সন্তদাস কাঠিয়াবাবা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শ্রী শ্রী সন্তদাস কাঠিয়া বাবা (১০ই জুন ১৮৫৯ - ১৯৩৫) ছিলেন হিন্দু ধর্মের নিম্বার্ক দার্শনিক, ধর্ম গুরু, নিম্বার্ক বৈষ্ণব ও প্রধান মহন্ত একজন আধ্যাত্মিক নেতা। নিম্বার্ক সম্প্রদায়ী শ্রী শ্রী ১০৮ স্বামী রামদাস কাঠিয়া বাবার একজন প্রধান শিষ্য।

শ্রী শ্রী সন্তদাস কাঠিয়া বাবা মহারাজ
উপাধিগুরু নিম্বার্ক আচার্য
ব্যক্তিগত
জন্ম
তারাকিশোর শর্মা চৌধুরী

১০ জুন, ১৮৫৯ (গঙ্গা দশহরার পবিত্র দিন)
মৃত্যু১৯৩৫(1935-00-00) (বয়স ৭৫–৭৬)
ধর্মহিন্দুধর্ম,নিম্বার্ক বৈষ্ণবধর্ম
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারত ব্রিটিশ ভারতীয়
শিষ্যবৃন্দনিম্বার্ক বৈষ্ণব ধর্ম
এর প্রতিষ্ঠাতানিম্বার্ক সম্প্রদায়ী দারানুবর্তী
দর্শনভগবান
ঊর্ধ্বতন পদ
গুরুশ্রী শ্রী রামদাস কাঠিয়া বাবা
কাজের মেয়াদ১৮৯৪-১৯৩৫
পূর্বসূরীনিম্বার্কাচার্য্য
উত্তরসূরীধনঞ্জয় দাস কাঠিয়াবাবা
পদ
  • নিম্বার্ক সন্ন্যাসী
  • নিম্বার্ক গুরু আচার্য্য
সম্মানকুম্ভ মেলার প্রেসিডেন্ট মহন্ত

জন্ম ও শৈশব[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী সন্তদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত ব্রজ বিদেহী মহন্ত বৈষ্ণব চতুঃসম্প্রদায় শ্রীমহন্ত শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী সন্তদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের নাম বৈষ্ণব সমাজে প্রাতঃস্মরণীয়। এই ঋষি কল্প ক্ষণজন্ম পুরুষ ,   হবিগঞ্জ জেলার (সাবেক সিলেট জেলা  সে সময়ে লঙ্করপুর মহকুমা ছিল, তারপর হবিগঞ্জ মহকুমা হয়, বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলা)  লাখাই উপজেলা হাওর অঞ্চল বামৈ গ্ৰামে সম্ভান্ত জমিদার ব্রাহ্মণ চৌধুরী পরিবারে জন্ম গ্ৰহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম শ্রীহরকিশোর চৌধুরী মাতার নাম শ্রীগিরিজাসুন্দরী দেবী। সন্তদাসজীর আবির্ভাব ( জন্ম ) ১৮৫৯ সালে ১০ই জুন শুক্রবার। ১২৬৬ বঙ্গাব্দে  ২৮ জৈষ্ঠ্য , জৈষ্ঠ্য শুক্লা দশমী দশহরা পূণ্য তিথিতে। তাঁহার পিতা ছিলেন যেমন তেজস্বী পুরুষ, তেমনি পরম শুদ্ধাচারী বৈষ্ণব। পিতার এই দুইটি গুনে সাধক সন্তদাসজী বাবাজী মহারাজের জীবনকে পরিপূর্ণ প্রভাবিত করিয়াছিল। তাঁহার শৈশবের নাম ছিল তারাকিশোর চৌধুরী। বাল্যকাল হইতেই তাঁর ছিল তীব্র বিদ্যানুরাগ। গ্ৰামের স্কুলে বিদ্যা আরম্ভ হয়।  শিক্ষাঃ লস্করপুর মহকুমা ইংরেজি স্কুলে লেখাপড়া করেন। জানা মতে এই স্কুলই  পরবর্তীতে হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হয়। ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দ ১২৮১ বঙ্গাব্দে ১৪ বছর বয়সে শ্রীহট্ট শহরের গভর্মেন্ট হাইস্কুল হইতে প্রবেশিকা পরীক্ষায় আসাম প্রদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া তিনি১৫  টাকা বৃত্তি পাইয়াছিলেন। মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হইলেন। সেখানে পড়িয়া তিনি এফ এ পরীক্ষায় অতি উচ্চ স্থান অধিকার করিয়া ২০ টাকার একটি বৃত্তি লাভ করেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি হন। বিএ পরীক্ষা দিলেন এবং ভগবত কৃপায় উত্তীর্ণ হইয়া গেলেন। ১৮৮৩ সনে বি,এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন[১][২]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

