তারা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বৃষ রাশিতে অবস্থিত প্লেইয়াডিস নামক তারা স্তবক। নাসার চিত্র
বৃষ রাশিতে অবস্থিত প্লেইয়াডিস নামক তারা স্তবক। নাসার চিত্র

তারা প্লাজমা দশাস্থিত অতি উজ্জ্বল এবং সুবৃহৎ গোলাকার বস্তুপিণ্ড। উচ্চ তাপে তারা নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত নিজের জ্বালানী উৎপন্ন করে। নিউক্লীয় সংযোজন থেকে উদ্ভুত তাপ ও চাপ মহাকর্ষীয় সঙ্কোচনকে ঠেকিয়ে রাখে। জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে একটি তারার মৃত্যু হয়ে শ্বেত বামন অথবা নিউট্রন তারা আবার কখনো কৃষ্ণ বিবরের সৃষ্টি হয়। পৃথিবী হতে সবচেয়ে কাছের তারা হচ্ছে সূর্য। তারা জ্বলজ্বল করার কারণ হচ্ছে, এর কেন্দ্রে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তা তারার পুরো অভ্যন্তরভাগ পার হয়ে বহিঃপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত হয়। হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম অপেক্ষা ভারী প্রায় সকল মৌলই তারার কেন্দ্রে প্রথমবারের মত উৎপন্ন হয়েছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তারার বর্ণালি, দীপন ক্ষমতা বা গতি পর্যবেক্ষণ করে এর ভর, বয়স, রাসায়নিক গঠন এবং অন্যান্য অনেক ধর্মই বলে দিতে পারেন। তারাটির সর্বমোট ভরই মূলত তার বিবর্তন এবং চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে দেয়। অন্যান্য ধর্মগুলো নির্ণয় করা হয় বিবর্তনমূলক ইতিহাসের মাধ্যমে যার মধ্যে রয়েছে ব্যাস, ঘূর্ণন, চাপ এবং তাপমাত্রা। অনেকগুলো তারার তাপমাত্রাকে তাদের দীপন ক্ষমতার বিপরীতে একটি লেখচিত্রে স্থাপন করলে যে চিত্র পাওয়া যায় তাকে হের্টস্‌স্প্রুং-রাসেল চিত্র বলা হয়। এই চিত্রের মাধ্যমেই তারার বিবর্তনের বর্তমান দশা এবং এর বয়স নির্ণয় করা যায়।

ধ্বসে পড়ছে এমন একটি মেঘের মাধ্যমে তারার জীবনচক্র শুরু হয়। এই মেঘের মধ্যে থাকে মূলত হাইড্রোজেন, অবশ্য হিলিয়াম সহ অতি সামান্য বিরল ভারী মৌল থাকতে পারে। তারার কেন্দ্রটি যখন যথেষ্ট ঘন হয় তখন সেই কেন্দ্রের হাইড্রোজেন নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়ামে পরিণত হতে থাকে। তারার অভ্যন্তরভাগের অবশেষ থেকে শক্তি বিকিরণ এবং পরিচলনের এক মিশ্র প্রকিয়ায় বহির্ভাগে নীত হয়। এই প্রক্রিয়াগুলো তারাকে ধ্বসে পড়তে দেয় না এবং উৎপন্ন শক্তি একটি নাক্ষত্রিক বায়ু তৈরী করে যা বিকিরণকে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। তারার মধ্যকার হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তার মৃত্যু ঘটে। মৃত্যু ভরের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। অবশ্য মৃত্যু ঘটার আগে তারাটি আরও কয়েক প্রজন্ম পার করে যার মধ্যে রয়েছে অপজাত অবস্থা। প্রতি প্রজন্মে তার পূর্বের প্রজন্মের তুলনায় ভারী মৌলের পরিমাণ বেশী থাকে। তারা নিঃসঙ্গ থাকতে পারে, আবার দুই বা ততোধিক তারা একসাথে একটি তন্ত্র গড়ে তুলতে পারে। দুটি হলে সাধারণত একে অন্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে এবং বেশী কাছাকাছি এসে গেল একে অন্যের বিবর্তনকেও প্রভাবিত করে।

সূচিপত্র

[সম্পাদনা] ব্যুৎপত্তি

তারা শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ "স্টার"। স্টার শব্দটি গ্রিক অ্যাস্টার থেকে এসেছে যা আবার হিত্তীয় ভাষার শব্দ শিত্তার থেকে এসেছে। শিত্তার শব্দটির বুৎপত্তি আবার সংস্কৃত শব্দ সিতারা (सितारा)[১]

