বিষয়বস্তুতে চলুন

খ্রিস্টানদের প্রতি মুহাম্মাদের দৃষ্টিভঙ্গি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মুহাম্মদের খ্রিষ্টানদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। মুহাম্মদ সাধারণভাবে খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন এবং তাঁদেরকে আব্রাহামীয় ওহির প্রাপক হিসাবে গণ্য করতেন, অর্থাৎ কিতাবধারী (আহল আল-কিতাব) হিসেবে দেখতেন। তবে, তিনি তাঁদের কিছু বিশ্বাসের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন খ্রিষ্টান রাষ্ট্রনায়কদের উদ্দেশে চিঠি প্রেরণ করেন, যেখানে তাঁদেরকে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করতে, অর্থাৎ ইসলামে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানানো হয়।[][][] ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ মক্কা অবস্থানকালে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

শান্তির গ্রন্থ

[সম্পাদনা]

মুহাম্মদের আশতিনামা (শান্তির গ্রন্থ) একটি দলিল, যা মুহাম্মদ কর্তৃক অনুমোদিত একটি চার্টার বা আদেশপত্র, যেখানে সেন্ট ক্যাথারিন মঠের খ্রিষ্টান সন্ন্যাসীদের জন্য নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিশেষাধিকারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।[] দলিলটি মুহাম্মদের হাতের ছাপযুক্ত একটি সীল দ্বারা মোহরকৃত।[] সন্ন্যাসীদের ঐতিহ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ প্রায়ই এই মঠে যেতেন এবং সিনাই অঞ্চলের পিতৃপুরুষদের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ও আলোচনা ছিল।[]

আশতিনামার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ নিচে উপস্থাপিত হলো:

এই পত্রটি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ, রসূল, নবী, বিশ্বস্ত, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছেন যেন পরবর্তীকালে কারো পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে—তাঁর পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

এই চুক্তিপত্র ইসলামের অনুসারীদের উদ্দেশ্যে জারি করা, যা পূর্ব ও পশ্চিমে, নিকট ও দূরে, আরব ও অনারব, পরিচিত ও অজানা—সবার মধ্যে যিশু নজরাইনীর অনুসারীদের প্রতি অঙ্গীকার।

এই পত্রে তাঁদের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার রয়েছে, এবং যে কেউ এর বিরুদ্ধাচরণ করবে, সে অবিশ্বাসী ও নির্দেশ অমান্যকারী হিসেবে গণ্য হবে।

যখন খ্রিষ্টান সন্ন্যাসী, ভক্ত এবং তীর্থযাত্রীরা একত্রিত হন, পাহাড় বা উপত্যকা, গুহা বা উন্মুক্ত স্থান, সমভূমি বা গির্জা, উপাসনালয়ে—তখন আমরা তাঁদের পেছনে থাকব এবং আমি, আমার বন্ধু ও সহকারীদের মাধ্যমে তাঁদের জীবন, সম্পদ ও চরিত্র রক্ষা করব, কারণ তাঁরা আমার প্রজাদের অন্তর্ভুক্ত এবং আমার নিরাপত্তায় রয়েছেন।

তাঁদের ওপর অন্যদের ন্যায় কোনো বোঝা চাপানো হবে না। তাঁদের বিচারকদের পদচ্যুতি করা যাবে না, সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় কাজকর্মে বাধা দেওয়া যাবে না, নির্জনবাসীদের ধ্যানস্থলে বাধা দেওয়া যাবে না।

কোনো খ্রিষ্টান গির্জা, উপাসনালয়, বা তাতে থাকা জিনিসপত্র মুসলিমদের ঘরে নেওয়া যাবে না। যদি কেউ তা করে, তবে সে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গকারী ও রসূলের অবাধ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

তাঁদের কাউকে বাধ্য করা যাবে না যাত্রা করতে, যুদ্ধ করতে বা অস্ত্র বহন করতে; বরং মুসলমানদের দায়িত্ব তাঁদের রক্ষা করা। তাঁদের সঙ্গে বিতর্ক বা তর্কে না গিয়ে কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী উত্তম আচরণ করতে হবে: ‘‘তোমরা কিতাবধারীদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো’’ [২৯:৪৬]।

তাঁরা যেন শান্তিতে ও সম্মানে জীবনযাপন করতে পারেন, ইসলাম প্রচারকদের পক্ষ থেকেও কোনো কষ্টভোগ না করেন।

