নব্য মিশরীয় সাম্রাজ্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
নব্য মিশরীয় সাম্রাজ্যের নতুন রাজত্ব

Nনতুন রাজত্বের অবস্থান
রাজধানী
সরকারDivine রাজতন্ত্র

নব্য মিশরীয় সাম্রাজ্য, যাকে মিশরের ইতিহাসে 'নূতন রাজত্ব' (নিউ কিংডম) রূপেও বর্ণনা করা হয়ে থাকে, খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী প্রাচীন মিশরের রাজবংশের কাহিনী, যা মিশরের অষ্টাদশ, ঊনবিংশ এবং বিংশতম রাজবংশকে সূচীত করে। রেডিওকার্বন ডেটিং থকে মনে করা হয় যে এই সাম্রাজ্যের সূচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব ১৫৭০ এবং ১৫৪৪ এর মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে।[১] নতুন রাজত্বের পরবর্তীতে দ্বিতীয় মধ্যবর্তী রাজত্ব এবং তারও পরে তৃতীয় মধ্যবর্তী রাজত্ব মিশর শাসন করেছিল। নূতন রাজত্বের সময়কাল ছিল প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময় এবং প্রাচীন মিশরের গৌরব, সমৃদ্ধি এবং শক্তির শীর্ষকে চিহ্নিত করে।[২]

১৮৪৫ সালে জার্মান মিশরবিদ ব্যারন ভন বুনসেন প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের তিনটি "স্বর্ণযুগের" ধারণা দেন এবং এই সময়কালকে তিনটি স্বর্ণযুগের অন্যতম বলে অভিহিত করেন। এই স্বর্ণযুগের ধারণাটি অবশ্য ঊনিবংশ এবং বিংশ শতকের বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্বিকের হাত ধরে পরিবর্তিত হয়েছে।[৩] নূতন সাম্রাজ্যের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাত ঊনবিংশ এবং বিংশতম রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ১২৯২-১০৬৯) এর আমলটি 'রামেসাইড কাল' হিসাবেও পরিচিত। উনিশতম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম রামেসিসের সম্মানার্থে এগারো জন ফারাও রামেসিস নামটি গ্রহণ করেন এবং তাদের নামেই এই সময়টিকে রামেসাইড কাল বলে চিহ্নিত করা হয়।[২]

সম্ভবত দ্বিতীয় মধ্যবর্তী সময়কালে বিদেশী শাসক হিকসোসদের শাসনকালের ফলস্বরূপ, নূতন সাম্রাজ্যের মিশর লেভান্ট এবং মিশরের মধ্যে যথাযথভাবে বাফার তৈরির প্রচেষ্টা দেখেছে এবং এই সময়েই মিশর তার সর্বোচ্চ সীমানা অর্জন করেছিল। একইভাবে, শক্তিশালী কুশীয় সাম্রাজ্যের দ্বারা দ্বিতীয় মধ্যবর্তী সময়কালে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতাব্দীর সফল আক্রমণগুলির প্রতিক্রিয়া হিসাবে, নূতন সাম্রাজ্যের শাসকরা নূবিয়ায় আরও দক্ষিণে মিশরের সীমানা প্রসারিত করতে এবং নিকট প্রাচ্যে বিস্তৃত অঞ্চল দখল করতে বাধ্য বোধ করেছিলেন। উত্তরে, মিশরীয় সেনাবাহিনী হিট্টাইট সেনাবাহিনীর সাথে আধুনিক-সিরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করেছিল।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

নতুন সাম্রাজ্যের উত্থান[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ রাজত্বের মিশরের কিছু বিখ্যাত রাজা ছিলেন প্রথম আহমোস , রাণী হাতশেপসুত, তৃতীয় থুতমোজ, তৃতীয় আমেনহোটেপ, আখেনাতেন এবং তুতানখামেনহাটশেপসুট পুন্ট দেশে বাণিজ্যিক অভিযান প্রেরণ সহ মিশরের বাহ্যিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে মনোনিবেশ করেছিলেন এবং রাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।

