বিষয়বস্তুতে চলুন

বেতিয়ারা শহীদ দিবস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ঐতিহাসিক বেতিয়ারা স্মৃতিসৌধ (চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা)

১১ নভেম্বর ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস বাঙালির ইতিহাসে ঐতিহ্যবাহী গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা বীরোচিত ভূমিকা পালন করেন। এই যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একাংশ অর্থাৎ ৬৮ জনের প্রশিক্ষিত একটি গেরিলা দল ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর শীতের কুয়াশাভেজা রাতে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বেতিয়ারা নামক স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ প্রতিরক্ষা যুদ্ধে লিপ্ত হন। রাত ১০.৩০ মিনিট হতে সমগ্র রাতব্যাপী অর্থাৎ পরদিন ভোর পর্যন্ত এই প্রতিরক্ষা যুদ্ধে যোদ্ধা দলটির দলপতি শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ তাঁর আটজন সহযোদ্ধাসহ প্রতিরক্ষাব্যুহ রচনা করে অপরাপর সহযোদ্ধাদের পশ্চাদপসরণের সুযোগ প্রদান করেন। এ সময় তাঁর সুযোগ ছিল নিভৃতে নিজের প্রাণ রক্ষার। কিন্তু সহযোদ্ধাদের ফেলে রেখে তিনি পেছনে ফিরে যেতে চাননি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুদ্ধ চলাকালে তাঁর অস্ত্র (এল.এম.জি.) নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং তিনিসহ মোট নয়জন (৯ জন) বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। শহীদেরা হলেন যোদ্ধা দলটির দলপতি শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ, শহীদ সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর, শহীদ বশিরুল ইসলাম (বশির মাস্টার), শহীদ জহিরুল হক (দুধ মিয়া) শহীদ শহীদুল্লাহ্ সাউদ, শহীদ আবদুল কাইউম, শহীদ আওলাদ হোসেন, শহীদ আবদুল কাদের এবং শহীদ মোহাম্মদ সফি উল্লাহ।

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা রণাঙ্গণের মৃত্যুঞ্জয়ী ৯ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা

এই সম্মুখ যুদ্ধে গেরিলা বাহিনীর হতাহতের পাশাপশি পাকিস্তানি বাহিনীর অনেকে মৃত্যুবরণ করে ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যা আজও আমাদের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এমনই অসংখ্য গেরিলা যুদ্ধ, সম্মুখ যুদ্ধ, মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিত যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্নসমর্পন ও ঐতিহাসিক সশস্ত্র বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা স্মৃতিসৌধের মূল প্রবেশদ্বার (চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা)

রাতব্যাপী যুদ্ধের পর পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী পশ্চাদপশরণ করতে বাধ্য হলে বেতিয়ারা অঞ্চলের সাধারণ গ্রামবাসী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শহীদদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সমাধিস্থ করন করেন। ১১ নভেম্বর ১৯৭৩ বেতিয়ারায় শহীদ স্মৃতিসৌধের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন কমরেড মণি সিংহ। স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং পাশেই নির্মিত হয় শহীদ স্মৃতিসৌধ। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহাসড়ক পুনঃনির্মাণকালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং শহীদ নিজাম উদ্দিন আজাদের ভাতৃষ্পুত্র জনাব ইফতেখার খালিদের ব্যক্তিগত অর্থায়ণে আধুনিক শৈলীতে গণকবরটি পাকা করে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা রণাঙ্গণের মৃত্যুঞ্জয়ী ৯ জন শহীদের সমাধিক্ষেত্র (চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা)

প্রতি বছর ১১ নভেম্বর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে বেতিয়ার দিবস পালন করা হয়।

বেতিয়ারার ঐতিহাসিক প্রান্তরে সেই কুয়াশায় ঢাকা অন্ধকারচ্ছন্ন রাতে শহীদ নিজাম উদ্দিন আজাদের বীরোচিত চূড়ান্ত আত্মত্যাগের কারণে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদদের স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সবার কাছে দিনটির গুরুত্ব বিশেষ আবেগ ও অনুভূতির। এই দিনটি সব মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। সহযোদ্ধারা রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বেতিয়ারা দিবস স্মৃতি চিরন্তন হয়ে আমাদের উজ্জীবিত করে যাবে অনন্তকাল।

বেতিয়ারা ৯ জন শহীদদের অমৃত পরিচয়ঃ[সম্পাদনা]

