দেবশ্রী রায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
দেবশ্রী রায়
স্থানীয় নাম চুমকী
জন্ম (১৯৬১-০৮-০৮) ৮ আগস্ট ১৯৬১ (বয়স ৫৫)
কলকাতা, ভারত
নাগরিকত্ব ভারতীয়
পেশা অভিনেত্রী
যে জন্য পরিচিত বাঙালী অভিনেত্রী, রাজনৈতিক নেত্রী

দেবশ্রী রায় একজন বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী। মূলত বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের দাপটেই তিনি খ্যাতির শীর্ষে পৌছে যান। তিনি টালিগঞ্জের বাংলা ছায়াছবির অন্যতম সফল একজন অভিনেত্রী ও নায়িকা। একশোরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং পেয়েছেন চল্লিশের বেশি পুরস্কার। তিনি তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে "চিন্তামণি" নামে অভিনয় করতেন। দেবশ্রী রায় একজন প্রথিতযশা ওড়িশি নৃত্যশিল্পী এবং সেই সাথে তার নটরাজ দলের কর্ণধার।

অপর্ণা সেনের ৩৬ চৌরঙ্গী লেন (১৯৮১) ছবিতে অভিনয়ের সুবাদেই দেবশ্রী রায় সর্বভারতীয় মুখ হিসাবে পরিচিত হন। পরবর্তী কালে সিনেমায় যেমন হয় (১৯৯৪), উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪), অসুখ (১৯৯৯), দেখা (২০০১), শিল্পান্তর (২০০২), প্রহর (২০০৪) - এই সব ছবিতে তার অভিনয় প্রতিভা উচ্চপ্রশংসিত হয়। বেশ কিছু হিন্দি ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। জিয়ো তো আয়সে জিয়ো, জাস্টিস চৌধুরী, ফুলবারি, সীপীয়ন, কভী আজনবী থে তার উল্লেখযোগ্য বলিউড নির্মিত হিন্দি ছায়াছবি। আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে নব্বই দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাণিজ্যিক বাংলা ছবির সর্বপ্রধান অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। কুহেলি,দাদার কীর্তি, সুবর্ণগোলক, ত্রয়ী, পারাবত প্রিয়া, ভালোবাসা ভালোবাসা, সম্রাট ও সুন্দরী, হীরের শিকল, শঙ্খচূড়, সুরের সাথী, সুরের আকাশে, আক্রোশ, চোখের আলোয়, ঝংকার, অহংকার, শুভ কামনা, মায়াবিনী, পুরুষোত্তম, রক্তেলেখা, শ্রদ্ধাঞ্জলী, লাঠি, বেয়াদপ, জীবন যৌবন, পুত্রবধূ, দেবাঞ্জলি, এক যে আছে কন্যা, যুদ্ধ, মহাগুরু, শুকনো লঙ্কা প্রমুখ তার উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য-সফল বাংলা ছবির উদাহরণ।

বাল্যকাল[উৎস সম্পাদনা]

দেবশ্রী রায় এর জন্ম, বেড়ে ওঠা কলকাতায়। তার পিতার নাম বীরেন্দ্র কিশোর রায় এবং মায়ের নাম আরতি রায়। ১৯৬৯ সনে তিনি প্রথম "বালক গদাধর" নামে একটি চলচিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন, যার পরিচালক ছিলেন হরিময় সেন। তিনি কলকাতার এ পি জে ,পার্ক স্ট্রীট শাখার স্কুলের ছাত্রী ছিলেন, যদিও নাচের প্রতি অত্যধিক ঝোঁক থাকার কারণে বেশিদূর এগোতে পারেন নি। তার ডাক নাম চুমকি।

নৃত্যশিল্পী হিসেবে খ্যাতি[উৎস সম্পাদনা]

অভিনয়ের পপাশাপাশি দেবশ্রী রায় একজন খ্যাতিমান ওড়িশি নৃত্য শিল্পী। তিনি প্রথমে তার মা এবং বড় বোন পূর্ণিমা রায় এর কাছ থেকে নাচ শেখেন। পরে বন্দনা সেন এবং খ্যাতনাম নৃত্যশিল্পী কেলুচরণ কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছ থেকে তালিম নেন। খুব কম বয়স থেকে তিনি মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। তার "নটরাজ" নামে নিজস্ব একটি নাচের দল আছে।

চলচিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাতি[উৎস সম্পাদনা]

তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেবশ্রী রায় বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং প্রায় দুই দশকব্যাপী তিনি তার বাণিজ্যিক সাফল্য ধরে রাখেন। অভিনেত্রী হিসেবে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছেন। একাধারে কমার্শিয়াল এবং প্যারালাল ছবিতে সমান তালে অভিনয় করেছেন। নায়িকা চরিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নদী থেকে সাগরে, যেখানে তার বিপরীতে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। ১৯৮০ সালে তরুণ মজুমদার এর দাদার কীর্তি ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৮১ সালে মনু সেনের সুবর্ণগোলক ছবিতেও তিনি মহুয়া রায়চৌধুরীর ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপরেই আসে অপর্ণা সেনের কালজয়ী ৩৬ চৌরঙ্গী লেন ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ। শশী কাপুরের প্রযোজনায় এই ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু এরপরেও এই চলচ্চিত্রের সুবাদেই মুম্বাইয়ের মিডিয়া মহলে তার অভিনয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পরে।[১]

১৯৮২ সালে দেবশ্রী, গৌতম মুখোপাধ্যায়ের ত্রয়ী ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবির বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্যের হাত ধরে দেবশ্রী টালিগঞ্জের প্রথম সারিতে উঠে আসেন।[২] ১৯৮৫ সালে তিনি বিজয় সিং প্রযোজিত ও পরিচালিত কভী আজনবী থে ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবিতে দেবশ্রী অভিনীত চরিত্রটি আশা নাম্নী এক নেপথ্য গায়িকার যিনি এক ক্রিকেটারের প্রেমে পরেন। এই ছবিতে তিনি তৎকালীন ক্রিকেটার সন্দীপ পাতিলের বিপরীতে অভিনয় করেন। মুম্বায়ের মিডিয়া মহলে সেই সময় এই ছবিটিকে ঘিরে তুমুল চর্চা শুরু হয়, বিশেষত গীত মেরে হোঠোকো দে গয়া কোই গানের দৃশ্যে দেবশ্রীর অপূর্ব আবেদনশীল অভিব্যক্তি প্রচার মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি  করে। স্বাভাবিকভাবেই জনমানসেও প্রত্যাশার তুমুল পারদ চড়তে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত মুক্তির পর ছবিটি প্রত্যাশা পূরন করতে ব্যর্থ হয়। এই ছবির বাণিজ্যিক ব্যর্থতা দেবশ্রীর হিন্দি ছবির পেশায় খরা ডেকে আনে।[৩] একের পর এক হিন্দি ছবি থেকে বাদ পরে যেতে থাকেন তিনি। বাংলা ছবিতে সেই সময় মহুয়া রায়চৌধুরীর অকালমৃত্যু এক শূণ্যতার জন্ম দিয়েছে। সেই বছরেই দেবশ্রী তরুণ মজুমদারের ভালোবাসা ভালোবাসা ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবির বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য তাকে মহুয়া রায়চৌধুরীর ছেড়ে যাওয়া সিংহাসন অধিকার করতে সাহায্য করে।[৪] এই ছবি তাপস-দেবশ্রী জুটির ভিত কে শক্তিশালী করে। পরবর্তীকালে অর্পণ (১৯৮৭), শঙ্খচূড় (১৯৮৮), সুরের সাথী (১৯৮৮), সুরের আকাশে (১৯৮৮), নয়নমণি (১৯৮৯), চোখের আলোয় (১৯৮৯), শুভ কামনা (১৯৯১), মায়াবিনী (১৯৯২), ফিরে পাওয়া (১৯৯৩), তবু মনে রেখো (১৯৯৩), পুত্রবধূ (১৯৯৮)— এর মতো বাণিজ্যিক সফল ছবিতে দেবশ্রী তাপস পালের বিপরীতে অভিনয় করেন। 

১৯৮৮ সালে বালাজি রাজ চোপড়ার পরিচালনায় ভারতের বিখ্যাত পুরাণকাহিনী মহাভারত অবলম্বনে দূরদর্শন সম্প্রচারিত মহাভারত ধারাবাহিকে সত্যবতীর চরিত্রে অভিনয় করেন।