যদি কোনো খ্রিষ্টান নারী মুসলমান পুরুষকে বিয়ে করেন, তবে তা তাঁর সম্মতি ব্যতীত হতে পারবে না, এবং তাঁকে গির্জায় যাওয়া থেকে বিরত করা যাবে না।

তাঁদের গির্জাগুলিকে সম্মান করতে হবে এবং নতুন গির্জা নির্মাণ বা মঠ মেরামতে বাধা দেওয়া যাবে না।

তাঁদের অস্ত্র বা পাথর বহনে বাধ্য করা যাবে না; বরং মুসলমানদের কর্তব্য তাঁদের রক্ষা ও প্রতিরক্ষা করা।

এই অঙ্গীকার লঙ্ঘন করা যাবে না, এবং কেয়ামতের দিন পর্যন্ত প্রতিটি মুসলমানের জন্য এই চুক্তিপত্র পালন করা বাধ্যতামূলক।

The Ashtiname of Muhammad[]

প্রথম ওহি লাভের পূর্বে

[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ যখন নয় বছর বয়সে ছিলেন—বা কিছু সূত্র অনুযায়ী বারো বছর বয়সে—তখন তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সঙ্গে সিরিয়া সফরে যান এবং সেখানে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ হয়। এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ ছিল নেস্টোরীয় সন্ন্যাসী বাহিরার সঙ্গে। তাঁরা বোসরা নামক স্থানে (বর্তমান সিরিয়া) সাক্ষাৎ করেন, এবং বাহিরা কিশোর মুহাম্মদকে তাঁর ভবিষ্যৎ নবুয়তের ভবিষ্যদ্বাণী করেন।[] এই কাহিনী সিরীয় সাহিত্যের একাধিক গ্রন্থে পাওয়া যায়।

আরেকটি কাহিনী ইবন সা’দের ‘সিরা’ গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে মুহাম্মদ যখন খাদিজার পক্ষে কর্মরত ছিলেন, তখন খাদিজা তাঁকে সিরিয়ায় এক সফরে পাঠান, তাঁর সঙ্গী ছিলেন মাইসারা নামক একজন ব্যক্তি। তাঁরা সিরিয়ার দক্ষিণে বোসরা পৌঁছালে মুহাম্মদ একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেন। এ সময় এক সন্ন্যাসী, যার নাম ছিল নেস্টর, মাইসারার কাছে গাছের নিচে বসা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। মাইসারা তাঁকে মুহাম্মদের পরিচয় দিলে নেস্টর বলেছিলেন, "এই গাছের নিচে বসা ব্যক্তি ব্যতীত আর কেউ নবী হতে পারেন না।"[]

ওয়ারাকা ইবনে নওফাল ছিলেন একজন নেস্টোরীয় সন্ন্যাসী এবং মুহাম্মদের স্ত্রী খাদিজার চাচাতো ভাই। কিছু সূত্র অনুযায়ী, তিনি মক্কার একজন যাজক বা ধর্মপ্রচারক ছিলেন। কুহে হিরায় মুহাম্মদ প্রথম ওহি লাভের পর তিনিই সর্বপ্রথম তাঁকে জানান যে তিনি একজন নবী।[১০]

বাইজেন্টাইনরা

[সম্পাদনা]

প্রচলিত ইসলামী সূত্র অনুসারে, ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ হেরাক্লিয়াসের নিকট একটি চিঠি পাঠান, যাতে তিনি তাঁকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান।[১১] হেরাক্লিয়াস (আরবি: هِرَقْل) বরাবর পাঠানো সেই চিঠির পাঠ্য নিম্নরূপ:

আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মদ থেকে হেরাক্লিয়াস, রোমানদের প্রধানের প্রতি— সালাম সেই সকলের প্রতি, যারা সঠিক পথ অনুসরণ করে। পরবর্তীতে, আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাই। ইসলাম গ্রহণ করুন এবং নিরাপদ থাকুন। ইসলাম গ্রহণ করলে আপনি দ্বিগুণ প্রতিদান লাভ করবেন। কিন্তু যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে আপনার উপর সাধারণ জনগণের গোনাহ বর্তাবে। "হে কিতাবধারীগণ, এসো এমন একটি কথায় যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন—যেন আমরা কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ব্যতীত প্রভু হিসেবে গ্রহণ না করে।" এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলো: 'তোমরা সাক্ষ্য দাও, আমরা মুসলমান।'[কুরআন ৩:৬৪]

