সমকামিতা ও মনোবিজ্ঞান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

বিগত শতাব্দীগুলোতে, মনোবিজ্ঞান ছিল সমকামিতাকে একটি স্বতন্ত্র দশা হিসেবে গবেষণা করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান পন্থা। ২০শ শতাব্দী জুড়ে, মনোবিজ্ঞানের সাধারণ মানদণ্ড অনুযায়ী রোগনির্ণয়ক আদর্শসমূহের পরিভাষায় সমকামিতাকে মানসিক অসুস্থতা হিসেবে দেখা হত। গবেষণায় এই সিদ্ধান্ত যাচাইকরণ শুরু হওয়ার পর, তা সমকামিতাকে অসুস্থতা হিসেবে যথেষ্ট প্রমাণাদি উদ্ভাবনে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আচরণিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বহু অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ একে মানসিক অসুস্থতা হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে আবদ্ধ থাকেন। পরবর্তী বছরগুলোতে, অনেকেই এই সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে দাবি করতেন, এবং মানসিক অসুস্থতার ডিএসএম নির্দেশিকার সঙ্গায়নেও প্রচলিত প্রভাবশালী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা-ভিত্তিক বিশ্বাস এবং পুনর্বাসন সংস্থা ও অপরাধমূলক আইনি বিচার-সংস্থাগুলোর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।[১]

১৯৭০-র পর থেকে, বিশ্বজুড়ে বহু স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং আচরণগত-সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ সমকামিতাকে মানব যৌন অভিমুখীতার একটি স্বাস্থ্যকর প্রকরণ হিসেবে দেখেন, যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ একে অসুস্থতা হিসেবে বহাল রাখেন।[২] ১৯৭৩ সালে, সমকামী অধিকার সংগঠনগুলোর ব্যাপক লবিং-এর ফলশ্রুতিতে[৩] মার্কিন মনোচিকিৎসক সমিতি মানসিক অসুস্থতা হিসেবে সমকামিতার সংজ্ঞাকে বাতিল করে।[৪] মার্কিন মনোচিকিৎসক সমিতির প্রতিনিধি কাউন্সিল ১৯৭৫ সালে[৫] এবং এরপর অন্যান্য স্বাস্থ্য ও মনস্তত্ব বিষয়ক বৃহত্তর সংস্থাগুলো উক্ত নতুন সংজ্ঞা অনুসরণ শুরু করে, যার মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০ সালে মানসিক বিকৃতির তালিকা থেকে সমকামিতাকে বাতিল করে দেয়।[৬]

বর্তমান বিশেষজ্ঞদের মতে, সমকামিতা কোন মানসিক ব্যাধি নয়। কয়েক দশক ধরে গবেষণা ও ক্লিনিকের অভিজ্ঞতার ফলে প্রধান প্রধান স্বাস্থ্য ও[৭] মনোস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, এসব প্রবৃত্তি মানুষদের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতারই প্রতিনিধিত্বমূলক।[৮] নারী ও পুরুষের মধ্যেকার সম্পর্কের মতোই সমলিঙ্গীয় সম্পর্কও স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর।[৯]

মনোবিদ্যায় বৃহত্তর গবেষণা[সম্পাদনা]

সমকামিতা নিয়ে বৃহত্তর মনস্তত্ব বিষয়ক গবেষণাকে পাচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে:[১০]

  1. কি কারণে কিছু লোক নিজের সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে?
  2. কী কারণে সমকামিতামুলক যৌন অভিমুখিতার প্রতি বৈষম্য করা হয় এবং বৈষম্য কিভাবে প্রভাবিত হয়?[১১]
  3. ব্যক্তি সমকামী হলে সেটা কী তার স্বাস্থ্যে, মানসিক দক্ষতায় অথবা জনস্বাস্থ্যে কোনো প্রভাব ফেলে?
  4. What determines successful adaptation to rejecting social climates? Why is homosexuality central to the identity of some people, but peripheral to the identity of others?[১২]
  5. সমকামী মানুষের সন্তান কিভাবে বেড়ে উঠবে?

মনস্তাত্বিক এই গবেষণাগুলো সমকামী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন অজ্ঞতামুলক কার্যক্রমকে প্রতিহত করার জন্য সবসময় গুরুত্ববহন করে এসেছে, গুরুত্ববহন করেছে সাধারণ এলজিবিটি মানুষদের অধিকার আদায়ে।[১০]

সমকামিতার কারণ[সম্পাদনা]

সমকামিতার বিকাশের ব্যাখ্যা করার জন্য বহুবিধ তত্ত্ব এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত হয়েছে, তবে সমকামিতা কেন হয়, বা তার উৎস কী, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনও সার্বজনীন তত্ব নেই।[১৩]

বৈষম্য[সম্পাদনা]