সন্তদাসজীর জীবন চরিতামৃত, বামৈ গ্ৰামে বাল্য লীলা। সন্তদাসজীর পূর্বাশ্রমের নাম তারাকিশোর চৌধুরী। সন্তদাসজীর পিতা শ্রী হরকিশোর চৌধুরী মহাশয় নিরামিষাশী  একাহারী বৈষ্ণব ভাগবত গৌতম ক্ষত্রিয় বৈদিক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন বাল্যকালে সন্তদাসজী তাঁহার পিতার এক জ্যাঠাইমার দ্বারা লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। তিনি এই ঠাকুমার মুখে রামায়ণ মহাভারত ও পুরাণাদি গল্প শ্রবণ করিতেন এবং শাস্ত্র বিষয়ে তাঁহার অনুরাগ বাল্যকালেই পরিলক্ষিত হইত। জয় বৎসর বয়সে তাহার বিদ্যারাম্ভ হয়। তিনি বাল্যকালে অতিশয় চঞ্চল প্রকৃতির, কিন্তু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং মেধাবী ছিলেন। এই সময় হইতেই তিনি পিতা, জ্যেষ্ঠতাত প্রভৃতি নিকট হতে সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি এবং বাড়ির অন্যান্য ছেলেদের সহিতএই বিষয়ে প্রতিযোগিতা হইত। খেলাধুলা সাঁতার কাটা, হাডুডু খেলা, গাছে চড়া ইত্যাদিতে তিনি খুব আনন্দ পাইতেন এবং অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁহার পিতা তাঁহার সামান্য দোষ ত্রুটির জন্য কঠোর শাসন করিতেন, এজন্য তিনি পিতাকেক অত্যন্ত ভয় করিতেন এবং তাঁহাকে যতদূর সম্ভব এড়াইয়া চলিতেন। নয় বৎসর বয়সে তাহার মাতৃবিয়োগ হয় মৃত্যুকেও জন্মের মত তাহার নিকট স্বাভাবিক উদ্ভিদ এজন্য জননী অগ্নিবীর তাহার কোন দুঃখ নাই বলিয়া তিনি বলেছেন। তারপর তারাকিশোর বাবু শ্রীহট্টে ফিরিয়া আসিলেন এবং খরচ পত্রের জন্য সন্তদাসজী মহারাজ কে টাকা দেওয়া কিছুদিনের জন্য বন্ধ করলেন।পরে কি ভাবিয়া পুনরায় একসঙ্গে তিন-চার মাসের খরচের টাকা সন্তদাসজী মহারাজের জন্য পাঠাইয়া দিলেন ।শ্রীশ্রী অন্নদা দেবীকে তাঁহার পিতার সঙ্গে  সন্তদাসজীর ইচ্ছা অনুযায়ী পিত্রালয়ে চলিয়া গেলেন।একদিকে ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণে অপরদিকে পারিবারিক অশান্তি সন্তদাসজীর স্বাস্থ্যভঙ্গ হইল এবং পড়াশুনার অত্যন্ত ক্ষতি হইতে লাগিল। দুর্বল শরীরে প্রস্তুত না হইয়া কোন রকমে বিএ পরীক্ষা দিলেন এবং ভগবত কৃপায় উত্তীর্ণ হইয়া গেলেন। বিএ পাস করিবার পর সন্তদাসজী মহারাজ এম এ পরীক্ষা ও প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য প্রস্তুত হতে চেষ্টা করেন, এই দুরবস্থার মধ্যে তাহা অতিশয় শ্রমসাধ্য বলিয়া পরে তিনি শেষোক্ত সংকল্প পরিত্যাগ করেন। ইহার পর ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারর্থে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি আনন্দমোহন বসু স্থাপিত সিটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে তিনি আনন্দমোহন বসু স্থাপিত সিটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। (পুর্ব পর্বের তৎপর কোন এক ব্রাহ্ম বন্ধুর অনুরোধে জয়নগর-মজিলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। উক্ত স্কুলে টেস্ট পরীক্ষার পর চাকুরী ত্যাগ করিয়া তিনি কলকাতায় এম এ পরীক্ষা দিতে আসেন। তখনো পরীক্ষা  ২ । ৩ মাস বাকি ছিল। কিন্তু দর্শন শাস্ত্রে এম এ পরীক্ষা দিবার সংকল্প ত্যাগ করিলেন না। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া প্রত্যহ প্রায় ১৫ ।১৬ ঘণ্টা পড়িতেন। যখন যাহা পড়িতেন  সংক্ষেপে তাহার সারমর্ম লিখিয়া রাখিতেন। পড়া আরম্ভ করিবার পূর্বে পূর্ব পাঠের পুনরালোচনা করিয়া নতুন  পাঠ আরম্ভ করিতেন।ইহাতে পাঠের  অগ্রগতি কম হলেও যাহা পড়িতেন  তাহা আয়ত্ত হইয়া যাইত।  পড়িতে পড়িতে মস্তিষ্ক গরম হলে সন্ধ্যার সময় সংগীতজ্ঞ বন্ধুর নিকট তবলা বাজাইয়া গান শিক্ষা করিতেন। ইহাতে মন প্রফুল্ল  হত এবং ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পুনরায় পাঠে মনোনিবেশের জন্য মস্তিষ্কের উপযোগীতা অনুভব করিতেন। এইভাবে পড়িয়াও সময়াভাবে পরীক্ষার সকল পুস্তক তিনি শেষ করিতে পারিলেন না। প্রাশ্চাত্য দর্শনের মূল মর্ম তাঁহার অধিগত হইল এবং মিল, হ্যামিল্টন প্রভৃতির দর্শন বিষয়ক উক্তিতে কোথায় কোথায় ভুল আছে বলিয়া তাঁহার নজরে পড়িতে লাগিল। এই অবস্থায় ১৮৮০ সনে এম এ  পরীক্ষা দিয়ে তিনি ফিলসফিতে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হইলেন। সেই বছর ফিলসফিতে আর কেহ পাস করে নাই। পর্ব—৯ সন্তদাসজী মহারাজ এম এ পরীক্ষার পর পুনরায় সিটি স্কুলে শিক্ষকতা গ্রহণ করেন। নির্দিষ্ট অধ্যাপনা কর্ম ব্যতীত ছাত্রদিগকে নীতিশিক্ষা দিবার এবং তাদেরকে চরিত্র গঠনের দিকে লক্ষ্য রাখিবার ভার ও তাঁহার উপর ছিল। ছাত্রদের সঙ্গে ইহাতে তাহার ঘনিষ্ঠতা জন্য এবং ক্রমশঃ তাহার নৈতিক চরিত্র গুনে ছাত্রদের উপর তাহার প্রভাব ও যোগ্যতার খ্যাতি বর্ধিত হইল। সিটি স্কুলে এফ এ ক্লাস খোলার পর তিনি তর্ক শাস্ত্র ও পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক নিযুক্ত হলেন। পিতার অভিপ্রায় অনুসারে তিনি এক বৎসর প্রেসিডেন্সি কলেজে এবং পর বৎসর মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।  ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে সিটি কলেজে  সন্তদাসজী  মহারাজ অধ্যাপনান্তে তথাকার  ল ক্লাসে যোগদান করিতে লাগিলেন। সিটি স্কুলে কাজ লইবার পর সন্তদাজী মহারাজ  ১৮৮০ সনে পূজার ছুটির সময় একবার দেশে গেলে তিনি ব্রহ্মজ্ঞানী, ম্লেচ্ছ  বলে কেহ কেহ তাঁহাকে ঘৃণার চোখে দেখতে লাগলো। তিনি এজন্য ঠাকুর ঘরে রান্নাঘরে কিংবা খাইবার ঘরে যাইতে না। বাড়িতে আসিয়া পিতার সহিত সাক্ষাৎ হইল না। ১৮৮৩ সনে বি,এল পরীক্ষা দিয়ে সন্তদাসজী মহারাজ সস্ত্রীক সহ স্ব গ্ৰাম, বামৈ গ্ৰামে ফিরে আসেন। শ্রীযুক্ত বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভু সন্তদাসজীর মতই হিন্দুধর্ম ত্যাগী এবং ব্রাহ্ম ধর্মে ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মসমাজের এক সভায় আহূত হয়ে গয়ায় গিয়েছিলেন। গোয়ায় আকাশ গঙ্গা পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে তিনি কতিপয় সাধুর সঙ্গে মিশে তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং গৈরিক বস্ত্র পরে কিছুদিন সেখানে সাধন-ভজন করতে থাকেন। এই সময় সৌভাগ্য বশতঃ তথায় মানস সরোবর হতে এক পরমহংসজী এসে বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামীজীকে দীক্ষা দান করেন। দীক্ষার পর তিনি এক গৈরিক বসন পরিহিত সম্পূর্ণ নতুন মানুষরূপে কলিকাতা ফিরে আসেন। এই সকল ঘটনা জানতে পেরে সন্তদাসজী মহারাজ মনে করলেন যে, ওকালতি একটি স্বাধীন ব্যবসা এবং এই ব্যবসাতে থাকলে তিনি ইচ্ছামত পশ্চিমে বেড়াইতে পারিবেন এবং সৌভাগ্য বশতঃ বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামীর  মত কোন এক সাধুর  কৃপা লাভ করতে পারবেন। এই ভরসায়  সন্তদাসজী মহারাজ ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে জানুয়ারি মাসে বি,এর পরীক্ষা দিয়ে সস্ত্রীক সহ স্বগ্ৰাম বামৈ গ্ৰামে ফিরে আসেন। শ্রীহট্টে ওকালতি ব্যবসায়ে তাঁহার প্রভূত প্রসার লাভ করেন। কিছুদিন পরই সন্তদাসজী মহারাজ বি,এল পাশ করেছেন, খবর পাইলেন।এই সময় হবিগঞ্জের শ্রীরামানন্দ নামে একজন জমিদার জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে সন্তদাসজী মহারাজের শরনাপন্ন হলে তিনি হাইকোর্ট হইতে সনদ না পাওয়া সত্ত্বেও আসামি পক্ষ অবলম্বন করে এমন কৃতিত্বের সহিত মামলা চাইলেন যে, বিচারক ঐ জমিদারকে অব্যাহতি দিলেন। এইরূপ পর পর আরও দুইটি তিনটি জটিল মোকদ্দমায় আসামি পক্ষ অবলম্বন করে সন্তদাসজী মহারাজ জয় লাভ করলে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। সকলে তাকে শ্রীহট্টে ওকালতি করিবার পরামর্শ দিলে ৩ -৪ বছর কাল সেখানে ওকালতি করেন এবং অনেক অর্থ উপার্জন করেন।

