভরশীল আর সৃৃষ্টিকর্তার প্রেম বা অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল মোক্ষ বা মহামুক্তি।

মূলত হিন্দু ধর্ম মতে সবকিছু সৃৃষ্টি করেছে ব্রহ্মা, আর শিব এই সবকিছু ধ্বংস করবেন।

বাহাই ধর্মে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

যদিও বাহাই ধর্ম পৃৃথিবীর সকল ধর্মকে সত্য বলে স্বীকৃৃতি দিয়েছে, তবুও বাহাই ধর্মের আপন বিশ্বাস মতে, সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন একক, ব্যক্তিগত অগম্য, সর্বজ্ঞ, সর্বব্যপী, অক্ষয়, এবং অবনেশ্বর স্বত্বা, যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। তাদের মতে, সৃষ্টিকর্তার কোনো শুরু বা শেষ নেই।

জরথুস্ত্রবাদে সৃৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

জরথুস্ত্রবাদে সৃৃষ্টিকর্তাকে "অহুরা মাজদা" (সর্বজ্ঞানস্বামী) বলা হয়। জরথুস্ত্রবাদীদের বিশ্বাস, আগুন হলো সৃৃষ্টিকর্তার পবিত্রতার প্রতীক। অহুরা মাজদাই এই বিশ্বজগৎ সৃৃষ্টি করেছে বলে জরথুস্ত্রবাদীদের বিশ্বাস। তাদের মতে, অহুরা মাজদা সর্বদাই অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধে লিপ্ত। মানুষের কাজ ভক্তি ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে মাজদাকে এ যুদ্ধে সহায়তা করা। ফলে পরকালে শান্তি লাভ করা যাবে।

প্রকৃতিবাদী ধর্মসমূহে সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

বৌদ্ধ ধর্ম

বৌদ্ধ ধর্ম একটি দর্শন এবং এটি কোনো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করে না। বৌদ্ধ ধর্ম দেবতাদের অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করে ঠিকই, কিন্তু তাদের কেউই স্রষ্টা নয়। বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে, বিশ্বজগত পরিচালিত হয় ৫ নিয়মে। এগুলো হলো, চিত্ত নিয়ম, রীত নিয়ম, বীর্য নিয়ম, ধর্ম নিয়ম ও কর্ম নিয়ম। এগুলো এক প্রকার জাগতিক নিয়মকানুন (Universal Rules)। আর এগুলোই বৌদ্ধ ধর্মে সৃষ্টিকর্তা।

জৈন ধর্ম

জৈন বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিত্ব প্রতিটি আত্মার বা প্রত্যেক জীবিত সত্বার অন্তর্নিহিত গুন। এই গুনের বৈশিষ্ট্য হলো শুদ্ধ জ্ঞান, অনন্ত আনন্দ এবং অন্যান্য গুণাবলির যথাযথ পূর্ণ বহি প্রকাশ।

জৈনধর্ম কোনো স্বাধীন, শক্তিশালী ও সর্বোচ্চ সত্বার (সৃষ্টিকর্তা) উপরে নির্ভরশীলতার শিক্ষা দেয় না। বিখ্যাত মনীষীরাই হলো আসল পথপ্রদর্শক ও জ্ঞানের ভান্ডার। তাদের জীবনের নৈতিক গুণাবলী সমুহ নিজাদের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে পারলেই সমাজ ও জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসবে। জৈনরা বিশ্বাস করে যে, জ্ঞান ও সকল কর্মের বন্ধন থেকে সর্বোচ্চ মুক্তি লাভ করার জন্য ব্যক্তিকে অবশ্যই নৈতিক আদর্শ পালন করতে হবে।

প্রকৃত অর্থে জৈন ধর্ম কোনো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের উপর বিশ্বাসকে সমর্থন করে না। জৈন মতবাদ অনুযায়ী, এই মহাবিশ্ব এবং এর উপাদানগুলির (আত্মা, পদার্থ, স্থান, সময়, গতি ইত্যাদি) সর্বদাই অস্তিত্ব ছিল।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সৃৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

সৃৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব একটি কল্পনা[সম্পাদনা]

