অধিবিদ্যা
অধিবিদ্যা (ইংরেজি: Metaphysics) হলো দর্শনশাস্ত্রের একটি শাখা, যা বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো নিয়ে অনুসন্ধান করে। প্রথাগতভাবে একে জগতের মন-নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যসমূহের অধ্যয়ন হিসেবে দেখা হয়, যদিও কিছু তাত্ত্বিক একে মানুষের বোধগম্যতার ধারণাগত কাঠামোর অনুসন্ধান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অ্যারিস্টটলসহ কিছু দার্শনিক অধিবিদ্যাকে প্রথম দর্শন নামে অভিহিত করেছেন, এই মর্মে যে এটি অন্যান্য দার্শনিক অনুসন্ধানের তুলনায় অধিকতর মৌলিক।[১][২]

অধিবিদ্যা বহুবিধ সাধারণ ও বিমূর্ত বিষয়ের উপর আলোকপাত করে। এটি অস্তিত্বের প্রকৃতি, সকল সত্তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং সেগুলোর বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভাজন নিয়ে অনুসন্ধান করে। একটি প্রভাবশালী বিভাজন হলো বিশেষ ও সামান্যের মধ্যে। বিশেষ (particular) হলো স্বতন্ত্র ও অনন্য সত্তা, যেমন একটি নির্দিষ্ট আপেল। সামান্য (universal) হলো ভিন্ন ভিন্ন বিশেষের মধ্যে থাকা সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যেমন লাল রঙ। মৌলবিদ্যাগত অধিবিদ্যা (modal metaphysics) পরীক্ষা করে দেখে কোনো কিছুর সম্ভাব্য বা অনিবার্য হওয়ার অর্থ কী। অধিবিদ্যাবিদগণ স্থান, কাল ও পরিবর্তনের ধারণা এবং কার্যকারণ ও প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও পরীক্ষা করেন। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে মন ও বস্তুর সম্পর্ক, জগতে সবকিছু পূর্বনির্ধারিত কি না এবং স্বাধীন ইচ্ছা আছে কি না।[৩]
অধিবিদ্যাবিদগণ তাদের অনুসন্ধানে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তারা সাধারণত যুক্তিসংগত স্বজ্ঞা ও বিমূর্ত যুক্তিতর্কের উপর নির্ভর করেন, তবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতিও ব্যবহার করেন। বিষয়ের বিমূর্ত প্রকৃতির কারণে অধিবিদ্যা তার পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা ও তত্ত্বের অর্থবহতা প্রশ্নবিদ্ধ করে সমালোচিত হয়ে এসেছে। অধিবিদ্যা অনেক জ্ঞানক্ষেত্রের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক, কারণ সেগুলো প্রায়শই অন্তর্নিহিতভাবে অধিবিদ্যাগত ধারণা ও অনুমানের উপর নির্ভর করে।[৪]
অধিবিদ্যার মূল উৎস প্রাচীন যুগে, যেখানে মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও উৎস নিয়ে জল্পনা-কল্পনা দেখা যায়, যেমন প্রাচীন ভারতে উপনিষদ, প্রাচীন চীনে তাওবাদ এবং প্রাচীন গ্রিসে প্রাক-সক্রেটিসীয় দর্শন। পরবর্তী মধ্যযুগে পশ্চিমা বিশ্বে সামান্যের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়। আধুনিক যুগে অধিবিদ্যার বিভিন্ন ব্যাপক পদ্ধতিগত রূপ আবির্ভূত হয়, যার অনেকগুলোই ভাববাদকে গ্রহণ করে। বিংশ শতাব্দীতে প্রথাগত অধিবিদ্যা এবং বিশেষত ভাববাদ নানা সমালোচনার মুখে পড়ে, যা অধিবিদ্যাগত অনুসন্ধানের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।[৫]
সংজ্ঞা
[সম্পাদনা]অধিবিদ্যা হলো বাস্তবতার সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহের অধ্যয়ন, যার মধ্যে রয়েছে অস্তিত্ব, বস্তু ও তাদের ধর্ম, সম্ভাবনা ও অনিবার্যতা, স্থান ও কাল, পরিবর্তন, কার্যকারণ, এবং বস্তু ও মনের সম্পর্ক। এটি দর্শনের সবচেয়ে প্রাচীন শাখাগুলোর একটি।[৬][৭]
অধিবিদ্যার প্রকৃত প্রকৃতি বিতর্কিত এবং ইতিহাসের ধারায় এর বৈশিষ্ট্যায়ন পরিবর্তিত হয়েছে। কিছু দৃষ্টিভঙ্গি অধিবিদ্যাকে একক ক্ষেত্র হিসেবে দেখে একে "বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নাবলি"র অধ্যয়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, অথবা বস্তুর সারসত্তার অনুসন্ধান হিসেবে। অন্য দৃষ্টিভঙ্গি সন্দেহ প্রকাশ করে যে অধিবিদ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্র কোনো অভিন্ন অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য ভাগ করে নেয়, এবং তার পরিবর্তে অধিবিদ্যাবিদদের দ্বারা অনুসন্ধানকৃত সকল মূল বিষয় তালিকাভুক্ত করে একটি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যায়ন প্রদান করে।[৮][৯]
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দর্শনে ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী দুটি সংজ্ঞা অধিবিদ্যাকে প্রথম কারণের বিজ্ঞান এবং সত্তা হিসেবে সত্তার (being qua being) অধ্যয়ন হিসেবে বোঝে, অর্থাৎ সকল সত্তার মধ্যে কী সাধারণ এবং তারা কোন মৌলিক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ক আলোচনা। আধুনিক যুগে অধিবিদ্যার পরিসর বিস্তৃত হয়ে মন ও দেহের পার্থক্য এবং স্বাধীন ইচ্ছার মতো বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করে।[১০] কিছু দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে অনুসরণ করে অধিবিদ্যাকে "প্রথম দর্শন" বলে বর্ণনা করেন, এই ইঙ্গিত দিয়ে যে এটি সবচেয়ে মৌলিক অনুসন্ধান, যার উপর অন্য সকল শাখা কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।[১১]
অধিবিদ্যা প্রথাগতভাবে বাস্তবতার মন-নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের অধ্যয়ন হিসেবে বোঝা হয়। ইমানুয়েল কান্টের সমালোচনামূলক দর্শন থেকে শুরু করে একটি বিকল্প ধারণা প্রাধান্য পায়, যা বহির্জগতের পরিবর্তে ধারণাগত কাঠামোর উপর গুরুত্ব দেয়। কান্ট অতীন্দ্রিয় অধিবিদ্যাকে, যা ইন্দ্রিয়ানুভূতির বাইরে বাস্তবতার বস্তুনিষ্ঠ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে চায়, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথক করেন, যা মানুষের সকল চিন্তা ও অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত দিক ও নীতিসমূহ তুলে ধরে।[১২] দার্শনিক পি. এফ. স্ট্রসন ধারণাগত কাঠামোর ভূমিকা আরও অনুসন্ধান করেন, বর্ণনামূলক অধিবিদ্যাকে, যা জগৎ বোঝার জন্য প্রচলিতভাবে ব্যবহৃত ধারণাগত কাঠামো তুলে ধরে, সংশোধনমূলক অধিবিদ্যার সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখান, যা উন্নত ধারণাগত কাঠামো তৈরি করতে চায়।[১৩]