১)শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদঃ[সম্পাদনা]

শহীদ নিজাম উদ্দীন আজাদ

ছিপছিপে, লম্বা, সহজাত এই তরুণের নাম নিজামউদ্দিন আজাদ। তাঁর পিতা ছিলেন বাংলাদেশের স্থপতিদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব, ভাষা সংগ্রামী, প্রখ্যাত লেখক, কূটনীতিবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং চিন্তাবিদ প্রয়াত কামরুদ্দীন আহমদ এবং মা ছিলেন মুন্সীগঞ্জের শাইনপুকুরের জমিদার পরিবারের জেষ্ঠ্য কন্যা প্রয়াত জোবেদা খানম। তাঁদের কনিষ্ঠতম পুত্র শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৪৮, বুধবারে।

আজাদের জনক কামরুদ্দীন আহমেদ একজন চিন্তাশীল বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। বাঙালী জাতিসত্বার স্বাধীন বিকাশের আকাংখা তিনি পোষণ করতেন। এই কামরুদ্দীন আহমেদ সাহেব পাকিস্তান স্বাধীন হবার পর আশান্বিত হয়েছিলেন। তাই পাকিস্তান জন্ম নেবার সময়কালে চৌদ্দই আগস্টে সন্তান জন্ম নেয়ায় স্বীয় সন্তানের নাম রেখেছিলেন “আজাদ”।

তাঁর পূর্ব প্রজন্মের নিবাস ছিল বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার ষোলঘর ইউনিয়নের ষোলঘর গ্রামের মিঞা বাড়িতে। বাবার কূটনৈতিক চাকরির সুবাদে আজাদের শৈশব কাটে প্রবাসে, বিশেষত পাশ্চাত্যে। একই কারণে তাঁর পড়ালেখার হাতেখড়ি হয় ১৯৫৮ সালের প্রবাসেই- বিখ্যাত ডন বস্কো কনভেন্ট স্কুলে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি ইংরেজী ভাষায় অত্যন্ত সাবলীল ছিলেন এবং পশ্চিমা ভাবধারায় চিন্তা করতেন।

১৯৬২ সালে তাঁর পিতা বার্মা (বর্তমান মায়ানমারের) রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হলে পড়ালেখার সুবিধার্থে তিনি ২০ ফেব্রুয়ারী ১৯৬২ সালে ঢাকা ফিরে আসেন এবং ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল থেকে ১৯৬৩ সালে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ভর্তি হন।

তিনি শৈশব থেকে স্কাউটিং করতেন। ১৯৬৩ সালে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষের সংগঠন ছাত্র ইউনিয়েনর রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। ছাত্র ইউনিয়েনর রাজনীতিতে জড়িয়ে তিনি বাংলা ভাষায় সাবলীল হয়ে ওঠেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে শেখেন। নেতৃত্বের সহজাত বৈশিষ্ট্য প্রথম মুহূর্ত থেকেই আজাদকে অনন্য করে তুলেছিলো। রাজধানী ঢাকার প্রথম মিছিল থেকে বেতিয়ারার অন্তিম মিছিল পর্যন্ত আজাদের জীবনক্রম ছিল ক্রমশঃ নির্মাণের। আজাদ ক্রমশঃ তাঁর গভীর ও চারপাশে স্থাপতিক নান্দনিকভাবে গড়ে তুলেছিলেন আস্থার পরিমন্ডল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রাবস্থায় দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক আসে। সব কিছু পেছনে ফেলে তিনি এগিয়ে যান সামনে, যোগ দেন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে। প্রশিক্ষণ শেষে গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে গেরিলা বাহিনী নিয়ে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য স্বদেশে প্রবেশকালে বেতিয়ারায় হঠাৎ ‘হ্যান্ডস আপ’ কমান্ড এলো রাস্তার অপর পার থেকে ওঁৎপেতে থাকা পাক সেনাদের কাছ থেকে। তিনি বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সাথে সাথে তিনি বুঝে যান সামনে সমূহ বিপদ। শত্রুদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি যোদ্ধাদের রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে সবার সামনে রুখে দাঁড়ান। গর্জে উঠে তার হাতের স্টেন গান, গর্জে উঠলো কয়েকজনের রাইফেল, লুটিয়ে পড়ে শত্রুরা।