বিজ্ঞান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করে না। বিজ্ঞানের মতে প্রকৃতির সবকিছু আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়েছে। আর সৃষ্টির শুরু হয়েছে "Big Bang" বা মহাবিষ্ফোরণ সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে। তবে বিজ্ঞান এখনো এই নিয়ে কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি। কারণ সৃষ্টিকর্তাকে দেখা যায় না। আর বিজ্ঞান অদৃশ্য বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ। যদিও মহাকাশ গবেষণায় (জ্যোতির্বিজ্ঞান) সকল অদৃশ্য বস্তুকে "Dark Particle " বা আধার কণা বলা হয়, তবে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের বিষয়টি এক্ষেত্রে গণ্য করা হয় না।

বিভিন্ন বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক উপমার সাহায্যে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছে। যেমন- ব্রিটিশ বিজ্ঞানী বার্ট্রান্ড রাসেল 'রাসেলের চায়ের কেতলি' নামক একটি বিখ্যাত তত্ত্বের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব কাল্পনিক বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে এসকল তত্ত্বের মাঝেও কিছু ত্রুটি রয়েছে।

প্রখ্যাত সাংবাদিক স্যাম হ্যারিসদানিয়াল ডেনেট দাবি করেছেন যে, ঈশ্বরবাদী ধর্মসমুহ ও তাদের ধর্মীয় পুস্তকসমুহ ঐশ্বরীয়ভাবে অনুপ্রাণিত না, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে সেগুলোকে মানুষই তৈরি করেছে। অর্থাৎ ঈশ্বর বা সৃৃষ্টিকর্তা নেই বলেই এই সব ধর্ম মানুষের সৃৃষ্টি। এর পরিপেক্ষিতে বিখ্যাত সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্স তার "গড ইজ নট গ্রেট" বইটি লিখেন। এরুপ সমালোচনার মাধ্যমে স্পষ্টতই সৃৃষ্টিকর্তার ধারণা কাল্পনিক বলে যুক্তি দেয়া হয়েছে।

বহির্জাগতিক প্রাণীর অস্তিত্বের সাথে তুলনা[সম্পাদনা]

কিছু বিজ্ঞানী ভিনগ্রহের প্রাণিদের অস্তিত্বের সাথে সৃৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের তুলনা করে থাকেন। বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন মিথোলজিতে সৃৃষ্টিকর্তা বা স্বর্গীয় দূতেরা স্বর্গীয় বাহনে করে পৃৃথিবীতে নেমে আসে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন- চৈনিক মিথোলজিতে, মহান সম্রাট চিন সি হুয়াংতি (Qin Shi Huangdi) নাকি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিলেন এক স্বর্গীয় ড্রাগন এর পিঠে চেপে। তথাকথিত ভিনগ্রহের প্রাণীরাওতো অশনাক্ত উড়ন্ত বস্তু তে (ইউএফও) পৃথিবী তে নেমে আসে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। তাদের (বিজ্ঞানী) মতে, প্রাচীনকালের মানুষ রা হয়্তো এই ইউএফওকেই স্বর্গীয় বাহন আর ভিনগ্রহের প্রাণীদের স্বর্গীয় দূত বা দেবতা ভেবে ভুল করে বসেছে। অর্থাৎ তাদের মতে তথাকথিত সৃৃষ্টিকর্তা বা দেবতারা আর কেউ না, তারা ভিনগ্রহের প্রাণী

১৯৭০ সালে দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী মাইকেল ভাসিন ও আলেকজান্ডার শারবাকোভ যুক্তি পেশ করেন যে চাঁদ "ফাঁপা"। যা বিজ্ঞানে "Hollow Moon Theory" বা "ফাঁপা চাঁদ তত্ত্ব" বলে। ভাসিন-শারবাকোভের মতে, চাঁদ হলো ফাঁপা এবং এর এর অভ্যন্তরে আছে একটি ভিনগ্রহের প্রাণীদের সামরিক ঘাঁটি। তারাই চাঁদ তৈরি করেছে পৃথিবীমানুষ এর কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখার জন্য।