সমকামি বিরোধী এ মনোভাব এবং আচরণ ( যাকে মাঝে মাঝে 'হোমোফোবিয়া' বা 'হেটোরোসেক্সুয়াল' নামে অভিহিত করা হয়) মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাগুলির একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের গবেষণাগুলোতে; সমাজে নারী সমকামির তুলনায় পুরুষ সমকামীদের প্রতি যে বৈরী আচরণ সচরাচর পরিলক্ষিত হয়, তাই ফুটে উঠেছে।[১০] যারা সমকামীদের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে পরিচিত নন, সমকামী-বিরোধী মনোভাব মুলত তাদের মধ্যেই দেখা যায়।[১৪] There is also a high risk for anti-gay bias in psychotherapy with lesbian, gay, and bisexual clients.[১৫]এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব সমকামী থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সেসব সমকামীদের প্রায় অর্ধ শতাংশই তাদের যৌন অভিমুখিতার জন্য সমাজের পুরুষ দ্বারা (যেমন: তার পরিবারের পুরুষ সদস্য, তার পুরুষ বন্ধুবান্ধব বা পুরুষ প্রতিবেশী) মৌখিক বা শারীরিকভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছিল, এই নিগ্রহের সাথে স্ট্রেস পরবর্তী বিভিন্ন লক্ষণ যেমনঃ হতাশা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, রগচটা ইত্যাদি সমস্যা-একজন নিগৃহীত সমকামিতে দেখার উচ্চতর ঝুকি থাকে। [১৬] গবেষকেরা দেখিয়েছেন, শিশুর যৌন অভিমুখিতা নিয়ে যেসমস্ত অভিভাবকেরা ঋণাত্মক চিন্তাধারণা পোষণ করেন, তাদের সন্তানেরা আত্মগ্লানিতে ভুগে এবং নারীদের প্রতি ঋণাত্মক চিন্তাজ্ঞাপন করে। এটাও দেখা গিয়েছে যে, পিতামাতা যত বেশি দিন সন্তানের সমকামিতার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকেন, তত দ্রুত তারা বিষয়টি মেনে নিতে শিখেন। [১৭]

উপরন্তু, গবেষণায় প্রস্তাবনা করা হয়েছে যে, "যেসব পরিবার তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ অনুসরণ করে, ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে, বিবাহ এবং সন্তানাদি থাকার প্রতি জোর দেয়, সেসব পরিবারের; উদার মনোভাবাপন্ন পরিবারের তুলনায় সমকামিতাকে গ্রহণ করার মানসিকতা কম দেখা যায়।"[১৮] তবে আরো একটি গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, এটি সর্বজনীন নয়। অর্থাৎ এর উল্টোটাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চানা এটেনংফ এবং কোলেট ডাইয়েট কর্তৃক "এপিএ'র সাইকোলজি অফ রিলিজিয়ন অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালিটি" (APA's Psychology of Religion & Spirituality) নামক জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা গেছে যে; বেশ কিছু ধর্মীয় পরিবারের সদস্যরা তাদের কোনো সদস্যের ভিন্ন যৌন অভিমুখিতাকে ধর্মীয় মুল্যবোধ ও ধর্মীয় গ্রন্থ দ্বারাই স্বীকার বা সমর্থন করেছেন। যেমনঃ একজন ক্যাথলিক মা, তার সমকামি পুত্রের অভিব্যক্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, "স্রষ্টার সকল নির্দেশনার উর্ধ্বে যে নির্দেশনা আছে; তা হলো ভালোবাসা"। একইভাবে একজন মেথোডিস্ট মা তার সমকামী পুত্রের সাথে এ বিষয়ে কথা আলোচনা করতে গিয়ে যীশুকেই তথ্যসুত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, "আমি যীশুর বার্তা পড়ি, তার বার্তায় তিনি ভালোবাসার কথা বলেছেন, ক্ষমার কথা বলেছেন, এবং আমি মনে করি না, একজন মানুষকে কখনোই তার ভালোবাসার ন্যায় কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া যায়।।" একই বক্তব্য প্রতিফলিত হয়েছে একজন ধার্মিক মরমন পিতার দ্বারা, তিনি বলেছেন, "যদি তুমি কাওকে ভালোবাসো, তাহলে সেটা স্বীকার করে নেওয়াই সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক এবং সমাজের কোনো অধিকার ন্যায়, এজন্য তাকে শাস্তির কাঠগড়ায় দাড় করানোর।"[১১]

যৌন অভিমুখিতার তারল্য[সম্পাদনা]

তরলের ধর্ম তারল্য হওয়ায়, তা যে পাত্রে রাখা হয়, সে পাত্রের আকার ধারণ করে, অর্থাৎ তরল পদার্থ সময়ের সাথে তার আকার বদলায়, মানুষের ক্ষেত্রে যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তিত হতে পারে বলেই, একে তারল্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

