সালমান শাহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
সালমান শাহ
সালমান শাহ.gif
সালমান শাহ
জন্ম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন
(১৯৭১-০৯-১৯)সেপ্টেম্বর ১৯, ১৯৭১
জকিগঞ্জ উপজেলা, সিলেট জেলা, বাংলাদেশ
মৃত্যু ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬(১৯৯৬-০৯-০৬) (২৪ বছর)
ইস্কাটন, ঢাকা, বাংলাদেশ
সমাধি জকিগঞ্জ উপজেলা, সিলেট জেলা, বাংলাদেশ
পেশা মডেল, অভিনেতা
কার্যকাল ১৯৮৬–১৯৯৬
যে জন্য পরিচিত কেয়ামত থেকে কেয়ামত
আনন্দ অশ্রু
স্বপ্নের নায়ক
ধর্ম ইসলাম
দাম্পত্য সঙ্গী সামিরা হক (বি. ১৯৯২–৯৬)
স্বাক্ষর
Salman Shah signature.jpg

সালমান শাহ (জন্ম: ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ - মৃত্যু: ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬), বাংলাদেশের ১৯৯০-এর দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক।[১] তাঁর প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন[২]। টেলিভিশন নাটক দিয়ে তার অভিনয় জীবন শুরু হলেও পরে তিনি চলচ্চিত্রে একজন জননন্দিত শিল্পী হয়ে উঠেন। ১৯৯৩ সালে তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত কেয়ামত থেকে কেয়ামত মুক্তি পায়[১]। একই ছবিতে নায়িকা মৌসুমী ও গায়ক আগুনের অভিষেক হয়। জনপ্রিয় এই নায়ক নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে সাড়া জাগানো অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তিনি সর্বমোট ২৭টি চলচ্চিত্র অভিনয় করেন এবং সবকয়টিই ছিল ব্যবসাসফল।[৩] তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অকালে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন[১]। অভিযোগ উঠে যে, তাকে হত্যা করা হয়; কিন্তু তার সিলিং ফ্যানে ফাঁসিতে হত্যাকান্ডের কোনো আইনী সুরাহা শেষ পর্যন্ত হয়নি।

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

জন্ম[সম্পাদনা]

সালমান শাহ ১৯৭১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সিলেট জেলায় অবস্থিত জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন, এবং তাঁর রাশি ছিল বৃশ্চিক। তাঁর পিতা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা নীলা চৌধুরী। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। যদিও তাঁর জন্মনাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন, কিন্তু চলচ্চিত্র জীবনে তিনি সবার কাছে সালমান শাহ বলেই পরিচিত ছিলেন।[৪]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

সালমান পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। একই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী দুই ক্লাস তার সহপাঠী ছিলেন।[৫] ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বি.কম. পাস করেন।[৬]

পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

সালমান শাহ ১২ আগস্ট ১৯৯২ তাঁর মায়ের বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেন। সামিরা হক ছিলেন একজন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের কিছু চলচ্চিত্রে তাঁর পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেন।[৬]

অভিনয়জীবন[সম্পাদনা]

নাটকে অভিনয়[সম্পাদনা]

সালমান ১৯৮৫ সালে বিটিভির আকাশ ছোঁয়া নাটক দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন। পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকে অভিনয় করেন।[৪] নয়ন নাটকটি সে বছর শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে।[৭] এছাড়া তিনি ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত পাথর সময় ও ১৯৯৪ সালে ইতিকথা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন।[৬]

চলচ্চিত্রে অভিষেক[সম্পাদনা]