রাজনীতি[উৎস সম্পাদনা]

দেবশ্রী রায় সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস দলের বিধায়ক (এমএলএ)। ২০১১ সালে তিনি রায়দিঘি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন সিপিএম এর শক্তিশালী প্রার্থী প্রাক্তন মন্ত্রী কান্তি গাঙ্গুলির সাথে এবং জয়ী হন।

ব্যাক্তিগত জীবন[উৎস সম্পাদনা]

দীর্ঘদিন সম্পর্কের পর ১৯৯২ সালে তিনি বিয়ে করেন বাংলা ছবির খ্যাতিমান অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় কে।[৫] ১৯৯৫ সালে তারা আলাদা হয়ে যান। ভারতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাণী মুখার্জী সম্পর্কে তার ভাগ্নি হন।[৬]

তাঁর অভিনীত চলচিত্র [৭][উৎস সম্পাদনা]

  • অন্তরে বাহিরে (২০১২)
  • লাইফ ইন পার্ক স্ট্রীট (২০১২)
  • জীবন রং বেরং (২০১১)
  • ভাল মেয়ে মন্দ মেয়ে (২০১১)
  • শুকনো লঙ্কা (২০১০)
  • অন্তরবাস (২০১০)
  • হাদা ভোঁদা (২০১০)
  • অনুভব (২০০৯)
  • নরক গুলজার (২০০৯)
  • পাখি(২০০৯)
  • মহাগুরু(২০০৭)
  • টাইগার (২০০৭)
  • এমএলএ ফাটাকেস্টো (২০০৬)
  • অভিমন্যু (২০০৬)
  • তিস্তা (২০০৫)
  • যুদ্ধ (২০০৫)
  • অবৈধ (২০০২)
  • অন্তর্ঘাত (২০০২)
  • দেখা(২০০১)
  • এক যে আছে কন্যা (২০০০)
  • চাকা (২০০০)
  • জয় মা দুর্গা (২০০০)
  • অসুখ (১৯৯৯)
  • স্বামী বিবেকান্দ (১৯৯৮)
  • আজব গাঁয়ের আজব কথা (১৯৯৮)
  • বেয়াদপ (১৯৯৬)
  • লাঠি (১৯৯৫)
  • উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪)
  • মায়াবিনী (১৯৯২)
  • মমতা কি ছাওন মেইন (১৯৯০)-হিন্দি
  • অপরাহ্ণের আলো (১৯৮৯)
  • ঝঙ্কার (১৯৮৯)
  • মানাইভি রেডি (১৯৮৬)- তামিল
  • জীবন (১৯৮৬)
  • কাভি আজনাবি থি (১৯৮৫)- হিন্দি
  • ভালবাসা ভালবাসা (১৯৮৫)
  • ফুলওয়ারি (১৯৮৪)-হিন্দি
  • বিষবৃক্ষ (১৯৮৩)
  • ত্রয়ী (১৯৮২)
  • ৩৬ চৌরঙ্গী লেন (১৯৮১)-ইংলিশ
  • জিও তো অ্যায়সা জিও-হিন্দি
  • দাদার কীর্তি (১৯৮০)
  • কুহেলি(১৯৭১)

পুরস্কার[উৎস সম্পাদনা]

  • জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার -১৯৯৬ [৮]

তথ্যসূত্র[উৎস সম্পাদনা]

  1. "Ten Most Beautiful Actrsses of Bengali Cinema" (en-US ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  2. "Ten Most Beautiful Actrsses of Bengali Cinema" (en-US ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  3. "Ten Most Beautiful Actrsses of Bengali Cinema" (en-US ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  4. "Ten Most Beautiful Actrsses of Bengali Cinema" (en-US ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  5. "Prosenjit the fighter"The Telegraph। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  6. Kantho, Kaler। "এক বার জানাল না রানি, ভোটেও অভিমানী দেবশ্রী | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho (বাংলা ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  7. http://www.gomolo.com/debashree-roy-movies-list-popular/4125
  8. http://iffi.nic.in/Dff2011/Frm42thNFAAward.aspx?PdfName=42NFA.pdf

বহিঃসংযোগ[উৎস সম্পাদনা]