সিল: আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ

ইসলামী সূত্রমতে, চিঠিটি পড়ে শুনানোর পর হেরাক্লিয়াস এতে প্রভাবিত হন এবং বার্তাবাহককে মূল্যবান পোশাক ও মুদ্রা উপহার দেন।[১২] অন্য সূত্র মতে, তিনি চিঠিটি কোলে রাখেন এবং পরবর্তীতে রোমের এক ধর্মীয় নেতার কাছে লিখে মুহাম্মদের নবুয়তের দাবির সত্যতা যাচাই করেন। উত্তরের চিঠি পাওয়ার পর তিনি রোমান পরিষদে বলেন, “যদি তোমরা মুক্তি ও সঠিক পথ চাও এবং চাও তোমাদের সাম্রাজ্য অটুট থাকুক, তবে এই নবীর অনুসরণ করো।” তবে পরিষদ এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে।[১২][১৩] শেষ পর্যন্ত হেরাক্লিয়াস ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবে দূতকে সম্মান জানিয়ে মদিনায় ফিরিয়ে দেন।[১৪]

তবে কিছু ইতিহাসবিদ এই বর্ণনার সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, কারণ ইসলামী সূত্র ছাড়া হেরাক্লিয়াসের ইসলাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।[১৫]

ইতিহাস অনুযায়ী, ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ একটি বাহিনী পাঠান, যার সদস্যসংখ্যা ছিল ৩,০০০ জন। এই বাহিনী আল কারাক–এর নিকটে প্রায় ১,০০,০০০ বাইজেন্টাইন সৈন্যের মুখোমুখি হয়। এই সংঘর্ষই মু’তার যুদ্ধ নামে পরিচিত এবং এতে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়।[১৬] পরবর্তী কিছু সূত্রে এই যুদ্ধকে মুসলমানদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কারণ অধিকাংশ মুসলিম সৈন্য নিরাপদে ফিরে এসেছিল।[১৭]

ইথিওপীয়রা

[সম্পাদনা]

প্রচলিত ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কার প্রারম্ভিক মুসলিম সম্প্রদায় নির্যাতনের মুখোমুখি হলে, মুহাম্মদ তাঁদের অক্সুমে আশ্রয় গ্রহণের পরামর্শ দেন। এই ঘটনার প্রাচীনতম বিবরণ ৮ম শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ইবন ইসহাক প্রদান করেন:[১৮][১৯]

যখন রাসূল (সা.) তাঁর সঙ্গীদের ওপর নির্যাতন দেখতে পেলেন, [...] তিনি তাঁদের বললেন: “তোমরা যদি আবিসিনিয়ায় চলে যেতে পারো, তবে তা তোমাদের জন্য ভালো হবে, কারণ সেখানে একজন রাজা আছেন যিনি কারো ওপর জুলুম বরদাশত করেন না। এবং সেখানে একটি বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশ আছে, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের কষ্ট দূর করেন।” তখন তাঁর সঙ্গীরা আবিসিনিয়ার উদ্দেশে রওনা হন, ধর্ম ত্যাগের ভয়ে এবং আল্লাহর দিকে আশ্রয় নিতে। এটি ইসলামের প্রথম হিজরত।

কুরাইশরা জানতে পারে যে মুহাম্মদের অনুসারীরা অক্সুমite রাজ্যে নিরাপদে ধর্ম পালন করছেন। এরপর তাঁরা নাজাশির দরবারে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান, যাতে তিনি মুসলিম অভিবাসীদের ফিরিয়ে দেন।[২০][২১] প্রতিনিধি দলে আমর ইবনে হিশাম ছিলেন। তাঁরা দাবি করেন, মুসলিম অভিবাসীরা "মূর্খ তরুণ", যারা এমন একটি ধর্ম আবিষ্কার করেছে যা মক্কা বা অক্সুমে আগে কেউ শোনেনি এবং তাঁদের আত্মীয়রা তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

নাজাশি, যিনি ছিলেন রাজা, মুসলিমদের ডেকে পাঠান এবং জানতে চান, তাঁদের কাছে কী এমন কিছু আছে যা ঈশ্বরের পক্ষ থেকে এসেছে। তখন মুসলিমদের একজন, জাফর, সূরা মারইয়াম থেকে একটি অংশ পাঠ করেন। রাজা তা শুনে বলেন, “নিশ্চয়ই এটি এবং যিশু যা এনেছেন, একই উৎস থেকে এসেছে।” এরপর তিনি ঘোষণা করেন, তিনি মুসলিমদের কখনো হস্তান্তর করবেন না।[২২][২৩]

