তরঙ্গ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পানির উপরিতলে তরঙ্গ

তরঙ্গ হলো এক ধরনের ঢেউ যা পরপর বা পর্যাবৃত্ত দোলনের মাধ্যমে কোনো জড় মাধ্যমের কণাগুলোকে স্থানান্তরিত না ক'রে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে ।[১]

কিছু কিছু তরঙ্গ শূণ্য মাধ্যম দিয়েও (অর্থাৎ কোন মাধ্যম ছাড়াই) সঞ্চারিত হতে পারে । এধরনের তরঙ্গ হলো তাড়িতচ্চৌম্বক তরঙ্গ (আলো) আর হয়তো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ[২]

জড় মাধ্যমের কণার আন্দোলনের ফলে যে তরঙ্গ সৃষ্টি হয় তাকে যান্ত্রিক তরঙ্গ বলে । এই তরঙ্গ মাধ্যমের কণার কোন স্থায়ী বিচ্যুতি ঘটায় না , বরং এই তরঙ্গ মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দণ বা কম্পণ দ্বারা সঞ্চালিত হয় । যান্ত্রিক তরঙ্গ সঞ্চালণের জন্য স্থিতিস্থাপক এবং অবিচ্ছিন্ন মাধ্যমের ওপর নির্ভশীল ।

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

জলে ঝাঁপ দিলে জলের উপরিতলে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়

আদর্শ অবস্থায় তরঙ্গের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যাদি দেখা যায় সেগুলো হলো :[৩]

  • তরঙ্গের সৃষ্টি হয় মাধ্যমের কণাস্পন্দন বা কম্পনের ফলে । কিন্তু এর প্রভাবে মাধ্যমের কণা স্থানান্তরিত হয় না শুধুমাত্র মাধ্যমের ভিতর দিয়ে তরঙ্গাকারে আন্দোলন সঞ্চারিত হয় ।
  • তরঙ্গের বেগ ও মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দনের বেগ আলাদা । মাধ্যমের সব জায়গায় তরঙ্গের বেগ একই থাকে কিন্তু মাধ্যমের কণাগুলো বিভিন্ন বেগে স্পন্দিত হয় । সাম্যাবস্থায় কণাগুলোর বেগ সবচেয়ে বেশি ।
  • সব তরঙ্গই শক্তিতথ্য সঞ্চারণ করে ।
  • তরঙ্গের বিস্তার , কম্পন , তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে ।
  • অগ্রগামী বা স্থির হতে পারে ।
  • এটা আড় বা লম্বিক অর্থাৎ অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য বরাবর হতে পারে ।
  • প্রতিফলন - প্রতিফলক তলে আপতিত হওয়ার পর তরঙ্গের অভিমূখ পরিবর্তিত হয় এবং আপতন কোণ সর্বদা প্রতিফলন কোণের সমান হয় ।
  • প্রতিসরণ - এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করার সময় তরঙ্গের বেগের পরিবর্তন হয় ।
  • ব্যতিচার (Interference) - একই উৎস থেকে নির্গত দু'টি সুসঙ্গত তরঙ্গমুখ থেকে প্রাপ্ত তরঙ্গের উপরিপাতনের ফলে ব্যতিচার সৃষ্টি হয় ।
  • অপবর্তন (Diffraction) - একই তরঙ্গমুখের বিভিন্ন অংশ থেকে নির্গত গৌণ তরঙ্গসমূহের উপরিপাতনের ফলে অপবর্তনের সৃষ্টি হয় । কোন প্রতিবন্ধকের ধার ঘেঁষে বা সরু চিরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় জ্যামিতিক ছায়া অঞ্চলের মধ্যে আলো বেঁকে যাওয়ার ঘটনাকে আলোর অপবর্তন বলে ।
  • বিচ্ছুরণ
  • তরঙ্গের প্রবাহের অভিমুখ বা দিক আছে ।

তরঙ্গের প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

সরল ছন্দিত তরঙ্গ তরঙ্গশীর্ষ বা চূড় এবং তরঙ্গপাদ বা তল দ্বারা বৈশিষ্টায়িত । এই তরঙ্গ সাধারণত দুই ধরনের , অনুপ্রস্থ তরঙ্গঅনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ । যে তরঙ্গের সঞ্চালনের দিক মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দনের দিকের সাথে সমকোণে থাকে তাকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বলা হয় । যেমন তাড়িতচৌম্বকীয় তরঙ্গ বা সুতার মধ্যে দিয়ে সঞ্চারিত তরঙ্গ । অন্যদিকে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গে তরঙ্গ সঞ্চালনের দিক মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দনের দিকের সাথে সমান্তরালে থাকে । এর উদাহরণ হলো শব্দের তরঙ্গ ।

