আবদুল কাদির (বাঙালি কবি)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
"আবদুল কাদির" এখানে পুননির্দেশ করা হয়েছে। অন্য ব্যবহারের জন্য, দেখুন আবদুল কাদির (দ্ব্যর্থতা নিরসন)
আবদুল কাদির
পেশা কবি, সাহিত্য সমালোচক
জাতীয়তা বাংলাদেশী
জাতি বাঙালি
নাগরিকত্ব বাংলাদেশ
ধরন কবিতা
উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ দিলরুবা (১৯৩৩), উত্তর বসন্ত (১৯৬৭)
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার একুশে পদক, বাংলা একাডেমি, মুক্তধারা পুরস্কার
দাম্পত্যসঙ্গী আফিয়া খাতুন


আবদুল কাদির (জন্ম : ১৯০৬ - মৃত্যু : ডিসেম্বর ১৯, ১৯৮৪) বাঙালি কবি, সাহিত্য-সমালোচক ও ছান্দসিক হিসেবে খ্যাত। তাঁর জন্ম বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার আড়াইসিধা গ্রামে ১ জুন, ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে। অতি শৈশবে তিনি মাতৃহারা হন। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অন্নদা মডেল হাইস্কুল থেকে পাঁচটি বিষয়ে লেটারসহ ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯২৫ -এ তিনি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। অতঃপর তিনি বিএ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সাংবাদিক জীবন[সম্পাদনা]

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় বিখ্যাত সওগাত পত্রিকায় সম্পাদনা বিভাগে চাকরি নেন। ১৯৩০ -এ কলকাতা করপোরেশনের একটি প্রাথমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে কমরেড মুজাফফর আহমদের কন্যা আফিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। বাংলা ১৩৩৭-এ জয়তী নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ এবং সম্পাদনা ছাড়াও একই বছর নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৩৮ -এ তিনি কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে কবি কাজী নজরুল ইসলামের দৈনিক নবযুগ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে সরকারের প্রচার সংস্থার বাংলা অনুবাদক পদে যোগ দেন। ১৯৪৬ -এ সাপ্তাহিক মোহাম্মদী ও অর্ধ-সাপ্তাহিক পয়গাম পত্রিকায় চাকরি করেন। ১৯৫২ -এ পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মুখপত্র মাসিক বিখ্যাত মাহেনও পত্রিকায় কর্মরত থাকার পর ১৯৬৪ -এ কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশনা কর্মকতা হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন তিনি অবসর গ্রহণ করেন সরকারি চাকুরি থেকে ।

সাহিত্য[সম্পাদনা]

তাঁর কাব্যপ্রয়াসে মোহিতলাল মজুমদারের ধ্রুপদী সংগঠন এবং নজরুলের উদাত্ত আবেগের চমৎকার সমন্বয় প্রত্যক্ষ হয়। মুসলিম সাহিত্য সমাজ (১৯২৬)-এর নেতৃত্বে ঢাকায় যে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন সূচিত হয়, কবি আবদুল কাদির তার নেতৃস্থানীয় উদ্যোক্তা। তিনি ছিলেন সাহিত্য সমাজের মুখপত্র বার্ষিক শিখা (১৯২৭) পত্রিকার প্রকাশক ও লেখক। প্রকাশিত কাব্য দিলরুবা (১৯৩৩) ও উত্তর বসন্ত (১৯৬৭)। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ ছন্দ সমীক্ষণ (১৯৭৯) যাতে তিনি বাংলা ছন্দ সম্পর্কে মৌলিক বক্তব্য রেখেছেন। আবদুল কাদিরের ছন্দ বিচারেও অধিকার সংশয়াতীত। সাহিত্য সম্পাদক হিসাবেও তিনি পরিশ্রম এবং একনিষ্ঠতার ছাপ রেখেছেন। তিনি সম্পাদনা করেছেন বিখ্যাত কাব্য সঙ্কলন কাব্য মালঞ্চ, মুসলিম সাহিত্যের সেরা গল্প, নজরুল রচনাবলি (প্রথম খণ্ড-পঞ্চম খণ্ড), রোকেয়া রচনাবলি, শিরাজী রচনাবলি, লুৎফর রহমান রচনাবলি, ইয়াকুব আলী চৌধুরী রচনাবলি, আবুল হুসেন রচনাবলি, কাব্যবীথি ইত্যাদি। সাহিত্যকীর্তির জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, মুক্তধারা পুরস্কার প্রভৃতি লাভ করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ[সম্পাদনা]