প্রথম আহমোসকে আঠারোতম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে দেখা হয়। তিনি তার পিতা সেকেনেনারে তাও এবং কামোসের সহায়তায় হিকসসদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিলেন এবং তিনি সমগ্র মিশরকে আরও একবার একীভূত করেন। শুধু তাই নয়, এরপরে আহমোস মিশরে ভবিষ্যতের কোনও আক্রমণ রোধ করতে হিকসসদের আবাসভূমি লেভ্যান্টে সক্রিয়ভাবে দৌত্য ও প্রচারণা চালিয়ে গিয়েছিলেন।[৪]

আহমোসের পরে, প্রথম আমেনহোটেপ সিংহাসনে বসেন, যিনি নুবিয়ায় অভিযান চালিয়েছিলেন এবং মিশরের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তার পরে প্রথম থুতমোজ মিশর শাসন করেন। প্রথম থুত্মোজ লেভ্যান্টে অভিযান চালিয়ে ইউফ্রেটিস সীমানা পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম। ত্নিই প্রথম ফ্যারাও, যিনি নদী পারাপার করেও অভিযান চালান।[৫] এই অভিযানের সময় সিরিয়ার রাজারা থুতমোজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। তবে, তিনি ফিরে আসার পরে, তারা শ্রদ্ধা নিবেদন বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ভবিষ্যতের আক্রমণগুলির বিরুদ্ধে শক্তিশালীকরণ শুরু করে দিয়েছিল।[৬]

আহমোসের পরে আমেনহোটেপ প্রথম, যিনি নুবিয়ায় প্রচার চালিয়েছিলেন এবং তার পরে থুতমোজ ছিলেন। থুতমোজ আমি লেভান্টে প্রচারণা চালিয়ে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত পৌঁছেছি। এভাবে নদী পারাপারের প্রথম ফারাও হয়ে উঠেছে। এই অভিযানের সময় সিরিয়ার রাজকুমাররা থুতমোসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। তবে, তিনি ফিরে আসার পরে, তারা শ্রদ্ধা নিবেদন বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ভবিষ্যতের আক্রমণগুলির বিরুদ্ধে শক্তিশালীকরণ শুরু করে।

হাতশেপসুত ছিলেন এই বংশের অন্যতম শক্তিশালী ফ্যারাও। তিনি প্রথম থুতমোজের মেয়ে এবং দ্বিতীয় থুতমোজের মহারাণী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পরে তিনি তাঁর সতীন পুত্র তৃতীয় থুতমোজের সাথে যৌথভাবে রাজত্ব করেছিলেন। তৃতীয় থুতমোজ যখন যৌথভাবে সিংহাসনের অধিকারী হন, তার বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। যাই হোক রাণী হাতশেপসুত শেষ পর্যন্ত ফ্যারাও রূপেই তাঁর নিজের অধিকারে মিশর শাসন করেছিলেন। হাতশেপসুত লাক্সারের কর্ণক মন্দির এবং পুরো মিশরে ব্যাপকভাবে মন্দির নির্মাণ করেন[৭] এবং তিনি দ্বিতীয় মধ্যবর্তী সময়কালে মিশরের হিকসসদের দখলের সময় ব্যাহত হওয়া বাণিজ্য চুক্তিগুলি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এর ফলে অষ্টাদশ রাজবংশের সম্পদ তৈরি হয়েছিল। তিনি পুন্ট রাজ্যে অভিযানের জন্যে প্রস্তুতি এবং তহবিলের তদারকি করেছিলেন। তার মৃত্যুর পরে, তৃতীয় থুতমোজ শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন।

তৃতীয় থুতমোজ ( যাকে"মিশরের নেপোলিয়ন" বলে অভিহিত করা হয়) মিশরের সেনাবাহিনীকে প্রসারিত করেছিলেন এবং তার পূর্বসূরীদের দ্বারা তৈরি সাম্রাজ্যকে সুসংহত করতে দুর্দান্ত ভূমিকা নিয়েছিলেন। এর ফলশ্রুতিতে তৃতীয় আমেনহোটেপের রাজত্বকালে মিশরের শক্তি ও সম্পদ শীর্ষে উঠে আসে।

