বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(বাংলাদেশে এলজিবিটি অধিকার থেকে পুনর্নির্দেশিত)
Jump to navigation Jump to search
বাংলাদেশ বাংলাদেশ এ সমকামিতা অধিকার
বাংলাদেশ
সমলিঙ্গের প্রতি যৌন কার্যকলাপ আইনগত বৈধ?অবৈধ
জরিমানা/বিচার:
দেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা মোতাবেক সমকাম তথা পায়ুমৈথুন শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি দশ বছর থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড এবং উপরন্তু জরিমানাও আরোপযোগ্য।[১]
লিঙ্গ পরিচয় / অভিব্যক্তিঅনুপস্থিত
নিরাপত্তায় বৈষম্যঅনুপস্থিত
পারিবারিক অধিকার
সম্পর্কের স্বীকৃতিব্যবস্থা নেই
গ্রহনযোগ্যতাঅনুল্লিখিত
বাংলাদেশী এলজিবিটি জনসমাজের উদ্দেশ্যে জন অ্যাশলি নির্মিত পতাকা।

বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার সমাজ, ধর্ম, সংবিধান ও আইন সমর্থিত কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশে প্রচুর সংখ্যক সমকামী আছে এবং তারা সমকামে পারঙ্গম; কিন্তু সমকাম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ এবং সামাজিকভাবে ঘৃণিত। সমকামীরা তাদের যৌনঅভিমুখ গোপন রাখে এবং সমলিঙ্গীয় যৌনকর্ম সম্পূর্ণ অপ্রকাশ্য বিবেচনা করা হয়। [১]

বাংলাদেশের মতো একটি রক্ষণশীল দেশে সমকামী অধিকার নিয়ে কাজ করাটা দুরূহ হলেও কিছু সংগঠন আছে যারা মানুষের সমকামের অধিকার বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়। মূলত সমকামী হিসেবে কেউ আত্মপ্রকাশ করলে তাকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হতে হয়। বাংলাদেশে সমকামী অধিকারকর্মীদের হত্যার হুমকি পেতেও জানা যায়। বাংলাদেশের সমাজে কেবল দুইজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের মধ্যে সম্মতিমূলক প্রেম এবং বিয়ে সমর্থিত যদিও এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সমাজ রক্ষণশীলতা অবলম্বন করে থাকে, সমপ্রেম একদমই সমর্থিত নয়, সম্মতি থাকলেও, ঠিক এই কারণে বাংলাদেশের মানুষরা তাদের সমকাম প্রবৃত্তি গোপন করেন আর প্রকাশ করলেও খুব কাছের বিশ্বস্ত মানুষের কাছে ছাড়া করেননা।[২][৩][৪][৫] বাস্তবে অনেক সমকামী মনে করে যে সমকামীতা নিয়ে হৈ-চৈ বা কোনোরূপ আন্দোলন তাদের প্রায়োগিক স্বার্থের অনুকূল নয়। তবে বিংশ শতাব্দীর অন্তিম কাল থেকে সমকামীদের মধ্যে কিছু সামাজিক সম্পর্ক গঠিত হচ্ছে। এই ধারা ক্রমবিকাশমান।

আইন ও অপরাধের ধারা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের সংবিধান-এ সকল নাগরিকের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার দেয়া হলেও নৈতিক অবক্ষয়ভিত্তিক বিধিনিষেধ রয়েছে।

  • খন্ড II আর্টিকেল ১৯ - সকল নাগরিকের সমান সুযোগের অঙ্গিকার।
  • খন্ড III ধারা ২৭ - সকল নাগরিকের জন্য আইনের দৃষ্টিতে সমান অধিকার রয়েছে।
  • ধর্ম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় উভয়ে প্রতিশ্রুতিশীল, কিন্তু অবশ্যই এই স্বাধীনতা "শালীনতা বা নৈতিকতা" ভিত্তিক বিধিনিষেধ সাপেক্ষে।
  • একজন নাগরিক সংসদের একজন সদস্য হিসেবে প্রার্থিতা পাবে না যদি উক্ত নাগরিক কোন "অপরাধী হয়, অথবা “দুশ্চরিত্র অপরাধ" এর দোষী সাব্যস্ত হয়।