  • দিলরুবা (কাব্য)
  • উত্তর বসন্ত (কাব্য)
  • কাব্যমালঞ্চ (সংকলন)
  • ছন্দ সমীক্ষণ - সাহিত্যালোচনা
  • বাংলা কাব্যের ইতিহাস : মুসলিম সাধনার ধারা (১৯৪৪) -গবেষণা গ্রন্থ
  • কবি নজরুল (১৯৭০) - জীবনী
  • মওলানা মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন (১৯৭৯) - জীবনী
  • কাজী আবদুল ওদুদ (১৯৭৬)- জীবনী
  • লোকায়ত সাহিত্য (১৯৮৫),
  • ড. মুহম্মদ এনামুল হক বক্তৃতামালা (১৩৯০),[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; পৃষ্ঠা- ৩২।

২ কালের ধ্বনি, আশিক রেজা ও ইমরান মাহফুজ সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা , ঢাকা ২০১৭

বহি:সংযোগ[সম্পাদনা]

বাংলাসাহিত্যে কম চেনা বড় মানুষদের মধ্যে অন্যতম আবদুল কাদির। ১৯৪৫ সালে আবদুল কাদির রেজাউল করিমের সাথে ‘কাব্য-মালঞ্চ’ সম্পাদনায় সংকলিত প্রবন্ধ বলেন : ‘বাঙ্গলার মুসলমান-সমাজে ওহাবী আন্দোলনের প্রভাব, আলীগড়-আন্দোলনের প্রভাব ও কামাল-পন্থীদের প্রভাব যে ভাবে নানা প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে, সে সম্বন্ধে সচেতন হওয়া আমাদের বহু অতি-আধুনিক লেখক বিশেষ প্রয়োজন মনে করেন না। ঐতিহ্যের জন্য কিছুমাত্র পরোয়া না করিয়া অধুনা ইহাদের কেহ কেহ মার্ক্সীয় গাঁথা বা পাকিস্তানী পুঁথি রচনার জন্য উদ্দীপিত হইতেছেন। মাত্রাহীন উন্মাদনা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব দুই-ই মারাত্মক।’

বাঙালি, বিশেষত বাঙালি মুসলমানের ক্রিয়াশীলরূপে উপস্থাপন কঠিন, বরং ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় এর তুমুল প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র পরিস্ফুট। বাঙালি জাতীয়তাবাদও একই ধারাবাহিকতায় প্রতিক্রিয়াশীলতা। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সন্ধান, তার যাত্রা, এমনকি বাঙালি মুসলমানের একটি স্বাধীন দেশের অন্বেষাও সে প্রতিক্রিয়াশীলতার অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক উত্থান-পতনে, পরিবর্তনেÑ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘হুজুগে বাঙালি’কে ভিন্ন অন্য কিছু মনে হওয়া কঠিন।

ওপরে উল্লেখিত লেখাটি কিন্তু ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’ নয়, বরং প্রতিক্রিয়া ও সত্য উচ্চারণ। এর সত্যটিকে আমরা ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’র গর্ভে জন্ম নেওয়া ‘সৃষ্টিশীলতা’র শাখা হিসেবে আবিষ্কার করি। ১৯১১ সালের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’কে যদি বঙ্গীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রথম বৃক্ষ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, তবে ১৯২৬ সালের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ১৯৪২ সালের ‘বঙ্গীয় মুসলিম রেনেসাঁ সোসাইটি’ সে বৃক্ষের দুটি শাখা। ভুল-শুদ্ধ কিংবা কার্যকর-ব্যর্থতার তকমা হটিয়ে, আবেগের চশমা সরিয়ে যদি দেখি, পরভৃত ব্রাহ্মণ ও মোল্লাদের করতলগত বাংলায় ‘সৃষ্টিশীলতা’, ‘মুক্তচিন্তা’ কখনোই মুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি। বরং প্রগতির মুখোশে উনিশ শতকীয় ধর্মান্দোলনের অনুকূল হাওয়ায় ব্রাহ্মণ ও মোল্লাদের কুক্ষিগত রাষ্ট্রচিন্তন ‘মাত্রাহীন উন্মাদনা’ তো বটেই ভূখ-বহির্ভূত ওহাবি ও আলিগড়ের সাথে ‘কামাল পন্থা’রও নয়, প্রতিযোগিতা গড়ে উঠছে ‘খেলাফতি মাতলামো’র, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আর তার তলে চাপা পড়েছে বুদ্ধিবৃত্তি, মুক্তচিন্তা এমনকি শুদ্ধ করে বাংলাদেশের স্বার্থচিন্তাও আমরা করতে পারি না।