তৃতীয় থুতমোজের আমলেই ফ্যারাও শব্দটি (১৪৭৯-১৪২৫ খ্রিস্টপূর্ব) রাজার সমার্থক হয়ে ওঠে; তার আগে মূলত রাজার বাসস্থান বা রাজবাড়ী বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হত।[৮]

ঐতিহাসিকরা ব্যাপকভাবে তৃতীয় থুতমোজকে একজন বিরল সামরিক প্রতিভা হিসাবে বিবেচনা করেন কারণ তিনি ২০ বছরে কমপক্ষে ১৬টি অভিযান চালিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সম্প্রসারণবাদী শাসক, যাকে কখনও কখনও মিশরের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়ী বা "মিশরের নেপোলিয়ন" বলা হয়। তিনি তাঁর শাসনামলে ৩৫০ টি শহর দখল করেছিলেন বলে জানা যায় এবং ষোলোটি পরিচিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তিনি ইউফ্রেটিস থেকে নুবিয়া পর্যন্ত নিকট প্রাচ্যের বেশিরভাগ অঞ্চল জয় করেছিলেন। প্রথম থুতমোসের পরে তিনিই ছিলেন দ্বিতীয় ফ্যারাও যিনি মিতান্নির বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ইউফ্রেটিস পার হয়েঅভিযান চালান। তিনি তখনো অপরাজেয় শহর আলেপ্পো এবং কার্কেমিশের অঞ্চল দিয়ে উত্তর দিকে যান এবং দ্রুত তাঁর নৌকায় নদী পেরিয়ে মিতান্নীয় রাজাকে অবাক করে দিয়ে আক্রমণ করেন।

এই রাজবংশের সমস্ত রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ছিলেন তৃতীয় আমেনহোটেপ, যিনি কর্ণাকের লাক্সার মন্দির, মন্থুর প্রান্ত এবং তার বিশাল মুর্তি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তৃতীয় আমেনহোটেপ মিশরের বৃহত্তম নির্মিত মালকাতা প্রাসাদও নির্মাণ করেছিলেন।

আঠারোতম রাজবংশের অন্যতম বিখ্যাত ফ্যারাও ছিলেন চতুর্থ আমেনহোটেপ , যিনি মিশরীয় দেবতা রা এর প্রতিনিধিত্বকারী আতেনের সম্মানে নিজের নাম পরিবর্তন করে আখেনাতেন রাখেন। আতেনকে তাঁর ইষ্টদেবতা হিসাবে উপাসনা করার বিষয়টি প্রায়শই ইতিহাসের একেশ্বরবাদের প্রথম উদাহরণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আখেনাতেনের স্ত্রী নেফারতিতি মিশরীয় ধর্মে তাঁর নতুন দিকনির্দেশনে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। নেফারতিতি আতেনের কাছে আচার অনুষ্ঠান করতে যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। আখেনাতেনের ধর্মীয় উত্সাহের কারণ হিসাবে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী পরবর্তীকালে মিশরীয় ইতিহাসে উপযুক্ত গুরুত্ব পাননি বলে মনে করা হয়। [৯] তাঁর শাসনামলে, খ্রিস্টপূর্ব চৌদ্দ শতকে মিশরীয় শিল্প একটি নতুন নতুন স্টাইলে সমৃদ্ধ হয়েছিল। ( আমারনা আমল দেখুন)

আঠারোতম রাজবংশের শেষের দিকে, মিশরের অবস্থান আমূল পরিবর্তন হয়েছিল। আখেনাতেনের আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিতে সুস্পষ্ট আগ্রহের অভাবের কারণে হিট্টাইটরা ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব ফেনিসিয়া এবং কনানে অব্ধি বিস্তার করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল - এমন এক শক্তি যাদের কারণে প্রথম সেতি ও তাঁর পুত্র দ্বিতীয় রামিসেস উনিশতম রাজত্বকালে বারবার হিট্টিদের আক্রমণের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।

