পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুধর্ম
হিন্দুধর্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সর্বাধিক প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস। ২০০১ সালের ভারতীয় জনগণনা অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ৭২.৫% হিন্দু।[১] পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা মূলত বৈষ্ণব বা শাক্ত মতাবলম্বী।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ভূখণ্ডে হিন্দুধর্মের আগমন ঘটে।[২] খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর বঙ্গদেশে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটলে, পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষ ওই ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু রাঢ়, উত্তরবঙ্গ ও গাঙ্গেয় অববাহিকা (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ) অঞ্চলে হিন্দুধর্মের প্রাধান্য বজায় থাকে। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ দুই ভাগে বিভক্ত হলে হিন্দু-প্রধান পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় অববাহিকা বঙ্গদেশের প্রধান হিন্দুধর্ম-চর্চাকেন্দ্র। মধ্যযুগে নবদ্বীপ ছিল ভারতের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র। নব্য-ন্যায় চর্চায় নবদ্বীপের বিশেষ খ্যাতি ছিল। নবদ্বীপেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ, পরমহংস যোগানন্দ প্রমুখ বাঙালি ধর্মগুরুরা কলকাতাকে কেন্দ্র করে হিন্দুধর্ম পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন শুরু করেন।
পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা মূলত বাংলা ও নেপালি ভাষাভাষী মানুষ। বাংলা ভাষায় মধ্যযুগে ও আধুনিক যুগে বহু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়েছে। কালী, দুর্গা, শিব ও কৃষ্ণের পূজা পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ জনপ্রিয়। এছাড়া মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর প্রমুখ লৌকিক দেবদেবীদের পূজাও হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হিন্দু উৎসব হল দুর্গাপূজা। এছাড়া কালীপূজা, রথযাত্রা, সরস্বতী পূজা ইত্যাদিও বিশেষ জনপ্রিয়।
উৎসব [সম্পাদনা]
| উৎসব (মোটা হরফে সরকারি ছুটির দিন) |
ছবি | সময় | গুরুত্ব |
|---|---|---|---|
| পয়লা বৈশাখ | ১ বৈশাখ (বাংলা) ১৪/১৫ এপ্রিল |
বাংলা নববর্ষ। | |
| অক্ষয় তৃতীয়া | বৈশাখ শুক্লা তৃতীয়া | শুভদিন হিসেবে গণ্য। | |
| বুদ্ধপূর্ণিমা | বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা | গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন। বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে পূজা করেন যে সব হিন্দু, তাঁদের কাছে পবিত্র দিন। | |
| জামাইষষ্ঠী | জ্যৈষ্ঠ শুক্লা ষষ্ঠী | সামাজিক উৎসব। এই দিন জামাইদের শ্বশুরবাড়িতে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করা হয়। | |
| দশহরা | জ্যৈষ্ঠ শুক্লা দশমী | গঙ্গা পূজা। জেলে সম্প্রদায় বিশেষভাবে পালন করে। | |
| স্নানযাত্রা | জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা | জগন্নাথের স্নান উৎসব। বিশেষ পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য। | |
| রথযাত্রা | আষাঢ় শুক্লা দ্বিতীয়া | জগন্নাথের রথ উৎসব। হুগলি জেলার মাহেশে ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া মহিষাদলের রথ ও কলকাতার ইসকনের রথযাত্রাও বিখ্যাত। | |
| গুরুপূর্ণিমা | আষাঢ় পূর্ণিমা | গুরু পূজা। | |
| রাখিবন্ধন রাখিপূর্ণিমা |
শ্রাবণ পূর্ণিমা | সামাজিক উৎসব। এই দিন বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বেঁধে দেয়। | |
| জন্মাষ্টমী | ভাদ্র কৃষ্ণ অষ্টমী | কৃষ্ণের জন্মোৎসব। | |
| বিশ্বকর্মা পূজা (শুধুমাত্র কলকারখানায়) |
ভাদ্র সংক্রান্তি | যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার পূজা। কলকারাখানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দ্বারা বিশেষভাবে পালিত হয়। | |