অধিবিদ্যা পৃথক বিজ্ঞান থেকে ভিন্ন, কারণ এটি বাস্তবতার সবচেয়ে সাধারণ ও বিমূর্ত দিকসমূহ অধ্যয়ন করে। বিপরীতে, পৃথক বিজ্ঞানসমূহ অধিকতর নির্দিষ্ট ও মূর্ত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে এবং নিজেদের নির্দিষ্ট শ্রেণির সত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, যেমন পদার্থবিজ্ঞান বস্তুগত বিষয়ে, জীববিজ্ঞান জীবন্ত সত্তায় এবং নৃবিজ্ঞান সংস্কৃতিতে মনোনিবেশ করে।[১৪]
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]মেটাফিজিক্স শব্দটির উৎপত্তি প্রাচীন গ্রিক শব্দ μετά (মেতা, অর্থ "পরে", "উপরে" এবং "অতিক্রম করে") এবং φυσικά (ফুসিকা) থেকে, যা ta metá ta phusikáর সংক্ষিপ্ত রূপ, যার অর্থ "যা পদার্থবিজ্ঞানের পরে আসে"। এটি প্রায়শই এই অর্থে ব্যাখ্যা করা হয় যে অধিবিদ্যা এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, যা তাদের সাধারণত্ব ও ব্যাপকতার কারণে পদার্থবিজ্ঞান ও এর অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণের সীমার বাইরে অবস্থান করে।[১৫][১৬]
বিকল্পভাবে, অ্যারিস্টটলের এই বিষয়ক গ্রন্থ মেটাফিজিক্স প্রকাশের সময় একটি ঐতিহাসিক দুর্ঘটনাক্রমে অধিবিদ্যা এই নাম পেয়ে থাকতে পারে।[১৭] অ্যারিস্টটল নিজে মেটাফিজিক্স শব্দটি ব্যবহার করেননি, বরং তার মৃত্যুর প্রায় দুই শতাব্দী পরে তার রচনাবলির একজন সম্পাদক (সম্ভবত রোডসের অ্যান্ড্রোনিকাস) শিরোনামের জন্য শব্দটি তৈরি করেন, সম্ভবত এই ইঙ্গিত দেওয়ার জন্য যে গ্রন্থটি অ্যারিস্টটলের ফিজিক্স গ্রন্থের পরে অধ্যয়ন করা উচিত। শব্দটি ১৫০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ল্যাটিন শব্দ metaphysica থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে।[১৮]
শাখাসমূহ
[সম্পাদনা]প্রারম্ভিক আধুনিক দর্শনের একটি প্রভাবশালী বিভাজন সাধারণ ও বিশেষ অধিবিদ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে।[১৯] সাধারণ অধিবিদ্যা, যাকে সত্তাতত্ত্ব (ontology)ও বলা হয়, সবচেয়ে ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এবং সত্তার সবচেয়ে মৌলিক দিকসমূহ অধ্যয়ন করে। এটি অনুসন্ধান করে যে সকল সত্তা কী কী বৈশিষ্ট্য ভাগ করে নেয় এবং তাদের কীভাবে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। শ্রেণিসমূহ হলো সবচেয়ে সাধারণ প্রকার, যেমন দ্রব্য, ধর্ম, সম্পর্ক এবং তথ্য।[২০]
বিশেষ অধিবিদ্যা অধিকতর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সত্তা বিবেচনা করে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে উপশাখায় বিভক্ত। অধিবিদ্যাগত বিশ্বতত্ত্ব পরিবর্তনশীল বিষয় পরীক্ষা করে এবং সেগুলো কীভাবে সংযুক্ত হয়ে স্থান ও কালব্যাপী বিস্তৃত একটি সামগ্রিক জগৎ গঠন করে, তা অনুসন্ধান করে। যুক্তিসংগত মনস্তত্ত্ব মনের সঙ্গে সম্পর্কিত অধিবিদ্যাগত ভিত্তি ও সমস্যাসমূহের উপর মনোনিবেশ করে, যেমন এর বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইচ্ছার স্বাধীনতা। প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব ঐশ্বরিক সত্তা এবং প্রথম কারণ হিসেবে তার ভূমিকা অধ্যয়ন করে।[২১]
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে প্রায়োগিক অধিবিদ্যাকে প্রায়োগিক দর্শনের একটি ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, যা দর্শনের মধ্যে ও বাইরে অধিবিদ্যার প্রভাব ও ব্যবহার পরীক্ষা করে। নীতিশাস্ত্র ও ধর্মদর্শনের মতো ক্ষেত্রে এটি নৈতিক দাবি ও ধর্মীয় মতবাদের সত্তাতাত্ত্বিক ভিত্তির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। দর্শনের বাইরে, এর প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানে সত্তা শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য সত্তাতত্ত্বের ব্যবহার।[২২]
মেটা-অধিবিদ্যা হলো অধিবিদ্যার তত্ত্ব সম্পর্কিত তত্ত্ব, যা অধিবিদ্যার প্রকৃতি ও পদ্ধতি অনুসন্ধান করে।[২৩]
বিষয়াবলি
[সম্পাদনা]অস্তিত্ব ও সত্তার শ্রেণিসমূহ
[সম্পাদনা]অধিবিদ্যাবিদগণ অস্তিত্ব বা সত্তাকে প্রায়শই সবচেয়ে মৌলিক ও সাধারণ ধারণাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।[২৪] অস্তিত্বশীল হওয়ার অর্থ হলো বাস্তবতার অংশ হওয়া, যা প্রকৃত সত্তাকে কাল্পনিক সত্তা থেকে পৃথক করে।[২৫] প্রথাগতভাবে প্রভাবশালী একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, অস্তিত্ব হলো ধর্মের একটি ধর্ম— যদি কোনো সত্তা অস্তিত্বশীল হয়, তবে তার ধর্মসমূহ বাস্তবায়িত হয়।[২৬] ভিন্ন একটি অবস্থান বলে যে অস্তিত্ব হলো একক সত্তার একটি ধর্ম, অর্থাৎ এটি আকৃতি বা আকারের মতো অন্যান্য ধর্মের অনুরূপ।[২৭] দার্শনিক আলেক্সিয়ুস মাইনোংের মতে, অস্তিত্বহীন বস্তু বলেও কিছু আছে, যার মধ্যে রয়েছে নিছক সম্ভাব্য বস্তু, যেমন সান্তা ক্লজ এবং পেগাসাস।[২৮][২৯]
সত্তাসমূহকে অন্তর্নিহিত সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পৃথক গোষ্ঠীতে বিভক্ত করাও অধিবিদ্যার একটি মূল বিষয়। শ্রেণিতত্ত্ব সবচেয়ে মৌলিক প্রকার বা সত্তার সর্বোচ্চ গণসমূহের একটি ব্যবস্থা প্রদান করে, যা সবকিছুর একটি ব্যাপক তালিকা তৈরি করে।[৩০] প্রথম দিকের শ্রেণিতত্ত্বগুলোর একটি প্রস্তাব করেন অ্যারিস্টটল, যিনি ১০টি শ্রেণির একটি ব্যবস্থা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন যে দ্রব্য (যেমন মানুষ ও ঘোড়া) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি, কারণ পরিমাণ, গুণ এবং স্থানের মতো অন্যান্য সব শ্রেণি দ্রব্যের অন্তর্গত এবং তার উপর নির্ভরশীল।[৩১] কান্ট শ্রেণিকে মানুষের বোধগম্যতার অন্তর্নিহিত মৌলিক নীতি হিসেবে বোঝেন এবং ১২টি শ্রেণির একটি ব্যবস্থা তৈরি করেন, যা পরিমাণ, গুণ, সম্পর্ক ও মোডালিটি— এই চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত।[৩২]
