তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া.jpg
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া
জন্ম মানিক মিয়া
ভান্ডারিয়া গ্রাম, পিরোজপুর জেলা
মৃত্যু ১ জুন, ১৯৬৯
রাওয়ালপিন্ডি, পাকিস্তান

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলা জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভান্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তিনি ভর্তি হন ভান্ডারিয়া হাই স্কুলে। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। তখন থেকেই তিনি ছিলেন সহচর-সহপাঠীদের কাছে ক্ষুদে নেতা। ভান্ডারিয়া স্কুলে মানিক মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর চলে যান পিরোজপুর জেলা সরকারী হাই স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশন সহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।[১]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলাসিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন। চাকরি করার সময় তিনি একবার বরিশাল জেলা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। কোর্টের চাকুরীকালীন সময়ে জনৈক মুন্সেফ একদিন তাঁর সাথে খারাপ আচরণ করেন। এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে চাকুরি ছেড়ে দেন। এ চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তিনি যোগ দেন করেন তদানীন্তন বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশাল জেলার সংযোগ অফিসার হিসেবে। সে চাকুরী ছেড়ে দেয়ার পর তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। রাজনৈতিক প্রচারকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে একটি প্রচারপত্রের প্রয়োজন ছিলো এবং সেই চিন্তা থেকেই মানিক মিয়ার উদ্যোগে ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় বের হয় 'দৈনিক ইত্তেহাদ'। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে 'দৈনিক ইত্তেহাদ'-এর পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। এ পত্রিকার সাথে মানিক মিয়া মাত্র দেড় বছরের মতো যুক্ত ছিলেন। এই পত্রিকার মাধ্যমেই তাঁর গণমাধ্যম জগতের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। দেশ বিভাগের পর থেকে পত্রিকাটি ঢাকায় নিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তিনবার পত্রিকাটিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেয়া হয় এবং এখানে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বার বার এভাবে পাকিস্তানি সরকার কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। মানিক মিয়াও তখন ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় মানিক মিয়ার বাড়ি

১৯৪৮ সালেই পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামে। এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বাঙালির পাকিস্তান মোহ কিছুটা কাটতে থাকে। ১৯৪৯ সালে মুসলীম লীগের বিরোধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। একই বছরে এই রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এর। আবদুল হামিদ খান ভাসানী পত্রিকাটির আনুষ্ঠানিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে মানিক মিয়া এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরিত হয়। এ সময়ে দৈনিক ইত্তেফাকপত্রিকা আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে তিনি এক বছর জেল খাটেন। ১৯৬৩ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন পৃন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি ইত্তেফাকের রাজনৈতিক হালচাল ও পরবর্তী সময়ে মঞ্চে নেপথ্যে কলামে মোসাফির ছদ্মনামে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখতেন। [২] ১৯৬৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক প্রেস ইন্সটিটিউটের পাকিস্তান শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে সৃষ্ট দাঙ্গা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধে স্থাপিত দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির প্রথম সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

দীর্ঘ সংগ্রামের পর একটা সময়ে এসে মানিক মিয়া কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাঁর শরীর ভেঙ্গে পড়ে। এ অবস্থায় ১৯৬৯ সালে ২৬ মে এই ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে রাওয়ালপিন্ডি যান। সেখানেই ১৯৬৯ সালের ১ জুন রাতে তিনি মারা যান।[৩]

পরিবারের সদস্য[সম্পাদনা]

পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে কর্মরত থাকাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের মরহুম খোন্দকার আবুল হাসান সাহেবের কন্যা মাজেদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার দুই ছেলে হলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। মইনুল হোসেন বঙ্গবন্ধু সরকারের এমপি ও ওয়ান ইলেভেন সরকারের আইন উপদেষ্টা ছিলেন। মানিক মিয়ার ছোট ছেলে জাতীয় পার্টি (জেপি) সভাপতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি এরশাদ ও শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।

জীবনপঞ্জি[সম্পাদনা]

পুরস্কার[সম্পাদনা]

দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

[৪]

  1. http://www.gunijan.org.bd/GjProfDetails_action.php?GjProfId=315
  2. http://dhakanews24.com/?p=34876
  3. http://shokalerkhabor.com/online/details_news.php?id=3146&&%20page_id=%2011
  4. http://www.mzamin.com/details.php?mzamin=NzY0Nzg=[১]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও বাঙালির মুক্তি সংগ্রামবড় লেখা লেখক: সিরাজ উদ্দীন আহমেদ

অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের প্রথমদিকে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। তিনি দেখলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হবে। ভারত ভাগ হলে বাংলা ভাগ হবে। তখন মুসলিম লীগ হতে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, কংগ্রেসের শরত্চন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায় স্বাধীন বাংলার রূপরেখা ইংরেজ সরকারের কাছে পেশ করেন। সোহ্রাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা জনগণের নিকট পৌঁছে দেয়। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ এবং পত্রিকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। সোহ্রাওয়ার্দী স্বাধীন বাংলা আন্দোলনকালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কংগ্রেসের বিরোধিতা ও বৃটিশ সরকারের দেশ ভাগ নীতির কারণে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়। দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে পাঞ্জাব, সিন্ধু সীমান্তে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। মহাত্মা গান্ধী ও হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কলকাতাকে কেন্দ্র করে শান্তি প্রতিষ্ঠার বাণী প্রচার শুরু করেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মূলত গান্ধী ও সোহ্রাওয়ার্দীর চেষ্টায় বাংলায় দাঙ্গা হয়নি। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সোহ্রাওয়ার্দীর সঙ্গে ছিলেন। গান্ধী-সোহ্রাওয়ার্দীর আদর্শে মানিক মিয়া অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় প্রভাবিত হয়েছেন। সারা জীবন মানিক মিয়া অসাম্প্রদায়িক আদর্শ প্রচার করেছেন এবং লেখনীর মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি অটুট রাখায় অবদান রেখেছেন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকার দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। ১৯৪৯ সালের ৫ মার্চ হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বাস ও রাজনীতি করার জন্য কলকাতা ত্যাগ করেন। একইসঙ্গে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন। মুসলিম লীগ সরকার সোহ্রাওয়ার্দীর বিরোধিতা করেছে। সোহ্রাওয়ার্দী মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে দল গঠনের প্রস্তুতি নেন। মূলত তার পরামর্শে মুসলিম লীগের বামপন্থী দল রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি নেয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান আসাম ত্যাগ করে টাঙ্গাইলে চলে আসেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। দলের সভাপতি হলেন মওলানা ভাসানী, সম্পাদক হলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সরাসরি রাজনীতিতে যোগ না দিলেও তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। নতুন দলের কর্মসূচি, পূর্ব বাংলার দাবি তুলে ধরার জন্য একটি পত্রিকা একান্ত দরকার। এমতাবস্থায় মানিক মিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক। মানিক মিয়া ১৯৩৪ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ডিস্টিংকশনসহ বিএ পাস করে পিরোজপুর দেওয়ানী আদালতে চাকরি করতেন। মুসলিম লীগ গঠনকালে সোহ্রাওয়ার্দী পিরোজপুর আগমন করেন। মানিক মিয়ার চাচা আফতাব উদ্দিন উকিল এবং ছোবহান মোক্তার তাকে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় করে দেন। মানিক মিয়া প্রথমে বরিশাল জেলার জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন। সোহ্রাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে কলকাতায় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ অফিসের দফতর সম্পাদক নিযুক্ত হন। তারপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানিক মিয়া সোহ্রাওয়ার্দীর একান্ত সান্নিধ্যে ছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ সরকার নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার শুরু করে। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। জননিরাপত্তা আইনে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেফতার করতে থাকে। ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি সাঁওতাল আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ তার ওপর পাশবিক অত্যাচার করে। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বরিশাল ও ঢাকায় দাঙ্গায় হিন্দুদের হত্যা-ঘরবাড়ি লুট করা হয়। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক মুসলিম লীগ সরকারের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। পত্রিকা সরকারের খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা তুলে ধরে। এ সময় লবণের সের হয়েছিল ১৬ টাকা। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে ছাত্রহত্যার সংবাদ গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেয় ইত্তেফাক। মানিক মিয়ার লেখনী বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ শক্তিশালী হয়। ১৯৫২ সালে রক্তে ভেজা পথ দিয়ে মানিক মিয়া বাঙালি জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে নিয়ে যান। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি হতে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাবন্দি ছিলেন। এ সময় ইত্তেফাক শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দাবি এগিয়ে নিয়ে যায়। মানিক মিয়ার সুযোগ্য পরিচালনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আওয়ামী মুসলিম লীগও দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী দলে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় সুনিশ্চিত হয়। ফলে ইত্তেফাকের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এসময় সাপ্তাহিক থেকে ইত্তেফাককে দৈনিক পত্রিকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৫৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর ইত্তেফাক দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সরকার ১৯৫৪ সালে মার্চ মাসে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। কৃষক শ্রমিক পার্টির সভাপতি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আওয়ামী মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদি আন্দোলন এগিয়ে চলে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে ২১ দফা দাবি গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে দেন। তিনি মোসাফির নামে দৈনিক ইত্তেফাকে নিয়মিত লেখেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিশাল বিজয় হয়। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন। মন্ত্রিসভা গঠনে মানিক মিয়া সহযোগিতা করেন। যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে গেল। সোহ্রাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেন। পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সোহ্রাওয়ার্দীর মতবিরোধ দেখা দেয়। দৈনিক ইত্তেফাক সোহ্রাওয়ার্দীর পররাষ্ট্র নীতির সমর্থনে ব্যাপক প্রচার করে। আওয়ামী লীগ বিভক্ত হলো। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি করে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে। শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে। ১৯৫৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সামরিক আইন লংঘনের অভিযোগে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। কয়েক মাস কারাভোগরে পর মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬২ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নির্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীকে করাচিতে গ্রেফতার করা হয়। সোহ্রাওয়ার্দীর গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর প্রমুখকে গ্রেফতার করে। সামরিক সরকার দৈনিক ইত্তেফাকের বিরোধী ছিল। সরকার পত্রিকার প্রচার-প্রসার পদে পদে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। ৬ মাস কারাভোগের পর সোহ্রাওয়ার্দী মুক্তি লাভ করেন এনডিএফ গঠন করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু করেন। এ সময় ইত্তেফাক ও মোসাফির কলামের লেখনী আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহ্রাওয়ার্দী বৈরুতে মৃত্যুবরণ করেন। সোহ্রাওয়ার্দীর মৃত্যুর ফলে মানিক মিয়া অসহায় হয়ে পড়েন। গণতন্ত্রের মানসপুত্র সোহ্রাওয়ার্দী বিদেশ থেকে মানিক মিয়ার নিকট একটি পত্র লেখেন। সোহ্রাওয়ার্দীর মসি ছিলেন মানিক মিয়া এবং অসি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে কাশ্মীরের মসজিদের হযরত বাল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা শুরু হয়। ১৬ জানুয়ারি মানিক মিয়ার উদ্যোগে ইত্তেফাক অফিসে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগ গঠনে সার্বিক সহযোগিতা করেন। আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি ঘোষণা করেন। ৬ দফা ছিল বাঙালিদের বাঁচার দাবি, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, স্বাধীনতার দাবি। ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এ সময় মানিক মিয়া ৬ দফা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ৬ দফা কি, কেন তা প্রচার করে ৬ দফা দাবি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। ৬ দফা দাবি অঙ্কুরে ধ্বংস করার জন্য আইয়ুব খান ও গভর্নর মোনায়েম খান দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার শুরু করে। ১৯৬৬ সালের ৮ মে শেখ মুুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ আজিজ প্রমুখকে গ্রেফতার করে। দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল “আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, জহুর আহমদ চৌধুরী, মুজিবুর রহমান ও এম এ আজিজ কারা প্রাচীরের অন্তরালে।” নেতৃবৃন্দের মুক্তি ও ৬ দফার দাবিতে পূর্ব বাংলাব্যাপী ৭ জুন প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। এদিন পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক নিহত হয়। ৭ জুনের হত্যা-নির্যাতনের সংবাদ পরিবেশন করে ইত্তেফাক ৬ দফা আন্দোলন বেগবান করে। ৬ দফা আন্দোলন স্তব্ধ করার ক্ষমতা আইয়ুব-মোনায়েমের নেই। অকুতোভয় নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মোসাফির কলামে অগ্নিঝরা লেখনীতে বাঙালি জাতিকে প্রচণ্ডভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছে। নেতারা বন্দী কিন্তু মানিক মিয়া ইত্তেফাক নেতাদের শূন্যতা পূরণ করেছে। ১৯৬৬ সালের ১০ মে দৈনিক ইত্তেফাকের মোসাফির তার রাজনৈতিক কলামে লিখলেন। “৬ দফার যে বিপুল জনসমর্থন রহিয়াছে সেই প্রশ্ন এ সময় না তুলিয়াও বলা চলে যে নির্যাতনের পথে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না বরং সমস্যা জটিল হয়। যাহারা রাজনৈতিক কারণে বিশেষত জনগণের দাবি-দাওয়া তুলিতে গিয়া নির্যাতিত হইবে না, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি রহিল আমাদের জাতির জন্য কোনো ত্যাগই বৃথা যায় না। ইহাই আজিকার সান্ত্বনা ও প্রেরণা।” ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র জগতের নির্ভীক সৈনিক পূর্ব বাংলার ৬ দফার সোচ্চার কণ্ঠ দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক রাজনৈতিক মঞ্চের লেখক মোসাফিরকে আইয়ুব খান মোনায়েম খানের নির্দেশে পুলিশ পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের ৩২(১) খ ধারা অনুসারে তাকে ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ১৬ জুন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান পাকিস্তান দেশ রক্ষা আইনের ৫২ নম্বর উপধারায় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রেস ১ নম্বর রামকৃষ্ণ মিশন রোডস্থ নিউ নেশান প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। ফলে দৈনিক ইত্তেফাক ও তার অপর দুটো পত্রিকা ঢাকা টাইমস এবং পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে বিরোধী দল পূর্ব পাকিস্তানে আইন পরিষদে মুলতবি প্রস্তাব এনেছিল। কিন্তু তা বাতিল হয়ে যায়। ইত্তেফাকের সাংবাদিক ও কর্মচারীরা ভীষণ অর্থকষ্টে দিন যাপন করে। ১৯৬৬ সালের ৯ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধি ৩২ দফা অনুসারে শেখ মুুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে ঢাকা হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট তাদের আটক আইনসঙ্গত বলে আবেদন নাকচ করে দেন। একই দিনে বিচারপতি বিএ সিদ্দিকির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের ৫২(২) যা ধারায় দৈনিক ইত্তেফাকের মুদ্রণালয় নিউ নেশন বাজেয়াপ্তকরণকে অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু ১৭ নভেম্বর মোনায়েম খান প্রতিরক্ষার ৩২ নম্বর বিধির ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী উক্ত প্রেস পুনরায় বাজেয়াপ্ত করেন। জেলের অভ্যন্তরে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট এম এ রউফের কোর্টে মানিক মিয়ার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ দু’বছর দৈনিক ইত্তেফাক বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ করুণভাবে দিন জীবনযাপন করে। তারা না খেয়ে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যায়। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে মুক্তি দেয়ার জন্য আইয়ুব খান সরকার তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। অবশেষে সরকার ১৯৬৭ সালে তাকে মুক্তি দেয়। ১৯৬৮ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন উদ্বোধন করেন। ১৯৬৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের ছাপাখানা নিউ নেশন প্রেসের বাজেয়াপ্তকরণ আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ আড়াই বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পুনরায় দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হলো। ৬ দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন চলছে। অবশেষে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে। শেখ মুুজিবুর রহমানসহ সকলই মুক্তি পায়। আন্দোলন চলছে। পিণ্ডির গোলটেবিল আলোচনা ব্যর্থ হয়। ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বাঙালি জাতির বিজয় মুহূর্তে তফাজ্জল হোসেন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজধানী রাওয়ালপিণ্ডি গমন করেন। তিনি ১৯৬৯ সালের ৩১ মে রাত ১২-৪০ মিনিটে রাওয়ালপিণ্ডির এক হোটেলে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১ জুন তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। মানিক মিয়ার মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধু বলেছেন- মরহুম মানিক মিয়া শুধু একজন দেশপ্রেমিক ও সাংবাদিক ছিলেন না। ‘মানিক ভাই ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক। তাহার আকস্মিক ইন্তেকালে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হইল।’ দৈনিক ইত্তেফাকে ১ জুন তার মৃত্যুর খবর যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, তা ছিল “মানিক মিয়া আর নাই, ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং পূর্ব বাংলার সংগ্রামী বীর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আর নাই।” তার মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। তাকে আজিমপুরে দাফন করা হয়। মানিক মিয়া ১৯১১ সালে বরিশালের ভাণ্ডারিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, আনোয়ার হোসেন এবং দুই কন্যা ও স্ত্রী মাজেদা বেগমকে রেখে যান। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ৬ দফা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। ৬ দফার পথ ধরে ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম ইতিহাসে চিরদিন জ্বলজ্বল করবে। -->