| মহালয়া | ভাদ্র অমাবস্যা | পিতৃতর্পণ। পূর্বপুরুষকে স্মরণ করার দিন। | |
| দুর্গাপূজা | আশ্বিন শুক্লা সপ্তমী-দশমী | হিন্দুদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব। | |
| কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা | আশ্বিন পূর্ণিমা | লক্ষ্মীপূজা। | |
| দীপান্বিতা লক্ষ্মীপূজা | কার্তিক অমাবস্যা | লক্ষ্মীপূজা, রাঢ় ও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোজাগরীর পরিবর্তে এই দিন বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজা করেন। | |
| দীপান্বিতা কালীপূজা | কার্তিক অমাবস্যা | পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হিন্দু দেবী কালীর বাৎসরিক পূজা। | |
| ভাইফোঁটা | কার্তিক শুক্লা দ্বিতীয়া | সামাজিক উৎসব। বোন ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেয়। | |
| জগদ্ধাত্রী পূজা | কার্তিক শুক্লা নবমী | দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা। কৃষ্ণনগর ও চন্দননগরে চারদিনব্যাপী উৎসব হয়। | |
| রাসযাত্রা | কার্তিক পূর্ণিমা | বৈষ্ণব উৎসব। নবদ্বীপে শাক্ত উৎসব হিসেবেও পালিত হয়। | |
| পৌষপার্বণ | পৌষ সংক্রান্তি | গঙ্গাসাগর স্নান ও পিঠেপুলি উৎসব। | |
| সরস্বতী পূজা | মাঘ শুক্লা পঞ্চমী | বিদ্যার দেবী সরস্বতীর পূজা। | |
| শিবরাত্রি | মাঘ কৃষ্ণা চতুর্দশী | শিব পূজা। | |
| দোলযাত্রা | ফাল্গুন পূর্ণিমা | রং খেলার উৎসব। | |
| বাসন্তী পূজা | চৈত্র শুক্লা সপ্তমী-দশমী | বসন্তকালীন দুর্গাপূজা। | |
| অন্নপূর্ণা পূজা | চৈত্র শুক্লা অষ্টমী | শস্যদেবী অন্নপূর্ণার পূজা। | |
| নীলপূজা | চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন | কৃষি উৎসব | |
| চড়ক | চৈত্র সংক্রান্তি | বর্ষশেষের উৎসব ও মেলা |
জেলাভিত্তিক হিন্দু জনসংখ্যা [সম্পাদনা]
| জেলা | শতাংশ (%) |
|---|---|
| বাঁকুড়া | ৮৭.৪%[৩] |
| বর্ধমান | ৭৮.৯%[৪] |
| বীরভূম | ৬৪.৫%[৫][৬] |
| কোচবিহার | ৭৫.৫%[৭] |
| দার্জিলিং | ৭৬.৯%[৮] |
| পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর | ৮৫.৬%[৯] |
| হুগলি | ৮৩.৬%[১০] |
| হাওড়া | ৭৫.০%[১১] |
| জলপাইগুড়ি | ৮৩.৩%[১২] |
| কলকাতা | ৭৭.৭%[১৩] |
| মালদহ | ৪৯.২%[১৪] |
| মুর্শিদাবাদ | ৩৫.৯%[১৫] |
| নদিয়া | ৭৩.৮%[১৬] |
| উত্তর চব্বিশ পরগনা | ৭৫.২%[১৭] |
| উত্তর দিনাজপুর | ৫১.৭%[১৮] |
| পুরুলিয়া | ৮৩.৪%[১৯] |
| দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা | ৬৫.৯%[২০] |
| দক্ষিণ দিনাজপুর | ৭৪.০%[২১] |
পাদটীকা [সম্পাদনা]
- ↑ "Data on Religion"। Census of India (2001)। Office of the Registrar General & Census Commissioner, India। archived from the original on August 12, 2007। সংগৃহীত August 26, 2006।
- ↑ Sen, Sukumar (1999). "Dharme [The Religion]" (in Bengali). Banga-Bhumika [An Introduction to the History of Bengal] (1st ed.). Kolkata: Paschimbanga Bangla Akademi. পৃ: 104–05. আইএসবিএন 81-86908-97-8.
- ↑ O’Malley, L.S.S., ICS, Bankura, Bengal District Gazetteers, pp. 48-52, 1995 reprint, Government of West Bengal
- ↑ Bardhaman district data
- ↑ Islam, Sheikh, Birbhumer Karmasansthane Matsya, Pranisampad Ebong Paschim Banga Sankhyalaghu Unnayan O Bityanigam, Paschim Banga, Birbhum Special Issue, p. 178
- ↑ Birbhum district data
- ↑ Cooch Behar district data
- ↑ Darjeeling district data
- ↑ Medinipur district data
- ↑ Hooghly district data
- ↑ Howrah district data
- ↑ Jalpaiguri district data
- ↑ Kolkata district data
- ↑ Malda district data
- ↑ Murshidabad district data
- ↑ Nadia district data
- ↑ North 24 Parganas district data
- ↑ Uttar Dinajpur district data
- ↑ Purulia district data
- ↑ South 24 Parganas district data
- ↑ Dakshin Dinajpur district data