অনেক দার্শনিক মূর্ত ও বিমূর্ত বস্তুর মধ্যকার পার্থক্যের উপর নির্ভর করেন। একটি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, মূর্ত বস্তু, যেমন পাথর, গাছ ও মানুষ, স্থান ও কালে অবস্থান করে, পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় এবং কারণ ও প্রভাব হিসেবে একে অপরকে প্রভাবিত করে। এগুলো বিমূর্ত বস্তুর বিপরীত, যেমন সংখ্যা ও সেট, যা স্থান ও কালে অবস্থান করে না, অপরিবর্তনীয় এবং কার্যকারণ সম্পর্কে যুক্ত হয় না।[৩৩]
বিশেষ
[সম্পাদনা]বিশেষ (particular) হলো স্বতন্ত্র সত্তা, যার মধ্যে রয়েছে মূর্ত বস্তু, যেমন অ্যারিস্টটল, আইফেল টাওয়ার বা একটি নির্দিষ্ট আপেল, এবং বিমূর্ত বস্তু, যেমন সংখ্যা ২ বা গণিতের একটি নির্দিষ্ট সেট। এগুলো অনন্য, অপুনরাবৃত্তিযোগ্য সত্তা এবং সামান্যের বিপরীত, যেমন লাল রঙ, যা একই সময়ে একাধিক স্থানে বিদ্যমান থাকতে পারে এবং একাধিক বিশেষকে চিহ্নিত করতে পারে।[৩৪] একটি ব্যাপকভাবে গৃহীত দৃষ্টিভঙ্গি হলো যে বিশেষ সামান্যকে বাস্তবায়িত করে, কিন্তু নিজেরা অন্য কিছুর দ্বারা বাস্তবায়িত হয় না। জন লকের দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত দ্রব্যাধার তত্ত্ব প্রতিটি বিশেষকে একটি দ্রব্যাধার বা "খালি বিশেষ" হিসেবে বিশ্লেষণ করে, যার সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম যুক্ত থাকে। গুচ্ছতাত্ত্বিকগণ এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করেন। ডেভিড হিউমের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা বলেন যে বিশেষ কেবল ধর্মের গুচ্ছ, কোনো অন্তর্নিহিত দ্রব্যাধার ছাড়াই।[৩৫]
প্রাত্যহিক জীবনে দেখা মূর্ত বিশেষ, যেমন পাথর, টেবিল ও জীব, বিভিন্ন অংশ দ্বারা গঠিত জটিল সত্তা। অংশ ও সমষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক অধ্যয়ন করে মেরিওলজি।[৩৬] "অনেকের সমস্যা" (problem of the many) হলো কোন শর্তে একাধিক পৃথক বস্তু মিলে একটি বৃহত্তর সমষ্টি গঠন করে, সে সম্পর্কিত একটি দার্শনিক প্রশ্ন। মেরিওলজিক্যাল সার্বজনীনবাদীদের মতে, সত্তার প্রতিটি সংগ্রহই একটি সমষ্টি গঠন করে। মেরিওলজিক্যাল মধ্যপন্থীগণ মনে করেন যে একটি সমষ্টি গঠনের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হতে হবে। মেরিওলজিক্যাল শূন্যবাদীগণ সমষ্টির ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করেন, দাবি করেন যে মেঘ বা টেবিল বলে কিছু নেই, শুধু মেঘাকারে বা টেবিলাকারে সাজানো কণা আছে।[৩৭]
সামান্য
[সম্পাদনা]সামান্য (universal) হলো সাধারণ সত্তা, যার মধ্যে ধর্ম ও সম্পর্ক উভয়ই অন্তর্ভুক্ত, যা প্রকাশ করে বিশেষসমূহ কীরূপ এবং তারা কীভাবে একে অপরের সাদৃশ্যপূর্ণ। এগুলো পুনরাবৃত্তিযোগ্য, অর্থাৎ এগুলো কোনো একক অস্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একই সময়ে বিভিন্ন বিশেষ দ্বারা বাস্তবায়িত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নেলসন ম্যান্ডেলা ও মহাত্মা গান্ধী "মানবতা" নামক সামান্যকে বাস্তবায়িত করেন, ঠিক যেমন একটি স্ট্রবেরি ও একটি চুনি "লাল" নামক সামান্যকে বাস্তবায়িত করে।[৩৮]
প্রাচীন দর্শন থেকে আলোচিত সামান্যের সমস্যা হলো সামান্যের সত্তাতাত্ত্বিক মর্যাদা বৈশিষ্ট্যায়নের চ্যালেঞ্জ।[৩৯] বাস্তববাদীগণ যুক্তি দেন যে সামান্য বাস্তব, মন-নিরপেক্ষ সত্তা, যা বিশেষের পাশাপাশি বিদ্যমান। প্লেটোনীয় বাস্তববাদীদের মতে, সামান্য বিশেষ থেকে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান। অ্যারিস্টটল-অনুপ্রাণিত অধিকতর মধ্যপন্থী বাস্তববাদ বলে যে সামান্য বিশেষের উপর নির্ভরশীল। নামবাদীগণ উভয় রূপেই সামান্যের অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করেন। ধারণাবাদীগণ একটি মধ্যবর্তী অবস্থান প্রস্তাব করেন, বলেন যে সামান্য বিদ্যমান, তবে কেবল মনের মধ্যে ধারণা হিসেবে, যা অভিজ্ঞতাকে শ্রেণিবদ্ধ করার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করতে ব্যবহৃত হয়।[৪০]
প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রকারকে প্রায়শই বিশেষ ধরনের সামান্য হিসেবে বোঝা হয়। একই প্রাকৃতিক প্রকারের অন্তর্গত সত্তাসমূহ প্রাকৃতিক জগতের কাঠামোর বৈশিষ্ট্যসূচক নির্দিষ্ট মৌলিক বৈশিষ্ট্য ভাগ করে নেয়, যেমন ইলেকট্রন, জল এবং বাঘ। বৈজ্ঞানিক বাস্তববাদী ও ভাববাদীরা প্রাকৃতিক প্রকারের অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।[৪১] সামাজিক প্রকার, যেমন অর্থ ও বেসবল, সামাজিক অধিবিদ্যার অধ্যয়নের বিষয় এবং একে কার্যকর সামাজিক নির্মাণ হিসেবে বৈশিষ্ট্যায়িত করা হয়, যা সম্পূর্ণ কাল্পনিক না হলেও মন-নিরপেক্ষ বাস্তবতার মৌলিক কাঠামো প্রতিফলিত করে না।[৪২]
সম্ভাবনা ও অনিবার্যতা
[সম্পাদনা]সম্ভাবনা ও অনিবার্যতার ধারণা প্রকাশ করে কী হতে পারে বা কী হতেই হবে, যেমন "ক্যান্সারের নিরাময় খুঁজে পাওয়া সম্ভব" এবং "দুই যোগ দুই সমান চার হওয়া অনিবার্য" জাতীয় বাক্যে প্রকাশিত হয়। মৌলবিদ্যাগত অধিবিদ্যা সম্ভাবনা ও অনিবার্যতাকে ঘিরে অধিবিদ্যাগত সমস্যা অধ্যয়ন করে, যেমন কেন কিছু মৌলবিদ্যাগত বাক্য সত্য অথচ অন্যগুলো মিথ্যা।[৪৩] কিছু অধিবিদ্যাবিদ মনে করেন যে মৌলবিদ্যা বাস্তবতার একটি মৌলিক দিক। ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তি দেয় যে মৌলবিদ্যাগত সত্যসমূহ বাস্তবতার কোনো স্বাধীন দিক নিয়ে নয়, বরং এগুলোকে অ-মৌলবিদ্যাগত বৈশিষ্ট্যে হ্রাস করা যায়।[৪৪]
