পৃষ্ঠটান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

পৃষ্ঠটান (ইংরেজি: Surface Tension) হল প্রবাহীর পৃষ্ঠের একটি স্থিতিস্থাপক প্রবণতা, যা তার উপরিতলকে সম্ভাব্য সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফল প্রদান করে। পৃষ্ঠটানের জন্যই কিছু কীট, যাদের দেহের ঘনত্ব জল অপেক্ষা অনেক বেশি, তারা জলের উপরিতলে ভাসমান থাকতে পারে আর হেঁটে যেতে পারে।

পৃষ্ঠটান ও পদার্থের জলবিকর্ষী ধর্ম জলের ফোঁটাকে কেটে তোলে।
সাবানের ফেনা দিয়ে পৃষ্ঠটানের একটি পরীক্ষা।

তরলগ্যাসের সংযোগস্থলে, তরল অণুগুলির পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ (সংসক্তি টানের জন্য), তরল ও গ্যাসের অণুগুলির আকর্ষণ (আসঞ্জন টানের জন্য) অপেক্ষা অনেক বেশি হওয়ায় পৃষ্ঠটান সংঘটিত হয়। তরলপৃষ্ঠের নীচে অভ্যন্তরীণ বলসমূহের লব্ধি বল এমনভাবে ক্রিয়া করে, যেন তরলের উপরিতল কোনো টান করা স্থিতিস্থাপক পর্দা দ্বারা আবৃত রয়েছে। এই অসম লব্ধি বলের কারণেই তরল পৃষ্ঠে সংকোচনশীল টান প্রযুক্ত হয়, সেই কারণেই সম্ভবত একে ‘পৃষ্ঠটান’ বলা হয়।[১] অন্যান্য তরলের থেকে জলের অণুগুলির হাইড্রোজেন বন্ধন উচ্চমানের হয় (২০° সে. উষ্ণতায় ৭২.৮ মিলিনিউটন প্রতি মিটার)।

পৃষ্ঠটানে বল প্রতি একক দৈর্ঘ্যে কিংবা প্রতি বর্গ-একক ক্ষেত্রফল প্রযুক্ত হতে পারে। এই দুই প্রকার বল বাস্তবে একই, কিন্তু প্রতি বর্গ-একক ক্ষেত্রফল প্রযুক্ত হলে, এই বলকে পৃষ্ঠশক্তি বলা হয়। পৃষ্ঠশক্তি আবার কঠিনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।

বস্তুবিজ্ঞানে পৃষ্টটানকে পৃষ্ঠ পীড়ন বা মুক্ত পৃষ্ঠশক্তি নামেও অভিহিত করা হয়।

কারণ[সম্পাদনা]

তরল অণুগুলোর উপরে প্রযুক্ত বলসমূহের চিত্র।

তরলের অণুগুলির মধ্যে পারস্পরিক সংসক্তি বলই পৃষ্ঠটান বিষয়টির জন্য দায়ী। নির্দিষ্ট আয়তনের তরলের অভ্যন্তরস্থ প্রতিটি অণু তার পরিপার্শ্বে থাকা সমস্ত অণুর দ্বারা সবদিক থেকে সমানভাবে আকর্ষিত হয়, ফলে লব্ধি বলটি শূন্য হয়। কিন্তু, তরলের মুক্তপৃষ্ঠে থাকা অণুগুলির পরিপার্শ্বে সব জায়গায় তরল অণু ঘিরে থাকে না, সেই জন্য ওই অণুগুলি নীচের দিকে আকর্ষিত হয়। এর ফলে একটি অভ্যন্তরীণ চাপের উৎপত্তি ঘটে এবং তরল অণুগুলি সম্ভাব্য সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফল ধারণ করতে বাধ্য হয়।

তরলের ফোঁটার বিশেষ আকৃতির জন্যও পৃষ্ঠটান দায়ী। যদিও তরলের নির্দিষ্ট আকৃতি নেই, তবুও পৃষ্ঠতলের অসম সংসক্তি বলের কারণে জলের ফোঁটাগুলোর গোলকাকার আকার ধারণের প্রবণতা দেখা যায়। অভিকর্ষ সহ অন্যান্য সকল পারিপার্শ্বিক বল অনুপস্থিত থাকলে, সমস্ত তরল পদার্থের ফোঁটাই প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করবে। ল্যাপলেসের নীতি অনুযায়ী, এই গোলাকার আকৃতি মুক্তপৃষ্ঠের প্রয়োজনীয় ‘পৃষ্ঠ পীড়ন’কে হ্রাস করতে সাহায্য করে।