পরে মুহাম্মদ রাজা নাজাশির (আসল নাম আরমাহ) উদ্দেশে একটি চিঠি লেখেন, যিনি মুসলিমদের রক্ষা করেছিলেন:

আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ থেকে আবিসিনিয়ার প্রধান নাজাশির প্রতি— সালাম সেই সকলের প্রতি, যারা সঠিক পথ অনুসরণ করে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করি, যাঁর ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই—তিনি রাজাধিরাজ, পবিত্র, শান্তিদাতা, বিশ্বাসদাতা, নিরাপত্তাদাতা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে ঈসা ইবনে মরিয়ম হলেন আল্লাহর আত্মা এবং তাঁর বাণী, যেটি তিনি নিষ্পাপ মরিয়মের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলেন। আল্লাহর আত্মা ও নিঃশ্বাস দ্বারা তিনি গর্ভধারণ করেছিলেন, যেমন আল্লাহ তাঁর নিজ হাতে আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন। আমি আপনাকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানাচ্ছি, যার কোনো শরিক নেই। আমি আপনাকে তাঁর আনুগত্যের পথে আসতে বলছি এবং যা আমার কাছে এসেছে, তাতে ঈমান আনতে বলছি। আমি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর রসূল এবং আপনাকে ও আপনার অনুসারীদের আল্লাহর পথে ডাকছি, যিনি শক্তিশালী ও মহান। এই বার্তা আমি আপনাকে জানিয়ে দিলাম এবং আন্তরিক উপদেশ দিলাম। সুতরাং আমার উপদেশ গ্রহণ করুন। “সালাম সেই সকলের প্রতি, যারা সঠিক পথ অনুসরণ করে।”[কুরআন ২০:৪৭]

সিলমোহর: মুহাম্মদ, আল্লাহর রসূল

এই চিঠির জবাবে নাজাশির কী করেছিলেন সে সম্পর্কে ধর্মনিরপেক্ষ কোনো উৎস নেই। তবে ইসলামী সূত্র মতে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কারণ পরবর্তীতে মুহাম্মদ মদিনায় তাঁর জন্য গায়েবানা জানাজার নামাজ আদায় করেন। এই নামাজ কেবলমাত্র মুসলমান মৃতদের জন্য আদায় করা হয় যাঁদের মৃত্যুস্থানে মুসলমানদের উপস্থিতি না থাকে।[২৪]

মদিনা পর্বে নাজরানের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে মুহাম্মদের সম্পর্ক

[সম্পাদনা]

প্রাচীন নাজরান নগরী, যেটিকে আজ উখদুদ নামে পরিচিত, মদিনা থেকে প্রায় ১২০০ মাইল দক্ষিণে বর্তমান নাজরান শহরের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত। প্রাচীন নাজরান ছিল একটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর, যা দুইটি প্রধান বাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল। ভৌগোলিক সুবিধার কারণে এটি কৃষি ও শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল এবং একে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। এই অর্থনৈতিক গুরুত্ব মুহাম্মদের শহরটির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে বলে অনুমান করা হয়।

এই আগ্রহের ফলে মক্কা পর্ব থেকেই নাজরানের খ্রিষ্টানরা ইসলামের প্রভাবের মুখোমুখি হতে শুরু করেন, বিশেষত কুরআনের প্রচার আরব উপদ্বীপজুড়ে বিস্তৃত হলে। তবে বাস্তব অর্থে মুহাম্মদ ও নাজরানের খ্রিষ্টানদের মধ্যে প্রথম সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে মদিনা পর্বে।[২৫]

মদিনা অবস্থানকালে মুহাম্মদ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ইসলামে আহ্বান জানাতে শুরু করেন। তিনি নাজরানে বিশেষভাবে দুটি দূত পাঠান, তাঁদের একজন ছিলেন খ্যাতনামা মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, যিনি ইসলামী শাসনের অধীনে নাজরানের খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন।[২৬]