[সম্পাদনা] পর্যবেক্ষণের ইতিহাস

প্রতিটি সংস্কৃতিতেই তারা বিশেষ গুরুত্ব বহন করতো। ধর্ম চর্চায় এর ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশী। এছাড়া তারার মাধ্যমে নাবিকরা দিক নির্ণয় করতো এবং ঋতুর সাথে এর সম্পর্কটিও মানুষ অনেক আগে বুঝতে পেরেছিল। প্রাচীন জ্যোতির্বিদরা অনেকেই বিশ্বাস করতেন, তারা স্বর্গীয় গোলকে নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ আছে এবং এরা অপরিবর্তনীয়। চলতি প্রথা অনুযায়ী তারা তারাগুলোকে কিছু তারামণ্ডলে ভাগ করেছিলেন এবং এই মণ্ডলগুলোর মাধ্যমে সূর্যের অনুমিত অবস্থান ও গ্রহের গতি সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতেন[২]। তারার পটভূমিতে তথা দিগন্তে সূর্যের গতিকে ব্যবহার করে পঞ্জিকা তৈরী করা হতো যা কৃষিকাজে বিশেষ কাজে আসতো। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত পঞ্জিকা হচ্ছে জর্জীয় পঞ্জিকা। এই পঞ্জিকাটিও সৌরকেন্দ্রিক। সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের কোণগুলোর মাধ্যমে এই পঞ্জিকা নির্মিত হয়।

জানা মতে সঠিকভাবে প্রস্তুতকৃত প্রাচীনতম পঞ্জিকা নির্মাণ করেছিল প্রাচীন মিশরীয়রা, ১,৫৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে[৩]। ইসলামী জ্যোতির্বজ্ঞানীরা অনেক তারার আরবী নাম দিয়েছিলেন যার অনেকগুলো এখনও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তারা তারার অবস্থান নির্ণয়ের জন্য প্রচুর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন। একাদশ শতাব্দীতে আবু রাইহান আল-বিরুনি আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বিপুল সংখ্যক ভগ্নাংশের সমন্বয়ে গঠিত বলে ব্যাখ্যা করেন। এর ভগ্নাংশগুলোর নীহারিকময় তারার মত ধর্ম রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ১০১৯ সালের এক চন্দ্র গ্রহণের সময় তিনি বিভিন্ন তারার অক্ষাংশও নির্ণয় করেছিলেন।[৪]

তারাকে স্বর্গীয় অপরিবর্তনীয় বস্তুরূপে কল্পনা করলেও চৈনিক জ্যোতির্বিদরা বুঝতে পেরেছিলেন, নতুন তারার উদ্ভব হতে পারে[৫]টাইকো ব্রাহের মত আদি ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশে নতুন তারার উদ্ভব দেখতে পান। এ থেকে তারা প্রস্তাব করেন, স্বর্গ অপরিবর্তনীয় নয়। ১৫৮৪ সালে জর্দানো ব্রুনো বলেন, তারাগুলো মূলত অন্যান্য সূর্য যাদের পৃথিবীর মত বা একটু অন্যরকম গ্রহও থাকতে পারে। গ্রহগুলো যার যার সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়[৬]। এই ধারণাটি এর আগে গ্রিক বিজ্ঞানী দিমোক্রিতুস এবং এপিকিউরাস-ও ব্যক্ত করেছিলেন। এর পরের শতাব্দী জুড়ে তারাগুলোকে অনেক দূরের সূর্য হিসেবে কল্পনা করার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে থাকে। তারাগুলো কেন সৌর জগৎকে মহাকর্ষীয় টানের মাধ্যমে প্রভাবিত করে না তা ব্যাখ্যা করার জন্য আইজাক নিউটন বলেন, তারা আসলে মহাবিশ্বে সমানভাবে বন্টিত। ধর্মতাত্ত্বিক রিচার্ড বেন্টলি সমরূপতার এই ধারণাটি প্রথম উল্লেখ করেছিলেন[৭]

ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী Geminiano Montanari ১৬৬৭ সালে আলগল নামক তারার জ্যোতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। এডমন্ড হ্যালি সর্বপ্রথম আমাদের কাছাকাছি অবস্থিত এক জোড়া স্থির তারার সঠিক গতি পরিমাপ করে তা প্রকাশ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখান প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি এবং হিপ্পার্কুসের সময়ে এটি যে অবস্থানে ছিল, এখন সেখানে নেই। পৃথিবী থেকে একটি তারার দূরত্ব প্রথম সঠিকভাবে পরিমাপ করেন ফ্রিডরিক বেসেল, ১৮৩৮ সালে। লম্বন কৌশল ব্যবহার করে তিনি এই দূরত্ব পরিমাপ করেছিলেন। তিনি পৃথিবী থেকে ৬১ সিগনি নামক তারাটির দূরত্ব ১১.৪ আলোকবর্ষ নির্ণয় করেছিলেন। লম্বন পরিমাপের মাধ্যমেই বোঝা গিয়েছিল স্বর্গীয় স্থির তারাগুলো আসলে একে অপর থেকে কতো দূরে দূরে অবস্থান করছে।

উইলিয়াম হার্শেল প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি আকাশে তারার বন্টনের সঠিক তাৎপর্য উদ্ধারে ব্রতী হন। ১৭৮০'র দশকে তিনি ৬০০টি ভিন্ন ভিন্ন দিকে এক বিশেষ পরিমাপ সম্পন্ন করেন। প্রতিটি দৃষ্টিরেখায় অবস্থিত তারার সংখ্যা পরিমাপ করে ফলাফলগুলো একত্রিত করেন। এ থেকে তিনি বের করেন, আকাশের একটি বিশেষ দিকে তারার সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। আর এই দিকটি হলে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের দিক। তার আবিষ্কার থেকে তিনি এও মন্তব্য করেন যে, কিছু কিছু তারা যে কেবল এক দৃষ্টিরেখায় আছে তা-ই নয়, ভৌতভাবে একে অন্যের সাথে সম্পর্কিতও থাকতে পারে। এ কারণেই যুগল তারা ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়।

নাক্ষত্রিক বর্ণালিবিক্ষণ বিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটান Joseph von Fraunhofer এবং Angelo Secchi। তারাসমূহের বর্ণালীর তুলনা করে তারা তাদের শক্তি এবং তাদের বর্ণালীতে উপস্থিত বিশোষণ রেখার সংখ্যায় পার্থক্য দেখতে পান। বিশোষণ রেখা বলতে নাক্ষত্রিক বর্ণালিতে উপস্থিত এমন সব কালো রেখাকে বোঝায়, তারাটির পরিবেশে আলোর নির্দিষ্ট কিছু কম্পাঙ্কের শোষণের কারণে যার সৃষ্টি হয়। ১৮৬৫ সালে Secchi তারাগুলোকে বর্ণালী ধরণে বিভক্ত করা শুরু করেন। অবশ্য নাক্ষত্রিক শ্রেণীবিভাগের আধুনিক সংস্করণটির উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন অ্যানি জে ক্যানন, বিংশ শতাব্দীতে।

উনবিংশ শতাব্দীতে যুগল তারা নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ১৮৩৪ সালে ফ্রিডরিক বেসেল লুব্ধক তারার প্রকৃত গতিতে বিবর্তন লক্ষ্য করেন এবং এর একটি গুপ্ত সাথী রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে আসেন।

[সম্পাদনা] তথ্যসূত্র

  1. Online Etymology Dictionary. Retrieved on 2007-09-21.
  2. George Forbes (1909). History of Astronomy (Free e-book from গুটেনবার্গ প্রকল্প), London: Watts & Co.. 
  3. von Spaeth, Ove (1999). "Dating the Oldest Egyptian Star Map". Centaurus International Magazine of the History of Mathematics, Science and Technology 42 (3): 159-179. Retrieved on 2007-10-21.
  4. Zahoor, A. (1997). Al-Biruni. Hasanuddin University. Retrieved on 2007-10-21.
  5. D. H. Clark, F. R. Stephenson (1981-06-29). "The Historical Supernovae". Supernovae: A survey of current research; Proceedings of the Advanced Study Institute: 355–370, Cambridge, England: Dordrecht, D. Reidel Publishing Co.. Retrieved on 2006-09-24. 
  6. Drake, Stephen A. (August 17, 2006). A Brief History of High-Energy (X-ray & Gamma-Ray) Astronomy. NASA HEASARC. Retrieved on 2006-08-24.
  7. Hoskin, Michael (1998). The Value of Archives in Writing the History of Astronomy. Space Telescope Science Institute. Retrieved on 2006-08-24.

[সম্পাদনা] আরও দেখুন

[সম্পাদনা] বহিঃসংযোগ


এই নিবন্ধটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেন

ব্যক্তিগত হাতিয়ারসমূহ