চিরায়ত বলবিদ্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
চিরায়ত বলবিদ্যা

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র
চিরায়ত বলবিদ্যার ইতিহাস

চিরায়ত বলবিজ্ঞান বা চিরায়ত বলবিদ্যা (ইংরেজি ভাষায়: Classical mechanics) নামের পদার্থবিজ্ঞানের শাখায় বিভিন্ন রকমের বস্তু, যেমন প্রক্ষেপক, যন্ত্রাংশ, খ-বস্তু, মহাকাশযান, গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, ইত্যাদির গতি বর্ণনার চেষ্টা করা হয়। যে সব বস্তুর গতি আলোর গতির চেয়ে অনেক অনেক কম, সেইসব ক্ষেত্রে চিরায়ত বলবিজ্ঞান খুবই সঠিক ফলাফল প্রদানে সক্ষম। এটি বিজ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম শাখা। চিরায়ত বলবিজ্ঞানের মূলনীতিসমূহ নিউটনের গতিসূত্রসমূহের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

এছাড়া, কঠিন, তরল ও বায়বীয় পদার্থ নিয়েও এ শাখার বিশেষায়িত ক্ষেত্রে গবেষণা করা হয়। আলোর বেগ-এর কাছাকাছি দ্রুতির বস্তুর গতি বর্ণনার জন্য চিরায়ত বলবিজ্ঞানে বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাহায্য নেওয়া হয়।

চিরায়ত বলবিদ্যার শাখাসমূহ[উৎস সম্পাদনা]

চিরায়ত বলবিদ্যা বল এবং বলের প্রভাবাদি নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে থাকে। বিজ্ঞানের যে শাখায় বল ও বলের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে বলবিদ্যা বা বলবিজ্ঞান বলে। এটি পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের মৌলিক পাঠ্য।

গতি আছে কি নেই এ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে, অধ্যয়নের সুবিধার জন্য বলবিদ্যাকে কয়েকটি শাখায় ভাগ করে নেয়া হয়। যথাঃ

১। স্থিতিবিদ্যা (Statics)

২। গতিবিদ্যা (Dynamics)

গতিবিদ্যা আবার দু'ভাগে অধ্যয়ন করা হয়ঃ

১। সৃতিবিদ্যা (Kinematics)

২। চলবিদ্যা (Kinetics)

আবার, প্রায়োগিক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বলবিদ্যাকে আরো কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নেয়া হয়। যেমনঃ

১। কঠিন বস্তুর বলবিদ্যা (Mechanics of Solids)

২। প্রবাহী বলবিদ্যা (Mechanics of Fluids)

৩। জ্যোতির্বলবিদ্যা (Celestial Mechanics)

স্থিতিবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

বলবিদ্যার যে শাখায় স্থির বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল বল ও বলের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে স্থিতিবিদ্যা বলে।

যেমনঃ বস্তুর ওজন, প্লবতা, প্রবাহীর চাপ সংক্রান্ত বল ইত্যাদি।

গতিবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

বলবিদ্যার যে শাখায় গতিশীল বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল বল ও বলের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে গতিবিদ্যা বলে। এটি আবার দু'ধাপে আলোচিত হয়। যথাঃ সৃতিবিদ্যা ও চলবিদ্যা।

সৃতিবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

গতিবিদ্যার যে শাখায় গতিশীল বস্তুর কেবল গতির অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়, কিন্তু, গতির কারণ (বল) সম্বন্ধে আলোচনা করা হয় না, তাকে সৃতিবিদ্যা (Kinematics) বলা হয়।

এখানে, গতিশীল বস্তুর উপর প্রযুক্ত বলের প্রভাব তথা বিভিন্ন গতীয় অবস্থা আলোচনা করা হয়, কিন্তু কেন গতির অবস্থা পরিবর্তিত হচ্ছে, তা নিয়ে আলোকপাত করা হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, গতির সমীকরণ (Equations of Motion) গুলো নিয়ে অধ্যয়নের সময় কেবল বিভিন্ন গতীয় অবস্থা যেমনঃ আদিবেগ, শেষবেগ, সরণ, ত্বরণ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়, কিন্তু কেন আদিবেগ পরিবর্তিত হয়ে শেষবেগ হচ্ছে কিংবা কেন বস্তুটি ত্বরিত হচ্ছে তা বলা হয় না।

গতির সমীকরণ[উৎস সম্পাদনা]