A = জলের গভীরে.
B = অগভীর জলে । উপরিতলের একটি বস্তুর উপবৃত্তাকার গতি গভীরতা কমার সাথে সাথে সমান হয়ে আসে ।
1 = তরঙ্গ সঞ্চারণের দিক
2 = তরঙ্গশীর্ষ
3 = তরঙ্গপাদ

-

উদাহরণ[সম্পাদনা]

সমুদ্রের ঢেউ পাথরের উপরে আছড়ে পড়ছে

তরঙ্গের উদাহরণের মধ্যে রয়েছে :

গাণিতিক বর্ণনা[সম্পাদনা]

সম বিস্তারের একটি তরঙ্গ
একটি তরঙ্গ (নীল রঙের) এবং এর মোড়কের (লাল রঙের)

'তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে পরপর দুটি তরঙ্গশীর্ষের (বা তরঙ্গপাদের)মধ্যবর্তী দূরত্ব। এটি গাণিতিকভাবে দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে তরঙ্গসংখ্যা কে () গাণিতিকভাবে নিম্নলিখিত উপায়ে সম্পর্কযুক্ত করা যায়ঃ

সরল ছন্দিত স্পন্দন

পর্যায়কাল () হলো একটি পূর্ণ স্পন্দন সম্পন্ন করতে একটি তরঙ্গ সঞ্চারকারী কণার যে সময় লাগে । কম্পাঙ্ক ( বা ) হচ্ছে একটি তরঙ্গ সঞ্চারকারী কণা এক সেকেন্ডে যতগুলো পূর্ণ কম্পন সম্পন্ন করতে পারে সেই সংখ্যা । এর একক হার্জ (hertz) । এদের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক হলো :

সুতরাং পর্যায়কাল এবং কম্পাঙ্ক পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক

স্থির তরঙ্গ[সম্পাদনা]

স্থির মাধ্যমে স্থির তরঙ্গ

স্থির তরঙ্গ হলো এমন একটি তরঙ্গ যা সঞ্চারণশীল নয়, বরং স্থির। স্থির তরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে এমন ক্ষেত্রে যখন তরঙ্গের মাধ্যমটি তরঙ্গের বিপরীত দিকে সঞ্চারণশীল থাকে অথবা কোন স্থির মাধ্যমে দুটি বিপরীতমূখী তরঙ্গের উপরিপাতনের ফলে।


তরঙ্গ মাধ্যম[সম্পাদনা]

যে জড় মাধ্যম দ্বারা তরঙ্গ সঞ্চারিত হয় তাকে তরঙ্গ মাধ্যম বলা যায়। তরঙ্গ মাধ্যমকে নিম্নলিখিত ভাবে প্রকারান্তর করা যায়ঃ

  • সীমিত মাধ্যম এবং অসীম মাধ্যম
  • সরলরৈখিক মাধ্যম যদি মাধ্যমের যে কোন বিন্দুতে অবস্থিত ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের বিস্তার যোগ করা যায়।
  • হোমোজেনিয়াস বা সম মাধ্যম মাধ্যমের কণাগুলোর বৈশিষ্ট্য স্থানভেদে পরিবর্তিত হয় না।
  • আইসোট্রপিক মাধ্যম

টীকা[সম্পাদনা]

  1. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত মাধ্যমিক পদার্থ বিজ্ঞান, পরিমার্জিত সংস্করণ ডিসেম্বর ২০০৮ পৃষ্ঠা ১০৪
  2. Gravitational waves have never been directly detected but are widely believed by the scientific community to exist .
  3. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত মাধ্যমিক পদার্থ বিজ্ঞান, পরিমার্জিত সংস্করণ ডিসেম্বর ২০০৮ পৃষ্ঠা ১০৬

বিবলিওগ্রাফি[সম্পাদনা]

উৎস[সম্পাদনা]

  • Campbell, M. and Greated, C. (1987). The Musician’s Guide to Acoustics. New York: Schirmer Books.
  • French, A.P. (১৯৭১)। Vibrations and Waves (M.I.T. Introductory physics series)। Nelson Thornes। আইএসবিএন 0-393-09936-9ওসিএলসি 163810889 
  • Hall, D. E. (১৯৮০)। Musical Acoustics: An Introduction। Belmont, California: Wadsworth Publishing Company। আইএসবিএন 0534007589 .
  • Hunt, F. V. (১৯৯২) [১৯৬৬]। Origins in Acoustics। New York: Acoustical Society of America Press। .
  • Ostrovsky, L. A.; Potapov, A. S. (১৯৯৯)। Modulated Waves, Theory and Applications। Baltimore: The Johns Hopkins University Press। আইএসবিএন 0801858704 .
  • Vassilakis, P.N. (2001). Perceptual and Physical Properties of Amplitude Fluctuation and their Musical Significance. Doctoral Dissertation. University of California, Los Angeles.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]