এমনকি অনেক তত্ত্ব এমনও মত পোষণ করে, যে আমরা মানুষরাও নাকি ভিনগ্রহের প্রাণিদের দ্বারা তৈরি। অর্থাৎ ভিনগ্রহীরাই আমাদের সৃৃষ্টিকর্তা। ভিনগ্রহের প্রাণীরা পৃথিবীমঙ্গল গ্রহকে বেছে নিয়েছিল পরীক্ষামূলক প্রাণ সঞ্চারের জন্য। তাদের পরীক্ষায় জীব সৃৃষ্টি হলো এবং তা থেকে হলো মানুষ। মঙ্গল গ্রহের প্রাণ হয়তো কোনো কারণে বা ভিনগ্রহীদের ইচ্ছায় ধ্বংস হয়ে গেল। আর পৃৃথিবীরটা টিকে রইল।

আত্মা, সৃৃষ্টিকর্তা এবং বিজ্ঞান[সম্পাদনা]

আত্মার অস্তিত্ব ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা: আত্মা বলতে সাধারণ অর্থে এমন এক সত্ত্বাকে বোঝানো হয়, যারা অদৃশ্য এবং মানুষের শরীর ভিতরে বা স্বাধীনভাবে বসবাস করে। তবে এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ভিন্ন।

বিজ্ঞান আত্মা এর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস করে না। বিজ্ঞানের মতে এটা মানুষের কল্পনা বা অনুভূতি। যারা দাবি করেন যে তারা আত্মা প্রত্যক্ষ করেছেন বা তাদের সাথে কথা বলেছেন, বিজ্ঞানের মতে এটা তাদের অনুভূতি বা কল্পনামাত্র। দৈনন্দিন জীবনে আত্মা, ধর্ম, ঈশ্বর ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস বা শ্রবণ করা এরকম ঘটনা মানুষের মস্তিষ্কতে গেথে যায়। ফলে মানুষ এমন ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার দাবি করে। এমনটাই বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা।

নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স:

চিকিৎসা বিজ্ঞান এ, নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স (Near death experience) বা "মৃত্যু-পূর্ব অভিজ্ঞতা" (সংক্ষেপে "NDE) বলতে বোঝায় এমন পরিস্থিতিকে, যা আশু মৃত্যু বা অনেকগুলো সাম্ভাব্য অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। এমন সময়ে মানুষের শরীরের সকল জৈবিক কার্যক্রম যেমন- হৃৃদ স্পন্দন, নাড়ির গতি, মস্তিষ্ক ইত্যাদির কার্যক্রমের হার শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এ রকম পরিস্থিতিতে মানুষের যে অভিজ্ঞতা হয়, তাই নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স। যারা এ ধরনের অভিজ্ঞতা ভোগ করে তাদের বলে নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্সড (Near death experienced)।

প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮-৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় বলে দাবি করেন।

বিজ্ঞান এর দৃৃষ্টিতে এই ধরনের পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক মৃৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য হলো এই যে, মৃৃত্যুর পর মানুষ মারা যায়, আর নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্সের পর মানুষ মারা যায় না। মানুষ সুস্থ্য হয়ে উঠে। বিজ্ঞান এধরনের অভিজ্ঞতা ও স্বাভাবিক মৃৃত্যুকে প্রায় সমার্থক বলে মনে করে। কারণ বিজ্ঞানের নজরে মৃৃত্যু হলো দেহের সকল জৈবিক কার্যক্রম স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স হলো দেহের সকল জৈবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠিকই, তবে স্থায়ী ভাবে না। সাধারণত এই ধরনের অভিজ্ঞতার পরে বেশিরভাগ মানুষ বেঁচে উঠে। স্নায়ুবিজ্ঞানের মতে, মস্তিষ্কের টেম্পেরাল লোব এর অদ্ভুত আচরণ এবং মস্তিষ্কের ডেমেজের কারণে এমনটি ঘটে।

NDE এর বৈশিষ্ট্য:-

  • মৃত্যুর অনুভূতি বা সচেতনতা।
  • পরম শান্তিভাব, যন্ত্রণামুক্তির অনুভব, পজিটিভ অনুভূতি, দেহ বিমুক্ত অভিজ্ঞতা।
  • অনেক নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্সডরাই দাবি করেন, এমন পরিস্থিতিতে নাকি তারা দৈব শক্তির বশীভূত হয়ে ছিলো। যেমন- অদৃশ্য কণ্ঠের কারো সাথে কথা বলা, আত্মাদের সাথে দেখা হওয়া-কথা বলা, স্বর্গ বা দোজখ দেখা, মৃৃত আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলা, অদৃশ্য কণ্ঠে কারও কাছ থেকে ভবিষ্যত্বাণী শোনা এবং ভবিষ্যত্বাণী একই দিনে, একই সময়, একই ভাবে সত্যি হওয়া ইত্যাদি।