এর জবাবে, নাজরান একটি খ্রিষ্টান পণ্ডিত দলের প্রতিনিধি দল পাঠায়, যাঁরা মুহাম্মদের ওহির সত্যতা যাচাই করতে আগ্রহী ছিলেন। এই প্রতিনিধি দল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে আতিথেয়তা ও নিরাপত্তা লাভ করেন। কিছু সূত্র অনুযায়ী, এই প্রতিনিধি দল ও মুহাম্মদের মধ্যে দুই বা তিন দিন শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় বিতর্ক হয়। আলোচনার শেষ পর্যায়ে দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, যাতে সিদ্ধান্ত হয় একে অপরের ধর্মে হস্তক্ষেপ করা হবে না।[২৭]

মুহাম্মদ ও নাজরানের খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার শর্তাবলী নিম্নরূপ ছিল:

আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। এটি মুহাম্মদ, আল্লাহর নবী ও রসূল, কর্তৃক নাজরানের জনগণের জন্য লিখিত একটি দলিল, যখন তাঁর কর্তৃত্ব ছিল তাঁদের ফলমূল, সোনা, রূপা, শস্য ও দাসদের উপর। তিনি অনুগ্রহ করে এসব তাঁদের কাছেই রেখে দেন, এর বিনিময়ে বছরে ২০০০ ‘হুল্লা’ প্রদান করার শর্তে—এর মধ্যে ১০০০ ‘হুল্লা’ রজব মাসে এবং ১০০০ ‘হুল্লা’ সফর মাসে দিতে হবে। প্রতি হুল্লা সমান ১ আউন্স, যা ৪ দিরহামের সমান। এছাড়া নাজরানবাসীরা রাসূলের দূতদের জন্য ২০ দিন পর্যন্ত আবাস ও খরচ বহন করবেন, তবে কোনো দূতকে এক মাসের বেশি রাখা যাবে না। যদি ইয়েমেনে কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটে, তাহলে তাঁরা ৩০টি ঢাল, ৩০টি ঘোড়া ও ৩০টি উট ঋণ হিসেবে সরবরাহ করবেন। এই ঋণকৃত জিনিস হারিয়ে গেলে তা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত রাসূলের পক্ষ থেকে দায়বদ্ধ থাকবে।

নাজরান আল্লাহর নিরাপত্তা ও মুহাম্মদের অঙ্গীকারের মধ্যে থাকবে। তাঁদের জীবন, ধর্ম, জমি, সম্পদ, উপস্থিত ও অনুপস্থিত সদস্য, গোত্র ও মিত্র—সব রক্ষা করা হবে। তাঁদের কোনো প্রথা পরিবর্তন করা হবে না, তাঁদের ধর্মের কোনো অধিকার বাতিল করা হবে না। কোনো বিশপ, সন্ন্যাসী বা চার্চের রক্ষককে অপসারণ করা যাবে না। যা তাঁদের আছে, তা তাঁদেরই থাকবে, যত বড় বা ছোট হোক না কেন। তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না, বা কোনো প্রতিশোধমূলক হত্যা চালানো যাবে না। তাঁদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা যাবে না, এবং কোনো সেনাবাহিনী তাঁদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারবে না। কোনো অধিকার দাবি করলে, ন্যায়বিচার করা হবে। পূর্ববর্তী সুদের ভিত্তিতে কেউ মুনাফা আদায় করলে, সে মুহাম্মদের নিরাপত্তার আওতায় থাকবে না। অন্য কারও অন্যায়ের জন্য নাজরানের কাউকে দায়ী করা যাবে না।[২৮][২৯]

