বার্মায় রোহিঙ্গা নির্যাতন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বলা হয় "বিশ্বের সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত জনপদ"[১] এবং "বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু"।[২] ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ফলে তারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হন।[৩] তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ করতে পারে না, জমির মালিক হতে পারে না এবং দুইটির বেশি সন্তান না নেওয়ার অঙ্গীকারণামায় স্বাক্ষর করতে হয়।[৩] তাদেরকে জোড়পূর্বক শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হয়। সাধারণত তাদের সপ্তাহে একদিন করে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনী অথবা সরকারি প্রকল্পে এবং সপ্তাহে একদিন প্রহরী হিসেবে কাজ করতে হয়। এছাড়াও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের অনেক আবাদী জমি জোড়পূর্বক দখল করে সেখানকার বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে অথবা মায়নমারের অন্য স্থানের বৌদ্ধদেরকে দিয়েছে।[৪][৩]

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৭৮ সাল থেকে মায়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গারা মানবাধিকার লংঘনের শিকার হচ্ছে এবং তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।[৫] ২০০৫ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনের কমিশনার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু মায়ানমারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরেও মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে সে চেষ্টা বাতিল হয়ে যায়।[৬] ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে দাঙ্গার পরও ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৪০,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমারের অভ্যন্তরীন শিবিরে বসবাস করত।[৭] জাতিসংঘের বেশ কিছু চেষ্টার পরও বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসা রোহিঙ্গারা ২০১২ সালের দাঙ্গার পর নির্যাতনের ভয়ে আর ফিরে যেতে চান নি। বাংলাদেশ সরকারও সে সময় রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছিল ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারা যাতে অনুপ্রবেশে উৎসাহ না পান।[৮] ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালাক্কা প্রণালীতে ২১ দিন সাগরে ভাসার পর অনেক রোহিঙ্গাকে সেসময় স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার করেছিল।[৯]

হাজার হাজার রোহিঙ্গা থাইল্যান্ডেও আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে থাইল্যান্ড থেকে রোহিঙ্গাদের পুনরায় নৌকায় করে খোলা সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৯০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে থাই সেনাবাহিনী সাগরে ভাসিয়ে দেয় বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়ার কতৃপর্ক্ষের কাছে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা বলেছেন তাদের থাই সেনাবাহিনী ধরেছিল এবং নির্যাতন করে পুনরায় খোলা সাগরে ভাসিয়ে দেয়।[১০]

২০০৪ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে: [১১]

রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা ব্যপকভাবে নিয়ণ্ত্রিত এবং তাদের অধিকাংশের বার্মার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। তাদের উপর বিভিন্ন রকম অন্যায় ও অবৈধ কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জমি জবর-দখল করা, জোর-পূর্বক উচ্ছেদ করা, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করা এবং বিবাহের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৫ সালে। বার্মার কুটনীতিকদের সাথে এক বৈঠকের পর ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করে তারা শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা ৯,০০০ রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফিরিয়ে দেবে।[১২][১৩] ২০১১ সালের ১৬ই অক্টোবর মায়ানমারের নতুন সরকার নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে স্বীকৃতি জানায়। কিন্তু ২০১২ সালের রাখাইন দাঙ্গা এই চেষ্টাকে বিফল করে দেয়।[১৪][১৫]

২০১৪ সালের ২৯ মার্চ বার্মা সরকার “রোহিঙ্গা” শব্দটি নিষিদ্ধ করে এবং তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারেরমত ২০১৪ সালের আদমশুমারিতে সংখ্যালঘুদের “বাঙালি” হিসেবে নিবন্ধের জন্য আহ্বান করে।[১৬][১৭] ২০১৪ সালের ৭ মে, যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ একটি বিল পাশ করে যেখানে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন বন্ধে মায়ানমার সরকারকে আহ্বান জানানো হয়।[১৮][১৯] লন্ডনের কুইন ম্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভ কমিটির গবেষকরা বলেন, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের গণহত্যা করে দেশ থেকে বিতাড়িত করার শেষ পর্যায়ে রয়েছে।[২০][২১] ২০১৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করা হচ্ছে বলে মায়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।[২২][২৩]

  1. মার্ক ডামিট (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০)। "বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ"বিবিসি। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জুলাই ২০১২ 
  2. "বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোচনা"এএফপি। ২৫ জুন ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জুলাই ২০১২ 
  3. জোনাথন হেড (৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯)। "কী রোহিঙ্গাদের সাগরে ধাবিত করে"বিবিসি। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জুলাই ২০১২ 
  4. Crisis Group 2014, পৃ. 19।
  5. Amnesty International (২০০৪)। "Myanmar – The Rohingya Minority: Fundamental Rights Denied"। ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  6. "UNHCR threatens to wind up Bangladesh operations"। New Age BDNEWS, Dhaka। ২১ মে ২০০৫। ২৫ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ এপ্রিল ২০০৭ 
  7. Head, Jonathan (১ জুলাই ২০১৩)। "The unending plight of Burma's unwanted Rohingyas"। সংগ্রহের তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  8. Dummett, Mark (২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭)। "Asia-Pacific | Burmese exiles in desperate conditions"। BBC News। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৩ 
  9. "Kompas - VirtualNEWSPAPER"। Epaper.kompas.com। ২০ জুন ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৩ 
  10. Rivers, Dan (12 February 2009). Thai PM admits boat people pushed out to sea. CNN.
  11. Myanmar - রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু: মৌলিক অধিকার হরণ, যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ২০০৪
  12. Press Trust of India (২৯ ডিসেম্বর ২০০৯)। "Myanmar to repatriate 9,000 Muslim refugees from B'desh"Zee News 
  13. Staff Correspondent (৩০ ডিসেম্বর ২০০৯)। "Myanmar to take back 9,000 Rohingyas soon"The Daily Star 
  14. "Myanmar to 'take back' Rohingya refugees"The Daily Star। ১৬ অক্টোবর ২০১১। 
  15. Ahmed, Akbar; Akins, Harrison (১ ডিসেম্বর ২০১১)। "Little help for the persecuted Rohingya of Burma"The Guardian। London। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৩ 
  16. "No registration for 'Rohingya' in Myanmar census"The Hindu। Chennai, India। ৩০ মার্চ ২০১৪। 
  17. "Burma census bans people registering as Rohingya"। BBC News। ৩০ মার্চ ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  18. Marcos, Cristina (৭ মে ২০১৪)। "House passes resolution pressuring Burmese government to end genocide"The Hill। সংগ্রহের তারিখ ৮ মে ২০১৪ 
  19. "H.Res. 418 - Summary"। United States Congress। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০১৪ 
  20. "Campaigns of violence towards Rohingya are highly organised and genocidal in intent"। Queen Mary University of London। ২৯ অক্টোবর ২০১৫। ৭ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ নভেম্বর ২০১৫ 
  21. Mandel, Seth। "The Cautionary Tale of Samantha Power"Commentary Magazine। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জানুয়ারি ২০১৭Rohingya, an ethnic Muslim minority currently being subjected to an unmistakable genocide 
  22. "The most persecuted people on Earth?"The Economist। ১৩ জুন ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০১৫ 
  23. Ghosh, Nirma l। "Genocide 'not the issue' in Myanmar"The Strait Times। সংগ্রহের তারিখ ২ নভেম্বর ২০১৫