দীক্ষা[সম্পাদনা]

জগন্নাথ ঘাটের স্থানে তিনি গঙ্গার উদ্গম স্থান গঙ্গোত্রী তাঁর সামনে ভেসে উঠল ও তাতে বিরাজমান হর-পার্বতী তাঁকে দর্শন দিলেন।শঙ্কর ভগবান তখন তাঁকে একটি একাক্ষরী বীজ মন্ত্র প্রদান করলেন এবং সেই মন্ত্র জপের প্রভাবে তাঁর সদ্গুরু লাভ হবে – এই রকম আশ্বাসন দিয়ে তাঁরা অন্তর্হিত হলেন। তখন হিমালয়ে সেই গোমুখ গঙ্গোত্রীর দৃশ্যও অন্তর্ধান হল। তিনি সেই বীজ মন্ত্র খুব নিষ্ঠার সাথে জপ করতে লাগলেন। সদ্গুরুর অন্বেষণে তিনি বিভিন্ন তীর্থ ঘুরতে লাগলেন এবং ক্রমেই তিনি তাঁর একটি বন্ধুর সহিত প্রয়াগ কুম্ভ মেলায় এসে পৌঁছালেন। এখানে তাঁর সাক্ষাৎকার তাঁর ভাবী গুরুদেব শ্রীশ্রী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের সাথে হলেও তিনি তাঁকে গুরুত্বে বরণ করবেন কি না সেই বিষয়ে সন্দিগ্ধ ছিলেন[৩]। তিনি শ্রীশ্রী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের কিছু কিছু অলৌকিক ব্যাপার দর্শন করলেন কিন্তু সম্পূর্ণরূপে সংশয়হীন হতে পারেন নি। তারপরে তিনি চৈত্র মাসে বৃন্দাবন গেলেন আর এবার তিনি কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের অতি নিকট থেকে তাঁর কার্য্য কলাপ দর্শন করে প্রায় হতাশ হয়ে গেলেন। শ্রীশ্রী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজকে ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ মনে করা ত দুরের কথা, তাঁকে শ্রী তারাকিশোর বাবু একটি সাধারণ বৃদ্ধ গ্রাম্য সাধু বলে মনে করলেন। কিন্তু যখন তাঁর অলৌকিক ক্রিয়া কলাপ মনে আসত তখন তিনি নিজের সিদ্ধান্ত ভুল কি ঠিক কিছুই বুঝতে পারতেন না। এই সংশয়গ্রস্ত মন নিয়ে তিনি কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলেন। কলকাতায় এক রাত্রিতে যখন তিনি বাড়ীর ছাদে শয়ন করছিলেন, তখন হঠাৎই নিদ্রাভঙ্গ হলে তিনি উঠে বসলেন। তিনি দেখলেন যে শ্রীশ্রীরামদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ আকাশ মার্গে আসছেন এবং ক্ষণকালের মধ্যেই তিনি সেই ছাদে তাঁর নিকট অবতীর্ণ হলেন। তার পর কাঠিয়া বাবাজী মহারাজ তাঁর কর্ণে একটি মন্ত্রোপদেশ প্রদান করে পুনরায় আকাশ মার্গে প্রস্থান করলেন।  শ্রী তারা কিশোর শর্মা চৌধুরীর মনে শ্রীশ্রী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের সম্বন্ধে অন্য কোনও সন্দেহ থাকল না। তাঁর সমস্ত দ্বিধা সেইক্ষণেই দূর হয়ে গেল এবং অভিলাষিত সদ্গুরুর আশ্রয় লাভ করেছেন বলে তিনি নিজেকে কৃতার্থ মনে করলেন। এইভাবে অলৌকিক ভাবে দীক্ষা পাবার পরেও তিনি বৃন্দাবনে ১৮৯৪ সালে জন্মাষ্টমীর দিনে লৌকিক ভাবে সস্ত্রীক দীক্ষা গ্রহণ করলেন[৪]