এ সময় তাঁর সুযোগ ছিল নিভৃতে নিজের প্রাণ রক্ষার। কিন্তু সহযোদ্ধাদের ফেলে রেখে তিনি পেছনে ফিরে যেতে চাননি। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করে নিজের যোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর অস্ত্র নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং আহতাবস্থায় শত্রু বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। এরপর বহু অনুসন্ধানের পরও তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি- দেশ মাতৃকার জন্য এই অকুতোভয় বীর তার প্রাণ বিলিয়ে দেন। হারিয়ে যায় এদেশের ছাত্র-গণআন্দোলনের এক সম্ভাবনাময় আলোকবর্তিকা। আমরা হারাই সাহস, দৃঢ়তা এবং জন্ম-নেতৃত্ব বৈশিষ্ট্যের এক চমৎকার জিয়ন কাঠিকে।

শহীদ নিজাম উদ্দিন আজাদ স্মরণে স্মৃতিফলক (ঢাকা কলেজ, ঢাকা, বাংলাদেশ)


শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের প্রয়াণে তাঁর পিতা প্রয়াত জনাব কামরুদ্দীন আহমদ তাঁর “Socio Political History of Bengal” বইতে কবি John Donne- এর ভাষায় তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন-

Any man's death diminishes me because I am involved in mankind. And therefore never send to know for Whom the bell tolls, it tolls for thee

এই পংক্তিগুলোই তাঁর বেদনাকে যথার্থভাবে প্রকাশ করে। শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদেরা ছিলেন তিন ভাই এবং এক বোন। সর্বজ্যেষ্ঠ প্রয়াত জহির উদ্দীন মাহমুদ, এরপর প্রয়াত মহিউদ্দীন খালেদ এবং ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ নিজামউদ্দিন আজাদ। তাঁদের একমাত্র বোন সালমা আহমেদ একজন গৃহিণী। অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয় হলো তার দুই ভাইকেই স্বাধীন বাংলাদেশে হত্যা করা হয়। জহির উদ্দীন মাহমুদ নিহত হন ১২ মার্চ ১৯৭৯ তে আর মহিউদ্দীন খালেদ ১৮ মে ১৯৯৯ তে। এসকল হত্যাকান্ডের বিচার আজও হয়নি।

ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ে “স্মৃতি চিরন্তন” এর নাম ফলকে শহীদ সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর (ছবিতে ক্রম ৯৯) এবং শহীদ নিজামউদ্দীন আজাদ (ছবিতে ক্রম ১০৭)

২)শহীদ সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর[সম্পাদনা]

উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়াত আলহাজ্ব দলিলউদ্দিন আহমদ এবং প্রয়াত জাহানারা আহমদের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ মো. সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীরের ছিলো দশ ভাই-বোন। ১৯৭১ সালে তিনি এমএ শেষ পর্বের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর কমিটির অন্যতম নেতা ছিলেন। পরে ঢাকা জেলা কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকায় ‘দুইয়ে দুইয়ে এক’ নামে একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখতেন। শহীদ মো. সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর সাহিত্য চর্চা করতেন। ১৯৭১ সালে প্রতিভাদীপ্ত এই গল্পকারের ছোট গল্প ‘শিল্পী’ প্রকাশিত হয়, এছাড়াও তিনি বেশ কিছু কবিতা রচনা করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ যৌথ গেরিলা বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন।

শহীদদের উৎসর্গে নির্মিত স্থাপনা (ঢাকা)

অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সিরাজুম মুনীরের দাদী, ফুপা, ফুপু এবং ফুপাতো ভাইবোনসহ মোট ৯ জন সৈয়দপুরে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক স্বজন হারানো এই পরিবারটি শহীদ সিরাজুম মুনীরের জন্য আজো হাহাকার করেন। তার সহোদরেরা হচ্ছেন : শাহিদা বেগম (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী), প্রয়াত দিলারা বেগম, জেবুন নেসা মঞ্জু, আঞ্জুমান আরা কানিজ (অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী), আলমগীর আহমেদ (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী), জিয়াউন নাসির জিয়ন (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী), মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদির, ইসমাতুল বাইস, কামরুম মুনির।

৩) শহীদ মো. বশিরুল ইসলাম (বশির মাস্টার)[সম্পাদনা]

