পুরসভা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

পুরসভা বা পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শহরাঞ্চলীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ একক। কলকাতা, আসানসোল, দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, হাওড়াচন্দননগর মহানগরগুলি বাদে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য শহরে এই ব্যবস্থা প্রচলিত। পশ্চিমবঙ্গে মোট পুরসভার সংখ্যা ১১৯টি। এর মধ্যে প্রেসিডেন্সি বিভাগে ৫৫টি, বর্ধমান বিভাগে ৪৩টি ও জলপাইগুড়ি বিভাগে ২১টি পুরসভা বিদ্যমান।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৩২ সালে অবিভক্ত বাংলায় প্রবর্তিত বঙ্গীয় পৌরসভা আইন বা বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট অনুসারে ও সেই আইনের ১৯৮০, ১৯৮২১৯৯২ সালের সংশোধনী অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের পুরসভাগুলি পরিচালিত হত। ১৯৯৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের পুরসভাগুলির পরিচালনার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ পৌর আইন বা দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট চালু হয়। ১৯৯৪১৯৯৫ সালে এই আইনের সংশোধন সাধন করা হয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পুরসভাগুলি এই আইন মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত আছে।

গঠন[সম্পাদনা]

নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলির নিরিখে রাজ্য সরকার কোনও অঞ্চলে পৌরসভা গঠন করতে পারে –

  • নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনসংখ্যা ২০,০০০-এর কম হবে না।
  • নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ন্যূনতম ৭৫০ জন হতে হবে।
  • প্রাপ্তবয়স্ক অধিবাসীদের অর্ধেকের বেশি লোক অকৃষিজীবী হবেন।

এছাড়াও রাজ্য সরকারকে নিশ্চিত হতে হয় যে, কোনও শহরকে পুরসভার অন্তর্গত করলে তা যথেষ্ট পরিমাণে কর ও অন্যান্য উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহে সক্ষম হবে।

শ্রেণিবিভাগ[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ পৌর আইন, ১৯৯৩ অনুসারে পুর অঞ্চলগুলিকে ৫টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলি হল –

  • ‘ক’ বিভাগ – ২,০০,০০০-এর বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট। ওয়ার্ড সংখ্যা সর্বাধিক ৩৫, সর্বনিম্ন ৯।
  • ‘খ’ বিভাগ – ১,৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ জনসংখ্যা বিশিষ্ট। ওয়ার্ড সংখ্যা সর্বাধিক ৩০, সর্বনিম্ন ৯।
  • ‘গ’ বিভাগ –৭৫,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ জনসংখ্যা বিশিষ্ট। ওয়ার্ড সংখ্যা সর্বাধিক ২৫, সর্বনিম্ন ৯।
  • ‘ঘ’ বিভাগ –২৫,০০০ থেকে ৭৫,০০০ জনসংখ্যা বিশিষ্ট। ওয়ার্ড সংখ্যা সর্বাধিক ২০, সর্বনিম্ন ৯।
  • ‘ঙ’ বিভাগ – ২৫,০০০-এর কম জনসংখ্যা বিশিষ্ট। ওয়ার্ড সংখ্যা সর্বাধিক ১৫, সর্বনিম্ন ৯।

কর্তৃপক্ষ[সম্পাদনা]