মার্কিন মনস্তাত্বিক সংগঠন (APA) এবিষয়ে বিবৃতিতে বলে, "কেও কেও মনে করে, যৌন অভিমুখিতা সহজাত এবং সুনির্দিষ্ট, যাইহোক; যৌন অভিমুখিতা একজন মানুষের গোটা জীবন জুড়েই ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হতে পারে। [১৯] আমেরিকার বৃহৎ বৃহৎ স্বাস্থ্য বিষয়ক সংগঠনের সাথে মিলিতভাবে মার্কিন মনস্তাত্বিক সংগঠন বিবৃতি দেয় "ভিন্ন ভিন্ন লোক জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বুঝতে পারে, তারা বিসমকামী, সমকামী, না উভকামী। [২০] মানসিক স্বাস্থ্য এবং আসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য মতে, "কিছু লোকের জন্য যৌন অভিমুখিতা সবসময়ের জন্য একই রকম থাকে, তবে কিছু মানুষের জন্য যৌন অভিমুখিতা তারল্যের ন্যায় সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। [২১] লিসা ডায়মণ্ডের "বয়ঃসন্ধি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক- নারীর উভকামিতা" নামক গবেষণা থেকে এটা দেখা গিয়েছে যে, "সমকামি ও বিসমকামী নারীদের স্বভাব, আত্মপরিচয়ে অভিমুখিতার তারল্য দেখা যায়"।[২২][২৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Case No. S147999 in the Supreme Court of the State of California, In re Marriage Cases Judicial Council Coordination Proceeding No. 4365(…)
  2. American Psychological Association: Appropriate Therapeutic Responses to Sexual Orientation
  3. Former president of APA says Organization controlled by gay rights movement lobbed for the removal of homosexuality as disorder. LifeSiteNews.com
  4. This American Life
  5. Bayer, Ronald (১৯৮৭)। Homosexuality and American Psychiatry: The Politics of Diagnosis। Princeton: Princeton University Press। আইএসবিএন 0-691-02837-0 [পৃষ্ঠা নম্বর]
  6. Bayer, Ronald (১৯৮৭)। Homosexuality and American Psychiatry: The Politics of Diagnosis। Princeton: Princeton University Press। আইএসবিএন 0-691-02837-0 [পৃষ্ঠা নম্বর]
  7. Freud, Sigmund (১৯৫৩)। Three essays on the theory of sexuality। London: Hogarth Press। 
  8. Ruitenbeek, H.M. (১৯৬৩)। The problem of Homosexuality in modern society। New York: Dutton। 
  9. American Psychological Association: Appropriate Therapeutic Responses to Sexual Orientation
  10. Sandfort, T., সম্পাদক (২০০০)। "2"। Lesbian and Gay Studies: An Introductory, Interdisciplinary Approachআইএসবিএন 978-0-7619-5417-0 
  11. Etengoff C.; Daiute C. (২০১৪)। "Family Members' Uses of Religion in Post–Coming-Out Conflicts With Their Gay Relative"। Psychology of Religion and Spirituality 6 (1): 33–43। ডিওআই:10.1037/a0035198 
  12. Etengoff C.; Daiute C. (২০১৫)। "Clinicians' perspectives of religious families' and gay men's negotiation of sexual orientation disclosure and prejudice"। Journal of Homosexuality 62 (3): 394–426। ডিওআই:10.1080/00918369.2014.977115 
  13. LeVay, Simon (1996). Queer Science: The Use and Abuse of Research into Homosexuality. Cambridge: The MIT Press আইএসবিএন ০-২৬২-১২১৯৯-৯[পৃষ্ঠা নম্বর]
  14. National Affirmation Annual Conference: "Homosexuality: A Psychiatrist's Response to LDS Social Services", September 5, 1999
  15. Cabaj, R; Stein, T. eds. Textbook of Homosexuality and Mental Health, p. 421
  16. Herek, et al. (1997)
  17. Holtzen and Agresti (1990).
  18. Newman and Muzzonigro (1993)
  19. American Psychiatric Association (মে ২০০০)। "Gay, Lesbian and Bisexual Issues"। Association of Gay and Lesbian Psychiatrics। 
  20. "Just the Facts About Sexual Orientation & Youth: A Primer for Principals, Educators and School Personnel"American Academy of Pediatrics, American Counseling Association, American Association of School Administrators, American Federation of Teachers, American Psychological Association, American School Health Association, The Interfaith Alliance, National Association of School Psychologists, National Association of Social Workers, National Education Association। ১৯৯৯। সংগৃহীত ২০০৭-০৮-২৮ 
  21. "ARQ2: Question A2 – Sexual Orientation"। Centre for Addiction and Mental Health। সংগৃহীত ২০০৭-০৮-২৮ 
  22. Diamond, Lisa M. (জানুয়ারি ২০০৮)। "Female bisexuality from adolescence to adulthood: Results from a 10-year longitudinal study" (PDF)। Developmental Psychology 44 (1): 5–14। ডিওআই:10.1037/0012-1649.44.1.5পিএমআইডি 18194000 
  23. "Bisexual women – new research findings"। Women's Health News। জানুয়ারি ১৭, ২০০৮। 

পাঠ্য ও বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

American Psychological Association
American Academy of Pediatrics

British Psychological Society[সম্পাদনা]

National Mental Health Association

Join statements by professional bodies in the United Kingdom[সম্পাদনা]