প্রয়াত মো: অলিউর রহমান এবং প্রয়াত সাহের বানুর তৃতীয় সন্তান মো. বশিরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৯ সালে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার কান্দাপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার পিতা ছিলেন এন্ট্রান্স ও পি.টি.আই. পাশ এবং মা সাহের বানু ছিলেন প্রাথমিক বৃত্তি প্রাপ্ত ও জি.টি. পাশ। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তারা চট্টগ্রাম ছেড়ে রায়পুরায় বসবাস শুরু করেন।

মো: বশিরুল ইসলাম রায়পুরা আর. কে. এম. উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করার পর ১৯৬৪ সালে ঢাকা গভ. মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে এইচএসসি এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি পাশ করেন। তিনি ১৯৭১ এ ঢাকা ল কলেজের আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি রায়পুরা আর. কে. এম. উচ্চ বিদ্যালয়ে বিনাবেতনে খন্ডকালীন শিক্ষকতা করতেন আর একারণেই তিনি ‘বশির মাস্টার’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন।

শহীদ বশির মাস্টার ধীর-স্থির, দৃঢ়চেতা ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ক্রীড়ামোদী ছিলেন, বিশেষ করে ফুটবল খেলতে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং এজন্য বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। একজন সৎ, কর্তব্যনিষ্ঠ, হিতাকাঙ্খী ও সম্ভামনাময় রাজনীতি সচেতন যুবক হিসেবে রায়পুরায় তার খ্যাতি ছিল। ১৯৬৯-৭০ এর গণআন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে জনমত সৃষ্টিতে ছাত্র জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। রায়পুরা থানা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রায়পুরা অস্ত্রাগার দখল করে স্থানীয় যুবকদের সীমিত আকারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ১২ জুন সকালে স্নান সেরে বড় বোন জাহানারা বেগমের (২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রয়াত) হাতে নাস্তা খেয়ে কাউকে কিছু না বলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে চলে যান। তিনি বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী গেরিলা দলের সদস্য ছিলেন।

কান্দাপাড়া শহীদ বশিরুল ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয় (রায়পুরা, নরসিংদী)

পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনি শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আহতাবস্থায় শত্রু বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে। এরপর বহু অনুসন্ধানের পরও তাঁকে আর খুজে পাওয়া যায়নি- দেশ মাতৃকার জন্য এই অকুতোভয় বীর তার প্রাণ বিলিয়ে দেন।

তাঁর বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার মো. শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছিলেন। শহীদ বশির মাস্টারের ৫ বোন। তার বোনেরা হচ্ছেন : প্রয়াত জাহানারা বেগম (২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রয়াত), হোসনে আরা বেগম (গৃহিনী), আনোয়ারা বেগম (গৃহিনী), কামরুন নাহার বেগম বিএবিএড এবং গুলজার বেগম বিএবিএড (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)। তাঁর সম্মানে তার পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘কান্দাপাড়া শহীদ বশিরুল ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

৪)শহীদ জহিরুল হক ভুঁঞা (দুধ মিয়া)[সম্পাদনা]

কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া শহীদ জহিরুল হক ভুঁইয়া (দুদু মিয়া) মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতা তালেব হোসেন ভুঁইয়াকে হারান। মা জোবেদা খাতুনের সাথে শিশু বয়সেই সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরু, আর তাই প্রথমিক বিদ্যালয়ে যাবার পর তার আর লেখাপড়ার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তিনি শৈশব থেকেই কৃষিকাজ করতেন। কিছুদিন কোহিনুর জুট মিলে কাজ করার সময় তিনি শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেন। পশ্চিমা শোষণ, বঞ্চণা ও বৈষম্যের কথা, শ্রমিক নেতাদের বক্তব্যে শুনে তার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তাই পরবর্তীতে রায়পুরা থানার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে জনমত সৃষ্টিতে ছাত্র জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রায়পুরা অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে স্থানীয় যুবকদের সীমিত আকারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে চলে যান।

জহিরুল হক ভুঁইয়া অত্যন্ত পেশিবহুল এবং সুঠামদেহী ছিলেন; ঠিক যেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী সুলতানের আঁকা ছবির মতো। তার গায়ের রঙ ছিল ‘দুধে-আলতা’ আর এজন্য তার মা আদর করে ডাকতেন ‘দুদু মিয়া’। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতের চলে যাবার সময় তিনি তার একমাত্র ছোট ভাই আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে লঞ্চ ঘাটে যান। বাড়িতে রেখে যান প্রিয় মা, বড় বোন প্রয়াত মন্ডা বিবি, আদরের ছোট বোন ফাতেমা আর রহিমা বেগমকে।

