হেমেন্দ্রমোহন বসু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হেমেন্দ্রমোহন বসু (জন্ম: ১৮৬৬ - মৃত্যূ: ২৮ আগস্ট ১৯১৬) একজন বাঙালি ব্যবসায়ী । তিনি মূলত সুগন্ধীদ্রব্য, সাইকেল, মোটর গাড়ি, রেকর্ড, টর্চ লাইট এবং ছাপাখানার ব্যবসা করেছিলেন । তিনি শিল্পে বাঙালির কর্মক্ষেত্র তৈরি করেন এবং বহু বিষয়ে নিজস্ব ধারার প্রবর্তন করেন । তিনি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিস্ময়কর যান্ত্রিক প্রগতির বিভিন্ন নিদর্শনকে এদেশ প্রবর্তন করেন ।

পরিবার[সম্পাদনা]

হেমেন্দ্রমোহন বসুর জন্ম হয় বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহে । তাঁদের পরিবারের আদিনিবাস ছিল ময়মনসিংহের জয়সিদ্ধি । তাঁর পিতার নাম হরমোহন । হেমন্দ্রমোহনের পুত্রকন্যাদের ভিতরে চিত্রপরিচলক নীতীন বসু, ক্রিকেটার কার্তিক বসু এবং সঙ্গীত শিল্পী মালতী ঘোষাল খ্যাতিলাভ করেছিলেন ।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

হেমেন্দ্রমোহন আই এ পাস করার পর মেডিকেল কলেজে পড়তে থাকেন । সেই সময় তাঁর চোখে অ্যাসিড ছিটকে পড়ায় কিছুদিন অসুস্থ থাকেন । এরপর পড়া ছেড়ে ১৮৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দে কুন্তলীন কেশ তৈল নিয়ে ব্যবসায় অবতীর্ণ হন । এইচ. বোস পারফিউমার কারখানা থেকে তৈরি হতে থাকে কুন্তলীন, দেলখোস, ল্যাভেণ্ডার ওয়াটার, ও-ডি কোলন, মিল্ক অফ রোজ প্রভৃতি সুগন্ধি দ্রব্য ।

বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম কলকাতার হ্যারিসন রোডে সাইকেলের দোকান খোলেন । তিনি নিজে সাইকেল চড়তেন এবং বন্ধু বান্ধবদের চড়তে শেখাতেন । সেই সময়ে বিদেশ থেকে শুধু মোটর গাড়ি নয় তার চালকও আনতে হত । সেই সময়ে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে হেমেন্দ্রমোহন তাঁর টু-সিটার ড্যাকার গাড়িটি নিজে চালাতেন । তিনি গ্রেট ইষ্টার্ন মোটর কোম্পানি স্থাপন করেন । পার্ক স্ট্রীটে গ্রেট ইষ্টার্ন মোটর ওয়ার্কস নামে তাঁর একটি মেরামতির কারখানাও ছিল ।

হেমেন্দ্রকুমার এদেশে প্রথম রেকর্ড তৈরির কারখানা খুলেছিলেন । এই রেকর্ড ছিল ফনোগ্রামের সিলিন্ডার । ধর্মতলার মার্বেল হাউসে দ্য টকিং মেশিন হল নামে এই কারখানা তিনি খোলেন । পরে বৌবাজার স্ট্রীটের দেলখোস হাউসে এই কারখানা স্থানন্তরিত হয় । ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু হবার পরেই এইচ. বোসেস রেকর্ডের আত্মপ্রকাশ এবং বন্দেমাতরম গান সহ শুধু দেশাত্মবোধক গানই এতে প্রচার করা হয়েছিল । স্বদেশী গান প্রচারের জন্য তিনি তাঁর প্রধান শিল্পী হিসাবে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে । তাঁর তৈরি রেকর্ডে লালচাঁদ বড়াল বহু গান দিয়েছিলেন । দ্য টকিং মেশিন হল - এ মেরামতি বিভাগও চালু করেছিলেন । প্যাথে ডিস্কে এইচ. বোসেস রেকর্ডসের প্রথম চালান কলকাতায় আসে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ।

হেমেন্দ্রকুমার প্রতিষ্ঠিত কুন্তলীন প্রেসেরও খুব সুনাম ছিল । তিনি নিজে দক্ষ আলোকচিত্রী ছিলেন । রঙিন আলোকচিত্র গ্রহণে তিনি এদেশে পথিকৃৎ । তাঁর তোলা কয়েকটি অটোক্রোম স্লাইড পাওয়া যায় ।

অন্যান্য অবদান[সম্পাদনা]

হেমেন্দ্রকুমার কুন্তলীনদেলখোসের প্রচার এবং সাহিত্যসৃষ্টিকে উৎসাহ দেবার জন্য ১৩০৩ বঙ্গাব্দে কুন্তলীন পুরস্কার প্রবর্তন করেন এবং অনেক সাহিত্যিককে নিজের প্রতিভা বিকাশে সুযোগ দেন । গল্প লিখে প্রথম বছরের পুরস্কার পেয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসুশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম মুদ্রিত গল্প মন্দিরা কুন্তলীন পুরস্কার বিজয়ী ।

হেমেন্দ্রকুমার খেলাধুলাতেও উৎসাহী ছিলেন । স্পোর্টিং ইউনিয়ন ক্লাবের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি । তাঁর ৫২ নং আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে বহু জ্ঞানীগুনীর আসাযাওয়া ছিল ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - প্রথম খণ্ড - সাহিত্য সংসদ ISBN 81-85626-65-0