গতিশীল বস্তুর গতীয় অবস্থা পর্যালোচনার জন্য এর আদিবেগ, শেষবেগ, সরণ, ত্বরণ ও সময় এই পাঁচটি রাশিকে ব্যবহার করে কয়েকটি সমীকরণ প্রতিপাদন করা হয়েছে, এগুলোকে গতির সমীকরণ বলা হয়। সমীকরণগুলো এরূপঃ

১।

২।

৩।

৪।

চলবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

গতিবিদ্যার যে শাখায় গতিশীল বস্তুর গতির প্রভাবের পাশাপাশি গতির কারণ আলোচনা করা হয়, তাকে চলবিদ্যা (kinetics) বলা হয়।

যেমনঃ নিউটনের গতিসূত্রসমূহ (Laws of Motion) মূলত চলবিদ্যার আলোচনাধীন বিষয়।

কঠিন বস্তুর বলবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

বলবিদ্যার যে শাখা কঠিন বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল বল, বলের প্রভাব, গতীয় অবস্থা প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে কঠিন বস্তুর বলবিদ্যা (Mechanics of Solids) বলা হয়। কঠিন বস্তুর বলবিদ্যা নিয়ে অধ্যয়নের সময়ও উপরের মত স্থিতিবিদ্যা, গতিবিদ্যা প্রভৃতি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়।

প্রবাহী বলবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

বলবিদ্যার যে শাখায় প্রবাহী পদার্থের (তরল ও বায়বীয়) উপর ক্রিয়াশীল বল, বলের প্রভাব, গতীয় অবস্থা প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে প্রবাহী বলবিদ্যা (Mechanics of Fluids) বলা হয়। প্রবাহী বলবিদ্যা নিয়ে অধ্যয়নের সময়ও উপরের মত স্থিতিবিদ্যা, গতিবিদ্যা প্রভৃতি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়।

চিরায়ত বলবিদ্যার সীমাবদ্ধতা ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যা[উৎস সম্পাদনা]

চিরায়ত বলবিদ্যা আমাদের বাস্তবিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও হিসাব-নিকাশের জন্য খুবই উপযোগী। তবে, ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে এমন বেশ কিছু ঘটনা বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেন, যা বলবিদ্যার প্রচলিত ধারণা ও সূত্র দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। এগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়েই আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূচনা হয়।

চিরায়ত বলবিদ্যা ব্যাখ্যা করতে পারে না- এমন কিছু বিষয় হলঃ

১। আলোর বেগের মত প্রচণ্ড বেগে গতিশীল বস্তুসমূহের গতীয় অবস্থাদি চিরায়ত বলবিদ্যা দ্বারা সঠিক ভাবে নির্ণয় করা যায় না।

২। কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সংক্রান্ত ঘটনা চিরায়ত বলবিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।

৩। আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে ভর বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা ভর ও শক্তির পারস্পারিক রূপান্তর ইত্যাদি বিষয় ব্যাখ্যা করা যায় না।

চিরায়ত বলবিদ্যার আলোচ্যসূচি[উৎস সম্পাদনা]

চিরায়ত বলবিদ্যার মূল আলোচ্য বিষয় বিভিন্ন প্রকার রাশি- যেমনঃ স্কেলার রাশি ও ভেক্টর রাশি, স্থিতিবিদ্যা, গতিবিদ্যা, সৃতিবিদ্যা, চলবিদ্যা, বিভিন্ন উপপাদ্য, গতিসূত্র, কৌণিক গতিসূত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, তাপতাপগতিবিদ্যা, তরঙ্গ, স্থিতিস্থাপকতা, প্রবাহী বলবিদ্যা, শব্দবিদ্যা, তড়িৎবিদ্যা, চৌম্বকবিদ্যা, আলোকবিদ্যা, পরিসাংখ্যিক বলবিদ্যা, নিউটনীয় বলবিদ্যা প্রভৃতি।

রাশিঃ স্কেলার ও ভেক্টর[উৎস সম্পাদনা]