অষ্টাদশ Dynasty- শেষ দুই সদস্য Ay, এবং Horemheb রাজদরবারের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদার থেকে শাসকদের -became যদিও Ay, এছাড়াও আখেনাতেন এর মামা এবং একজন 'ফেলো বংশধর হয়েছে হতে পারে Yuya এবং Tjuyu ।

আঠারোতম রাজবংশের শেষ দুই সদস্য — আই এবং হোরেমেহব - রাজদরবারের আধিকারিকদের পদ থেকে শাসক হয়েছিলেন। আই আখনাতেনের মামাতো ভাই ছিলেন এবং ইউয়া ও তজুয়ের বংশধরও ছিলেন বলে মনে করা হয়।

ক্ষমতা অর্জনের জন্য আয়ে তুতানখামেনের ছোট বোন, আঁখেসেনামুনকে বিয়ে করেছিলেন; যদিও তিনি পরে আর বাঁচেনি। এরপরে আয় নেফারতিতির ধাত্রী তেয় কে বিবাহ করেন।

আইয়ের শাসনকাল অল্পদিনের ছিল, তার পরে সিংহাসনে বসেন হোরেমহেব। তুতানখামেনের রাজত্বকালে হোরেমহেব ছিলেন একজন সেনাধিপতি। যদি ফ্যারাও নিঃসন্তান রূপে মারা যান, তাহলে সিংহাসনে বসার জন্যে হোরেমহেবকে প্রস্তুত করা হয়েছিল [১০]। হোরেমহেব সম্ভবত একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আয়ের থেকে ক্ষমতা দখল করেন।

নিউ কিংডমের উচ্চতা[সম্পাদনা]

উনিশতম রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভিজিয়ার প্রথম রামেসিস, যাকে আঠারোতম রাজবংশের শেষ শাসক, ফ্যারাও হোরেমেহেব তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। হোরেহমেবের সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে পরবর্তীকালের ঊনবিংশ রাজবংশের শক্তিশালী ফ্যারাওদের রাজত্বের মধ্যে একটি রূপান্তরকাল চিহ্নিত করেছিল। তাঁর পুত্র ও পৌত্র প্রথম সেটি এবং দ্বিতীয় রামেসিস মিশরকে শক্তির নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।

প্রথম সেটি তাঁর রাজত্বের প্রথম দশকে পশ্চিম এশিয়া, লিবিয়া এবং নুবিয়ায় একাধিক যুদ্ধজয় করেছিলেন। সেটির সামরিক ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে জানার প্রধান উত্স হ'ল কার্ণাকের হাইপোস্টাইল হলের বাহিরের প্রাচীরের তার যুদ্ধের দৃশ্য এবং ক্যানান এবং নুবিয়ার যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া বেশ কয়েকটি রাজকীয় শিলালিপি। প্রথম সেটির বৈদেশিক নীতির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিটাইট সাম্রাজ্য থেকে সিরিয়ার শহর কাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী আমুরুর শহর দখল করা। আখেনতানের সময় থেকে কাদেশকে মিশর কখনও ধরে রাখতে পারেনি। তুতানখামুন এবং হোরেমহেব হিট্টীয়দের কাছ থেকে শহরটি পুনর্দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে, সেটির মৃত্যুর পরে হিট্টিরা এটি আবার দখল করতে সক্ষম হয়েছিল।