জার্মান দার্শনিক গটফ্রিড উইলহেল্ম লাইবনিৎসের ধর্মতাত্ত্বিক তত্ত্ব থেকে একটি পরিভাষা ধার করে, অনেক অধিবিদ্যাবিদ মৌলবিদ্যাগত বাক্যের অর্থ ও সত্তাতাত্ত্বিক পরিণতি বিশ্লেষণে সম্ভাব্য জগৎ-এর ধারণা ব্যবহার করেন। একটি সম্ভাব্য জগৎ হলো সবকিছুর একটি সম্পূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্ভাব্য রূপ।[৪৫] উদাহরণস্বরূপ, বাস্তব জগতে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু এমন সম্ভাব্য জগৎ আছে যেখানে তারা এখনও জীবিত।[৪৬] মৌলবিদ্যাগত বাস্তববাদীগণ যুক্তি দেন যে সম্ভাব্য জগৎ বাস্তব জগতের মতোই মূর্ত সত্তা হিসেবে বিদ্যমান।[৪৭]
স্থান, কাল ও পরিবর্তন
[সম্পাদনা]স্থান ও কাল হলো মাত্রা, যা সত্তাসমূহ দখল করে। স্থানকাল-বাস্তববাদীগণ মনে করেন যে স্থান ও কাল বাস্তবতার মৌলিক দিক এবং মানব মন থেকে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান। স্থানকাল-ভাববাদীগণ, বিপরীতে, মনে করেন যে স্থান ও কাল মানব মনের নির্মাণ, যা বাস্তবতাকে সুশৃঙ্খল ও বোধগম্য করার জন্য তৈরি।[৪৮] স্থানকাল-দ্রব্যবাদ স্থানকালকে একটি স্বতন্ত্র বস্তু হিসেবে বোঝে, যেখানে কিছু অধিবিদ্যাবিদ একে একটি ধারক হিসেবে ধারণা করেন, যা অন্য সব সত্তাকে ধারণ করে। স্থানকাল-সম্পর্কবাদ স্থানকালকে বস্তু হিসেবে নয়, বরং বস্তুর মধ্যকার সম্পর্কের একটি জালিকা হিসেবে দেখে।[৪৯]
কালের অধিবিদ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈসাদৃশ্য হলো A-ধারা ও B-ধারার মধ্যে। A-ধারা তত্ত্ব অনুসারে, কালের প্রবাহ বাস্তব, অর্থাৎ ঘটনাসমূহকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। B-ধারা তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, কাল স্থির এবং ঘটনাসমূহ "আগে" ও "পরে" সম্পর্কের মাধ্যমে সাজানো হয়, অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য ছাড়াই।[৫০] চিরন্তনবাদ মনে করে যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমানভাবে বাস্তব, যেখানে বর্তমানবাদ দাবি করে যে কেবল বর্তমানের সত্তাই বিদ্যমান।[৫১]
বস্তুগত বস্তু কালের মধ্য দিয়ে টিকে থাকে এবং এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়, যেমন একটি গাছ যা বেড়ে ওঠে বা পাতা হারায়।[৫২] কালের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার ধারণায়নের প্রধান দুটি উপায় হলো স্থিতিবাদ (endurantism) ও ব্যাপ্তিবাদ (perdurantism)। স্থিতিবাদ অনুসারে, বস্তুগত বস্তু ত্রিমাত্রিক সত্তা, যা প্রতিটি মুহূর্তে সম্পূর্ণরূপে উপস্থিত থাকে। ব্যাপ্তিবাদীগণ বস্তুগত বস্তুকে চতুর্মাত্রিক সত্তা হিসেবে দেখেন, যা কালব্যাপী বিস্তৃত এবং বিভিন্ন কালীন অংশ দ্বারা গঠিত।[৫৩]
কার্যকারণ
[সম্পাদনা]কার্যকারণ হলো কারণ ও ফলাফলের মধ্যকার সম্পর্ক, যার মাধ্যমে একটি সত্তা অন্য সত্তাকে উৎপন্ন বা পরিবর্তিত করে।[৫৪] উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি একটি গ্লাসে ধাক্কা দেয় এবং তার বিষয়বস্তু ছড়িয়ে পড়ে, তবে ধাক্কাটি কারণ এবং ছড়িয়ে পড়াটি ফলাফল।[৫৫] কার্যকারণ সাধারণত নিয়ন্ত্রণবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়, অর্থাৎ একটি কারণ সবসময় তার ফলাফল বয়ে আনে। তবে জি. ই. এম. আনস্কম্বের মতো কিছু দার্শনিক এই ধারণার বিরুদ্ধে প্রতি-উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন।[৫৬]
ডেভিড হিউমের দর্শনে অনুপ্রাণিত নিয়মিততা তত্ত্ব বলে যে কার্যকারণ হলো একটি "ধ্রুব সংযোগ" মাত্র, যেখানে মন উপলব্ধি করে যে একটি ঘটনা, যেমন হাত আগুনে দেওয়া, সবসময় অন্য একটি ঘটনা দ্বারা অনুসৃত হয়, যেমন ব্যথার অনুভূতি।[৫৭] প্রতি-বাস্তবিক তত্ত্বসমূহ নিয়মিততার উপর নয়, বরং ফলাফল কীভাবে তাদের কারণের উপর নির্ভরশীল, তার উপর মনোনিবেশ করে।[৫৮] আদিমতাবাদ অনুসারে, কার্যকারণ একটি মৌলিক ধারণা, যা অ-কার্যকারণমূলক ধারণায় বিশ্লেষণ করা যায় না।[৫৯] বর্জনবাদীগণ উপরের সব তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে কার্যকারণ বলে কিছু নেই।[৬০]
মন ও স্বাধীন ইচ্ছা
[সম্পাদনা]মন বলতে বোঝায় চিন্তা করা, উপলব্ধি করা, অনুভব করা ও কামনা করার মতো ঘটনা, পাশাপাশি এসবের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাসমূহ।[৬১] মন-দেহ সমস্যা হলো শারীরিক ও মানসিক ঘটনাসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্ট করার চ্যালেঞ্জ। কার্তেসীয় দ্বৈতবাদ অনুসারে, মন ও দেহ ভিন্ন দ্রব্য। এগুলো বিভিন্নভাবে কার্যকারণসূত্রে পরস্পর মিথস্ক্রিয়া করে, কিন্তু নীতিগতভাবে স্বাধীনভাবেও বিদ্যমান থাকতে পারে।[৬২] একত্ববাদীগণ এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করেন, যুক্তি দেন যে বাস্তবতা কেবল একটি প্রকারের। অধিবিদ্যাগত ভাববাদ অনুসারে, সবকিছুই মানসিক বা মনের উপর নির্ভরশীল, বস্তুগত বস্তুসহ, যা সচেতন মনের ধারণা বা উপলব্ধি হিসেবে বোঝা যেতে পারে। বস্তুবাদীগণ, বিপরীতে, বলেন যে সমস্ত বাস্তবতা মূলত বস্তুগত।[৬৩] নিরপেক্ষ একত্ববাদীগণ যুক্তি দেন যে বাস্তবতা মূলত বস্তুগত বা মানসিক কোনোটিই নয়।[৬৪] মন-দেহ সমস্যার একটি মূল দিক হলো চেতনার কঠিন সমস্যা, অর্থাৎ মস্তিষ্কের মতো শারীরিক ব্যবস্থা কীভাবে প্রপঞ্চগত চেতনা উৎপন্ন করতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা।[৬৫]