ভৌতজগতে যা কিছু পরিমাপ করা যায় তাকেই রাশি বলে। যেমন কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, ভর, আয়তন ইত্যাদি পরিমাপ করা যায়। এগুলো সবই রাশি। এই মান প্রকাশ করতে আমরা একটা সংখ্যা এবং একটা একক ব্যবহার করি। কিন্তু কেবল মান এবং একক দিয়ে এ সব রাশিকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না। যেমন, যদি আমরা বলি একটি গাড়ি ঘন্টায় ৫০ কিলোমিটার বেগে চলছে, তাহলে এতে বুঝা যাবে যে গাড়িটি ঘন্টায় ৫০ কিলোমিটার দুরত্ব অতিক্রম করছে, কিন্তু কোন দিকে দুরত্ব অতিক্রম করছে তা বুঝা যাবে না। গাড়িটির গতির গাড়িটির বেগ কোন দিকে সেটাও উল্লেখ করতে হবে। দিকের বিবেচনায় আমরা বস্ত জগতের সকল রাশিকে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি, যথাঃ

  1. স্কেলার রাশি
  2. ভেক্টর রাশি

স্কেলার রাশিঃ[উৎস সম্পাদনা]

যে সকল ভৌত রাশিকে শুধু মান দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায়, দিক নির্দেশনার প্রয়োজন হয়না তাদেরকে স্কেলার রাশি বলে। যেমন ধরুন আপনি বাজার থেকে ৫ কেজি চাল কিনেছেন, এ কথাটি বোঝাতে আপনাকে শুধু চালের পরিমাণ তথা ৫ কেজি বললেই হয়, কথাটি সম্পূর্ণ হয়। এক্ষেত্রে আপনাকে কোন ধরনের দিক উল্লেখ করতে হয় না।

দুটি স্কেলার রাশির যোগ সাধারনত বীজগণিতের নিয়মানুসারে করা হয়, যেমন ৫ কেজি চালের সাথে আরো ৪ কেজি চাল যোগ করলে হয় ৯ কেজি। অর্থ্যাৎ, স্কেলার রাশি বীজগণিতের নিয়ম মেনে চলে। যে সকল রাশি স্কেলার বলে পরিচিত তাদের একটা সাধারণ তালিকা নিম্নরূপ-

ভেক্টর রাশিঃ[উৎস সম্পাদনা]

যে সকল ভৌত রাশিকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার জন্য মান ও দিক উভয়েরই প্রয়োজন হয় তাদেরকে ভেক্টর রাশি বলে। মনে করুন আপনি একটি বল ১০০ মিটার দূরে ছুডে মেরেছেন, এখন আমি যদি বলটি খুজি তবে তা খুজে পাওয়া সহজ হবেনা কেননা বলটি কোন দিকে ছুড়ে দেয়া হয়ে ছিল তা বলা হয়নি, এক্ষেত্রে বলটির অবস্থান সঠিক ভাবে বুঝাতে বলটি ছুড়ে দেয়ার দিকও উল্লেখ করা প্রয়োজন। দিগ বিষয়টি জড়িত থাকার কারনে ভেক্টর রাশি বীজগণিতের নিয়ম মেনে চলে না, তাদের প্রত্যেকের দিক এবং মধ্যবর্তী কোণের উপরও নির্ভর করে। এজন্য ভেক্টর রাশির হিসাব-নিকাশ বিশেষ জ্যামিতিক উপায়ে করতে হয়।

যে সকল রাশি ভেক্টর বলে পরিচিত তাদের একটা সাধারণ তালিকা নিম্নরূপ-
  • সরণ
  • ওজন
  • বেগ
  • ত্বরন
  • তড়িৎ তীব্রতা
  • চৌম্বক তীব্রতা


ফলিত পদার্থবিজ্ঞান · পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান · আলোক পদার্থবিজ্ঞান · চিরায়ত বলবিদ্যা · ঘনীভূত পদার্থ পদার্থবিজ্ঞান · পরম্পরা বলবিদ্যা · তড়িচ্চুম্বকত্ব · বিশেষ আপেক্ষিকতা · সাধারণ আপেক্ষিকতা · কণা পদার্থবিজ্ঞান · কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব · কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান · পরিসাংখ্যিক বলবিদ্যা · তাপগতিবিজ্ঞান


বিজ্ঞানের শাখাসমূহ

পদার্থবিজ্ঞান · রসায়নবিজ্ঞান · আলোকবিজ্ঞান · জীববিজ্ঞান · সামাজিক বিজ্ঞান · পরম্পরা বলবিদ্যা · তড়িচ্চুম্বকত্ব · বিশেষ আপেক্ষিকতা · সাধারণ আপেক্ষিকতা · মনোবিজ্ঞান · কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব · কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান · পরিসাংখ্যিক বলবিদ্যা · তাপগতিবিজ্ঞান