কাদেশের যুদ্ধের সময়ে মিশরীয় ও হিট্টি সাম্রাজ্য

দ্বিতীয় রামেসিস ("দ্য গ্রেট রামেসিস") লেভ্যান্টে যে অঞ্চলগুলি অষ্টাদশ রাজবংশের অধীনে ছিল তা পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর পুনরুদ্ধারের অভিযানগুলি শেষ হয় কাদেশের যুদ্ধে, যেখানে তিনি হিট্টির রাজা দ্বিতীয় মুওয়াতাল্লির বিরুদ্ধে মিশরীয় সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইতিহাসের প্রথম রেকর্ডকৃত সামরিক আক্রমণে রামেসিস হিট্টিদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন, যদিও মিশরের রিজার্ভ সেনাবাহিনী নেআরিনের আগমনের মাধ্যমে হিট্টিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জোয়ার ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন । উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশে নিজেদের বিজয় ঘোষণা করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তির ফলে যুদ্ধের ফলাফল নির্বিঘ্ন হয়েছিল। মিশর অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রামেসিসের শাসনামলে সম্পদ এবং স্থিতিশীলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাঁর তৎকালীন উত্তরসূরিরা সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন, যদিও ক্রমবর্ধমান অন্তর্বর্তী সমস্যা এবং এক পর্যায়ে আমেনমেসের মত ফ্যারাওয়ের সিংহাসনে আরোহণের ফলে মিশরের পক্ষে এই অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।

দ্বিতীয় রামেসিস পুরো মিশর এবং নুবিয়া জুড়ে ব্যাপকভাবে নির্মাণকার্য চালিয়েছিলেন এবং এমনকি যে স্থাপনাগুলি তিনি নির্মাণ করেননি সেখানেও তার কাহিনী বিশিষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়েছে।[১১] পাথর, মূর্তি, প্রাসাদ এবং অসংখ্য মন্দিরের গাত্রে তাঁর সম্মানের বিবরণ খোদিত রয়েছে — বিশেষত পশ্চিম থিবসের রামসিয়াম এবং আবু সিম্বেলের শিলা মন্দির। তিনি নীলনদের বদ্বীপ থেকে নুবিয়া পর্যন্ত অংশটি এমনভাবে মন্দির দিয়ে ভরিয়ে রেখেছিলেন যা তাঁর আগে কোনও ফ্যারাও করেননি।[১২] তিনি তাঁর রাজত্বকালে বদ্বীপ অঞ্চলে একটি নতুন রাজধানী শহরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এটি পাই-রেমেসিস নামে পরিচিত। এটি পূর্বে প্রথম সেটির রাজত্বকালে গ্রীষ্মকালীন আবাস রূপে ব্যবহৃত হত। [১৩]

দ্বিতীয় রামেসিস আবু সিম্বেলের প্রত্নতাত্ত্বিক কমপ্লেক্স, এবং র‌্যামেসিয়াম নামে পরিচিত মর্ত্য মন্দির সহ অনেকগুলি বৃহত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর উত্তরাধিকার সময়ের বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকবে তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিলেন। বিদেশিদের উপর তাঁর বিজয়ের প্রচারের মাধ্যম হিসাবে তিনি ভাস্কর্য ও শিল্পকে ব্যবহার করেছিলেন, যা অসংখ্য মন্দিরের নির্মাণে চিত্রিত হয়েছে। দ্বিতীয় রামেসিস অন্যন্য ফ্যারাওদের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে নিজের মূর্তিও নির্মাণ করেছিলেন।

দ্বিতীয় রামেসিস তাঁর বিভিন্ন স্ত্রী এবং উপপত্নীর দ্বারা বিপুল সংখ্যক সন্তানের পিতা হয়েছিলেন; রাজাদের উপত্যকায় তিনি তাঁর পুত্রদের জন্য (যার মধ্যে অনেকেই রামেসিসের জীবনকালেই মারা যান) সমাধি তৈরি করেছিলেন তা মিশরের বৃহত্তম সমাধিস্থল বলে মনে করা হয়।।

