আহলে হাদীস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আহলে হাদীস, বা আহল-ই-হাদীস ফার্সি শব্দ, বা আসহাবুল হাদীস (আরবি: Ahl al-ḥadīth; أهل الحديث) অথবা (Aşḥāb al-ḥadīth; أصحاب الحديث) যার শব্দিক অর্থ হল, হাদীসের অনুসারী। পারিভাষিক অর্থঃ কুরআন এবং ছহীহ হাদীসের নিরপেক্ষ অনুসারী । কুরাআনকে আল্লাহ তায়াল নিজেই অনেক জায়গায় হাদিস বলেছেন(সুরা যুমার,সুরা আল কাহফ) আর হাদীসের শব্দিক অর্থ বাণী, যেহেতু রাসূল (সাঃ) এর বাণী হচ্ছে হাদীস, তাই সব মিলিয়ে আহলে হাদীস বা আসহাবুল হাদীস অর্থ কুর'আন এবং ছহীহ হাদীসের অনুসারী। পূর্ববর্তী আলেমদের অভিমত, এরা হল মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার এমন একটি দল যারা কুরআন এবং হাদীসের অনুসরণে সকল মাযহাবের চেয়ে এগিয়ে। এর নিজস্ব অনুসারীরা একে আহলে হাদীস (আহল আল-হাদীস) বা সালাফি মতবাদ বলে ডাকলেও, অনেকেই একে ওয়াহাবি আন্দোলনের একটি প্রকরণ বলে দাবি করে[১][২] এর অনুসারীদের ওয়াহাবি[৩] নামে চিহ্নিত করেন।[৪][৫][৬]

তারা প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), ইমাম মালিক (রহঃ), ইমাম শাফী (রহঃ), ইমাম হাম্বল (রহঃ) সহ সকল মুজতাহিদগণের ফতোয়াকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে, তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট মাযহাব বা ইমামের মতকে এককভাবে অনুসরণ করেন না।

তাদের আরো বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তারা কুর'আন এবং ছহীহ হাদীসকে সর্ব প্রথম অনুসরণ করেন[৭], তারপরে অস্পষ্ট বিষয়গুলিতে ইমামগণ অর্থাৎ মুজতাহিদদের ফতোয়া পর্যালোচনা করে গ্রহণ করেন। তারা বা আহলে হাদীস আলেমগণ হাদীস শাস্ত্রের বিভিন্ন পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে হাদীসের সনদ যাচাই বাছাইয়ের পর সহীহ, দূর্বল, জাল এভাবে হাদীসের শ্রেণি বিভাগ করেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আনুমানিক ইসলাম আগমনের তৃতীয়তম শতাব্দীর দিকে সমসাময়িক আইনশাস্ত্রের আলেমদের মতামতের থেকে মুহাম্মাদের মতাদর্শ বা হাদিসের উপর অধিক জোর দেয়ার মাধ্যমে এই মতবাদের সূচনা হয়। [৮]৯ম শতাব্দীতে মুতাজিলা মতবাদের বিরোধিতার মাধ্যমে এই মতবাদের উদ্ভব ঘটে।[৯]কেভিন জাকুয়েসের মতে, আহলে হাদিসগণ খলিফা ইয়াজিদ কর্তৃক সঙ্ঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে একটি ধর্মীয় ইতিবাচক ব্যাখ্যার উন্মেষ ঘটিয়েছেন।[১০] অধ্যাপক "সেরিল গ্লাস" ইবনে হাজমকে আহলে হাদিস মতবাদের সবচেয়ে বড় দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বলে মনে করেন।[৬] ইবনে তাইমিয়া[১১], আল জাহাবি[১২], আহ্মাদ ইবনে হাম্বল, ইবনে কাইম আল জাওয়াজিয়া[১৩], মুহাম্মাদ আল বুখারি, ইবনে হাজার আস্কালানি[১৪], কাজই আইয়াদসহ আরও অনেকেই এই মতবাদকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন। এই মতবাদের অনুসারীগণ নিজেদের রাশিদুন খলিফার মতবাদের অনুসারী বলে মনে করেন।

দক্ষিণ এশিয়া[সম্পাদনা]