পুরসভার দায়িত্বে আছেন –

  • পুরসভা বা বোর্ড অব কাউন্সিলরস – এঁরা পুরসভার নির্বাচিত সদস্য।
  • সপারিষদ-সভাপতি বা চেয়ারম্যান-ইন-কাউন্সিল – সপারিষদ-সভাপতিতে থাকবেন সভাপতি, সহসভাপতি ও অন্যান্য সদস্য। এঁদের ভূমিকা মন্ত্রীসভার ক্যাবিনেটের মতো। সপারিষদ-সভাপতির সদস্যসংখ্যা ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’, ‘ঘ’ ও ‘ঙ’ এই পাঁচটি শ্রেণির জন্য সর্বাধিক যথাক্রমে ৫,৪,৩,২ ও ১টি।
  • সভাপতি বা চেয়ারম্যান – পুরসভা নিজেদের মধ্যে একজনকে সভাপতি নির্বাচন করেন। সভাপতি পুরসভার শাসনতান্ত্রিক প্রধান ও পৌরপ্রশাসনের নিয়ন্ত্রক। সভাপতি পুরসভার সদস্যদের মধ্যে থেকে একজনকে সহসভাপতি ও সপারিষদ-সভাপতির সদস্যদের মনোনীত করেন ও তাঁদের মধ্যে কাজ বণ্টন করে দেন। সভাপতির ইচ্ছানুযায়ী সপারিষদ-সভাপতির সদস্যেরা ক্ষমতা ভোগ ও কাজ করেন। সভাপতি অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে সহসভাপতি সপারিষদ-সভাপতি ও পুরসভার সকল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। পুরসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সভাপতি অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করা যায় এবং এরপর সভার বিশেষ অধিবেশনে এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের লিখিত দাবির ভিত্তিতে সভাপতি অপসারিত হন।

পুরসভা প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ওয়ার্ড কমিটি গঠন করে। পশ্চিমবঙ্গ পৌর আইন অনুসারে পুর অঞ্চলে বসবাসকারী তপশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত জনসংখ্যার অনুপাতে তপশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মানুষদের আসন সংরক্ষিত থাকবে। এই আইন অনুসারে কোনও পুরসভাকেই বাতিল করা যায় না, কেবলমাত্র ভেঙে দেওয়া যায়। কিন্তু ভেঙে দেবার ছয় মাসের মধ্যে নতুন করে নির্বাচন করতে হয়।

ক্ষমতা ও কার্যাবলি[সম্পাদনা]

যেসব ক্ষমতা ও দায়িত্ব পুরসভাগুলির হাতে সমর্পণ করা হয়েছে সেগুলি হল –

  • রাস্তা, সেতু, বাগান, জলাশয়, ঘাট, কুয়ো, নর্দমা, শৌচাগার, ইত্যাদির নির্মান, বৈচিত্রায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন,
  • রাস্তায় জল দেওয়া ও ধুয়ে পরিচ্ছন্ন রাখা,
  • আলোর ব্যবস্থা করা,
  • জল সরবরাহ,
  • জঞ্জাল অপসারণ করে পরিবেশ রক্ষা করা,
  • উন্মুক্ত স্থানগুলিকে ব্যবহারোপযোগী করে তোলা ও সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন করা,
  • বৃক্ষরোপন ও রক্ষণাবেক্ষণ,
  • বাসযোগ্য গৃহ নির্মান,
  • শিক্ষার প্রসার
  • হাসপাতাল, চিকিৎসালয়, অনাথ আশ্রম, প্রসূতি ভবন, ধর্মশালা ও অতিথিনিবাসের সংখ্যা বৃদ্ধি।
  • রোগ-প্রতিষেধক টীকাকরণ আয়োজন,
  • ভয়াবহ ব্যাধি সংক্রমণ প্রতিহত করা,
  • পৌর বাজার ও কসাইখানা নির্মান ও রক্ষণাবেক্ষণ,
  • সরকারি গ্রন্থাগারগুলির উন্নয়ণ,
  • দুর্ভিক্ষ, খরা, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কালে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।
  • মৃত জন্তুর দেহ অপসারণ,
  • শ্মশানঘাট, গোরস্থান ও কবরখানা নির্মান ও রক্ষণাবেক্ষণ,
  • জেলা পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে পৌর অঞ্চলে পরিকল্পনা রূপায়ণ
  • বস্তি উন্নয়ন, ইত্যাদি।

আয়[সম্পাদনা]