কোনো ব্যক্তির নিজের কাজ নির্বাচন করার ক্ষমতা হিসেবে স্বাধীন ইচ্ছার মর্যাদা মন-দেহ সমস্যার একটি কেন্দ্রীয় দিক।[৬৬] অধিবিদ্যাবিদগণ স্বাধীন ইচ্ছা এবং কার্যকারণগত নিয়তিবাদের মধ্যকার সম্পর্কে আগ্রহী— নিয়তিবাদ হলো এই দৃষ্টিভঙ্গি যে মহাবিশ্বের সবকিছু, মানব আচরণসহ, পূর্ববর্তী ঘটনা ও প্রকৃতির নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত। নিয়ন্ত্রণবাদ-অসংগতিবাদ অনুসারে, নিয়ন্ত্রিত জগতে স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে পারে না।[৬৭] কঠোর নিয়তিবাদীগণ এখান থেকে সিদ্ধান্তে আসেন যে স্বাধীন ইচ্ছা নেই, যেখানে স্বাধীনতাবাদীগণ সিদ্ধান্তে আসেন যে নিয়তিবাদ মিথ্যা হতে হবে। সংগতিবাদীগণ তৃতীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তাব করেন, যুক্তি দেন যে নিয়তিবাদ ও স্বাধীন ইচ্ছা পরস্পরকে বাদ দেয় না।[৬৮]
অন্যান্য
[সম্পাদনা]অভিন্নতা একটি সম্পর্ক, যা প্রতিটি সত্তার নিজের সঙ্গে একধরনের সাদৃশ্য হিসেবে বিদ্যমান। সাংখ্যিক অভিন্নতা তখন প্রযোজ্য যখন একই সত্তা জড়িত থাকে, যেমন "শুকতারা হলো সন্ধ্যাতারা" বাক্যে (উভয়ই শুক্র গ্রহ)। কিছুটা ভিন্ন অর্থে, এতে গুণগত অভিন্নতাও অন্তর্ভুক্ত, যা তখন ঘটে যখন দুটি পৃথক সত্তা হুবহু একই রকম হয়, যেমন যমজ ভাইবোন।[৬৯] অভিন্নের অবিচ্ছেদ্যতার নীতি ব্যাপকভাবে গৃহীত এবং বলে যে সাংখ্যিকভাবে অভিন্ন সত্তা পরস্পরের সঙ্গে হুবহু সাদৃশ্যপূর্ণ। বিপরীত নীতি, যা অবিচ্ছেদ্যের অভিন্নতা বা লাইবনিৎসের সূত্র নামে পরিচিত, অধিকতর বিতর্কিত।[৭০]
সমসাময়িক অনেক অধিবিদ্যাবিদ তাদের অনুসন্ধান পরিচালনার জন্য সত্য, সত্য-বাহক এবং সত্যনির্মাতা তত্ত্ব-এর ধারণার উপর নির্ভর করেন।[৭১] সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার একটি ধর্ম। সত্য-বাহক হলো এমন সত্তা, যা সত্য বা মিথ্যা হতে পারে, যেমন ভাষাগত বিবৃতি ও মানসিক প্রতিনিধিত্ব। কোনো বিবৃতির সত্যনির্মাতা হলো সেই সত্তা, যার অস্তিত্ব বিবৃতিটিকে সত্য করে তোলে।[৭২] সত্যের প্রকৃতি সম্পর্কিত তত্ত্বসমূহের মধ্যে রয়েছে সাযুজ্য তত্ত্ব, সংগতি তত্ত্ব, প্রায়োগিক তত্ত্ব, শব্দার্থগত তত্ত্ব এবং নিরাসক্তিবাদী তত্ত্ব।[৭৩]
পদ্ধতিবিজ্ঞান
[সম্পাদনা]অধিবিদ্যাবিদগণ অধিবিদ্যাগত তত্ত্ব বিকাশ এবং সেগুলোর পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।[৭৪] প্রথাগতভাবে, প্রাগভিজ্ঞ (a priori) পদ্ধতিসমূহ প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে কাজ করেছে। এগুলো ইন্দ্রিয়ানুভূতির পরিবর্তে যুক্তিসংগত স্বজ্ঞা ও সাধারণ নীতি থেকে বিমূর্ত যুক্তিতর্কের উপর নির্ভর করে। অনুভবাশ্রয়ী (a posteriori) পদ্ধতিসমূহ, বিপরীতে, অধিবিদ্যাগত তত্ত্বকে অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তিতে স্থাপন করে।[৭৫] দুটি পদ্ধতি পরস্পর একচেটিয়া নয়— উভয় পদ্ধতির উপাদান একত্রিত করাও সম্ভব।[৭৬]
প্রাগভিজ্ঞ পদ্ধতিসমূহ প্রায়শই স্বজ্ঞার উপর নির্ভর করে, যা নির্দিষ্ট দাবি বা সাধারণ নীতির সঠিকতা সম্পর্কে অ-অনুমানমূলক ছাপ।[৭৭] কিছু পদ্ধতি স্বজ্ঞা ব্যবহার করে স্বতঃসিদ্ধ নামে পরিচিত একটি ক্ষুদ্র স্বতঃপ্রমাণিত মৌলিক নীতির সেট প্রতিষ্ঠা করে এবং সেগুলো থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অবরোহী যুক্তি ব্যবহার করে জটিল অধিবিদ্যাগত ব্যবস্থা গড়ে তোলে।[৭৮] স্বজ্ঞাভিত্তিক পদ্ধতিসমূহ চিন্তা পরীক্ষার সঙ্গে একত্রিত করা যায়, যা স্বজ্ঞাকে কাল্পনিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে স্পষ্ট করতে সাহায্য করে।[৭৯]
ধারণাগত বিশ্লেষণ, বিশ্লেষণী দর্শনে বিশেষভাবে প্রচলিত একটি পদ্ধতি, অধিবিদ্যাগত ধারণাসমূহকে উপাদান অংশে বিভক্ত করে তাদের অর্থ স্পষ্ট করা এবং মৌলিক সম্পর্ক চিহ্নিত করার লক্ষ্যে কাজ করে।[৮০] প্রপঞ্চবিজ্ঞানে, আদর্শিক প্রকরণ পদ্ধতি প্রপঞ্চের অন্তর্নিহিত মৌলিক কাঠামো অনুসন্ধানে ব্যবহৃত হয়।[৮১]
কিছু দৃষ্টিভঙ্গি প্রাগভিজ্ঞ যুক্তিতর্ককে কম গুরুত্ব দেয় এবং অধিবিদ্যাকে অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞানের সঙ্গে ধারাবাহিক একটি চর্চা হিসেবে দেখে, যা বিজ্ঞানের অন্তর্দৃষ্টিকে সাধারণীকরণ করে এবং তাদের অন্তর্নিহিত অনুমানকে স্পষ্ট করে তোলে। এই পদ্ধতিটি প্রকৃতিবাদী অধিবিদ্যা নামে পরিচিত এবং উইলার্ড ভ্যান অরমান কোয়াইনের কাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।[৮২] তিনি এই ধারণার উপর নির্ভর করেন যে বিজ্ঞান ও অন্যান্য ক্ষেত্রের সত্য বাক্যের সত্তাতাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, অর্থাৎ সেগুলো এই ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট সত্তা বিদ্যমান।[৮৩]
প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিগত নীতিও ব্যবহৃত হয়। অকামের ক্ষুর একটি সুপরিচিত নীতি, যা সরল তত্ত্বকে প্রাধান্য দেয়, বিশেষত সেগুলো যা অল্প সংখ্যক সত্তার অস্তিত্ব অনুমান করে।[৮৪]
সমালোচনা
[সম্পাদনা]দর্শনের একটি প্রধান শাখা হিসেবে মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও, অধিবিদ্যা একটি জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে তার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে অসংখ্য সমালোচনার শিকার হয়েছে।[৮৫] একটি সমালোচনা যুক্তি দেয় যে অধিবিদ্যাগত অনুসন্ধান অসম্ভব, কারণ বাস্তবতার চূড়ান্ত প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানীয় ক্ষমতা মানুষের নেই।[৮৬] অভিজ্ঞতাবাদীগণ প্রায়শই এই চিন্তাধারা অনুসরণ করেন, যেমন হিউম, যিনি দাবি করেন যে অধিবিদ্যাগত জ্ঞানের কোনো ভালো উৎস নেই, কারণ অধিবিদ্যা অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের ক্ষেত্রের বাইরে অবস্থান করে। মন সক্রিয়ভাবে অভিজ্ঞতাকে কাঠামোবদ্ধ করে যুক্তি দিয়ে, কান্ট প্রথাগত অধিবিদ্যার সমালোচনা করেন এর মন-নিরপেক্ষ বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভের প্রচেষ্টার জন্য।[৮৭]