পৃষ্ঠটানের জন্য পেপার ক্লিপটি জলে ডুবে যায় না।

পৃষ্ঠটানের কারণ ব্যাখ্যার আরেকটি উপায় হল শক্তির পরিপ্রেক্ষিতে দেখা। অণুটির সাথে পরিপার্শ্বের বাকি অণুর সংযোগ না থাকলে, তা যে শক্তিস্তরে থাকে, পরিপার্শ্বের সাথে সংযুক্ত থাকা অণু তার চেয়ে কম শক্তিস্তরে থাকে। তরলের অভ্যন্তরে থাকা অণুগুলিকে ঘিরে অসংখ্য অণু থাকতে পারে, কিন্তু মুক্তপৃষ্ঠে থাকা অণুগুলির চারপাশে কম সংখ্যক অণু থাকে (অভ্যন্তরের অণুগুলির তুলনায়), তাই বহিস্থ অণুগুলোর স্থিতিশক্তি বেশি হয়। তরলের শক্তিস্তর সর্বনিম্ন করতে হলে (বা স্থায়িত্ব পেতে হলে) তরলের মুক্তপৃষ্ঠে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন অণুর সংখ্যা কমাতে হবে। আর মুক্তপৃষ্ঠে থাকা অণুর পরিমাণ কমালে পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলও হ্রাস পাবে।[২] এই পৃষ্ঠ-ক্ষেত্রফল সংকোচনের ফলে, পৃষ্ঠতলটি সবচেয়ে মসৃণ ও টান-টান আকার ধারণ করার চেষ্টা করে (ইউলার-ল্যাংরেঞ্জের সমীকরণ থেকে গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করা যায়, ‘মসৃণ’ আকারের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল সর্বনিম্ন হয়)। পৃষ্ঠতলের আকারে কোনো বক্রতা তৈরি হলেই তার স্থিতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। অতএব, সেই বক্রতা কমানোর জন্য পৃষ্ঠতল নেমে যায়, ঠিক যেভাবে একটি বলকে ওপরে ছুঁড়ে দিলে অভিকর্ষীয় স্থিতিশক্তি কমানোর জন্য তা নীচে নেমে আসে।

পৃষ্ঠটানের প্রভাব[সম্পাদনা]

জল[সম্পাদনা]

পৃষ্ঠটান জলের ওপরে অনেক প্রভাব বিস্তার করে:

ক. মোমের মতো পিচ্ছিল আবরণ যুক্ত তলে (গাছের পাতা) বৃষ্টির জল মুক্তোর মতো ক্ষুদ্র আকার নেয়। জল মোমের সাথে দুর্বলভাবে আকর্ষিত হয়, কিন্তু নিজের অণুর সাথে দৃঢ় সংঘবদ্ধ থাকে। তাই জল ছোটো ছোটো বিন্দুর আকারে ভেঙে যায়। পৃষ্ঠটান এদের গোলাকার আকার দিতে সাহায্য করে, কারণ সমান আয়তনের ক্ষেত্রে গোলক পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে কম হয়।

খ. জলের ভর প্রসারিত হলে জলবিন্দুর সৃষ্টি হয়। অ্যানিমেশনে দেখানো হয়েছে, জল ততক্ষণ নলটির সাথে আটকে থাকে, যতক্ষণ না তার ভর প্রসারিত হতে হতে এমন অবস্থায় পৌঁছয়, যে অবস্থায় পৃষ্ঠটান জলকে নলের সাথে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। তখন এটা মুক্ত হয় আর পৃষ্ঠটানের জন্য গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। নল থেকে জলের প্রবাহ চালালে, তা নীচে পড়ার সময় অসংখ্য জলকণায় পরিণত হবে। অভিকর্ষ জলের প্রবাহকে নীচে টেনে আনে, আর পৃষ্ঠটান তাকে ভেঙে জলকণায় পরিণত করে।[৩]

গ. জলের চেয়ে বেশি ঘনত্বযুক্ত বস্তুর জলে ভেসে চলাও পৃষ্ঠটানেরই ফলাফল। তবে এটা তখনই ঘটবে, যখন সেই বস্তুর ওজন এতটাই নগণ্য হয় যে, পৃষ্ঠটান জনিত বল সেই ওজনকে সহ্য করতে সক্ষম হয়। উদাহরণ হিসেবে, কিছু পোকা পৃষ্ঠটানকে কাজে লাগিয়ে পুকুরের জলের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে। পোকাটির পা’গুলির ভারের নগণ্যতার জন্য পায়ের অণু আর জলের অণুর কোনো আকর্ষণ থাকে না, তাই যখন জলের মধ্যে পা’টি ফেলা হয়, পৃষ্ঠটান কেবল জলে পায়ের জন্য সৃষ্ট বক্রতাকে মসৃণ করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ জল পোকাটিকে উপরে ঠেলে দেয় যাতে সেটা জলের মুক্ততলের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই অবস্থায় জল পোকার ভার বহন করতে পারে। এক্ষেত্রে জলতল একটি স্থিতিস্থাপক পর্দার মতো কাজ করে। পোকাটির পায়ের চাপে জলের পৃষ্ঠতলে খাঁজের সৃষ্টি হয় বা পৃষ্ঠতল সামান্য অবনমিত হয়,[৪] আর পৃষ্ঠতলের বক্রতা (তথা ক্ষেত্রফল) সংকোচনের প্রবণতার জন্য জল পোকার পা’টিকে উপরে ঠেলে দেয়।

ঘ. আলাদা দুটি তরলের মুক্তপৃষ্ঠের টানের তারতম্যের জন্য জল ও তেলের পৃথকীকরণ (ছবিতে জল ও তরল মোম) সম্ভব হয়। এর জন্যও দায়ী পৃষ্ঠটান।