পুরসভাগুলির আয়ের প্রধান উৎস রাজ্য সরকারের দেয় অনুদান। পুরসভার মোট খরচের ৬০% বহন করে রাজ্য সরকার। দ্বিতীয় উৎস, জাতীয় অর্থ কমিশনের সুপারিশে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক হস্তান্তরিত রাজস্ব। তৃতীয় উৎস, পুরসভাগুলির নিজস্ব রাজস্ব। পুরসভার নিজস্ব রাজস্বগুলি হল –

  • বার্ষিক মূল্যের ইজারার উপর কর,
  • জলকর,
  • বিদ্যুতকর,
  • শৌচাগারের উপর আরোপিত কর,
  • যানবাহনের উপর আরোপিত কর,
  • ব্যবসায়ী ও চাকুরিজীবীদের আরোপিত কর,
  • গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের উপর আরোপিত কর,
  • সেতু ও ফেরির কর,
  • ঘাট বা পুরসভার নিজস্ব জায়গাগুলি ব্যবহারের উপর কর।

পশ্চিমবঙ্গ পৌর আইন, ১৯৯৩ অনুসারে প্রত্যেক পুরসভার জন্য একটি করে পৌর তহবিল বা মিউনিসিপ্যাল ফান্ড গঠন করা হবে ও পৌর খাতে আদায়ীকৃত সব অর্থ সেই তহবিলে জমা পড়বে।

পশ্চিমবঙ্গের পুরসভার তালিকা[সম্পাদনা]

প্রেসিডেন্সি বিভাগ

বারাসাত, বরানগর, বাদুড়িয়া, বনগাঁ, অশোকনগর-কল্যানগড়, ব্যারাকপুর, গোবরডাঙা, বসিরহাট, দমদম, ভাটপাড়া, গারুলিয়া, হাবড়া, কামারহাটী, নৈহাটি, খড়দহ, কাঁচড়াপাড়া, নিউ ব্যারাকপুর, উত্তর ব্যারাকপুর, দক্ষিণ দমদম, উত্তর দমদম, পানিহাটি, টাকি, টিটাগড়, হালিশহর

রাজপুর, বারুইপুর, জয়নগর, মজিলপুর, বজবজ, ডায়মণ্ড হারবার, মহেশতলা

উলুবেড়িয়া, বালি

রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর, বীরনগর, নবদ্বীপ, চাকদহ, কল্যাণী, গয়েশপুর, কুপার্স ক্যাম্প, তাহেরপুর

মুর্শিদাবাদ, কান্দি, জিয়াগঞ্জ, আজিমগঞ্জ, জঙ্গীপুর, বহরমপুর, ধুলিয়ান, বেলডাঙা

বর্ধমান বিভাগ

কাটোয়া, দাঁইহাট, কালনা, রাণীগঞ্জ, বর্ধমান, গুসকরা, মেমারি, কুলটি, জামুরিয়া

সিউড়ি, রামপুরহাট, বোলপুর, দুবরাজপুর, সাঁইথিয়া, নলহাটি

বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, সোনামুখী

তমলুক, কাঁথি, এগরা, হলদিয়া

মেদিনীপুর, খড়গপুর, ঘাটাল, চন্দ্রকোনা, ক্ষীরপাই, ঝাড়গ্রাম, রামজীবনপুর

বাঁশবেড়িয়া, ভদ্রেশ্বর, বৈদ্যবাটি, শ্রীরামপুর, আরামবাগ, চাপদানি, রিষড়া চুঁচুড়া, কোন্নগর, উত্তরপাড়া, তারকেশ্বর

পুরুলিয়া, ঝালদা, রঘুনাথপুর

জলপাইগুড়ি বিভাগ

দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং, মিরিক

জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, মাল, ধুপগুড়ি

কোচবিহার, মাথাভাঙ্গা, দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ, হলদিবাড়ি, তুফানগঞ্জ

রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, ইসলামপুর

বালুরঘাট, গঙ্গারামপুর

মালদহ, ইংলিশবাজার

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

ভারতীয় প্রশাসন, শিউলি সরকার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা, ২০০৫