সমকামীতা একটি প্রবণতা এবং বস্তুতঃ এ নিয়ে বাংলাদেশে কোনো আইন নেই। কিন্তু বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা মোতাবেক সমকাম তথা পায়ুমৈথুন শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি দশ বছর থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড এবং সাথে জরিমানাও হতে পারে।[৬]

৩৭৭. প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ: কোন ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোন পুরুষ, নারী বা পশু প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম করে, তবে তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হবে, অথবা বর্ণনা অনুযায়ী নির্দিষ্টকালের কারাদণ্ড প্রদান করা হবে যা দশ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে, এবং এর সাথে নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক জরিমানাও দিতে হবে।

ব্যাখ্যা: ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণে যৌনসঙ্গমের প্রয়োজনীয় প্রমাণ হিসেবে লিঙ্গপ্রবেশের প্রমাণ যথেষ্ট হবে।[৬][৭]

৩৭৭ ধারার ব্যাখ্যায় পায়ুসঙ্গমজনিত যে কোন যৌথ যৌন কার্যকলাপকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একারণে, পরস্পর সম্মতিক্রমে বিপরীতকামী মুখকাম ও পায়ুমৈথুনও উক্ত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে।[৮][৯]

সামাজিক মনোভাব[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে প্রকাশ্যে সমলিঙ্গের বন্ধুদের মধ্যে পারস্পরিক আবেগী আকর্ষণ প্রচলিতভাবে স্বীকৃত। এ নিয়ে কোন সমালোচনা না হলেও, সমকামের প্রতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।[১০] উক্ত দেশের ৯০% ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যার ধর্মীয় ঐতিহ্য (মধ্যমপন্থী) ও বাংলাদেশী সমাজের মানসিকতার ফলে উক্ত বিরোধী মনোভাব দেখা যায়। পরিবারে বাইরের ব্যক্তিবর্গ যেমন: পুলিশ, যৌনস্বাধীনতা-বিদ্বেষী ও মুসলিম মৌলবাদী দলসমূহ এলজিবিটি (হিজড়া ব্যতীত) সদস্যদেরকে হয়রানি, নির্যাতন ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারে।[১১][১২] এই নৈতিক মানদণ্ডে সরকার কোন অর্থায়ন না করলেও কোন প্রকার উদ্যোগ নিতে কোন প্রকার উৎসাহ বা সক্রিয়তাও কখনো তাদের মাঝে দেখা যায় না।[১৩]

বাংলাদেশী সমকাম-অধিকার বিষয়ক সংস্থাসমূহ[সম্পাদনা]

পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাংলাদেশের এলজিবিটি অধিকার শোভাযাত্রা (২০১৫)।

বাংলাদেশে প্রথম এলজিবিটি সংক্রান্ত জনসচেতনতা গড়ে তোলার প্রকাশ্য প্রয়াস শুরু হয় ১৯৯৯ সালে যখন রেংগ্যু নামক এক কানাডিয় নাগরিক (যিনি জাতিগতভাবে একজন চাকমা) বাংলাদেশের সমকামীদের জন্য প্রথম অনলাইন গ্রুপ "গে বাংলাদেশ" প্রতিষ্ঠা করেন।[১৪] অব্যবহিত পরে “বয়েজ অব বাংলাদেশ” নামে আরেকটি অনলাইন গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত হয় যার মাধ্যমে বাংলাদেশের সমকামীদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হতে শুরু হয। পরবর্তাকালে একই নামে অর্থাৎ 'বয়েজ অব বাংলাদেশ' নামে একটি পুরুষ সমকামী সংগঠন স্থাপিত হয়। এটি ২০০৯ থেকে ঢাকায় এলজিবিটি সচেতনতাবর্ধক অনুষ্ঠান করে আসছে। এই দলটি বাংলাদেশে একটি সুসংহত এলজিবিটি সমাজ গড়তে চায়, এবং একই সঙ্গে বাংলঅদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাটির প্রযোজ্যতার অবসান চায়।[১৫]