ঙ. অ্যালকোহলীয় পানীয় রাখা কোনো পাত্রের দেয়ালে তরলের বিন্দু ও ধীর প্রবাহকে ‘টিয়ার্স অফ ওয়াইন’ বা ‘ওয়াইনের অশ্রু’ বলে। জল ও ইথানলের পৃথক পৃষ্ঠটানের মধ্যে জটিল মিথষ্ক্রিয়ায় এটি ঘটে; জল ও উদ্বায়ী ইথানলের মিশ্রিত পৃষ্ঠটান এর জন্য দায়ী।

পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থ[সম্পাদনা]

পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থ (surfactant) ব্যবহার করলে তরলের পৃষ্ঠটান উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়, তখন পৃষ্ঠটানের প্রমাণ পাওয়া যায়:

  • সাবানের বুদবুদের ভর অত্যন্ত কম হয়, কিন্তু সেই তুলনায় পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল অনেক বেশি হয়। বিশুদ্ধ জলে বুদবুদগুলো অস্থায়ী। পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থ যোগ করলে বুদবুদগুলোকে স্থিতিশীল করা সম্ভবপর হয় (ম্যারাঙ্গোনি প্রভাব)। আসলে ওই জাতীয় পদার্থ জলের পৃষ্ঠটান তিনগুণ বা তারও বেশি কমিয়ে দেয়।
  • ‘এমালশন’ হল এক ধরনের কলয়েড জাতীয় দ্রবণ, যেখানে পৃষ্ঠটান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশুদ্ধ জলে তেলের অতি ক্ষুদ্র ফোঁটা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দিলে ফোঁটাগুলি অনায়াসেই একজোট হয়ে অধিক ভর সৃষ্টি করে। কিন্তু পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থের উপস্থিতিতে পৃষ্ঠটান হ্রাস পায়, ফলস্বরূপ জলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তেলের ফোঁটা পৃথক্‌ভাবে ভাসমান থাকে।

পদার্থবিদ্যা[সম্পাদনা]

একক[সম্পাদনা]

পৃষ্ঠটানকে সাধারণত γ (গ্রিক অক্ষর গামা) চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করা হয় এবং এর পরিমাপ হয় ‘বল প্রতি একক দৈর্ঘ্য’ দিয়ে। এর এসআই একক হল নিউটন প্রতি মিটার, তবে সিজিএস পদ্ধতিতে ডাইন প্রতি সেমি এককটিও ব্যবহার করা হয়।

পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি[সম্পাদনা]

পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজনীয় বলকে চিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই বল তরলের পৃষ্ঠটানের সমানুপাতিক।

পৃষ্ঠটান, বল কিংবা শক্তি – উভয়ের বিচারেই পরিমাপ করা যায়।

বলের বিচারে: তরলে পৃষ্ঠটান হল একটি বল, যা প্রতি একক দৈর্ঘ্যে প্রযুক্ত হয়। ডানদিকের চিত্রে, আয়তাকার কাঠামোটি তিনটি দৃঢ় অপ্রসার্য বাহু (কালো রঙের), যারা সম্মিলিতভাবে ‘U’ আকৃতি গঠন করেছে, আর একটি সচল বাহু (নীল রঙের) নিয়ে গঠিত। নীল বাহুটি তার পার্শ্ববর্তী দুটি কালো বাহু বরাবর বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারে। কাঠামোটি চার বাহুর মাঝে সাবান-জলের একটি পাতলা সর রয়েছে। পৃষ্ঠটান ক্ষেত্রফল সংকোচনের জন্য নীল বাহুটিকে বাঁ দিকে ঠেলতে চাইবে; ওই বাহুটিকে স্থিরাবস্থায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিপরীতমুখী বল , বাহুটির দৈর্ঘ্য এর সমানুপাতিক। সেহেতু অনুপাতটি শুধুমাত্র ওই সাবান-জলের স্বকীয় ধর্মের উপর নির্ভরশীল (গঠন, উষ্ণতা ইত্যাদি), তরলটি বা কাঠামোর আকৃতির উপর নয়। উদাহরণ হিসেবে, কাঠামোটির গঠন যদি আরও জটিল হয় এবং সচল বাহুর দৈর্ঘ্য আর সেই বাহুর সরণের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বল হয়, তবেও এর মান একই থাকবে। অতএব, পৃষ্ঠটানের সূত্র হয়:

সাবান-জলের সরটির দুটো পৃষ্ঠ রয়েছে, এদের প্রত্যেকটির ওপর পৃষ্ঠটান জনিত বলটি সমান ভাবে কাজ করে, তাই এর মানের আগে এসেছে; অর্থাৎ যে কোনো একটি পৃষ্ঠে প্রযুক্ত বল

শক্তির বিচারে: কোনো তরলের পৃষ্ঠটান হল ওই তরলটির স্থিতিশক্তির পরিবর্তন এবং পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল পরিবর্তনের (যার জন্য স্থিতিশক্তির পরিবর্তন ঘটে) অনুপাত। বলের বিচারে প্রাপ্ত পৃষ্ঠটানের সংজ্ঞার সাথে এর যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে; যদি চলমান বাহুটির সরণের বিরুদ্ধে প্রযুক্ত বিপরীতমুখী বল হয়, তবে নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী, এই বলটিই আবার ওই বাহুটিকে সমবেগে গতিশীল রাখতে সাহায্য করবে। কিন্তু যদি বাহুটির সরণ ডানদিকে হয় (অর্থাৎ যেদিকে বলটি প্রযুক্ত হচ্ছে), তবে ওই বল তরলের ওপর যে কার্য করছে, তার প্রভাবে তরলপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ বর্ধমান পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল সরটির শক্তিরও বৃদ্ধি ঘটায়। বাহুটিকে ডানদিকে দূরত্ব সরাতে বল কর্তৃক কৃতকার্য ; একইসাথে সরটির মোট ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি (ক্ষেত্রফল দ্বিগুণ হওয়ার কারণ, সরের দুটি মুক্তপৃষ্ঠ রয়েছে)। এখন এর লব ও হর উভয়কেই দিয়ে গুণ করলে পাওয়া যায়:

তাত্ত্বিকভাবে এখানে পরিমাণ কার্য তরলে স্থিতিশক্তি হিসেবে সঞ্চিত থাকে। অতএব শক্তির বিচারে পৃষ্ঠটানের এসআই একক হবে জুল প্রতি বর্গমিটার এবং সিজিএস পদ্ধতিতে আর্গ প্রতি বর্গসেমি। এক্ষেত্রে যান্ত্রিক সংস্থাগুলো সর্বদাই সর্বনিম্ন স্থিতিশক্তি সম্পন্ন একটি অবস্থায় পৌঁছতে চায়, আর তরলবিন্দুর আকৃতি গোলাকার হওয়ায় নির্দিষ্ট আয়তনে এর মুক্তপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল সর্বনিম্ন হয়, অর্থাৎ স্থিতিশক্তিও সর্বনিম্ন হয়। মাত্রা সমীকরণের সাহায্যে প্রমাণ করে যায়, ‘শক্তি প্রতি বর্গএকক ক্ষেত্রফল’ এবং ‘বল প্রতি একক দৈর্ঘ্য’ – উভয়ের সাহায্যেই পৃষ্ঠটানের পরিমাপ বাস্তবে একই।

পৃষ্ঠ বক্রতা ও চাপ[সম্পাদনা]

মুক্তপৃষ্ঠের একটি ক্ষুদ্র অংশে পৃষ্ঠটান জনিত বলের ক্রিয়া। δθx এবং δθy যথাক্রমে xy অক্ষ বরাবর ওই ক্ষুদ্র অংশের বক্রতাকে নির্দেশ করছে। ইয়ং-ল্যাপলেস সমীকরণ অনুযায়ী বল ও চাপের সমতা নির্ধারণ করতে হয়।

যদি কোনো টানযুক্ত পৃষ্ঠতলে বহিস্থ বল ক্রিয়া না করে, তবে মুক্তপৃষ্ঠ সমতল থাকে। কিন্তু পৃষ্ঠতলে একদিকের চাপের সঙ্গে অন্য দিকের চাপের পার্থক্য হলে একটি লব্ধি বলের সৃষ্টি হয়। চিত্রে দেখানো হয়েছে, পৃষ্ঠের একটি ক্ষুদ্র অংশের বক্রতার জন্য পৃষ্ঠটানজনিত বলের লব্ধি উপাংশগুলো ওই অংশের কেন্দ্রে কীভাবে ক্রিয়া করে। সমস্ত বলগুলো প্রশমিত হলে, ইয়ং-ল্যাপলেসের নীতি অনুযায়ী, এর সমীকরণ হয়:

যেখানে,

  • হল চাপের পার্থক্য, যাকে ল্যাপলেস চাপ বলা হয়।
  • হল পৃষ্ঠটান।
  • হল মুক্তপৃষ্ঠের সমান্তরাল প্রতিটি অক্ষের বক্রতা ব্যাসার্ধ।

সমীকরণে প্রথম বন্ধনীতে থাকা রাশিগুলো হল পৃষ্ঠের মোট বক্রতার পরিমাপ। এই সমীকরণের সমাধান করে জলবিন্দু, সাবানের বুদবুদ এবং পৃষ্ঠটানজনিত অন্যান্য আকারের (যেমন পোকার পায়ের চাপে পুকুরের জলে যে বক্রতার সৃষ্টি হয়) ধারণা পাওয়া যায়। নীচের ছকে দেখানো হয়েছে, কী পরিমাণে জলবিন্দুর ব্যাসার্ধ কমার সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি হয়। মোটামুটি ছোটো জলবিন্দুর ক্ষেত্রে এর প্রভাব নগণ্য, কিন্তু জলবিন্দু আণবিক আয়তনে এসে পৌঁছলে চাপের পার্থক্য বিরাট হয় (কিন্তু যদি বিন্দুতে একটিই অণু থাকে, তবে বিষয়টি অর্থহীন হয়ে পড়ে)।

প্রমাণ চাপ ও উষ্ণতায় জলবিন্দুর বিভিন্ন ব্যাসার্ধের জন্য Δp
জলবিন্দুর ব্যাসার্ধ ১ মিমি ০.১ মিমি μm ১০ nm
Δp (atm) ০.০০১৪ ০.০১৪৪ ১.৪৩৬ ১৪৩.৬

ভাসমান বস্তু[সম্পাদনা]

জলের উপরিতলে ভাসমান একটি সূচের প্রস্থচ্ছেদের চিত্র। Fw হল বস্তুর ওজন এবং Fs হল পৃষ্ঠটানের লব্ধিসমূহ।

তরলের ওপর কোনো বস্তু ফেলা হলে, তার ওজন মুক্তপৃষ্ঠে চাপ দেয়, এবং সেই চাপ প্রশমিত করে পৃষ্ঠটান , যা বস্তুটির সাথে জলের সংযোগবিন্দু থেকে উদ্ভূত হয়। লক্ষণীয়, এর অনুভূমিক উপাংশ দুটির দিক ঠিক পরস্পরের বিপরীতমুখী, অর্থাৎ এরা নিজেদের প্রশমিত করতে পারে। কিন্তু এর উল্লম্ব উপাংশ দুটি একই দিকে গতিশীল, তাই এরা একত্রে ওজনকে প্রশমিত করে। এই ঘটনাটি ঘটাতে হলে বস্তুটির উপরিতলকে অবশ্যই জলবিকর্ষী হতে হবে, এবং বস্তুটির ভর এতই নগণ্য হবে, যাতে পৃষ্ঠটান তা সহ্য করতে পারে।

তরলের পৃষ্ঠতল[সম্পাদনা]

পৃষ্ঠতল সংকোচন

যে কোনো আকারের কাঠামো দিয়ে ঘিরে থাকা তরলের সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফলযুক্ত মুক্তপৃষ্ঠের আকার গাণিতিকভাবে নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। তার দিয়ে তৈরি বহিঃকাঠামো সাবানজলে ডুবিয়ে আনলে, যে সাবানের সর তৈরি হয়, তা সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফলযুক্ত আকারে পৌঁছয়।

ইয়ং-ল্যাপলেস সমীকরণ থেকে বলা যায়, এর কারণ হল তরলে চাপের পরিবর্তন বক্রতার সমানুপাতিক। সাবানের সরের ক্ষেত্রে, চাপের পরিবর্তন শূন্য হয়, তাই বক্রতাও শূন্য হয় অর্থাৎ সংকুচিত পৃষ্ঠের কোনো বক্রতা থাকে না।

স্পর্শকোণ[সম্পাদনা]

তরলের মুক্তপৃষ্ঠে তরল ও অন্য কোনো পদার্থের সংযোগস্থল থাকে। উদাহরণ হিসেবে, পুকুরের জলের উপরিতলে জল ও বায়ুর সংস্পর্শ থাকে। সেহেতু পৃষ্ঠটানকে শুধু তরলের নিজস্ব ধর্ম বলা চলে না, বরং একে তরল ও অন্য কোনো মাধ্যমের সংযোগস্থলে তৈরি একটা ধর্ম বলা যায়। যদি তরলকে কোনো পাত্রে রাখা হয়, তবে এর উপরিতলে তরল ও বায়ুর সংযোগস্থল ছাড়াও তরল আর পাত্রের দেয়ালেরও সংস্পর্শ হয়। তরল আর বায়ুর মধ্যবর্তী পৃষ্ঠটান সাধারণত তরল ও পাত্রের দেয়ালের মধ্যবর্তী পৃষ্ঠটান থেকে পৃথক হয় কিংবা বৃহত্তর হয়। দুটি পৃষ্ঠ যেখানে সংস্পর্শে থাকে, সেখানে জ্যামিতিক উপায়ে সমস্ত বলগুলো সমতা বজায় রাখে।

স্পর্শকোণ ৯০° অপেক্ষা বেশি (বাঁ দিকে) কিংবা ৯০° অপেক্ষা কম (ডান দিকে) হলে সংযোগ বিন্দুতে বিভিন্ন বলের ক্রিয়া।

দুটি পৃষ্ঠের সংস্পর্শ তলটিতে, তাদের স্পর্শকোণ (Contact angle) তৈরি হয়, তরলপৃষ্ঠের স্পর্শক এবং কঠিনের পৃষ্ঠ মিলিতভাবে কোণটি তৈরি করে। ডানদিকের চিত্রে দুটি এরূপ উদাহরণ দেখানো হয়েছে। বাঁদিকের উদাহরণে তরল-কঠিন এবং কঠিন-গ্যাসীয় সংস্পর্শের মধ্যে পৃষ্ঠটানের পার্থক্য , তরল-গ্যাসীয় সংস্পর্শের পৃষ্ঠটান থেকে কম, তবুও সেই পার্থক্য ধনাত্মক হয়, অর্থাৎ

চিত্রে, সংযোগবিন্দুতে সমস্ত অনুভূমিক ও উল্লম্ব বলগুলো পরস্পরকে প্রশমিত করে, একেই বলা হয় ‘সাম্যাবস্থা’। বলটির অনুভূমিক উপাংশকে প্রশমিত করে আসঞ্জন বল

উল্লম্বদিকে, বলের উল্লম্ব উপাংশ বলকে সম্পূর্ণ প্রশমিত করে।

তরল কঠিন স্পর্শকোণ
জল
সোডা-লাইম গ্লাস
সিসের গ্লাস
গলিত কোয়ার্টজ
০°
ইথানল
ডাইইথাইল ইথার
কার্বন টেট্রাক্লোরাইড
গ্লিসারল
অ্যাসিটিক অ্যাসিড
জল প্যারাফিন মোম ১০৭°
রুপো ৯০°
মিথাইল আয়োডাইড সোডা-লাইম গ্লাস ২৯°
সিসের গ্লাস ৩০°
গলিত কোয়ার্টজ ৩৩°
পারদ সোডা-লাইম গ্লাস ১৪০°
কিছু তরল-কঠিন স্পর্শকোণ[৫]

যেহেতু বলসমূহ পৃষ্ঠটানের সাথে সমানুপাতিক, তা থেকে আমরা এটাও পাই:

যেখানে

  • হল তরল-কঠিন পৃষ্ঠটান,
  • হল তরল-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটান,
  • হল কঠিন-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটান,
  • হল স্পর্শকোণ; যেখানে অবতল পৃষ্ঠের ক্ষেত্রে স্পর্শকোণ ৯০° অপেক্ষা কম, আর উত্তল পৃষ্ঠের স্পর্শকোণ ৯০° অপেক্ষা বেশি।

এর অর্থ হল, যদিও তরল-কঠিন এবং কঠিন-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটানের পার্থক্য, সরাসরি পরিমাপ করা জটিল, কিন্তু তরল-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটান, থেকে একে সহজেই অনুমান করা যায়, এবং সাম্যাবস্থায় স্পর্শকোণ -কেও পরিমাপ করা যায়, যা সহজেই পরিমাপযোগ্য বর্ধমান ও হ্রাসমান স্পর্শকোণের একটি অপেক্ষক।

একেবারে ডানদিকের ছবিটাতে একইরকম উদাহরণ পাওয়া যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, যেহেতু স্পর্শকোণ ৯০° এর কম, তাই তরল-কঠিন ও কঠিন-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটানের পার্থক্য ঋণাত্মক হয়:

বিশেষ স্পর্শকোণ[সম্পাদনা]

কিছু বিশেষ অবস্থা, যেমন জল-রুপোর সংস্পর্শে তৈরি স্পর্শকোণ ৯০° এর সমান হয়, তাই তরল-কঠিন/কঠিন-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটানের পার্থক্যটা ঠিক শূন্য হয়।

আরেকটি বিশেষ অবস্থা দেখা যায়, যেখানে স্পর্শকোণ ঠিক ১৮০° হয়। জল ও বিশেষভাবে প্রস্তুত টেফলনের সংস্পর্শে এই স্পর্শকোণ প্রাপ্ত হয়। স্পর্শকোণ ১৮০° হলে, সেই ক্ষেত্রে তরল-কঠিন পৃষ্ঠটান আর তরল-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটান সমান হয়ে যায়।

পরিমাপ পদ্ধতি[সম্পাদনা]

গোনিয়োমিটারের সাহায্যে ভাসমান বিন্দু পদ্ধতিতে পৃষ্ঠটান পরিমাপ করা যায়।

যেহেতু নানা ক্রিয়ার মাধ্যমে পৃষ্ঠটান প্রকট হয়, তাই একে পরিমাপ করারও নানা পদ্ধতি আছে। এদের মধ্যে কোন্ পদ্ধতিটি কখন অনুকূল, তা নির্ভর করে পরীক্ষাবদ্ধ তরলের প্রকৃতি, পৃষ্ঠটানের ওপরে প্রভাবশালী নানা শর্তাবলি এবং বিকৃত মুক্তপৃষ্ঠের স্থিতিশীলতার উপর।

  • ডু নোয়ি রিং পদ্ধতি: পৃষ্ঠটান পরিমাপের একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া। তবে মুক্তপৃষ্ঠ কিংবা সংস্পর্শ তলের সিক্তকরণ ধর্ম এই পরিমাপ পদ্ধতিতে সামান্য প্রভাব বিস্তার করে। মুক্তপৃষ্ঠ দ্বারা রিঙের ওপরে উদ্ভূত সর্বোচ্চ টান পরিমাপ করা হয়।
  • ডু নোয়ি-প্যাডে পদ্ধতি: ডু নোয়ি রিং পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে এই পদ্ধতিতে রিঙের জায়গায় স্বল্প ব্যাসার্ধের একটি ধাতব সূচ ব্যবহার করা হয়, যা সর্বোচ্চ টান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে করতে পারে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করার সুবিধা হল, প্লবতা সংশোধন না করেই এই উপায়ে খুব স্পষ্টভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়তন নির্ধারণ করা যায়। এছাড়াও, এই পদ্ধতিতে পরিমাপের জন্য অত্যন্ত কম সময় লাগে (২০ সেকেন্ডের কাছাকাছি)। এই নীতির উপর ভিত্তি করে প্রথম বাণিজ্যিক টেনশিওমিটার তৈরি করা হয়েছিল।

উইলহেলমি প্লেট পদ্ধতি: নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পৃষ্ঠটান পরিমাপের একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়া। এর উল্লম্ব প্লেটটাকে পেরিমিটার বলা হয় এবং তাকে তুলাযন্ত্রের সাথে যুক্ত করা হয়; এবং সিক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বল পরিমিত হয়।

  • ঘূর্ণায়মান বিন্দু পদ্ধতি: নিম্ন সংস্পর্শ টান পরিমাপের একটি আদর্শ প্রক্রিয়া। এই পদ্ধতিতে ঘূর্ণায়মান জলবিন্দুর ব্যাসার্ধের পরিমাপ করা হয়।
  • ভাসমান বিন্দু পদ্ধতি: পৃষ্ঠটান তথা সংস্পর্শ টানকে অনেক উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপেও এই পদ্ধতিতে পরিমাপ করা যায়। এতে জলবিন্দুর জ্যামিতিক গঠন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

বুদবুদ চাপ (জ্যাগারের পদ্ধতি): সূক্ষ্ম পৃষ্ঠতলে উদ্ভূত পৃষ্ঠটানকে পরিমাপ করা হয়। প্রত্যেকটি বুদবুদের সর্বোচ্চ চাপ মাপা হয়।

  • বিন্দু আয়তন পদ্ধতি: নির্দিষ্ট ঘনত্বের তরলকে পৃথক ঘনত্বের দ্বিতীয় তরলে চালনা করা হয়। তরলবিন্দু গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় মাপা হয়।
  • কৈশিক ক্রিয়া পদ্ধতি: একটি কৈশিক নলের শেষাগ্রকে কোনো তরলে ডোবানো হয়। তরলটি ওই নলের মধ্য দিয়ে যত উচ্চতা উঠতে পারে, তা থেকে পৃষ্ঠটানের ধারণা পাওয়া যায়।
  • স্ট্যালাগমোমেট্রিক পদ্ধতি: এই প্রক্রিয়ায় তরলকণার ওজন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
  • সিসিলি বিন্দু পদ্ধতি: এই প্রক্রিয়ায় কোনো বস্তুর উপর তরলকণা ফেলা হয় আর তার স্পর্শকোণ পরিমাপ করা হয়। এর থেকে তরলের পৃষ্ঠটান ও ঘনত্বের ধারণা পাওয়া যায়।

প্রভাব[সম্পাদনা]

উল্লম্ব নলে তরল[সম্পাদনা]

পারদ ব্যারোমিটার।

একটি পারদ ব্যারোমিটার তৈরি হয় ১ সেমি ব্যাসার্ধের একটি উল্লম্ব কাচনল দিয়ে, যা আংশিক ভাবে পারদ দ্বারা পূর্ণ থাকে এবং অপূর্ণ অংশে একটি শূন্যস্থান থাকে (একে টরিসেলির শূন্যস্থান বলে)। লক্ষণীয়, প্রস্থ বরাবর কাচনল ঘেঁষা প্রান্তগুলোর থেকে মাঝখানের অংশে পারদের উচ্চতা বেশি হয়, ফলে পারদের উপরিতল গম্বুজাকৃতি (বা উত্তল) হয়। যদি পারদের এই উপরিতল সমতল হত, তবে প্রস্থচ্ছেদ বরাবর পারদের সামগ্রিক ভরকেন্দ্র সামান্য নীচে অবস্থান করত। কিন্তু উপরিতল গম্বুজের ন্যায় হওয়ায় পারদের সমগ্র ভরের সাপেক্ষে পৃষ্ঠতল কিছুটা কম হয়। আবারও, তরল তার মোট স্থিতিশক্তি হ্রাস করার চেষ্টা করে। এইজন্য পারদের উপরিতল উত্তল হয়।

এই ক্ষেত্রে আমরা পারদের সমগ্র পৃষ্ঠতল নিয়ে গণনা করব (কাচনলের সংস্পর্শে থাকা পৃষ্ঠের নিচু অংশকে নিয়ে), কারণ পারদ আর কাচের কোনো বিশেষ আসঞ্জন টান নেই। তাই পারদের পৃষ্ঠটান সমগ্র মুক্তপৃষ্ঠ বরাবর ক্রিয়া করে, এমনকি কাচের সংস্পর্শে থাকা অংশেও। কিন্তু কাচের বদলে নলটি তামার তৈরি হলে, অবস্থাটা ভিন্ন হত। পারদ ও তামার পারস্পরিক আসঞ্জন টান অনেক বেশি। অর্থাৎ তামার নলে পারদ নিলে নল ঘেঁষা প্রান্তগুলোর থেকে মাঝের অংশের পারদের (প্রস্থ বরাবর) উচ্চতা কম হত (অর্থাৎ অবতল হত)। এই ক্ষেত্রে নলের সংস্পর্শে থাকা পারদপৃষ্ঠের পৃষ্ঠটানকে ঋণাত্মক ধরা হবে। এসময় পারদ তামার সংস্পর্শে থাকা পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বাড়াতে চায়। সংস্পর্শতলের ক্ষেত্রফল বাড়ানোর সাথে সাথে স্থিতিশক্তি হ্রাস পায়। ফলে প্রান্ত বরাবর পারদের অধিক উচ্চতার জন্য যে স্থিতিশক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা প্রশমিত হয়।

কৈশিক উত্থান ও পতনের চিত্র। লাল=স্পর্শকোণ ৯০° অপেক্ষা কম; নীল=স্পর্শকোণ ৯০° অপেক্ষা বেশি।

যদি নলটি পর্যাপ্ত সরু হয় এবং নলের দেয়ালের সাথে তরলের আসঞ্জন তীব্র হয়, তবে পৃষ্ঠটানের জন্য তরল ওই নল বরাবর অনেকটা উচ্চতা উঠতে সক্ষম হয়, একেই কৈশিক ক্রিয়া বলে। তরল যে উচ্চতা পর্যন্ত উঠতে পারে, তার সূত্র হল:

যেখানে,

  • হল তরলের উচ্চতা,
  • হল তরল-গ্যাসীয় পৃষ্ঠটান,
  • হল তরলের ঘনত্ব,
  • হল কৈশিক নলের ব্যাসার্ধ,
  • হল অভিকর্ষজ ত্বরণ,
  • হল স্পর্শকোণ। যদি এর মান ৯০° থেকে বেশি হয় (যেমন পারদ আর কাচের সংস্পর্শে), তবে তরল উপরে ওঠার বদলে নীচে নেমে যাবে।

তাপগতিবিদ্যা[সম্পাদনা]

আগেও বলা হয়েছে পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কৃতকার্য হল । স্থির উষ্ণতা ও চাপে প্রতি পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফলে গিব্‌স মুক্ত শক্তি পৃষ্ঠটানের সমান হয়:

এখানে হল গিব্‌স মুক্ত শক্তি এবং হল ক্ষেত্রফল। তাপগতিবিদ্যা অনুসারে সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থার পরিবর্তন গিব্‌স মুক্ত শক্তি হ্রাসের কারণে হয়।

এর থেকে সহজেই বোঝা যায়, নির্দিষ্ট ভরের তরলের পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল হ্রাস কেন স্বতঃস্ফূর্ত হয় (), যেখানে এর সাথে কোনো অন্য শক্তির পরিবর্তন মিলিত ক্রিয়া করে না। পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল বাড়াতে হলে স্থিতিশক্তিও সামান্য বাড়বে – এই নীতির অনুসরণ করা হয়।

গিব্‌স মুক্ত শক্তির সমীকরণ হল, , যেখানে হল এনথ্যালপি এবং হল এনট্রপি। যেহেতু পৃষ্ঠটান হল প্রতি একক ক্ষেত্রফলে গিব্‌স মুক্ত শক্তির পরিমাণ, তাহলে প্রতি একক ক্ষেত্রফলে এনট্রপির সাপেক্ষে তাকে লেখা যায়,

পূর্বের সমীকরণগুলোর পুনর্গঠন করে কেলভিন সমীকরণ প্রাপ্ত হয়। এতে বলা আছে, স্থির উষ্ণতা ও চাপে পৃষ্ঠ এনথ্যালপি বা পৃষ্ঠশক্তি (পৃষ্ঠ মুক্ত শক্তি নয়) সাধারণত পৃষ্ঠটান এবং তার অন্তরকলজের উপর নির্ভরশীল।

সাবান বুদবুদের তাপগতিবিদ্যা[সম্পাদনা]

তাপগতীয় মুক্ত শক্তির ধারণা থেকে আদর্শ সাবান বুদবুদের ভিতরকার চাপ নির্ধারণ করা যায়। নির্দিষ্ট কণার সংখ্যা ও নির্দিষ্ট চাপে, , অবকল হেলমোল্‌জ় শক্তি হল–

যেখানে হল বুদবুদের ভিতরে ও বাইরে চাপের পার্থক্য, এবং হল পৃষ্ঠটান। সাম্যাবস্থায় হয়, অর্থাৎ,

গোলকাকার বুদবুদের আয়তন আর পৃষ্ঠ ক্ষেত্রফল হয়:

,

এবং

এই সমস্ত সমীকরণের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে আমরা পাই,

এই সমীকরণটি ইয়ং-ল্যাপলেস সমীকরণেরই অনুরূপ, যেখানে হয়। বাস্তব বুদবুদের ক্ষেত্রে এই চাপ দ্বিগুণ হয়, কারণ, বুদবুদের দুটো পৃষ্ঠতল থাকে, একটি ভিতরের দিকে, আর একটি বাইরের দিকে।

পৃষ্ঠটানের ফোটোগ্যালারি[সম্পাদনা]

নোট[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. US Geological Survey (জুলাই ২০১৫)। "Surface Tension (Water Properties) – USGS Water Science School"। US Geological Survey। সংগৃহীত নভেম্বর ৬, ২০১৫ 
  2. White, Harvey E. (১৯৪৮)। Modern College Physics। van Nostrand। আইএসবিএন 0-442-29401-8 
  3. Bush, John W. M. (মে ২০০৪)। "MIT Lecture Notes on Surface Tension, lecture 5" (PDF)। Massachusetts Institute of Technology। সংগৃহীত এপ্রিল ১, ২০০৭ 
  4. Bush, John W. M. (মে ২০০৪)। "MIT Lecture Notes on Surface Tension, lecture 3" (PDF)। Massachusetts Institute of Technology। সংগৃহীত এপ্রিল ১, ২০০৭ 
  5. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; s_z নামের সূত্রের জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]