শহীদ জহিরুল হক ভূঁঞা স্মৃতি সংসদের সামনে ঐতিহাসিক বেতিয়ারা রণাঙ্গণের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস (রায়পুরা, নরসিংদী, ২০২৪)

তিনি বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী গেরিলা দলের সদস্য ছিলেন। পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনিও শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন।

শত্রু বাহিনীর সাথে হাতাহাতি যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে যান। শত্রুরা তাকে উর্দুতে বলতে বলেছিলেন, ‘বোলো পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ দুদু মিয়া উচ্চস্বরে বলেছিলেন ‘জয় বাংলা’। শত্রুরা গুলি করলো। তবুও দুদু মিয়ার কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’। আবার গুলি। চরাচরভেদী কণ্ঠ দুদু মিয়ার ‘জ-য়-য়-য়-য় বাংলা’। ব্রাশফায়ার। অনিঃশেষ দুদু মিয়া।

এমন যোদ্ধাকে আমাদের রাষ্ট্র আজও ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ ঘোষণা করতে পারেনি এটা রাষ্ট্রেরই সীমাবদ্ধতা। তার স্মরণে রায়পুরার হাশিমপুরে ‘বীর শহীদ জহিরুল হক স্মৃতি সংসদ’ গঠিত হয়েছে।

৫) শহীদ আওলাদ হোসেন[সম্পাদনা]

১৭ আগস্ট ১৯৪৭ এ বিক্রমপুর জেলার ধাইদাহ গ্রামের নানা বাড়িতে জন্ম নেওয়া শহীদ আওলাদ হোসেন ছিলেন তাঁর পিতা প্রয়াত মো: আলমাস উদ্দিন এবং প্রয়াত বেগম হোসনে আরার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর ছিলো গানের সখ। বুলবুল ললিত কলা একাডেমিতে ওস্তাদ বেদার উদ্দীনের কাছে তিনি নজরুল সংগীত শেখেন। শৈশব থেকেই অর্থনৈতিক দুরাবস্থায় থাকা সত্বেও তিনি সংস্কৃতির পাশাপাশি আদর্শিক রাজনীতির চর্চা করতেন।

১৯৭০ সালে তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দ্দী কলেজ) ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত ভি.পি আর ১৯৭১ এ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল থেকে ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক।

দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবারের দায়িত্ব ছিলো তাঁর উপর। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি চাকরীর সন্ধান করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকে চাকরি-ও পান। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে ভারতে চলে যান। ভারতে চলে যাবার পূর্বে তিনি তাঁর মাকে পত্রিকার পাতা ছিঁড়ে একটি চিরকুট লিখে পাঠান। তাঁর মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের খবর পেয়ে স্থানীয় রাজাকারেরা তাঁর বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেন।

তিনিও বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী দলের সদস্য ছিলেন। পাক বাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনি শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন এবং যুদ্ধ করতে করতে এই অকুতোভয় বীর তার প্রাণ বিলিয়ে দেন।

শহীদ আওলাদ হোসেনের সমাধি (বন্দর, নারায়ণগঞ্জ)

শহীদ আওলাদ হোসেন ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের একটি গান খুব গাইতেন, যে কথা বলতে গিয়ে তাঁর শিক্ষক প্রয়াত আশেক আলী মাস্টার ডুকরে কেঁদে উঠতেন:

‘জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে/সে জীবনী লিখে রেখো, তোমাদের গানের খাতায়/যেদিন রবো না আর তোমাদের মাঝে/যদি এই তানপুরা আর নাহি বাজে/তখন হঠাৎ যদি মনে পড়ে মোরে/গেয়ো শুধু মোর গান/যতটুকুলেখা থাকে তোমাদের স্মৃতির পাতায়..’