কিন্তু ১৯৯০ দশকের গোড়ার দিকে ঢাকার কাকরাইলে বন্ধু নামে একটি বিদেশী সাহায্যপুষ্ট বেসরকারী সংস্থা স্থাপিত হয় যা প্রথম থেকেই পুরুষ সমকামীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে বন্ধু’র শাখা দপ্তর স্থাপিত হয়েছে। এই সংস্থাটি সরকার কর্তৃক স্বীকৃত হওয়ায় এর কার্যক্ষেত্র প্রকাশ্য ও ক্রম প্রসারমান। পায়ূমৈথুনকে সহজ করার জন্য ল্যুবরিক্যাণ্ট প্রস্তুত ও বিনামূল্যে বিতরণ এবং পায়ূমৈথুনজ্বনিত রোগ প্রতিরোধের জন্য বিনামূল্যে রোধক (কণ্ডোম) বিতরণে সরকার বাধা প্রদান করে না।

২০১০ সালে গবেষক ও বিজ্ঞান-লেখক অভিজিৎ রায় সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেন।[১৬] বাংলা ভাষায় এলজিবিটি জনগণ ও তাঁদের মানবাধিকার নিয়ে এই বইতেই প্রথম খোলাখুলি আলোচনা করা হয়েছে।[১৭]

সারাংশ ছক[সম্পাদনা]

সমকামিতা বৈধ? No
দৈহিক মিলনের জন্য নুনতম বয়স? No
কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আইন? No
পণ্য, সেবা এবং বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আইন? No
অন্যান্য সব জায়গায় বৈষম্যবিরোধী আইন (ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়া সহ)? No
সমলৈঙ্গিক বিয়ে? No
সম-লিঙ্গের মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের স্বীকৃতি No
সন্তান দত্তক (নাম পরিচয়হীন সন্তান)? No
এতিম শিশু দত্তক? No
সামরিক বাহিনীতে চাকরীর অনুমতি? No
লিঙ্গ পরিবর্তনের অনুমতি? No
সমকামিনীদের জন্য আইভিএফ? No
সারোগেসি? No
রক্তদানের অনুমতি? No

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "সমকামিতা ফৌজদারি অপরাধ, নিশাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী"ntvbd.com। ৫ মে ২০১৬। 
  2. "সমকামিতা: দুই পুরুষে ঘর!"dailyjanakantha.com 
  3. "সমকামী এক বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা: 'আমি এখন পরিবারের বিষফোঁড়া'"bbc.com। ১৯ মে ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৭ নভেম্বর ২০১৭ 
  4. "ই-বই: সমকামিতা, অভিজিৎ রায়"। মুক্তমনা ওয়েবসাইট। ২৭ এপ্রিল ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৭ 
  5. "Raped and abused, this 23-year-old gay refugee from Bangladesh on the run in Nepal shares his story"gaystarnews.com। ২৬ এপ্রিল ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০১৭ 
  6. "Sodomy Laws Around the World"। ২৪ এপ্রিল ২০০৭। সংগ্রহের তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০০৭ 
  7. "Indian Penal Code" (PDF)। District Court Allahabad। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০১৩ 
  8. "Bangladesh: Treatment of homosexuals including legislation, availability of state protection and support services"। www.unhcr.org। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০১২ 
  9. "Bangladesh_Penal_Code_1860_Full_text.pdf (application/pdf Object)" (PDF)। www.unodc.org। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০১২ 
  10. "Dhaka Diary: Gays and Lesbians: the hidden minorities of Bangladesh"। mukto-mona.net। সংগ্রহের তারিখ ১৩ অক্টোবর ২০০৭ 
  11. "Founder of Bangladesh's first and only LGBT magazine killed"theguardian.com। ২৫ এপ্রিল ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০১৭ 
  12. "28 youngsters detained on charges of homosexuality in Bangladesh"indiatoday.in। ১৯ মে ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০১৭ 
  13. Ashok Deb। "A text book case how sexuality is enforced upon in Bangladeshi society"। lgbtbangladesh.wordpress.com। সংগ্রহের তারিখ ২০ জানুয়ারি ২০১১ 
  14. "The Boys of Bangladesh"। pink-pages.co.in। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০১-০৯ 
  15. "Bangladesh: Treatment of homosexuals including legislation, availability of state protection and support services"। www.unhcr.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০১-০৯ 
  16. "Samakamita: The first Bengali book on homosexuality"। lgbtbangladesh.wordpress.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০১-১৫ 
  17. "সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান"। www.mukto-mona.com। সংগ্রহের তারিখ ২০ জানুয়ারি ২০১১ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]