যদিও দ্বিতীয় রামেসেসের তাত্ক্ষণিক উত্তরসূরিরা সামরিক অভিযান চালিয়ে যান কিন্তু ক্রমবর্ধমান অন্তর্বর্তী ঝামেলা চলতেই থাকে। তার পরে সিংহাসনে বসেন, তার পুত্র মের্নেপতাহ এবং তারপরে দ্বিতীয় মেরেনপ্তার পুত্র দ্বিতীয় সেটি। দ্বিতীয় সেটির সিংহাসনের অধিকারটি নিয়ে তাঁর সৎ ভাই আমেন্মেসির সাথে মনোমালিন্য হয়েছিল, যিনি সম্ভবত থিবস থেকে সাময়িকভাবে শাসন করেছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পরে, দ্বিতীয় সেটির পুত্র সিপতাহ, যিনি সম্ভবত তাঁর জীবনকালে পলিওমিলাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন, সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিপতাহ খুব তাড়াতাড়ি মারা গেলেন এবং সিংহাসন গ্রহণ করেছিলেন টোভ্রেসেট, যিনি তাঁর পিতার পাটরাণী ছিলেন; সম্ভবত তাঁর চাচা আমেন্মেসির বোন ছিলেন টভ্রেসেট।

টোভ্রেসেটের সংক্ষিপ্ত রাজত্বের শেষে অরাজকতার একটি সময় দেখা গেল এবং শেত্তনাখতে সিংহাসনে আরোহণ করে বিংশতম রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ক্ষমতার চূড়ান্ত বছর[সম্পাদনা]

নতুন রাজত্ব থেকে শেষ "মহান" ফ্যারাওরূপে ব্যাপকভাবে তৃতীয় রামেসিসকে বিবেচনা করা হয়, তিনি দ্বিতীয় রামেসিসের বেশ কয়েক দশক পরে রাজত্ব করেছিলেন।[১৪]

তাঁর রাজত্বের অষ্টম বছরে, সমুদ্রের মানুষরা মিশর আক্রমণ করেছিল স্থল ও সমুদ্র দিয়ে। তৃতীয় রামেসিস তাদের দুটি দুর্দান্ত স্থল ও সমুদ্র যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। তিনি তাদেরকে মিশরের প্রজা মানুষ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং মনে করা হয় যে তিনি তাদেরকে দক্ষিণ কানান শহরে বসবাস করতে বাধ্য করেছিলেন। কনানে তাদের উপস্থিতি মিশরীয় সাম্রাজ্যের পতনের পরে এই অঞ্চলে ফিলিস্তিয়ার মতো নতুন রাজ্য গঠনে অবদান রেখেছিল। পরে তিনি যথাক্রমে তাঁর ষষ্ঠ বছরে এবং একাদশ বছরে মিশরের পশ্চিম ডেল্টায় দুটি বড় অভিযানে লিবিয়ার উপজাতিদের আক্রমণ করতে বাধ্য হন।[১৫]

এই যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার আস্তে আস্তে মিশরের ভান্ডারকে ধসিয়ে দিয়েছিল এবং এশিয়ায় মিশরীয় সাম্রাজ্যের ক্রমহ্রাসমানতার পিছনে অবদান রেখেছিল। তৃতীয় রামেসেসের রাজত্বের উনিশ বছরের সময় রেকর্ডকৃত ইতিহাসে প্রথম জানা শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল। সেই সময়, মিশরের পছন্দের এবং অভিজাত রাজকীয় সমাধি নির্মাতারা এবং কারিগরদের জন্য দির এল মদিনা গ্রামের খাবারের খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়নি।[১৬] বায়ু দূষণ বায়ুমণ্ডলে অনুপ্রবেশকারী সূর্যের আলোকে সীমিত করে দেয়, কৃষিক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে এবং প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বব্যাপী গাছের বৃদ্ধিকে ব্যহত করে খ্রিস্টপূর্ব ১১৪০ অব্দ পর্যন্ত।[১৭] এর প্রস্তাবিত কারণ হ'ল আইসল্যান্ডের হেকলা আগ্নেয়গিরির হেকলা 3 বিস্ফোরণ, তবে এর ডেটিংটি বিতর্কিত রয়ে গেছে।