আরেকটি সমালোচনা মনে করে যে সমস্যাটি মানুষের জ্ঞানীয় ক্ষমতায় নয়, বরং অধিবিদ্যাগত বিবৃতিগুলোতেই, যেগুলো কেউ কেউ দাবি করেন সত্য বা মিথ্যা নয়, বরং অর্থহীন। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীগণের মতে, উদাহরণস্বরূপ, কোনো বিবৃতির অর্থ তার যাচাইকরণ পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত হয়, সাধারণত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। এই বিতর্কিত অনুমানের ভিত্তিতে, তারা যুক্তি দেন যে অধিবিদ্যাগত বিবৃতি অর্থহীন, কারণ সেগুলো অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কোনো পরীক্ষণযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী করে না।[৮৮]
কিছুটা দুর্বল একটি অবস্থান অধিবিদ্যাগত বিবৃতিকে অর্থপূর্ণ বলে মেনে নেয়, তবে মনে করে যে অধিবিদ্যাগত মতবিরোধ কেবল জগৎ বর্ণনার ভিন্ন উপায় নিয়ে মৌখিক বিতর্ক। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অধিবিদ্যাগত ন্যূনায়নবাদ বলা হয়।[৮৯] এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করেন তথাকথিত "গুরুতর অধিবিদ্যাবিদ"গণ, যারা মনে করেন অধিবিদ্যাগত বিতর্কসমূহ বাস্তবতার অন্তর্নিহিত কাঠামোর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য নিয়ে।[৯০]
মার্টিন হাইডেগার প্রথাগত অধিবিদ্যার সমালোচনা করেন, বলেন যে এটি স্বতন্ত্র সত্তা এবং সত্তার অধিষ্ঠান হিসেবে বিয়িং-এর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়। "অধিবিদ্যাকে অতিক্রম" করার তার প্রচেষ্টা জাক দেরিদার বিনির্মাণ পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে।[৯১]
এসব সমালোচনার বৈধতা নিয়ে এবং এগুলো সামগ্রিকভাবে অধিবিদ্যাকে না কেবল এর নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে কি না, তা নিয়ে কোনো ঐকমত্য নেই।[৯২]
অন্যান্য শাখার সঙ্গে সম্পর্ক
[সম্পাদনা]অধিবিদ্যা বহু জ্ঞানক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ এটি তাদের মৌলিক ধারণা এবং বাস্তবতার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক অনুসন্ধান করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান তাদের তত্ত্ব প্রণয়ন এবং পরীক্ষার ফলাফল ভবিষ্যদ্বাণী বা ব্যাখ্যা করতে প্রকৃতির নিয়ম, কার্যকারণ, অনিবার্যতা ও স্থানকালের মতো ধারণার উপর নির্ভর করে।[৯৩] আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিভিন্ন অধিবিদ্যাবিদকে স্থান ও কালকে স্বাধীন মাত্রার পরিবর্তে একটি একীভূত মাত্রা হিসেবে ধারণা করতে প্রণোদিত করে।[৯৪]
সামাজিক বিজ্ঞানেও একই ধরনের বিষয় দেখা যায়, যেখানে অধিবিদ্যাবিদগণ তাদের মৌলিক ধারণা এবং সেগুলোর অধিবিদ্যাগত প্রভাব বিশ্লেষণ করেন।[৯৫] অধিবিদ্যা পদার্থবিজ্ঞান কসমোলজি ও ধর্মতত্ত্ব উভয়ের সঙ্গেই প্রথম কারণ ও সমগ্র মহাবিশ্ব অনুসন্ধানের দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ। মূল পার্থক্য হলো অধিবিদ্যা যুক্তিসংগত অনুসন্ধানের উপর নির্ভর করে, যেখানে পদার্থবিজ্ঞান কসমোলজি অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণকে অধিক গুরুত্ব দেয় এবং ধর্মতত্ত্ব ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ ও বিশ্বাসভিত্তিক মতবাদ অন্তর্ভুক্ত করে।[৯৬]
কম্পিউটার বিজ্ঞানীগণ বস্তু প্রতিনিধিত্ব ও শ্রেণিবদ্ধ করতে সত্তাতত্ত্বের আকারে অধিবিদ্যার উপর নির্ভর করেন। তারা সীমিত ক্ষেত্রের জন্য "সত্তাতত্ত্ব" নামে পরিচিত ধারণাগত কাঠামো তৈরি করেন।[৯৭] যুক্তিবিজ্ঞান বা সঠিক যুক্তিতর্কের অধ্যয়ন প্রায়শই অধিবিদ্যাবিদদের দ্বারা সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক সূত্রের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করতে ব্যবহৃত হয়।[৯৮]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]অধিবিদ্যার উৎপত্তি প্রাচীন যুগে মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও উৎস নিয়ে জল্পনা থেকে।[৯৯] প্রাচীন ভারতে, খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে, ধর্মীয় ও দার্শনিক গ্রন্থ হিসেবে উপনিষদ রচিত হয়, যা পরীক্ষা করে কীভাবে ব্রহ্ম চূড়ান্ত বাস্তবতা সমস্ত সত্তার ভিত্তি গঠন করে। এগুলো আরও অন্বেষণ করে আত্মার প্রকৃতি এবং চূড়ান্ত বাস্তবতা বোঝার মাধ্যমে তা কীভাবে মোক্ষ লাভ করতে পারে।[১০০] এই সময়ে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মেরও উদ্ভব ঘটে, যা একটি স্বাধীন আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং জগৎকে একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝে।[১০১] প্রায় একই সময়ে প্রাচীন চীনে, তাওবাদ বিদ্যালয় গঠিত হয় এবং মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা, যা "তাও" নামে পরিচিত, তা দুটি সম্পর্কিত শক্তি যিন ও ইয়াংের আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে অন্বেষণ করে।[১০২]
প্রাচীন গ্রিসে অধিবিদ্যার উদ্ভব ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাক-সক্রেটিসীয় দার্শনিকদের হাতে, যারা মহাবিশ্বের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা প্রদান করেন প্রথম নীতি পরীক্ষা করে, যেখান থেকে সবকিছুর উদ্ভব।[১০৩] তাদের কাজের উপর ভিত্তি করে, প্লেটো (৪২৭–৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্ব) তার আদর্শবাদ তত্ত্ব প্রণয়ন করেন, যা বলে যে চিরন্তন আদর্শ বা ধারণাসমূহের সর্বোচ্চ ধরনের বাস্তবতা রয়েছে, যখন বস্তুগত জগৎ কেবল তাদের অসম্পূর্ণ প্রতিফলন।[১০৪] অ্যারিস্টটল (৩৮৪–৩২২ খ্রিষ্টপূর্ব) প্লেটোর এই ধারণা মেনে নেন যে সার্বজনীন আদর্শ আছে, তবে বলেন যে এগুলো স্বাধীনভাবে বিদ্যমান থাকতে পারে না, বরং বস্তুর উপর নির্ভরশীল। তিনি শ্রেণিসমূহের একটি ব্যবস্থাও প্রস্তাব করেন এবং তার চার কারণ তত্ত্বের মাধ্যমে প্রাকৃতিক জগতের একটি ব্যাপক কাঠামো গড়ে তোলেন।[১০৫]