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে সালমান শাহ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলা তিনটি হিন্দি ছবি 'সনম বেওয়াফা' 'দিল' ও 'কেয়ামত সে কেয়ামত তক' এর কপিরাইট নিয়ে সোহানুর রহমান সোহানের কাছে আসে এর যে কোন একটির বাংলা পুনঃনির্মাণ করার জন্য কিন্তু তিনি উক্ত ছবিগুলোর জন্য উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা খুঁজে না পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। নায়িকা হিসেবে মৌসুমীকে নির্বাচিত করলেও নায়ক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন নায়ক আলমগীরের সাবেক স্ত্রী খোশনুর আলমগীর 'ইমন' নামে একটি ছেলের সন্ধান দেন। প্রথম দেখাতেই তাকে পছন্দ করে ফেলেন পরিচালক এবং সনম বেওয়াফা ছবির জন্য প্রস্তাব দেন, কিন্তু যখন ইমন 'কেয়ামত সে কেয়ামত তক' ছবির কথা জানতে পারেন তখন তিনি উক্ত ছবিতে অভিনেয়র জন্য পীড়াপীড়ি করেন। তাঁর কাছে কেয়ামত সে কেয়ামত তক ছবি এতই প্রিয় ছিলো যে তিনি মোট ২৬ বার ছবিটি দেখেছেন বলে পরিচালক কে জানান। শেষ পর্যন্ত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তাঁকে নিয়ে কেয়ামত থেকে কেয়ামত চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ইমন নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখা হয়।[৮] পরে মৌসুমীর বিপরীতে তিনি আরও তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবি তিনটি হল অন্তরে অন্তরে (১৯৯৪), স্নেহ (১৯৯৪) ও দেনমোহর (১৯৯৫)। শিবলী সাদিক পরিচালিত অন্তরে অন্তরে হিন্দি চলচ্চিত্র আও পেয়ার করের আনঅফিসিয়াল রিমেক, স্নেহ পরিচালনা করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও শফি বিক্রমপুরী পরিচালিত দেনমোহর হিন্দি চলচ্চিত্র সনম বেওয়াফার অফিসিয়াল রিমেক।[৯]

চলচ্চিত্রে সাফল্য[সম্পাদনা]

তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জহিরুল হকতমিজউদ্দিন রিজভী পরিচালিত তুমি আমার চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল হয়। পরিচালক জহিরুল হক চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ নির্মাণ করার পর মারা যান। পরে তমিজউদ্দিন রিজভী বাকি কাজ শেষ করেন।[১০] এই চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মত তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন শাবনূর[১১] পরে তার সাথে জুটি বেধে একে একে সুজন সখি (১৯৯৪), বিক্ষোভ (১৯৯৪), স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৪), মহামিলন (১৯৯৫), বিচার হবে (১৯৯৬), তোমাকে চাই (১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬), জীবন সংসার (১৯৯৬), চাওয়া থেকে পাওয়া (১৯৯৬), প্রেম পিয়াসী (১৯৯৭), স্বপ্নের নায়ক (১৯৯৭), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), বুকের ভিতর আগুন (১৯৯৭) সহ মোট ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছেন।[১২] সবকটি ছবি ব্যবসাসফল হয়।

চলচ্চিত্রের তালিকা[সম্পাদনা]

বছর চলচ্চিত্র চরিত্র পরিচালক সহশিল্পী টীকা
১৯৯৩ কেয়ামত থেকে কেয়ামত রাজ সোহানুর রহমান সোহান মৌসুমী চলচ্চিত্রে অভিষেক।
১৯৯৪ তুমি আমার আকাশ জহিরুল হকতমিজউদ্দিন রিজভী শাবনূর শাবনুরের সাথে ১ম সিনেমা
অন্তরে অন্তরে শান শিবলী সাদিক মৌসুমী
সুজন সখি সুজন শাহ আলম কিরণ শাবনুর
বিক্ষোভ অনিক মহম্মদ হাননান শাবনূর
স্নেহ ইমন গাজী মাজহারুল আনোয়ার মৌসুমী
প্রেমযুদ্ধ রাজা জীবন রহমান লিমা
১৯৯৫ দেনমোহর সরোয়ার শফী বিক্রমপুরী মৌসুমী
কন্যাদান দেলোয়ার জাহান ঝন্টু লিমা
স্বপ্নের ঠিকানা সুমন এম. এ. খালেক শাবনূর বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ২য় সর্বোচ্চ আয়কারী (১৯ কোটি)
আঞ্জুমান সালমান হাফিজউদ্দিন শাবনাজ
মহামিলন শান্ত দিলীপ সোম শাবনূর
আশা ভালোবাসা আকাশ তমিজউদ্দিন রিজভী শাবনাজ
১৯৯৬ বিচার হবে সুজন শাহ আলম কিরণ শাবনূর
এই ঘর এই সংসার মিন্টু মালেক আফসারী বৃষ্টি
প্রিয়জন নয়ন/জীবন রানা নাসের শিল্পী
তোমাকে চাই সাগর মতিন রহমান শাবনূর
স্বপ্নের পৃথিবী মাসুম বাদল খন্দকার শাবনূর
সত্যের মৃত্যু নাই জয় ছটকু আহমেদ শাহনাজ
জীবন সংসার সবুজ জাকির হোসেন রাজু শাবনূর
মায়ের অধিকার রবিন শিবলী সাদিক শাবনাজ
চাওয়া থেকে পাওয়া সাগর এম এম সরকার শাবনূর
১৯৯৭ প্রেম পিয়াসী হৃদয়/জীবন চৌধুরী (ছদ্ম নাম) রেজা হাসমত শাবনূর
স্বপ্নের নায়ক রাজু নাসির খান শাবনূর
শুধু তুমি আকাশ কাজী মোরশেদ শ্যামা
আনন্দ অশ্রু খসরু শিবলী সাদিক শাবনূর
বুকের ভিতর আগুন আগুন ছটকু আহমেদ শাবনূর শেষ ছবি
  • সালমান শাহ মৃত্যুর আগে মন মানে না ছবির ৫০% কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর চিত্রনায়ক রিয়াজ কে দিয়ে ছবিটি করানো হয়।[১৩]

টিভি নাটক[সম্পাদনা]

সিলেটে সালমান শাহ্‌-এর কবরের এপিটাফ।
বছর নাটক চরিত্র
১৯৮৫ আকাশ ছোঁয়া জানা নেই
১৯৮৮ সৈকতে সারস রাব্বি
১৯৯০ পাথর সময় জানা নেই
১৯৯৪ ইতিকথা জানা নেই
১৯৯৪ দোয়েল জানা নেই
১৯৯৫ সব পাখি ঘরে ফেরে জানা নেই
১৯৯৫ নয়ন সুলতান
১৯৯৬ স্বপ্নের পৃথিবী জানা নেই

মৃত্যু[সম্পাদনা]

সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পরলোক গমন করেন। রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনে তাঁর নিজ বাস ভবনে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। ময়না তদন্ত রিপোর্টে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্য এখনো কাটেনি। অনেকেই সালমান শাহ-এর মৃত্যুর জন্য তাঁর স্ত্রী সামিরার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন, এমনকি পরবর্তীকালে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী সামিরা ও আরো কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয় কিন্তু পরে এই মামলার আর কোন অগ্রগতি হয়নি ফলে সালমানের মৃত্যু নিয়ে রহস্য আর উদঘাটিত হয়নি।[১৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Salman Shah Forever etched in memory"দ্য ডেইলি স্টার (ঢাকা, বাংলাদেশ)। ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১১। সংগৃহীত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১১ 
  2. Arts & Entertainment (০৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৯)। "Salman Shah’s 13th death anniversary"দ্য ডেইলি স্টার (ঢাকা, বাংলাদেশ)। সংগৃহীত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১১ 
  3. "মৃত্যুর ২০ বছর পরেও আলোচনায় নায়ক সালমান শাহ। কেন তিনি এত জনপ্রিয় ছিলেন?"বিবিসি বাংলা (ঢাকা, বাংলাদেশ)। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  4. "সাফল্যের রাজপুত্র সালমান শাহ"দৈনিক প্রথম আলো (ঢাকা, বাংলাদেশ)। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১২। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  5. "একই স্কুলে পড়তেন সালমান-মৌসুমী"বাংলা মুভি ডেটাবেজ। সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৬। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  6. শান্তা মারিয়া (৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। "অন্তরে সালমান শাহ"বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (ঢাকা, বাংলাদেশ)। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  7. "সালমান শাহের নাটক ‘নয়ন’"দ্য রিপোর্ট। সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৪। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  8. "ইমন থেকে সালমান"দৈনিক কালের কণ্ঠ (ঢাকা, বাংলাদেশ)। ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সংগৃহীত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ 
  9. "সালমান-মৌসুমীর রসায়ন"দ্য রিপোর্ট। সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৪। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  10. গোলাম রিয়াদ (৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। "স্মরণ : অমর নায়ক সালমান শাহ"দৈনিক ভোরের পাতা। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  11. "একে অন্যের চোখের ইশারা বুঝতে পারতাম: শাবনূর"দৈনিক প্রথম আলো। সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৪। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  12. "সালমান শাহ’র নায়িকারা"দ্য রিপোর্ট। সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৫। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  13. "আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন"। কালের কণ্ঠ। সংগৃহীত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ 
  14. "সালমান শাহ’র মৃত্যু এখনো রহস্য"রাইজিংবিডি। সংগৃহীত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]