মুহাম্মদের মৃত্যুর পরও এই চুক্তি কার্যকর ছিল, তবে দ্বিতীয় খলিফা উমর চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে নাজরানের খ্রিষ্টানদের বিতাড়িত করেন। তাঁদের ইরাকে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে পাঠানো হয় এবং সেখানে তাঁদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।[৩০]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Guillaume, Alfred (১৯৬৭)। The Life Of Muhammad: A Translation of Ishaq's Sirat Rasul Allah (English ভাষায়) (13th সংস্করণ)। Karachi: Oxford University Press। পৃ. ৬৫৩। আইএসবিএন ০-১৯-৬৩৬০৩৩-১। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২১{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক)
  2. "In Pictures: Prophet Mohammed's letters that were sent to rulers"Al Arabiya English। ১৪ মে ২০১৭।
  3. "Sahih al-Bukhari 2940, 2941 - Fighting for the Cause of Allah (Jihaad) - كتاب الجهاد والسير"sunnah.com। Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২১
  4. Brandie Ratliff, "The monastery of Saint Catherine at Mount Sinai and the Christian communities of the Caliphate." Sinaiticus. The bulletin of the Saint Catherine Foundation (2008) ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৫-০২-১৩ তারিখে.
  5. Ratliff, "The monastery of Saint Catherine at Mount Sinai and the Christian communities of the Caliphate."
  6. "Mohammed and the Holy Monastery of Sinai"। ১৩ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩
  7. trans. Haddad, Anton F. (১৯০২)। "The Oath of the Prophet Mohammed to the Followers of the Nazarene"। New York, NY: Board of Counsel, 1902। সংগ্রহের তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
  8. Haykal, The Life of Muhammad, American Trust Publications, p.54
  9. "Evaluation of Khadija's Marriage and Related Narrations" (turkish ভাষায়)। Dergipark: ৭। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০২৩ {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য |journal= প্রয়োজন (সাহায্য)উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক)
  10. Encyclopedia of Islam, Online ed., "Waraqah bin. Nawfal".
  11. Siddiqui (2007)
  12. 1 2 Mubarakpuri, Safi ar-Rahman (২০০২)। When the Moon Split (A Biography of Prophet Muhammad)। Darussalam Publications। আইএসবিএন ৯৭৮-৬০৩-৫০০-০৬০-৪
  13. "Sahih al-Bukhari 7 - Revelation - كتاب بدء الوحى"sunnah.com। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২১
  14. Mubârakpûrî, Safî-ur-Rahmân (২০০২)। Sealed Nectar : Biography of the Noble Prophet.। Dar-Us-Salam Publications। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৯১৪৪-০৭১-০
  15. Kaegi, Walter Emil (২০০৩)। Heraclius, emperor of Byzantium। Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-৮১৪৫৯-৬
  16. Kaegi 1992, p. 67.
  17. Powers, David S. (২০০৯)। Muhammad Is Not the Father of Any of Your Men: The Making of the Last Prophet.। University of Pennsylvania Press.। আইএসবিএন ৯৭৮০৮১২২২১৪৯৭
  18. Ibn Ishāq (২০০৪)। Sīratu Rasūlillāh (tr. Alfred Guillaume)। Oxford University Press। পৃ. ১৪৬।
  19. W. Montgomery Watt (১৯৮০)। Muhammad at Mecca। Oxford University Press। পৃ. ১১০–১১১।
  20. Martin Lings (২০০৬)। Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources। Inner Traditions। পৃ. ৮১–৮৪।
  21. Ibn Ishāq (২০০৪)। Sīratu Rasūlillāh (tr. Alfred Guillaume)। Oxford University Press। পৃ. ১৫০–১৫৩।
  22. Ibn Ishāq (২০০৪)। Sīratu Rasūlillāh (tr. Alfred Guillaume)। Oxford University Press। পৃ. ১৫০–১৫৩।
  23. Martin Lings (২০০৬)। Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources। Inner Traditions। পৃ. ৮১–৮৪।
  24. al-Bukhari, Imam (২০১৩)। Sahih al-Bukhari: The Early Years of Islam Chapter:THE BEGINNINGS OF ISLAM; Section:XIV THE DEATH OF THE NEGUS। Muhammad Asad কর্তৃক অনূদিত। The Other Press। পৃ. ১৭৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৬৭-৫০৬-২৯৮-৮। সংগ্রহের তারিখ ২১ আগস্ট ২০২০
  25. Shahid, Irfan। "Nadjran"Encyclopedia of Islam, Second Edition.। Brill Online, 2013.। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩
  26. Tobi, Joseph (১৯৯৯)। The Jews of Yemen: Studies in Their History and Culture। Leiden, Netherlands: Koninklijke Brill NV। পৃ. ২০। আইএসবিএন ৯০০৪১১২৬৫০
  27. Acar, Ismail। "Interactions between Prophet Muhammad and Christians"The Fountain on Life, Knowledge, and Belief। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩
  28. Muhammad। "The Covenant of the Prophet Muhammad with the Christians of Najran."The Covenant of the Prophet Muhammad with the Christians of the World.। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩
  29. Salahi, Adil। "Prophet Muhammad Meets Najran Christians."OnIslam.। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩
  30. Abd al-Muhsin Madʼaj M Madʼaj. (১৯৮৮)। The Yemen in Early Islam (9-233/630-847): A Political History.। London: Ithaca Press। পৃ. ১১২। আইএসবিএন ৯৭৮০৮৬৩৭২১০২১