এমন কাঁটা বিছানো পথে আবদুল কাদিরের পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যখন তিনি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রবর্তনের পর নির্বাচন, বাঙালি মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েও ‘সমাজ প্রগতির অনুপস্থিতি’কে চিহ্নিত করেন। এ প্যারাডক্সটিকে নজরুল-গবেষক রফিকুল ইসলাম এভাবে প্রকাশ করেন- ‘বাঙালী মুসলমানের সমাজ সচেতনতা আর রাজনৈতিক সচেতনতা সমান্তরাল নয়। পাকিস্তান আন্দোলন, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় বাঙালী মুসলমান সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা, সংস্কারে বা আধুনিক সমাজ গঠনে তা পরিলক্ষিত হয় না। বাঙালী মুসলমান সমাজে বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ আবুল হুসেন বা কাজী আব্দুল ওদুদের উত্তরসূরী নেই বললেই চলে। এ সমাজের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত সামাজিক সমস্যাগুলিকে এড়িয়ে যান ধর্মব্যবসায়ীদের ভয়ে। তাই বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও সমাজ প্রগতি দূরাগত স্বপ্ন মাত্র। বস্তুত রাষ্ট্রবিপ্লবের চেয়ে সমাজবিপ্লব দুরূহ; মুসলমান প্রধান দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক ছাড়া আর কোথাও রাষ্ট্রবিপ্লবের পরপর সমাজবিপ্লব ঘটেনি কারণ আর কোন দেশে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের মতো আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাব ঘটেনি।’

বস্তুত, রুটি ও রাষ্ট্রের চিন্তায় দিন কাটানো বাঙালি, ব্রাহ্মণ ও মোল্লাপীড়িত বাঙালি, বাঙালির নেতারা বোধ করি এখনো ‘সমাজ প্রগতি’র প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি সম্পর্কে ভেবে উঠতে পারেনি। প্রসঙ্গের দাবি মেনে যদি বলা যায়, বাঙালি রুটি ও রাষ্ট্রের নেতা অনেক পেয়েছে কিন্তু জাতি নির্মাণের সারথির সৌভাগ্য লাভ করেনি, বোধ করি খুব অন্যায় হবে না। কিন্তু অন্যায় হবে যদি অস্বীকার করা হয় যে (যদিও প্রতিক্রিয়াশীলতার অংশ), বাঙালির লড়াই ও অর্জনে বুদ্ধিবৃত্তি একেবারে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু সে যাকে বলে ‘রুধির ধারার মতো’। আবার দৃশ্যত বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, বরং নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই বাংলার সমাজচিন্তনকে, সমাজসংঘটনকে প্রভাবিত করেছে। বলা চলে ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে। বেন্টিঙ্কের দাপ্তরিক ভাষাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যেমন ভাষাভিত্তিক জাতি গঠনে বাঙালিকে প্রণোদিত করেছে, তেমনি শেরেবাংলার জমিদারি বিলোপ আইন, বাংলায় একটি সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে মাইলফলক সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তটির প্রভাব বর্তমান বাংলাদেশি বাস্তবতায় বোঝা কঠিন, কিন্তু প্রতিবেশী ভারতের কিংবা পাকিস্তানি সমাজব্যবস্থা ও তার প্রতিনিধিদের দিকে সতর্কতাসহকারে তাকালেই পার্থক্যটি পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের এমন একাধিক সিদ্ধান্তের দৃষ্টান্ত রয়েছে। পাকিস্তানি আমলের ভুলের সংশোধনের প্রয়াস যেমন তাতে সংশ্লিষ্ট, তেমনি একটি জাতি সংগঠনে ঐতিহাসিক গতিপথ নির্ধারণে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক।