ধর্ম সাধনা[সম্পাদনা]

একদিন সিটি কলেজ ছুটি শেষে বিকালে তিনি ব্রাহ্ম গুরু শ্রীযুক্ত সেন মহাশয়ের নিকট গেলে তিনি সন্তদাসজী  মহারাজের শরীরে প্রাণায়ামের দ্বারা শক্তি সঞ্চার করিতে লাগিলেন। সন্তদাসজী মহারাজ ও প্রাণায়াম করিতে থাকেন, সেইদিন তাঁহার মূলাধার  হইতে  দ্বিদল পর্যন্ত ছয়টি চক্রই ভেদ  হইয়া গেল। এইরূপে অল্প সময়ের মধ্যে একেবারে ষটচক্র ভেদ  অন্য কাহাও  হয় নাই। তারপর হইতে সন্তদাসজী আনন্দচিত্তে এই সাধন অভ্যাস করতে থাকেন। তিনি তখনও ব্রাহ্মসমাজে রীতিমত যোগদান করতঃ ব্রাহ্মণের সহিত উপাসনা করিতে থাকেন। এইসময় তাঁহার পিতা পুত্র বধুকে লইয়া কলকাতায় আসেন এবং একটি বাসায় তাঁহাদিগকে লইয়া অবস্থান করেন। শ্রীযুক্ত বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয় ও তাঁহার পরে শ্রীযুক্ত জগৎবাবুর নিকট যোগসাধন লাভ করেন। সন্তদাসজী মহারাজ যোগীসম্প্রদায়ে প্রবেশ করিয়া ১২  বৎসর যোগসাধন অভ্যাস করিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি কিছু যোগ বিভূতি লাভ করেছিলেন বটে, কিন্তু তিনি ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার বা মোক্ষলাভের কোন সম্ভাবনা দেখিতে পাইলেন না। অতঃপর পরপর কতগুলি ঘটনায় সন্তদাসজী মহারাজের ভাবান্তর উপস্থিত হইল এবং তিনি হিন্দু ধর্মের দিকে ক্রমশ আকৃষ্ট এবং সদ্গুরু অন্বেষণ করতে থাকেন। পরপর কতকগুলি এ ঘটনায় পর সন্তদাজী মহারাজের ভাবান্তর উপস্থিত হইল। এবং তিনি পুনঃরায় হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। সদ্গুরু অন্বেষণ করিতে থাকেন।(১) ভারতবর্ষীয় কোন এক মহাপুরুষ আমেরিকায় কর্নেল অলকট্ নামে এক ভদ্রলোকের শয়ন কক্ষে অলৌকিকভাবে আবির্ভূত হইয়া তাঁহাকে ভারতবর্ষে আসিবার নির্দেশ দেন এবং তাহার বিশ্বাস জন্মাইবার জন্য   মহাপুরুষের মাথার পাগড়ী টি শয়ন কক্ষে রাখিয়া আসেন ।তৎপর তিনি অদৃশ্য হইয়া যান। অতঃপর অলকট্ সাহেবের ভারতবর্ষে আসিয়া ঘটনাচক্রে পাহাড়ের গুহায় ঐ মহাপুরুষের দর্শন পান। এই সংবাদ  সন্তদাসজী  মহারাজের চিত্তে রেখা পাত করিল এবং ভারতীয় যোগী মহাপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধার উদ্রেক হইল ।