তৃতীয় মধ্যবর্তী সময়কালে সাম্রাজ্যের হ্রাস[সম্পাদনা]

তৃতীয় রামেসিসের মৃত্যুর পরে তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বছরের পর বছর ঝগড়া-বিবাদ ঘটে। তাঁর তিন পুত্র পরপর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন - চতুর্থ রামেসিস , ষষ্ঠ রামেসিস এবং অষ্টম রামেসিস । কিন্তু সেই সময়ে মিশর ক্রমাগত খরা, নীল নদের বন্যার অভাব, দুর্ভিক্ষ, নাগরিক অস্থিরতা এবং কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ফলে ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। রাজবংশের শেষ ফারাও, একাদশ রামেসিসের শক্তি এতটাই কম হয়ে পড়েছিল যে দক্ষিণে আম্বানের উচ্চ যাজকরা থিবসে উচ্চ মিশরের ডি-ফ্যাক্টো শাসক হয়ে উঠেছিলেন এবং রামেসেস একাদশের মৃত্যুর আগেই স্মেনডেস নিম্ন মিশরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তমিসে একুশতম রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্মেনডেস।

নূতন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ছবি[সম্পাদনা]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Christopher Bronk Ramsey et al., Radiocarbon-Based Chronology for Dynastic Egypt, Science 18 June 2010: Vol. 328, no. 5985, pp. 1554–1557.
  2. The Oxford History of Ancient Egypt। Oxford University Press। ২০০০। পৃষ্ঠা 481আইএসবিএন 978-0-19-815034-3 
  3. Schneider, Thomas (২৭ আগস্ট ২০০৮)। "Periodizing Egyptian History: Manetho, Convention, and Beyond"। Historiographie in der Antike। Walter de Gruyter। পৃষ্ঠা 181–197। আইএসবিএন 978-3-11-020672-2 
  4. Weinstein, James M. The Egyptian Empire in Palestine, A Reassessment, p. 7. Bulletin of the American Schools of Oriental Research, n° 241. Winter 1981.
  5. Shaw and Nicholson (1995) p.289
  6. Steindorff p.36
  7. JJ Shirley: The Power of the Elite: The Officials of Hatshepsut's Regency and Coregency, in: J. Galán, B.M. Bryan, P.F. Dorman (eds.): Creativity and Innovation in the Reign of Hatshepsut, Studies in Ancient Oriental Civilization 69, Chicago 2014, আইএসবিএন ৯৭৮-১-৬১৪৯১-০২৪-৪, p. 206.
  8. Redmount, Carol A. "Bitter Lives: Israel in and out of Egypt." p. 89–90. The Oxford History of the Biblical World. Michael D. Coogan, ed. Oxford University Press. 1998.
  9. Tyldesley, Joyce (২০০৫-০৪-২৮)। Nefertiti: Egypt's Sun Queen (ইংরেজি ভাষায়)। Penguin UK। আইএসবিএন 9780141949796 
  10. Gardiner, Alan (১৯৫৩)। "The Coronation of King Haremhab": 13–31। 
  11. Amelia Ann Blandford Edwards। "Chapter XV: Rameses the Great"। ১৩ মে ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ এপ্রিল ২০০৮ 
  12. Wolfhart Westendorf, Das alte Ägypten, 1969
  13. Kitchen (1982), p. 119.
  14. Eric H. Cline and David O'Connor, eds. Ramesses III: The Life and Times of Egypt's Last Hero (University of Michigan Press; 2012)
  15. Nicolas Grimal, A History of Ancient Egypt, Blackwell Books, 1992. p.271
  16. William F. Edgerton, "The Strikes in Ramses III's Twenty-Ninth Year", JNES 10, no. 3 (July 1951), pp. 137–145.
  17. Frank J. Yurco, "End of the Late Bronze Age and Other Crisis Periods: A Volcanic Cause," in Gold of Praise: Studies on Ancient Egypt in Honor of Edward F. Wente, ed: Emily Teeter & John Larson, (SAOC 58) 1999, pp. 456-458.