বস্তুত জাতি নির্মাণের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সুনিয়ন্ত্রিত পরিচালন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সে ক্ষেত্রে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্ম, সমাজচিন্তন-প্রশ্নহীনভাবে কেন্দ্রীয় সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, মেরুকরণ-দূরীকরণের সাথে সম্পর্কিত। বাঙালি শুরু থেকেই সমাজ ও রাষ্ট্র অভিন্ন বিষয় গণ্য করে এসেছে। আমাদের বুঝতে হবে বিষয় দুটি পরস্পরসম্পর্কিত ভিন্ন জগৎ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসিত হতে পারে বটে, সমাজের তা হবার জো নেই। সমাজ সর্বদা সর্বাদিসম্মত। ভিন্নমত, ভিন্ন রং, ধর্মচর্চা সমাজেরই অংশ। এখানে বিরোধী, ব্যতিক্রম বলে কিছু নেই। একটি অসাম্প্রদায়িক জাতি নির্মাণে সমাজ প্রগতি অবশ্য প্রয়োজনীয় আর সমাজ প্রগতির জন্য ওহাবি, আলিগড়, মুসলিম রেনেসাঁ কিংবা হেফাজতি সমাজ নয়, বাংলার বহুবর্ণ সমাজের প্রতিনিধিত্বের সাথে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ চর্চিত সমাজচিন্তন ১৯২৬-এর চেয়ে ২০১৬ সালে বেশি প্রাসঙ্গিক। সে প্রাসঙ্গিকতার সূত্রেই আবদুল কাদিরের চেতনা, চারিত্র ও চর্চা আমাদের সামনে একটি আলোকবর্তিকাস্বরূপ হাজির হয়।

খ.

যেকালে আবদুল কাদিরের বেড়ে ওঠা, সেকালের কালিক প্রয়োজন ও জোয়ারের পাশাপাশি ‘রুধির ধারা’টি লক্ষ করবার মতো। যে সম্প্রদায়টির তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন, তা ছিল পিছিয়ে পড়া, উল্টা পথের যাত্রী। যে জাতিটির তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন, তা ছিল চরম সাম্প্রদায়িক, বিভক্তি ও অসাম্যের প্রতিভূ। যে রাজনীতিটি মূলধারা হিসেবে পরিগণিত ছিল তা ছিল হুজুগ, খেলাফতি মাতলামো-পরবর্তী অবসাদ ও ভূখ-বহির্ভূত শক্তিনিয়ন্ত্রিত। আর সমাজ ও সমাজচিন্তন জলের অতলে ঘোলা পরবর্তী বুদ্বুদের বিকারগ্রস্ততায় অস্থির। তাঁর শিক্ষণের কালে পদচারণ ঘটেছে ‘মোহাম্মদী’র মতো পান্ডাশাসিত পত্রিকায়। কিন্তু তাঁর প্রবণতা ছিল মুক্তাকাশে উড়বার শক্তি যাচাইয়ে দিলখোলা, দৃষ্টি প্রসারিত। ‘সওগাত’, ‘নবযুগ’-এর সাথে কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, মুজফ্ফর আহমদসহ নজরুলের সঙ্গ তাঁর চিন্তনকে পাখনা দিয়েছিল সন্দেহ নেই। ফলত তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি মুক্তি লাভ করেছিল সে ডামাডোলের কালেই।