(৬)শহীদ শহীদুল্লাহ সাউদ[সম্পাদনা]

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অন্য আর সবার সাথে খেলাঘরও অংশ নিয়েছিল দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করার লড়াইয়ে। যে লড়াইয়ে আমরা হারিয়েছিলাম ৩০ লাখ বীরকে। যাঁদের মধ্যে ছিল অসংখ্য বীর কিশোর। এদেরই একজন শহীদ শহীদুল্লাহ সাউদ। ২ নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলের কর্মচারী প্রয়াত মো. জাবেদ আলী সাউদ ও প্রয়াত মোসাম্মৎ জোবেদা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে শহীদুল্লাহ্ সাউদ ছিলেন তৃতীয়। গোদনাইল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে তিনি ভর্তি হন গোদনাইল হাই স্কুলে। এরই মধ্যে তিনি জড়িয়ে যান ঝিলিমিলি খেলাঘর আসরের সাথে। ছাত্র ইউনিয়নও করতে শুরু করেন স্কুল জীবন থেকেই। শহীদুল্লাহ সাউদ যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

দেশপ্রেমের প্রবল টানে মাত্র ১৪ বছর বয়সে নবম শ্রেণীর ছাত্র শহীদল্লাহ্ সাউদ যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ প্রান্তর থেকে তিনি বাড়ির সবাইকে কেবলই জানাতেন ভাল আছি কাজ শেষ হলেই ফিরব। তার তিন ভাইয়েরা হলেন: আব্দুস সামাদ সাউদ, আব্দুল মজিদ সাউদ ও কবির হোসেন সাউদ।

বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী দলের সদস্য পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন। শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধের একপর্যায়ে আহতাবস্থায় তিনি তার সহযোদ্ধা শুক্কর মাহমুদের সাহায্যে পিছিয়ে আসার সময়ে শত্রু বাহিনী তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। শুক্কর মাহমুদও আহত অবস্থায় মৃতের ভান করে লক্ষ্য করেন কি অসীম সাহসে লড়াই করতে করতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারায় এই কিশোর আরো ৮ জন সহযোদ্ধার সাথে শহীদ হন। স্বজনেরা গোদনাইলে তার স্মৃতি রক্ষার্থে গড়ে তুলেছেন ‘শহীদ শহীদুল্লাহ সাউদ স্মৃতি সংসদ’।

৭)শহীদ আব্দুল কাইউম[সম্পাদনা]

সরকারি তহসিলদার প্রয়াত ছানাউল্লাহ মিয়া ও প্রয়াত হালিমা খাতুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ আব্দুল কাইউমের জন্ম ১ মার্চ ১৯৪৮ সালে চাঁদপুর জেলার হাইমচর থানার নীল কমল গ্রামে ‘মালত’ বাড়িতে। শহীদ আব্দুল কাইউম বাল্যকাল থেকে অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের, ধীর-স্থির এবং মৃদুভাষী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ক্রীড়ামোদী ছিলেন, বিশেষ করে ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে (প্রিলিমিনারি) ভর্তি হন এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন ইকবাল হলে (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) অবস্থান করেন। ২৫ মার্চের কালোরাতের কিছুদিন পূর্বে তিনি হাইমচরে চলে আসায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান।

১৯৬৯-৭০ এর গণআন্দোলনে আব্দুল কাইউম সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। হাইমচর থানা ন্যাপের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ‘নবারুন সংঘ’ এর সম্পাদক হিসেবে ১৯৭১ সালে তিনি হাইমচরের জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি আরো ১০ জনের সাথে ভারতের উদ্দেশ্য চলে যান। বাড়িতে রেখে যান প্রিয় বাব-মা, বড় বোন প্রয়াত সুরাইয়া বেগম (অক্টোবর ২০১৬ এ প্রয়াত), আদরের ছোট বোন শামসুন্নাহার, নাসিমা শাকিল, ছোট ভাই কামরুল হাসান (১৯ জুন ২০১৭ সালে প্রয়াত) সহ আরো চার বোন এক ভাইকে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি হাইমচর বালক বিদ্যালয়ে বিনাবেতনে খন্ডকালীন শিক্ষকতা করতেন।

শহীদ আব্দুল কাইউম স্মৃতি পাঠাগার ( (হাইমচর, চাঁদপুর)

বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পাক বাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনি শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন। কিন্তু এই অকুতোভয় বীর নিজে দেশমাতৃকার জন্য তার প্রাণ বিলিয়ে দেন।

নীল কমল নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তার সমস্ত স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। আর আজ তার ছাত্ররা তার জন্য হাইমচরে ‘শহীদ আব্দুল কাইউম স্মৃতি পাঠাগার’ গড়ে তুলেছেন যা তার স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখার একান্ত প্রয়াস।

৮)শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ[সম্পাদনা]

শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ ছবি সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়নি