মধ্যযুগীয় পাশ্চাত্য দর্শন প্রাচীন গ্রিক চিন্তাধারা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়, যেখানে দার্শনিকগণ এসব ধারণাকে খ্রিস্টীয় দার্শনিক শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করেন। বোয়েথিয়ুস (৪৭৭–৫২৪ খ্রিষ্টাব্দ) প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের সামান্যের তত্ত্বকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।[১০৬] টমাস অ্যাকুইনাস (১২২৪–১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দ) অধিবিদ্যাকে "সত্তা"র বিভিন্ন অর্থ অনুসন্ধানকারী শাস্ত্র হিসেবে বোঝেন।[১০৭] অ্যাভিসেনা (৯৮০–১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) অস্তিত্ব ও সারসত্তার মধ্যকার বৈসাদৃশ্য পরীক্ষা করে একটি ব্যাপক দার্শনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।[১০৮]
প্রারম্ভিক আধুনিক যুগে, রেনেসাঁর সময় প্লেটোবাদের প্রতি নবজাগ্রত আগ্রহের প্রেক্ষাপটে, রনে দেকার্ত (১৫৯৬–১৬৫০) একটি দ্রব্য-দ্বৈতবাদ প্রণয়ন করেন, যা অনুসারে দেহ ও মন স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিদ্যমান, যারা কার্যকারণসূত্রে মিথস্ক্রিয়া করে।[১০৯] এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন বারুখ স্পিনোজা (১৬৩২–১৬৭৭), যিনি একটি একত্ববাদী দর্শন প্রণয়ন করেন, যা প্রস্তাব করে যে কেবল একটিই দ্রব্য আছে, যার শারীরিক ও মানসিক উভয় ধর্মই পাশাপাশি বিকশিত হয়, মিথস্ক্রিয়া ছাড়াই।[১১০] গটফ্রিড উইলহেল্ম লাইবনিৎস (১৬৪৬–১৭১৬) সম্ভাব্য জগতের ধারণা প্রবর্তন করেন এবং মোনাডলজি নামে পরিচিত একটি অধিবিদ্যাগত ব্যবস্থা তৈরি করেন।[১১১] জর্জ বার্কলির (১৬৮৫–১৭৫৩) ভাববাদ অনুসারে, সবকিছুই মানসিক, বস্তুগত বস্তুসহ।[১১২] ডেভিড হিউম (১৭১১–১৭৭৬) কার্যকারণের নিয়মিততা তত্ত্বসহ অধিবিদ্যায় বিভিন্ন অবদান রাখেন এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতির অগম্য চূড়ান্ত নীতি খোঁজার অধিবিদ্যাগত তত্ত্বের সমালোচনা করেন।[১১৩] এই সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪–১৮০৪), যিনি অধিবিদ্যাকে মন-নিরপেক্ষ বাস্তবতা অনুধাবনের প্রচেষ্টার পরিবর্তে চিন্তা ও বোধগম্যতার মৌলিক নীতি ও শ্রেণির অনুসন্ধান হিসেবে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন।[১১৪]
পরবর্তী আধুনিক যুগের অনেক উন্নয়ন কান্টের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়। জার্মান ভাববাদীগণ বাস্তবতার ভিত্তি হিসেবে একটি একীভূত নীতি খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় তার ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন।[১১৫] গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল (১৭৭০–১৮৩১) এর ভাববাদী দাবি হলো, বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে ধারণাগত এবং সত্তা নিজেই যুক্তিসংগত।[১১৬] আর্থার শোপেনহাওয়ার (১৭৮৮–১৮৬০) জার্মান ভাববাদের কট্টর সমালোচক ছিলেন এবং একটি ভিন্ন অধিবিদ্যাগত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন, বাস্তবতার অন্তর্নিহিত নীতি হিসেবে একটি অন্ধ ও অযৌক্তিক ইচ্ছাকে স্থাপন করেন।[১১৭]
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্লেষণী দর্শনে, বার্ট্রান্ড রাসেল (১৮৭২–১৯৭০) ও জি. ই. মুর (১৮৭৩–১৯৫৮)-এর মতো দার্শনিকগণ "ভাববাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ" নেতৃত্ব দেন, সাধারণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মন-নিরপেক্ষ জগতের অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি দেন।[১১৮] আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড (১৮৬১–১৯৪৭) প্রক্রিয়া অধিবিদ্যা বিকাশ করেন, বস্তুনিষ্ঠ ও বিষয়ীগত উভয় ক্ষেত্রের একটি সামগ্রিক বর্ণনা প্রদানের প্রচেষ্টা হিসেবে।[১১৯]
রুডলফ কার্নাপ (১৮৯১–১৯৭০) ও অন্যান্য যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীগণ অধিবিদ্যাগত বিবৃতির একটি ব্যাপক সমালোচনা প্রণয়ন করেন, যুক্তি দিয়ে যে সেগুলো অর্থহীন কারণ সেগুলো যাচাই করার কোনো উপায় নেই।[১২০] যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের পতন অধিবিদ্যাগত তত্ত্বায়নের পুনরুজ্জীবন ঘটায়।[১২১] উইলার্ড ভ্যান অরমান কোয়াইন (১৯০৮–২০০০) অধিবিদ্যাকে অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রকৃতিবাদী করার চেষ্টা করেন। তার শিষ্য ডেভিড লুইস (১৯৪১–২০০১) তার মৌলবিদ্যাগত বাস্তববাদ প্রণয়নে সম্ভাব্য জগতের ধারণা ব্যবহার করেন।[১২২] শল ক্রিপকি (১৯৪০–২০২২) অভিন্নতা ও সারসত্তাবাদ নিয়ে আলোচনার পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করেন, অনিবার্যতাকে একটি অধিবিদ্যাগত ধারণা হিসেবে জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণা প্রাগভিজ্ঞ থেকে পৃথক করেন।[১২৩]
মহাদেশীয় দর্শনে, এডমুন্ড হুসার্ল (১৮৫৯–১৯৩৮) প্রপঞ্চবিজ্ঞানগত বর্ণনার মাধ্যমে সত্তাতত্ত্বে নিয়োজিত হন, যেখানে তার শিষ্য মার্টিন হাইডেগার (১৮৮৯–১৯৭৬) সত্তার অর্থ স্পষ্ট করতে মৌলিক সত্তাতত্ত্ব বিকাশ করেন।[১২৪] হাইডেগারের দর্শন জাক দেরিদার (১৯৩০–২০০৪) অধিবিদ্যার সমালোচনাকে প্রভাবিত করে।[১২৫] জিল দ্যলুজের (১৯২৫–১৯৯৫) অধিবিদ্যার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বহুত্ব, ঘটনা ও পার্থক্যের মতো বিকল্প ধারণার মাধ্যমে দ্রব্য, সারসত্তা ও অভিন্নতার মতো প্রথাগতভাবে প্রভাবশালী ধারণাসমূহকে চ্যালেঞ্জ করে।[১২৬]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 1–3
- ↑ Koons ও Pickavance 2015, পৃ. 1–2
- ↑ Mumford 2012, § What Is an Introduction?