এধরনের ঘটনা ক্ষেত্রেবিজ্ঞান আত্মার ব্যাখ্যাটি দিয়ে থাকে। অর্থাৎ, এটি মানুষের কল্পনা বা স্বপ্ন। জীবনে আত্মা, পরলোক, দোজখ-বেহেশত ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি অত্যধিক বিশ্বাস ও মস্তিষ্কের জন্য এমনটা হয়ে থাকে বলে বিজ্ঞানের অভিমত। বিজ্ঞানের মতে, নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্সের সময় মস্তিষ্ক মনে করে সত্যিই হয়তো আমরা মারা যাচ্ছি। তাই তখন মৃৃত্যুর পরবর্তী জীবনের কথা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন ধর্মে বলা হয়েছে মরার পর মানুষ স্বর্গে যাবে। তখন মস্তিষ্ক স্বর্গের একটি কল্পিত চিত্র আমাদের চোখ এর সামনে তুলে ধরে, আর আমরা ভাবি যে আমরা স্বর্গ দেকছি। এ বিষয়ে বিজ্ঞানের এই অভিমত। তবে ভবিষ্যত্বাণী করা আর তা সত্যি হওয়া, বিজ্ঞানের এক্ষেত্রে কোনো ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ।

ধর্মীয় দৃৃষ্টিকোণ থেকে, মৃৃত্যু বলতে দেহ থেকে আত্মা বেরিয়ে যাওয়াকে নির্দেশ করে। আর নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স নিয়েও ধর্মের ব্যাখ্যা একই। সৃৃষ্টিকর্তার নির্দেশে কোনো ভাবে আত্মা দেহ থেকে বের হয়ে স্বর্গ নরক ইত্যাদি পরিদর্শন করে। অন্যান্য আত্মাদের সাথে কথা বলে। মৃৃত আত্মীয়দের আত্মার সঙ্গে দেখা করে। আবার সৃৃষ্টিকর্তার নির্দেশে আত্মা দেহে ফিরে আসে। তখন মানুষ ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠে।

আর ভবিষ্যত্বাণীর বিষয়টি ধর্মের দৃৃষ্টিতে একটা সংকেত। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানিয়ে দেয়ার সংকেত।

অধিকাংশ ধর্মেই নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স সম্পর্কে এই ধারণা প্রচলিত। এমনকি যেসকল ধর্ম সৃৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব মানে না সে সকল ধর্মেও এই তত্ত্ব প্রচলিত। শুধুমাত্র সৃৃষ্টিকর্তার বিষয়টি অনুপস্থিত।

বিভিন্ন সূত্রমতে এ ঘটনার পর বহু নাস্তিক ব্যক্তিরাও এই ধরনের ঘটনার ধর্মের দিকে ফিরে এসেছে।

নাস্তিক্যবাদ[সম্পাদনা]

নাস্তিক্যবাদ বলতে বোঝায় ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে স্বীকার না করা এবং সম্পূর্ণ ভৌত বা প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেওয়া। নাস্তিকতা কোনো দর্শন বা বিশ্বাস না। বরঞ্চ বিশ্বাসের (ধর্ম) অনুপস্থিতিই হলো নাস্তিকতা

নাস্তিকতা ও বিজ্ঞান প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। নাস্তিকেরা বিভিন্ন ঘটনা ও তাদের অভিমতের ব্যাখ্যা দিতে বৈজ্ঞানিক উপমাসমূহ ব্যবহার করে থাকে। নাস্তিকেরা কোনো বিশেষ দার্শনিক মতবাদ পালন করে না। বৈজ্ঞানিক মতবাদই মূলত নাস্তিক্যের দর্শন

নাস্তিকতার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন গ্রিস এর বিজ্ঞানীদার্শনিকেরাই সর্বপ্রথম নাস্তিকতার পক্ষে তাদের রায় প্রকাশ করেন। তৎকালীনগ্রিস এর বহু ঈশ্বর মতবাদটি ছিল বিজ্ঞান পরিপন্থী। আর এখান থেকেই নাস্তিক্য মতবাদের শুরু। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েই নাস্তিক্যবাদের সূচনা হয়েছিল।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]