প্রয়াত আব্দুল মজিদ ও রজবুন্নেসার (২৩ নভেম্বর ২০২০ এ প্রয়াত) দ্বিতীয় পুত্র শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহর জন্ম নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার ১২ নং ইউনিয়নের পূর্ব আলাইরপুর গ্রামে। শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বাল্যকাল থেকে অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের, ধীর-স্থির এবং মৃদুভাষী ছিলেন। এই বীর শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নও করতে শুরু করেন স্কুলজীবন থেকেই। মোহাম্মদ শফিউল্লাহ যখন আলাইরপুর-কাজীরহাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের (বর্তমান শহীদ আমানুল্লাহ) যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসেন এবং নিজ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলেন।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে দেশকে ভালোবেসে মোহাম্মদ শফিউল্লাহ ১৯৭১ সালের কাউকে কিছু না বলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতের ত্রিপুরায় চলে যান। তার তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাই আহছানউল্লাহ কামাল ছাড়া বাকী দুই ভাই মোহাম্মদ রহিমউল্লাহ আর মোহাম্মদ শহিদউল্লাহ বাবুল আজ প্রয়াত। আদরের দু’বোন মাসকুরা বেগম আর জান্নাতুল ফেরদৈাস আজও তার কথা বলতে গিয়ে আবেগাক্রান্ত হয়ে যান।

বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী গেরিলা দলের সদস্য হিসেবে পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের সাথে যাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধের একপর্যায়ে আহতাবস্থায় শত্রু বাহিনী তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। অসীম সাহসে লড়াই করতে করতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারায় সাহসী এই বীর সন্তান কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শফিউলল্লাহ আরো ৮ জন সহযোদ্ধার সাথে শহীদ হন।

শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ স্মৃতি পাঠাগার (পূর্ব আলাইরপুর, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী)

আলাইরপুর-কাজীরহাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে (বর্তমান শহীদ আমানুল্লাহ) তার একটি ছবি ছিল। কিন্তু ২০০০ সালে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় বিদ্যালয়টির স্থানান্তর করার সময় তার সমস্ত স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। সময়োচিত উদ্যোগের অভাবে হারিয়ে গেছে তার শেষ চিহ্নটুকু আর তার সুজন মহিউদ্দীন মহিমের নেতৃত্বে তার জন্য পূর্ব আলাইরপুর গ্রামে গড়ে উঠা ‘শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহের স্মৃতি পাঠাগার’ আজ প্রায় বন্ধের মুখে। শহীদ জননী রজবুন্নেসা আমৃত্যু আকুল হয়ে তার শফিউল্লাহকে খুজতেন, ডুকরে কেঁদে উঠতেন তার কিশোর সন্তানের জন্য।

(৯)শহীদ আব্দুল কাদের[সম্পাদনা]

শহীদ আব্দুল কাদেরের ছবি সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়নি

শহীদ আব্দুল কাদের ছিলেন কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী স্টেশনের নিকটবর্তী সাতবাড়িয়া গ্রামের সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এসময় তিনি ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে দেশের অভ্যন্তরে রণক্ষেত্রে নিরাপদে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীকে স্বদেশে পৌঁছে দেয়ার সময় কুমিল্লার বেতিয়ারায় পাক সেনাদের সাথে সম্মুখ সমরে শহীদ হন।

তার স্ত্রী আমেনা খাতুন তাঁদের একমাত্র মেয়ে হালিমা বেগমের সাথে বর্তমানে গুণবতী গ্রামে বসবাস করেন আর একমাত্র ছেলে মো. এয়াকুব যিনি পেশায় একজন ট্রাক চালক, চট্টগ্রামে বসবাস করেন।

শহীদ আব্দুল কাদেরের সমাধি (গুণবতী, সাতবাড়িয়া, চৌদ্দগ্রাম)

বেতিয়ারায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীটির অগ্রগামী গেরিলা দলের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের সাথে যাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুর সাথে অসীম সাহসে লড়াই করতে করতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারায় চৌদ্দগ্রামের সাহসী এই বীর শহীদ হন।

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ স্মৃতিসৌধ ও সমাধিক্ষেত্র (চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা)

তিনি পেশায় একজন কৃষক ছিলেন এবং তার কোন ছবির সন্ধান আজো পাওয়া যায়নি।

ঐতিহাসিক বেতিয়ারার রণাঙ্গণের ৯ জন শহীদের সমাধি (চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা)