জয়নগর-মজিলপুর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
জয়নগর মজিলপুর
কলকাতা মহানগর অঞ্চল
জয়নগর মজিলপুর পশ্চিমবঙ্গ-এ অবস্থিত
জয়নগর মজিলপুর
জয়নগর মজিলপুর
জয়নগর মজিলপুর ভারত-এ অবস্থিত
জয়নগর মজিলপুর
জয়নগর মজিলপুর
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২২°১০′৩৮″ উত্তর ৮৮°২৫′৩৩″ পূর্ব / ২২.১৭৭২° উত্তর ৮৮.৪২৫৮° পূর্ব / 22.1772; 88.4258স্থানাঙ্ক: ২২°১০′৩৮″ উত্তর ৮৮°২৫′৩৩″ পূর্ব / ২২.১৭৭২° উত্তর ৮৮.৪২৫৮° পূর্ব / 22.1772; 88.4258
দেশ  ভারত
রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ
জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগণা
অঞ্চল বৃহত্তর কলকাতা
স্থাপিত ১ এপ্রিল ১৮৬৯; ১৪৯ বছর আগে (১ এপ্রিল ১৮৬৯)
সরকার
 • ধরন চেয়ারম্যান–কাউন্সিল
 • শাসক জয়নগর মজিলপুর পৌরসভা
আয়তন
 • মোট ৫.৮৫ কিমি (২.২৬ বর্গমাইল)
উচ্চতা ৮ মিটার (২৬ ফুট)
জনসংখ্যা (২০১১)
 • মোট ২৫,৯২২
 • ঘনত্ব ৪৪০০/কিমি (১১০০০/বর্গমাইল)
ভাষা
 • অফিসিয়াল

বাংলা, হিন্দি,

ইংরেজি
সময় অঞ্চল আইএসটি (ইউটিসি+৫:৩০)
পিন ৭৪৩৩৩৭
টেলিফোন কোড +৯১ ৩২১৮
লোকসভা নির্বাচনক্ষেত্র জয়নগর
বিধানসভা নির্বাচনক্ষেত্র জয়নগর
ওয়েবসাইট
  1. পুনর্নির্দেশ টেমপ্লেট:ইউআরএল

জয়নগর মজিলপুর হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার অন্তর্গত একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা । এই শহরটি কলকাতার দক্ষিণ শহরতলিতে অবস্থিত । এটি বৃহত্তর কলকাতার অন্তর্ভুক্ত এবং কলকাতা মহানগর উন্নয়ন পর্ষদের অধীনস্ত এলাকা ।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

শিয়ালদহ-লক্ষ্মীকান্তপুর রেললাইনের পশ্চিমে জয়নগর শহর ও পূর্বে মজিলপুর শহর। কায়স্থ প্রধান জয়নগর হল প্রাচীন শহর, অপরদিকে ব্রাহ্মণ প্রধান মজিলপুর হল অপেক্ষাকৃত নবীন শহর। আদিগঙ্গার প্রাচীন প্রবাহপথে অবস্থিত সুন্দরবনের অন্তঃপাতী এই স্থান একসময় ঘন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। একসময় এখানকার আদিগঙ্গার উপর দিয়ে পর্তুগিজ বণিকদের জাহাজ যাতায়াত করত এবং আন্দুল গ্রামের কাছে বর্তমান সাঁকরাইল খাল দিয়ে পাশে হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে পৌঁছাত। ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর মঙ্গলকাব্যগুলিতে জয়নগর শহরের উল্লেখ থাকলেও মজিলপুর শহরের নেই।

জয়নগর নামটি এসেছে স্থানীয় দেবী জয়চণ্ডীর নাম থেকে। জনশ্রুতি আছে, এখানকার প্রথম বসতি স্থাপয়িতা কলকাতার বাগবাজারের মতিলালবংশের পূর্বপুরুষ গুণানন্দ মতিলাল সপ্তদশ শতকে বাণিজ্যের কারণে নদীপথে যেতে যেতে গঙ্গার কিছু দূরে এক বাদাম গাছের কাছে নোঙর করেন; রাতে গঙ্গার কিছু দূরে জনশূন্য স্থানে আশ্চর্য আলো দেখতে পান এবং দেবী জয়চণ্ডী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে মাটি খুঁড়ে প্রতিষ্ঠা করতে বলেন। পরদিন গুণানন্দ মাটি খুঁড়ে একটি প্রস্তরখণ্ড পেয়ে তা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। আজও দেবী এখানে পূজিতা এবং প্রতি জৈষ্ঠ্যপূর্ণিমায় দেবীর প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে মেলা বসে। মতিলালবংশের পর এখানে কায়স্থ সেন এবং বড়িশার মিত্রবংশ বসতি করেন। মিত্রপরিবারের প্রতিষ্ঠিত রাধাবল্লভ মন্দির ও দোলমঞ্চ বর্তমান।

অষ্টাদশ শতকের রেনেলের গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানচিত্রে দেখা যায়, বর্তমান মজিলপুর শহরের পশ্চিমাংশের বিস্তৃত ধানক্ষেত 'গঙ্গার বাদা'র উপর দিয়েই আদিগঙ্গার প্রবাহ বইত। আদিগঙ্গার মজাগর্ভে নতুন বসতির উৎপত্তি হয়েছিল বলেই এই শহরের নাম 'মজিলপুর' হয়েছে। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে ভাগ্যবিপর্যয়ের ফলে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের আমলা-অমাত্য, ব্রাহ্মণ-কায়স্থ পণ্ডিত-পুরোহিতরা সুন্দরবনের এই জঙ্গলাকীর্ণ জনবিরল স্থানে বসবাস শুরু করেন। এখানকার দত্ত-ভট্টাচার্য ও পোণ্ডাবংশীয়রা আদি বাসিন্দা; ক্রমে চক্রবর্তী, দে, কান্বায়ণ ও অন্যান্য ব্রাহ্মণ-কায়স্থরা বসতি শুরু করেন। ছাত্র ও দেবালয়বহুল প্রাচীন মজিলপুর শহরে শিক্ষার জন্য অনেক চতুষ্পাঠী ছিল এবং সেগুলি জমিদার ও ধনী ব্যক্তিদের বৃত্তি বা নিষ্কর ভূমিস্বত্ব থেকে পরিচালিত হত। [১]

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

ভারতের ২০০১ সালের আদম শুমারি অনুসারে জয়নগর-মজিলপুর শহরের জনসংখ্যা হল ২৩,৩১৯ জন।[২] এর মধ্যে পুরুষ ৫২%, এবং নারী ৪৮%।

এখানে সাক্ষরতার হার ৭৬%, । পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮২%, এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৭১%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৫৯.৫%, তার চাইতে জয়নগর-মজিলপুর শহরের সাক্ষরতার হার বেশি।

এই শহরের জনসংখ্যার ১০% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী।

সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

জয়নগর শহরে জয়চণ্ডীর মন্দির বিখ্যাত। এছাড়া, মিত্র-গঙ্গা দীঘির পাশে পোড়ামাটির ভাস্কর্যের দ্বাদশ মন্দির বর্তমান; এগুলির প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৫৫ খ্রিঃ থেকে ১৭৯৯ খ্রিঃ। এরপাশেই দেবতা 'দক্ষিণের ক্ষেত্রপাল' বর্তমান; মূর্তি নেই, শুধু আছে পাথরের প্রাচীন মন্দিরের দরজার বা স্তম্ভের ভগ্নাংশ। মিত্র-গঙ্গা দীঘি খোঁড়ার সময়ই কতকগুলি ভাঙা প্রস্তরমূর্তি পাওয়া যায়, এগুলি কোন প্রাচীন মন্দিরের পাথরের ভগ্নাবশেষ বলে মনে করা হয়। জয়নগর শহরের রক্তাখাঁ পাড়ায় লোকদেবতা বৃষভবাহন পঞ্চানন ও বিবির থান রয়েছে। রক্তাখাঁ পীর বড়খাঁ গাজীর নামান্তর বলে মনে করা হয়।

মজিলপুর শহরের ধন্বন্তরি কালীবাড়ি একটি প্রাচীন শক্তিপীঠ। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে আদিগঙ্গার তীরবর্তী স্থানগুলি শক্তিসাধনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল; সপ্তদশ শতকে এক সিদ্ধতান্ত্রিক ভৈরবানন্দ আদিগঙ্গার তীরে এই ধন্বন্তরি দেবীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। মজিলপুর শহরের উল্লেখযোগ্য লোকদেবতা হলেন পণ্ডিতপাড়া ও কয়েলপাড়ার পঞ্চানন ঠাকুর। কয়েলপাড়ার পঞ্চানন গভীর পাঁশুটে রঙের ভয়ঙ্কর মূর্তি, পাশে গর্দভবাহনা শীতলা দেবীর ও বাবাঠাকুরের (দক্ষিণরায়) মূর্তি আছে। পণ্ডিতপাড়ার পঞ্চানন ও শীতলা সাধারণ ইটের ঘরে পাশাপাশি বিরাজিত; এদের সামনে বাবাঠাকুর, জরাসুর ও বসন্ত রায়ের ছোট ছোট মূর্তি বর্তমান। আগে মন্দিরটি চালাঘরের ছিল এবং মূর্তির বদলে ঘটে পূজা করা হত।

উল্লেখ্য, রাঢ়-বাংলার লোকদেবতা ধর্মঠাকুর ক্রমে ভাগীরথী প্রবাহের নিম্নধারায় জনসংস্কৃতিতে মজিলপুর শহরের পঞ্চানন রূপের ভিতর দিয়ে পরিপূর্ণ শিবমূর্তিতে রূপান্তরিত হয়েছেন। [১]

খ্যাতি[সম্পাদনা]

জয়নগরের মোয়া নামক মিষ্টান্নটি সুপ্রসিদ্ধ। কনকচূর ধানের খই ও খেজুরের নলেন গুড় থেকে তৈরী এই মোয়ার জন্যে জয়নগর শহরের ব্যপক পরিচিতি আছে। মজিলপুর শহরে অগ্নিযুগের বিপ্লবী শহীদ কানাইলাল ভট্টাচার্যের বাড়ী। তিনি দীনেশ গুপ্তকে ফাঁসির আদেশদানকারী বিচারক গার্লিককে হত্যা করেছিলেন। মজিলপুর শহরের দত্তপাড়ায় তার একটি আবক্ষ মূর্তি আছে।[৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ঘোষ, বিনয়, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি", তৃতীয় খন্ড, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন, পৃষ্ঠা: ২৫১-২৫৪
  2. "ভারতের ২০০১ সালের আদম শুমারি"। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ৭, ২০০৬ 
  3. জয়দেব দাস (২০১৫)। অজানা সুন্দরবন। কলকাতা। পৃষ্ঠা ৮৮।