বিভিন্ন ইতিহাসবিদগণের তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে আহলে হাদীস গণ অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বাংলাদেশে বর্তমানে আহলে হাদীসদের দুটি সংগঠনকে দেখতে পাওয়া যায়, যারা ধর্ম প্রচারের কাজ করে থাকে। [১৫] একটি "জমিয়তে আহলে হাদীস", যা ১৯৪৮ সালে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা লাভ করে,[১৬] ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমীর পুরষ্কার প্রাপ্ত প্রথম সাহিত্যিক আল্লামা আব্দুল্লাহেল কাফী আল কোরায়েশীর মাধ্যমে এবং অন্য সংগঠনটি হল "আহলে হাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ", যা ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব প্রতিষ্ঠা করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

আহলে হাদীসগণ সুফিবাদের ও শিয়া মতবাদের[১৫] কঠোর বিরোধিতা করে থাকেন।[১৭] এছাড়াও তারা দাড়ি রাখাকে সুন্নাত নয় বরং ওয়াজিব মনে করেন এবং তাদের সালাত বা নামায আদায়ের পদ্ধতি প্রচলিত বাংলা মাযহাবের নামায পড়ার পদ্ধতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। তারা নামাজে দন্ডায়মান অবস্থায় বুকে হাত বাঁধেন, প্রথম দুই রাকআতে সূরা ফাতিহার পর সজোরে আমিন বলেন[৫] এবং তারা নামায শেষে ইমামের নেতৃত্বে সম্মিলিত মোনাজাত করেন না। এদিক থেকে তাদের নামাযের পদ্ধতির সাথে মালিকি, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবের মিল খুজে পাওয়া যায়। আহলে হাদীসদের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হল তাঁরা শির্ক এবং বিদ'আতের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমে সমাজে অর্থোডক্স ইসলামের আচারকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Alex Strick Van Linschoten and Felix Kuehn, An Enemy We Created: The Myth of the Taliban-Al Qaeda Merger in Afghanistan, pg. 427. New York: Oxford University Press, 2012. ISBN 9780199927319
  2. Anatol Lieven, Pakistan: A Hard Country, pg. 128. New York: PublicAffairs, 2011. ISBN 9781610390231
  3. Rabasa, Angel M. The Muslim World After 9/11 By Angel M. Rabasa, p. 275
  4. Olivier Roy; Antoine Sfeir, সম্পাদকবৃন্দ (২০০৭-০৯-২৬)। The Columbia World Dictionary of Islamism। Books.google.com.my। সংগৃহীত ২০১২-০৯-২৪ 
  5. ৫.০ ৫.১ Hewer, C. T. R.। Understanding Islam: The First Ten Steps। Books.google.com.my। সংগৃহীত ২০১২-০৯-২৪ 
  6. ৬.০ ৬.১ Glasse, Cyril (২০০১)। The New Encyclopedia of Islam (revised সংস্করণ)। AltaMira Press। পৃ: ৩১। 
  7. "Ahl al-Hadith"। Oxford Islamic Studies। সংগৃহীত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  8. "Ahl al-Hadith"। Oxford Islamic Studies। সংগৃহীত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  9. A Brief History of Islam by Karen Armstrong, Phoenix, London
  10. Jaque, R. Keven (২০০৪)। Martin, Richard C., সম্পাদক। Encylopedia of Islam and the Muslim World। Thomson Gale। পৃ: ২৭। 
  11. The Right Way- By Imam Ibn Taymiyyah, Darrussalam publishers KSA
  12. al-Dhahabi, Muhammad ibn Ahmad। al-Mu`allimi, সম্পাদক। Tadhkirah al-Huffadh (Arabic ভাষায়) 1। India। পৃ: ৪। 
  13. Jonathan A.C. Brown। "Salafism - Islamic Studies - Oxford Bibliographies"। Oxford Bibliographies। সংগৃহীত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  14. Al-`Asqalani, Ahmad ibn `Ali (২০০৫)। Abu Qutaybah al-Firyabi, সম্পাদক। Fath al-Bari (Arabic ভাষায়) 1 (first সংস্করণ)। Riyadh: Dar al-Taibah। পৃ: ২৯০। আইএসবিএন 1-902350-04-9 
  15. ১৫.০ ১৫.১ Olivier, Roy; Sfeir, Antoine, সম্পাদকবৃন্দ (২০০৭)। The Columbia World Dictionary of Islamism। Columbia University Press। পৃ: ২৭। 
  16. Roy, Olivier, The Failure of Political Islam, by Olivier Roy, translated by Carol Volk, Harvard University Press, 1994, p.118-9
  17. Arthur F Buehler, Sufi Heirs of the Prophet: the Indian Naqshbandiyya and the Rise of the Mediating Sufi Shaykh, pg. 179. Part of the Studies in Comparative Religion series. Columbia: University of South Carolina Press, 1998. ISBN 9781570032011

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]