পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুধর্ম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হিন্দুধর্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সর্বাধিক প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস। ২০০১ সালের ভারতীয় জনগণনা অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ৭২.৫% হিন্দু।[১] পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা মূলত বৈষ্ণব বা শাক্ত মতাবলম্বী।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ভূখণ্ডে হিন্দুধর্মের আগমন ঘটে।[২] খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর বঙ্গদেশে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটলে, পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষ ওই ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু রাঢ়, উত্তরবঙ্গ ও গাঙ্গেয় অববাহিকা (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ) অঞ্চলে হিন্দুধর্মের প্রাধান্য বজায় থাকে। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ দুই ভাগে বিভক্ত হলে হিন্দু-প্রধান পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় অববাহিকা বঙ্গদেশের প্রধান হিন্দুধর্ম-চর্চাকেন্দ্র। মধ্যযুগে নবদ্বীপ ছিল ভারতের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র। নব্য-ন্যায় চর্চায় নবদ্বীপের বিশেষ খ্যাতি ছিল। নবদ্বীপেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ, পরমহংস যোগানন্দ প্রমুখ বাঙালি ধর্মগুরুরা কলকাতাকে কেন্দ্র করে হিন্দুধর্ম পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন শুরু করেন।

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা মূলত বাংলা ও নেপালি ভাষাভাষী মানুষ। বাংলা ভাষায় মধ্যযুগে ও আধুনিক যুগে বহু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়েছে। কালী, দুর্গা, শিবকৃষ্ণের পূজা পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ জনপ্রিয়। এছাড়া মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর প্রমুখ লৌকিক দেবদেবীদের পূজাও হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হিন্দু উৎসব হল দুর্গাপূজা। এছাড়া কালীপূজা, রথযাত্রা, সরস্বতী পূজা ইত্যাদিও বিশেষ জনপ্রিয়।

উৎসব[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু উৎসব
উৎসব
(মোটা হরফে সরকারি ছুটির দিন)
ছবি সময় গুরুত্ব
পয়লা বৈশাখ ১ বৈশাখ (বাংলা)
১৪/১৫ এপ্রিল
বাংলা নববর্ষ।
অক্ষয় তৃতীয়া বৈশাখ শুক্লা তৃতীয়া শুভদিন হিসেবে গণ্য।
বুদ্ধপূর্ণিমা বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন। বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে পূজা করেন যে সব হিন্দু, তাঁদের কাছে পবিত্র দিন।
জামাইষষ্ঠী জ্যৈষ্ঠ শুক্লা ষষ্ঠী সামাজিক উৎসব। এই দিন জামাইদের শ্বশুরবাড়িতে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করা হয়।
দশহরা জ্যৈষ্ঠ শুক্লা দশমী গঙ্গা পূজা। জেলে সম্প্রদায় বিশেষভাবে পালন করে।
স্নানযাত্রা জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা জগন্নাথের স্নান উৎসব। বিশেষ পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য।
রথযাত্রা আষাঢ় শুক্লা দ্বিতীয়া জগন্নাথের রথ উৎসব। হুগলি জেলামাহেশে ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া মহিষাদলের রথ ও কলকাতার ইসকনের রথযাত্রাও বিখ্যাত।
গুরুপূর্ণিমা আষাঢ় পূর্ণিমা গুরু পূজা।
রাখিবন্ধন
রাখিপূর্ণিমা
শ্রাবণ পূর্ণিমা সামাজিক উৎসব। এই দিন বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বেঁধে দেয়।
জন্মাষ্টমী ভাদ্র কৃষ্ণ অষ্টমী কৃষ্ণের জন্মোৎসব।
বিশ্বকর্মা পূজা
(শুধুমাত্র কলকারখানায়)
ভাদ্র সংক্রান্তি যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার পূজা। কলকারাখানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দ্বারা বিশেষভাবে পালিত হয়।
মহালয়া ভাদ্র অমাবস্যা পিতৃতর্পণ। পূর্বপুরুষকে স্মরণ করার দিন।
দুর্গাপূজা Durga Idol on Dashami.jpg আশ্বিন শুক্লা সপ্তমী-দশমী হিন্দুদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আশ্বিন পূর্ণিমা লক্ষ্মীপূজা।
দীপান্বিতা লক্ষ্মীপূজা কার্তিক অমাবস্যা লক্ষ্মীপূজা, রাঢ় ও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোজাগরীর পরিবর্তে এই দিন বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজা করেন।
দীপান্বিতা কালীপূজা Kali-puja.jpg কার্তিক অমাবস্যা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হিন্দু দেবী কালীর বাৎসরিক পূজা।
ভাইফোঁটা কার্তিক শুক্লা দ্বিতীয়া সামাজিক উৎসব। বোন ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেয়।
জগদ্ধাত্রী পূজা Jagaddhatri Puja2 2009 Chandannagar.JPG কার্তিক শুক্লা নবমী দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা। কৃষ্ণনগরচন্দননগরে চারদিনব্যাপী উৎসব হয়।
রাসযাত্রা কার্তিক পূর্ণিমা বৈষ্ণব উৎসব। নবদ্বীপে শাক্ত উৎসব হিসেবেও পালিত হয়।
পৌষপার্বণ পৌষ সংক্রান্তি গঙ্গাসাগর স্নান ও পিঠেপুলি উৎসব।
সরস্বতী পূজা Saraswati with Vitarka Mudra.JPG মাঘ শুক্লা পঞ্চমী বিদ্যার দেবী সরস্বতীর পূজা।
শিবরাত্রি মাঘ কৃষ্ণা চতুর্দশী শিব পূজা।
দোলযাত্রা ফাল্গুন পূর্ণিমা রং খেলার উৎসব।
বাসন্তী পূজা চৈত্র শুক্লা সপ্তমী-দশমী বসন্তকালীন দুর্গাপূজা।
অন্নপূর্ণা পূজা চৈত্র শুক্লা অষ্টমী শস্যদেবী অন্নপূর্ণার পূজা।
নীলপূজা চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন কৃষি উৎসব
চড়ক চৈত্র সংক্রান্তি বর্ষশেষের উৎসব ও মেলা

