মণি সিংহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মণি সিংহ
মণি সিংহ.jpg
জন্ম(১৯০১-০৭-২৮)২৮ জুলাই ১৯০১
নেত্রকোণা, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০(1990-12-31) (বয়স ৮৯)
জাতীয়তাবাংলাদেশি
জাতিসত্তাবাঙালি
নাগরিকত্ববাংলাদেশ Flag of Bangladesh.svg
পরিচিতির কারণবিপ্লবী রাজনীতিবিদ
রাজনৈতিক দলবাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
পুরস্কারস্বাধীনতা দিবস পুরস্কার

কমরেড মণি সিংহ (২৮ জুলাই ১৯০১ - ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০) বাংলাদেশের বিশিষ্ট বিপ্লবী বামপন্থী রাজনীতিবিদ[১]

জন্ম[সম্পাদনা]

মণি সিংহ ১৯০১ সালের ২৮শে জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুর এলাকার জমিদার বংশের কন্যা।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

রাজনৈতিক জীবনের সূচনা[সম্পাদনা]

১৯২১ সালে মণি সিংহ মহাত্মা গান্ধীর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শরিক হন। ১৯২৫ সালে তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হন। এসময় তিনি ময়মনসিংহ থেকে কলকাতায় আসেন। কলকাতার মেটিয়াবুরুজে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেন। এজন্য ১৯৩০ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাঁচ বছর পর ছাড়া পান, তবে আরো কিছুদিন অন্তরীণ হয়ে থাকতে হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

কৃষক আন্দোলন[সম্পাদনা]

তিনি সুসংয়ে টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করেন।[২][৩] আবারো তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে গণ দাবির মুখে ১৯৩৭ সালে মুক্তি পান। ১৯৩৮ সালে মণি সিংহ আরো কয়েকজনের সহযোগিতায় ময়মনসিংহ জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। পার্টির সাংগঠনিক তৎপরতার ফলে সামন্তবাদবিরোধী আন্দোলনে কৃষকেরা ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হয়। কৃষকদের এই আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হয়; আর তারপরে ১৯৪৮ সালে হয় নাচোলের বিদ্রোহ

পাকিস্তান আমল[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবমুখী নীতি গ্রহণ করে। পার্টির নেতা ও কর্মীদের ব্যাপকহারে গ্রেপ্তার শুরু হয়। মণি সিংহ আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। তিনি পার্টি পুনর্গঠনের জন্য কাজ করতে থাকেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় অল্প কিছুদিন তিনি আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। পাকিস্তান আমলের অনেকটা সময়ই তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়; এর মাঝেই কয়েকবার তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছে। তবে এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বামপন্থী সংগ্রাম ও গণআন্দোলন সংগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৭ সালে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি মুক্তি পান ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি রাজশাহী জেলে বন্দী ছিলেন। এসময় তিনি জেল থেকে পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বামপন্থীদের সংগঠনে ও সমন্বয় সাধনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারকে পরামর্শ দেয়ার জন্য গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন মণি সিংহ।[৪] এই পরিষদের অন্যান্য সদস্যের মাঝে ছিলেন মওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রমুখ।

কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি[সম্পাদনা]

১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ কমরেড মণি সিংহ ১৯২৫ সালে প্রখ্যাত বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তীর সাথে আলোচনার পর মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আদর্শরূপে গ্রহণ করেন। কমরেড মণি সিংহ ১৯২৮ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিজেকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উৎসর্গ করেন। এ সময় তিনি কলকাতায় শ্রমিক আন্দোলনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে থাকেন। ১৯৩০ সালের ৯ মে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেলেও নিজ গ্রাম সুসং দুর্গাপুরে তাকে অন্তরীণ করে রাখা হয়। এ সময় কৃষক-খেতমজুরদের পক্ষ নিলে নিজ মামাদের জমিদার পরিবারের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। পাটের ন্যায্য মূল্য দাবি করে কৃষকদের পক্ষে ভাষণ দিলে তাঁর দেড় বছরের জেল হয়।

১৯৩৭ সালে জেল থেকে বেরিয়ে এলে পার্টির সদস্য বলে তাকে জানানো হয়। এরপর দুর্গাপুরে মায়ের সাথে দেখা করে কলকাতার শ্রমিক আন্দোলনে ফিরে যেতে চাইলেও, এলাকার মুসলমান কৃষক ও গাড়ো হাজং প্রভৃতি আদিবাসী মণি সিংহকে ‘টঙ্ক প্রথা’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। এরপর মণি সিংহ সর্বতোভাবে টঙ্ক আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন এবং কালক্রমে তিনি এ আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৯৪১ সালে মণি সিংহকে আবার গ্রেপ্তার করে ১৫ দিন আটক রাখা হয়। ছাড়া পেয়ে তিনি পরিস্থিতি বুঝে আত্মগোপনে চলে যান।

১৯৪৪ সালে মণি সিংহ সারা বাংলার কৃষাণ সভার প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কৃষাণ সভার ঐতিহাসিক সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মণি সিংহ ছিলেন সম্মেলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে গিয়ে কমরেড মণি সিংহকে অসংখ্যবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ণ গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের আদর্শকে যাঁরা সামনে নিয়ে এসেছেন, মণি সিংহ তাঁদের একজন। আর এ কাজটি করতে গিয়ে তাঁর ওপর নেমে আসে পাকিস্তান সরকারের দমন-নির্যাতন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে প্রায় ২০ বছর তিনি আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি ছিল এবং আইয়ুব সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। ১৯৫১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে তিনি আত্মগোপন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সম্মেলনে পুনরায় পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৬৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ সম্মেলনে (যেটাকে পার্টির প্রথম কংগ্রেস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল) তিনি জেলে থাকাকালীন সময় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চাপে অন্যান্য রাজবন্দীর সাথে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। এ বছর ২৫ মার্চ পুনরায় সামরিক আইন জারি হলে তিনি জুলাই মাসে আবার গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় অনেক নেতাকে মুক্তি দিলেও, ইয়াহিয়া সরকার কমরেড মণি সিংহকে মুক্তি দেয়নি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বন্দীরা রাজশাহীর জেল ভেঙ্গে তাকে মুক্ত করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন-সাহায্য-সহযোগিতা আদায়ে কমরেড মণি সিংহের অবদান ছিল অবিসংবাদিত। তিনি ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতার পর কমরেড মণি সিংহ পূর্ণ গণতান্ত্রিক এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে সোচ্চার হন। ’৭৩ সালে অনুষ্ঠিত সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেস এবং ’৮০ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কংগ্রেসের মণি সিংহ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কমিউনিস্ট পার্টি আবার বেআইনি ঘোষিত হয়। জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসন চলাকালে ’৭৭ সালে মাঝামাঝিতে ৭৭ বছর বয়সী মণি সিংহ আবার গ্রেপ্তার হন। জিয়ার শাসনামলে তাকে ৬ মাস কারাগারে অন্তরীণ থাকতে হয়।

তিনি ৮৪ বছর বয়স পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে পার্টির দায়িত্ব পালন করেন।[৫]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৯০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর কমরেড মণি সিংহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে প্রতি বছর তার মৃত্যু দিবসে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরে টঙ্ক স্মৃতি স্তম্ভ প্রাঙ্গণে সাতদিন ব্যাপী কমরেড মণি মেলা অনুষ্ঠিত হয়।[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]