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 1–2
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 183–197
- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 1–3
- ↑ McDaniel 2020, § 0.3 An Overview of Metaphysics and Other Areas of Philosophy
- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 1–4
- ↑ Van Inwagen, Sullivan এবং Bernstein 2023, Lead Section, § 1. The Word 'Metaphysics' and the Concept of Metaphysics
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 1–4
- ↑ Koons ও Pickavance 2015, পৃ. 8–10
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 1–2, 6–7
- ↑ MacDonald 2008, পৃ. 18
- ↑ Ney 2014, পৃ. xiii
- ↑ Hoad 1993, পৃ. 291, 351
- ↑ Cohen ও Reeve 2021, Lead Section
- ↑ Hamlyn 2005, পৃ. 590
- ↑ OED staff 2025
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 3–5, 10
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 10–14
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 3–5, 10
- ↑ Hawley 2016, পৃ. 165–169, 171–172
- ↑ McDaniel 2020, § 7 Meta-metaphysics
- ↑ Lowe 2005b, পৃ. 277
- ↑ Lowe 2005b, পৃ. 277
- ↑ Casati Fujikawa, Lead Section, §1. Existence as a Second-Order Property and Its Relation to Quantification
- ↑ Casati Fujikawa, Lead Section, §2. Existence as a First-Order Property and Its Relation to Quantification
- ↑ Van Inwagen 2023
- ↑ Nelson 2022, Lead Section, §2. Meinongianism
- ↑ Thomasson 2022, Lead Section
- ↑ Studtmann 2024, § 2. The Ten-Fold Division
- ↑ Thomasson 2022, § 1.2 Kantian Conceptualism
- ↑ Falguera, Martínez-Vidal এবং Rosen 2022, Lead Section, § 1. Introduction, § 3.5 The Ways of Negation
- ↑ Lowe 2005, পৃ. 683
- ↑ Maurin 2019, Lead Section
- ↑ Varzi 2019, Lead Section, § 1. 'Part' and Parthood
- ↑ Weatherson 2023, Lead section, § 3. Overpopulation
- ↑ MacLeod Rubenstein, Lead Section
- ↑ MacLeod Rubenstein, Lead Section, § 1c. The Problem of Universals
- ↑ MacLeod Rubenstein, Lead Section, § 2. Versions of Realism, § 3. Versions of Anti-Realism
- ↑ Brzović, Lead Section, § 3. Metaphysics of Natural Kinds
- ↑ Ney 2014, পৃ. 259–263
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. 149–150
- ↑ Goswick 2018, পৃ. 97–98
- ↑ Menzel 2023, Lead Section, § 1. Possible Worlds and Modal Logic
- ↑ Nuttall 2013, পৃ. 135
- ↑ Parent, Lead Section, § 2. Lewis' Realism, § 3. Ersatzism, § 4. Fictionalism
- ↑ Dainton 2010, পৃ. 245–246
- ↑ Hoefer, Huggett এবং Read 2023, Lead Section
- ↑ Dyke 2002, পৃ. 138
- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 179–181
- ↑ Miller 2018, Lead Section
- ↑ Miller 2018, Lead Section
- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 20–22
- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 20
- ↑ Wiland ও Driver 2022, § 3. Metaphysics
- ↑ Lorkowski, Lead Section, § 2. Necessary Connections and Hume's Two Definitions, § 4. Causal Reductionism
- ↑ Carroll ও Markosian 2010, পৃ. 26
- ↑ Ney 2014, পৃ. 231–232
- ↑ Tallant 2017, পৃ. 231–232
- ↑ Morton 2005, পৃ. 603
- ↑ McLaughlin 1999, পৃ. 684–685
- ↑ McLaughlin 1999, পৃ. 685–691
- ↑ Stubenberg ও Wishon 2023, Lead Section; § 1.3 Mind and Matter Revisited
- ↑ Weisberg, Lead Section, § 1. Stating the Problem
- ↑ Timpe, Lead Section
- ↑ Vihvelin 2022, § 5. Choice and the Consequence Argument
- ↑ O'Connor ও Franklin 2022, Lead Section, § 2. The Nature of Free Will
- ↑ Kirwan 2005, পৃ. 417–418
- ↑ Sleigh 2005, পৃ. 418
- ↑ Tallant 2017, পৃ. 1–4
- ↑ Lowe 2005a, পৃ. 926
- ↑ Dowden Swartz, Lead section
- ↑ Loux ও Crisp 2017, পৃ. xi, 2
- ↑ Koons ও Pickavance 2015, পৃ. 2–3
- ↑ Tahko 2015, পৃ. 151–152, 172–173
- ↑ Daly 2015, পৃ. 11–12, Introduction and Historical Overview
- ↑ Goldenbaum, Lead Section, § 1. The Geometrical Method
- ↑ Tahko 2015, পৃ. 177–178
- ↑ Jackson 1998, পৃ. 28–30
- ↑ Drummond 2022, পৃ. 75
- ↑ Ney 2014, পৃ. 30–31
- ↑ Ney 2014, পৃ. 37–38, 40
- ↑ McDaniel 2020, পৃ. 217–221
- ↑ Van Inwagen, Sullivan এবং Bernstein 2023, § 5. Is Metaphysics Possible?
- ↑ Van Inwagen, Sullivan এবং Bernstein 2023, § 5. Is Metaphysics Possible?
- ↑ Willaschek 2018, পৃ. 43
- ↑ Van Inwagen, Sullivan এবং Bernstein 2023, § 5. Is Metaphysics Possible?
- ↑ Manley 2009, পৃ. 4, 15, 32
- ↑ Manley 2009, পৃ. 28, 36
- ↑ Wheeler 2020, § 1. Biographical Sketch, § 2.2.1 The Question, § 3.3 Technology
- ↑ Rea 2021, পৃ. 215–216, 223–224
- ↑ Göhner Schrenk, Lead Section, § 1. What Is Metaphysics of Science?
- ↑ Healey 2016, পৃ. 356–357
- ↑ Hawley 2018, পৃ. 188–189
- ↑ Van Inwagen 2024, পৃ. 6–8
- ↑ Grütter ও Bauer-Messmer 2007, পৃ. 350
- ↑ Ney 2014, পৃ. 1–2, 18–20
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 183
- ↑ Perrett 2016, পৃ. 7–10
- ↑ Velez, Lead Section, § 3. The Buddha's Cosmology and Metaphysics
- ↑ Littlejohn, § 5. Fundamental Concepts in the Daodejing
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 183
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 184–185
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 185–187
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 188–189
- ↑ Brown, § 5. Metaphysics
- ↑ Lizzini 2021, Lead Section, § 3. Essence and Existence, § 4. Modality and Existence
- ↑ Hamlyn 2005, পৃ. 591
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 190
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 190–191
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 192
- ↑ Morris ও Brown 2023, § 3. Philosophical Project, § 5. Causation, § 6. The Idea of Necessary Connection
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 192–193
- ↑ Hancock 2006, পৃ. 193
- ↑ Houlgate 2005, পৃ. 106
- ↑ Grayling 2019, § Schopenhauer
- ↑ Griffin 2013, পৃ. 383, 396, 399–402
- ↑ Desmet ও Irvine 2022, § 6. Metaphysics
- ↑ Hamlyn 2005, পৃ. 592
- ↑ Broadbent 2016, পৃ. 145
- ↑ Hylton 2007, পৃ. 348
- ↑ Ahmed 2010, পৃ. 3
- ↑ Smith 2018, Lead Section, § 5. Phenomenology and Ontology, Epistemology, Logic, Ethics
- ↑ Reynolds, Lead Section
- ↑ Smith, Protevi এবং Voss 2023, Lead Section
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- "Metaphysics"। Stanford Encyclopedia of Philosophy।
- "Metaphysics"। Internet Encyclopedia of Philosophy।