জেলাভিত্তিক হিন্দু জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জনসংখ্যা (২০০১)
জেলা শতাংশ (%)
বাঁকুড়া ৮৭.৪%[৩]
বর্ধমান ৭৮.৯%[৪]
বীরভূম ৬৪.৫%[৫][৬]
কোচবিহার ৭৫.৫%[৭]
দার্জিলিং ৭৬.৯%[৮]
পূর্বপশ্চিম মেদিনীপুর ৮৫.৬%[৯]
হুগলি ৮৩.৬%[১০]
হাওড়া ৭৫.০%[১১]
জলপাইগুড়ি ৮৩.৩%[১২]
কলকাতা ৭৭.৭%[১৩]
মালদহ ৪৯.২%[১৪]
মুর্শিদাবাদ ৩৫.৯%[১৫]
নদিয়া ৭৩.৮%[১৬]
উত্তর চব্বিশ পরগনা ৭৫.২%[১৭]
উত্তর দিনাজপুর ৫১.৭%[১৮]
পুরুলিয়া ৮৩.৪%[১৯]
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ৬৫.৯%[২০]
দক্ষিণ দিনাজপুর ৭৪.০%[২১]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "Data on Religion"Census of India (2001)। Office of the Registrar General & Census Commissioner, India। আসল থেকে August 12, 2007-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত August 26, 2006 
  2. Sen, Sukumar (1999)। "Dharme" [The Religion]। Banga-Bhumika [An Introduction to the History of Bengal] (Bengali ভাষায়) (1st সংস্করণ)। Kolkata: Paschimbanga Bangla Akademi। পৃ: 104–05। আইএসবিএন 81-86908-97-8 
  3. O’Malley, L.S.S., ICS, Bankura, Bengal District Gazetteers, pp. 48-52, 1995 reprint, Government of West Bengal
  4. Bardhaman district data
  5. Islam, Sheikh, Birbhumer Karmasansthane Matsya, Pranisampad Ebong Paschim Banga Sankhyalaghu Unnayan O Bityanigam, Paschim Banga, Birbhum Special Issue, p. 178
  6. Birbhum district data
  7. Cooch Behar district data
  8. Darjeeling district data
  9. Medinipur district data
  10. Hooghly district data
  11. Howrah district data
  12. Jalpaiguri district data
  13. Kolkata district data
  14. Malda district data
  15. Murshidabad district data
  16. Nadia district data
  17. North 24 Parganas district data
  18. Uttar Dinajpur district data
  19. Purulia district data
  20. South 24 Parganas district data
  21. Dakshin Dinajpur district data