কৈবর্ত বিদ্রোহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
কৈবর্ত বিদ্রোহ
তারিখ১০৭৫-১০৮২ খ্রিষ্ট্রাব্দ
অবস্থানবরেন্দ্র, দিনাজপুর, বঙ্গ (বর্তমানে বাংলাদেশ
ফলাফল
অধিকৃত
এলাকার
পরিবর্তন
বরেন্দ্র স্বল্প সময়ের জন্য পাল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়
সেনাধিপতি
  • দিব্য
  • রুদোক
  • ভীম
  • রাজা দ্বিতীয় মহীপাল
  • রামপাল
  • কৈবর্ত বিদ্রোহ বা বরেন্দ্র বিদ্রোহ বলতে পাল কর্মচারী দিব্যের নেতৃত্বে শুরু হওয়া কৈবর্ত সম্প্রদায়ের তৎকালীন দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭৭) পাল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিপ্লবকে বোঝানো হয় যা ১০৮০ সালে হয়েছিল।এটিকে বাংলাদেশ এমনকি ভারতবর্ষের প্রথম সফল বিদ্রোহ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে কৈবর্ত নেতারা বরেন্দ্রকে নিজেদের অধীনে আনতে সক্ষম হন। ১০৮২ খ্রিস্টাব্দে পাল রাজা রামপাল সামান্তরাজাদের সহযোগিতায় পরবর্তী কৈবর্ত নেতা ভীমকে হারিয়ে পিতৃভূমি বরেন্দ্রীকে নিজেদের দখলে আনতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে বাঙ্গালিদের প্রথম রাষ্ট্রবিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে।

    প্রেক্ষাপট[সম্পাদনা]

    কৈবর্তেরা মূলত জেলে শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। পূর্বপুরুষ থেকে তারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। অন্যদিকে পাল রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন বলে ধর্মীয় দিক থেকে অহিংস নীতির কারণে তারা মাছ মাংস ভক্ষণের বিরোধী ছিলেন। এবং এ সমস্ত পেশাকে তারা নিরুৎসাহিত এমনকি বাধাগ্রস্থও করতেন। এর ফলে সমাজে কৈবর্তদেরকে নানাভাবে নির্যাতিত হতো। এছাড়া সিংহাসন আরোহণের সময় পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপাল তার দুই ভাই দ্বিতীয় শুরপাল ও দ্বিতীয় রামপালকে বন্দী করেন। ফলে বন্দী দুই ভাইয়ের কিছু স্থানীয় সামন্তও তার বিরুদ্ধে মহীপালের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

    পাল শাসনকে সাধারণত “স্বর্ণযুগ” বলে অভিহিত করা হয়। দেবপাল, ধর্মপালের শাসনের স্বর্ণযুগ পেড়িয়ে যখন পাল শেষ দিকে আসতে থাকে তারা তাদের পুরনো গৌরব হারিয়ে ফেলে। ধীরে তাদের শাসন দুর্বল হতে থাকে ও অরাজকতা সৃষ্টি হতে থাকে। তাদের এই অরাজকতা থেকে রক্ষা পাওয়াই ছিল কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রধান উদ্দেশ্য।

    সময়কাল[সম্পাদনা]

    এই বিদ্রোহ হয়েছিল পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় মহীপাল ও দ্বিতীয় রামপালের শাসন আমলে ১০৮০ খ্রিস্টাব্দে।

    বিপ্লব[সম্পাদনা]

    পাল কর্মচারী দিব্য কৈবর্তদের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহের ডাক দেন। তারা এতে সাড়া দেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের বরেন্দ্রী অংশ অধীনে আনতে সক্ষম হয়। কৈবর্তের নৌকা চালাতে পারদর্শী বলে তারা নৌ যুদ্ধকেই প্রাধান্য দেয়। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল আক্রমণ করতে গিয়ে যুদ্ধে নিহত হয় এবং এর ফলে কিছু দিনের জন্য হলেও পাল সেনারা পিছু হাঁটতে বাধ্য হয়। এর মধ্যেই দিব্যর নেতৃত্বে বরেন্দ্রীকে রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা হয়। দিব্যর মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার ছোট ভাই রুদোক ও তারপরে রুদোক পুত্র ভীম। ভীম নিজেকে একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ভীম যুদ্ধ বিধ্বস্ত বরেন্দ্রীকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। বাংলাদেশের দিনাজপুরের কৈবর্ত স্তম্ভ আজও এই রাজবংশের স্মৃতিস্বরূপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। বর্তমান মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতেও একটি বিজয়স্তম্ভ ছিল বীর দিব্যক ভীমের কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিস্বরূপ। তা পাল রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর ভেঙ্গে ফেলা হয়।[১]

    বরেন্দ্রকে পুনরুদ্ধার[সম্পাদনা]

    রামপাল সিংহাসন লাভের পর ভীমের জনপ্রিয়তা, দক্ষতা, উদারতা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হোন। আরও ভূমি হারানোর ভয়ে প্রতিবেশী ও সামান্তরাজাদেরকে অপরিমিত অর্থ ও ভূমি দান করেন এবং যুদ্ধের জন্য তারা সহযোগিতা করতে রাজি হয়। সম্মিলিত সৈন্যের সাথে ভীমের নবগঠিত রাষ্ট্রের পেরে ওঠা অনেকটা অসম্ভব ছিল। গঙ্গার উত্তর তীরে যুদ্ধ করতে গিয়ে জীবিত অবস্থায় ভীম বন্দিত্ব বরণ করেন। ভীমের অগণিত রাজকোষ পাল সেনারা লুণ্ঠন করে। কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনে রামপাল অন্যান্য সামন্ত রাজাদের সাহায্য পেয়েছিলেন একথা সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে উল্লেখ আছে।

    ভীম বন্দী হওয়ার পর ভীমের অন্যতম সুহৃদ, বিশ্বস্ত হরি পরাজিত সৈনিকদের একত্রিত করেন এবং রামপালের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধে লড়ার অঙ্গীকার করেন। হরির নেতৃত্বে যখন সেনারা যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন রামপাল তার স্বর্ণকলস উজাড় করে দেয়ার মাধ্যমে তাদের বশীভূত করতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমেই বরেন্দ্রীর স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন চিরতরের জন্য মৃত্যু লাভ করে এবং পুনরায় পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

    ভীমের বিচার[সম্পাদনা]

    কৈবর্তেরা যেন আর কখনো রুখে দাঁড়াতে না পাড়ে সে জন্য তারা কৈবর্তে নেতাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হয়। ভীমের পরিবারকে তার সামনে হত্যা করা হয় এবং ভীমকেও পরবর্তীকালে হত্যা করা হয়। পাল রাজারা এই বিদ্রোহ দমনে চরম নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিলেন।[১]

    তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

    1. সম্পাদনা অরূপ চন্দ্র (২০১৪)। বাংলায় হাজার বছরের কৃষক বিদ্রোহ ও মুর্শিদাবাদ। বহরমপুর: বাসভূমি প্রকাশন। পৃষ্ঠা ৭৩। 
    Bibliography