শুধু যে তিনি ‘প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন’ ছিলেন, তা-ই নয়, তাঁর ‘জয়তী’তে জাতি, সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তা, জাতীয় রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য, জাত ও জাতির প্রশ্ন, হিন্দু-মুসলমান যুদ্ধ, স্বাদেশিকতা ও মুসলমান, স্বাধীনতা আন্দোলন, এমনকি ‘সওগাত’ ও ‘সম্মিলনী’ প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকার আলোচনা খেয়াল করলে বোঝা যায়, তিনি তৎকালীন বিতর্কিত বিষয়সমূহ সম্পর্কে কতটা নির্মোহ থাকতে পেরেছেন। তাঁর পরিণত বয়সের ‘মুসলিম রেনেসাঁ’র তুমুল আকর্ষণ থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখতে পেরেছেন। তাঁর প্রায় শতবর্ষ পুরোনো প্রতিটি চিন্তা আজও কী ভীষণভাবে সমকালীন। আজকের বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সমস্যাসমূহ একটু তলিয়ে ও আবদুল কাদিরের পাঁজির সাথে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে ঐ চরম সাম্প্রদায়িক কালে আবদুল কাদির যা ভাবতেন, তা স্বপ্ন দেখার সাহস রাখেন না প্রায় শতবর্ষ পরের রাষ্ট্রনায়কেরা।

গ.

‘সওগাত’ থেকে নিজস্ব ‘জয়তী’ হয়ে ‘মাহে নও’ পর্যন্ত পত্রিকা সম্পাদনার দীর্ঘ যাত্রায় তিনি যে অপরাপর ঐতিহাসিক কর্তব্য ভুলে যাননি, তাঁর পর্বতপ্রমাণ সিরাজী রচনাবলী সম্পাদনা, কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলী সম্পাদনা, ডা. লুৎফর রহমান রচনাবলী সম্পাদনা, রোকেয়া রচনাবলী সম্পাদনা, লোকায়ত সাহিত্য সংকলন ও সম্পাদনা, বাংলা সনেট সংকলন ছাড়াও ৮০টির মতো ছন্দবিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, বাংলা ছন্দের ইতিবৃত্ত, ‘ছন্দ-সমীক্ষণ প্রভৃতি কমপক্ষে তিনটি ছন্দবিষয়ক গ্রন্থরচনা, নজরুল রচনা সংগ্রহ (১ম-৫ম খ-), নজরুল-স্বরলিপি সংকলন। আজকের যে নজরুল ইসলামকে আমরা জানি, সে জানার অনেকখানি তাঁর বিনির্মাণ। নজরুল-সখা শৈলেন্দ্র কিংবা কাজী আবদুল ওদুদের বিচ্ছিন্ন প্রয়াসের বাইরে তিনিই নজরুল-চর্চার পথিকৃৎ, সে কথা এ সংখ্যার লেখাগুলো পাঠ করলে কিংবা নজরুল-বিশেষজ্ঞ যে কারোর লেখা পাঠ করলেই বোঝা যাবে।

বাংলায় এ ধরনের চর্চা বিরল। হুমায়ুন আজাদের শামসুর রাহমান বিনির্মাণ কিংবা পিএইচডির প্রয়োজনে যেসব উদ্দেশ্যমূলক চর্চা হয়ে থাকে, তার থেকে কাদিরের নজরুল-চর্চা ও নিবেদন ভিন্নতর। আবদুল আজীজ আল আমান কিংবা আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ কাদির সমালোচক-উত্তর সময়ে সেটির সঘোষ উচ্চারণ অন্তত আরও একবার জরুরি বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

পাশাপাশি মধুসূদনের সময় থেকেই বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছন্দচিন্তন ও চর্চার পাশাপাশি বিদ্রোহের, নতুনের যে ঝা-া উচ্চকিত; একই সাথে কলকাতাকেন্দ্রিক চর্চার বৃত্তের বাইরে থেকে বাংলা ছন্দের অন্দর-বাহির এমন দর্শনেরও যে তিনি পথিকৃৎ, আজকের প্রজন্ম সে সম্পর্কে অনবহিত তো বটেই, তাঁর ছন্দ-ধারণার সাথেই পরিচিত নয়। বৃত্ত ভাঙার কারিগর, তারুণ্যের শক্তিকে তাঁর চিন্তনের সাথে নবপরিচয়ের উদ্দীপক হতে ‘কালের ধ্বনি’ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

সর্বোপরি, বিশের দশকে কবিতায় যাত্রা শুরু করে আশির দশকে চলে যাওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় দশক কবিতায় সমর্পিত কবিতাকর্মী, যিনি সারা জীবন মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশকারী, এমন বিরল মিতাচারী কবির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করতে পেরে আমরা আনন্দিত।

আশিক রেজা, ইমরান মাহফুজ