ধর্মীয় চিন্তা[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী সন্তদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের জীবন লীলামৃত। ছাত্র জীবন ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়।তিনি বাল্যকাল হইতেই চিন্তাশীল ও সত্যানুসন্ধিৎসু ছিলেন। অধ্যাত্মতত্ত্ব ধর্ম সম্বন্ধে তাঁহার বিশেষ আগ্রহ ছিল  । তিনি প্রথম বার্ষিক শ্রেণীতে পড়ার সময় হিন্দুয়ানী ত্যাগ করিয়া একেশ্বরবাদী হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি এক হরিসভা ও কীর্তনের যোগদান করতেন ও কীর্তনের সময় তাঁর খুব ভাব হত এবং তাঁকে স্পর্শ করলে তারও বাবা বেশ হত। যোগীসম্প্রদায়ের অর্জিত সন্তদাসজীর সাধনা শক্তি। কিন্তু তিনি সাধন বিষয় কা,কেও প্রকাশ করতেন না। তিনি রাত্রিতে সাধন-ভজন করতেন। এই সময় অনেক দলাদলির পর সন্তদাসজী মহারাজ কর্তব্যবোধ ও পিতৃ নির্দেশে পণ্ডিতগণের ব্যবস্থা লইয়া প্রায়শ্চিত্ত করে হিন্দু সমাজে উঠেন।

জীবন কাহিনী[সম্পাদনা]

শ্রীদ্বিজদাস নামে তাহার এক বন্ধু কলিকাতার মুসলমান পাড়ার এক ছাত্রদের মেসে খুব পীড়িত হইয়া পড়িয়াছিলেন শুনিয়া সন্তদাসজী মহারাজ তাঁকে দেখতে যান। পীড়িত বন্ধুটি জ্বরে শয্যাগত ।অতিশয় কাতর ও ম্রিয়মাণ হইলেও তিনি সন্তদাসজী মহারাজ কে জানান তিনি পীড়িত হইলেও ম্যাচের কেউই তাঁকে নিজ নিজ পড়া ছাড়িয়া সেবা-যত্ন না করায়, তিনি রোগের যাতনায় আত্মহত্যা পর্যন্ত করিতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু কেবল ভগবত উপাসনায় শান্তি লাভ করিয়া জীবিত আছেন এবং ক্লেশকে ক্লেশ বোধ করিতেছেন না । কথা প্রসঙ্গে বন্ধুটি  সন্তদাসজী মহারাজকে আরো বলেন যে, এই অসুখের সময় সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তিনি ভগবত কৃপা বিশেষভাবে অনুভব করেছেন, যাহা অন্য সময় এই উপলব্ধি করেন না । তাঁহার কথা শুনিয়া সন্তদাসজী মহারাজের ভাবান্তর উপস্থিত হইল। ভগবচ্চিন্তার ফলে বন্ধুটি রোগ যন্ত্রণাকে যন্ত্রণা বলিয়া বোধ করিতেছেন না। বহু বহু মহাজন' পূর্বে বলিয়া গিয়েছেন যে ভগবত কৃপা তাঁহারা অনুভব করেছেন তাতে শান্তি লাভ করিয়াছে । ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দেহ পোষন করাতে তাঁহার অশান্তি বৃদ্ধি পাইতেছে বলিয়া সন্তদাসজী মহারাজের মনে হল।কোন কোন মহাত্মা যে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ভগবৎ দর্শন লাভ করিয়াছে তাহা ও তিনি শুনিয়াছন তাঁহাদের কথা অবিশ্বাস করার কোন কারন নাই। অতএব তিনি নিরীশ্বরবাদকে অন্তরে পোষন করা সঙ্গত কিনা এ বিষয়ে সন্দিহান  হইলেন।

শেষ জীবন[সম্পাদনা]

১৯৩৫ সালে সজ্ঞানে সধামে যাত্রা করেন। বৃন্দাবন কাঠিয়া বাবা কা স্থান আশ্রম, ভারত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Santadas Kathamrita"www.exoticindiaart.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-৩১ 
  2. "Sadgurus - Sages - Saints"www.sadgurus-saints-sages.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-৩১ 
  3. Wikitaips (২০২১-০৮-১৫)। "English: This is the most famous photograph of Santadas Kathiababa, বাংলা: সন্তদাস কাঠিয়াবাবা ভারত কাঠিয়াবাবা অাশ্রমে, हिन्दी: संतदास काठियाबाबा भरत काठियाबाबका स्थान आश्रम" 
  4. "SANTADAS BABA ASHRAM - Guru Darshan Gallery"sites.google.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-৩১