দেবশ্রী রায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
দেবশ্রী রায়
স্থানীয় নাম চুমকী
জন্ম (১৯৬১-০৮-০৮) ৮ আগস্ট ১৯৬১ (বয়স ৫৬)
কলকাতা, ভারত
নাগরিকত্ব ভারতীয়
পেশা অভিনেত্রী
নৃত্যশিল্পী
বিধায়ক
যে জন্য পরিচিত বাঙালী অভিনেত্রী, রাজনৈতিক নেত্রী
উল্লেখযোগ্য কাজ বাসবদত্তা
স্বপ্নের সন্ধানে
বিচিত্র
নবরস
দাদার কীর্তি
৩৬ চৌরঙ্গী লেইন
ভালোবাসা ভালোবাসা
সম্রাট ও সুন্দরী
উনিশে এপ্রিল
কালসন্ধ্যা
অসুখ
দেখা
শিল্পান্তর
প্রহর

দেবশ্রী রায় একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী। তিনি নটরাজ দলের কর্ণধার। তিনি ভারতীয় লোকনৃত্যকে পাশ্চাত্য মঞ্চে উপস্থাপনা করেন এবং ধ্রুপদী ও লোকনৃত্যের সংমিশ্রণে এক অপূর্ব নৃত্যকৌশলী রচনা করেন। তিনি বাংলা ছায়াছবির অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী। তিনি তামিল চলচ্চিত্রে "চিন্তামণি" নামে অভিনয় করেছেন। তিনি একশোরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং পেয়েছেন চল্লিশের বেশি পুরস্কার। তিনি ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের একজন মাননীয় বিধায়ক।

প্রথম যখন ক্যামেরার সামনে দেবশ্রী আসেন, তার বয়স তখন মাত্র এগারো মাস। এরপর তরুণ মজুমদারের কুহেলী (১৯৭১) ছবিতে রাণুর চরিত্রে অভিনয় করার পরে তার পরিচিতির বিস্তার ঘটে। প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেত্রী হিসাবে তার প্রথম ছবি অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নদী থেকে সাগরে (১৯৭৮)। ১৯৮১ সালে অপর্ণা সেনের ৩৬ চৌরঙ্গী লেন ছবিতে অভিনয়ের সুবাদেই দেবশ্রী সর্বভারতীয় মুখ হিসাবে পরিচিত হন। তার অভিনীত প্রথম হিন্দি ছবি কনক মিশ্রর পরিচালনায় জিয়ো তো আয়সে জিয়ো (১৯৮১)। ১৯৮২ সালে, গৌতম মুখোপাধ্যায়ের বাংলা ছবি ত্রয়ীর বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্যের দরুণ দেবশ্রী টালিগঞ্জের প্রথম সারিতে উঠে আসেন। আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে নব্বই দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাণিজ্যিক বাংলা ছবির সর্বপ্রধান অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। পরবর্তী কালে সিনেমায় যেমন হয় (১৯৯৪), উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪), অসুখ (১৯৯৯), দেখা (২০০১), শিল্পান্তর (২০০২), প্রহর (২০০৪) - এই সব ছবিতে তার অভিনয় প্রতিভা উচ্চপ্রশংসিত হয়।

বাল্যকাল[সম্পাদনা]

দেবশ্রী রায় এর জন্ম, বেড়ে ওঠা কলকাতায়। তার পিতার নাম বীরেন্দ্র কিশোর রায় এবং মায়ের নাম আরতি রায়। ১৯৬৯ সনে তিনি প্রথম "বালক গদাধর" নামে একটি চলচিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন, যার পরিচালক ছিলেন হরিময় সেন। তিনি কলকাতার এ পি জে ,পার্ক স্ট্রীট শাখার স্কুলের ছাত্রী ছিলেন, যদিও নাচের প্রতি অত্যধিক ঝোঁক থাকার কারণে বেশিদূর এগোতে পারেন নি। তার ডাক নাম চুমকি।

নৃত্যশিল্পী হিসেবে খ্যাতি[সম্পাদনা]

দেবশ্রী রায় প্রথমে তার মা এবং বড় বোন পূর্ণিমা রায় এর কাছ থেকে নাচ শেখেন। খুব কম বয়স থেকে তিনি মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বন্দনা সেন এবং কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে ওড়িশি নৃত্যের তালিম নেন। ওড়িশির পাশাপাশি কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রভাবে ভারতীয় লোকনৃত্যের প্রতি দেবশ্রীর গভীর আসক্তি তৈরী হয়। ১৯৯১ সালে তিনি নটরাজ দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং দলের প্রথম পরিবেশনা বাসবদত্তা মঞ্চস্থ হয়।[১] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিসার কবিতা অবলম্বনে এই নৃত্যনাট্য উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।[১] নটরাজের অন্যতম প্রযোজনা স্বপ্নের সন্ধানে ছিল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের লোকনৃত্যের সমন্বয়ে এক মঞ্চ-উপস্থাপনা যা দর্শকমহলে প্রসংশিত হয়।[১] স্বপ্নের সন্ধানে-এর সাফল্যের পর দেবশ্রী আরো বড় পদক্ষেপ নেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানের লোকনৃত্যকে পাশ্চাত্যের মঞ্চে উপস্থাপন করেন। তার এই অভিনব প্রযোজনার নাম বিচিত্র যা ইউরোপীয় মহাদেশে ভূয়সী প্রসংশা অর্জন করে।[১][২][৩]

চলচিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাতি[সম্পাদনা]

তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেবশ্রী রায় বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং প্রায় দুই দশকব্যাপী তিনি তার বাণিজ্যিক সাফল্য ধরে রাখেন। অভিনেত্রী হিসেবে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছেন। একাধারে কমার্শিয়াল এবং প্যারালাল ছবিতে সমান তালে অভিনয় করেছেন। নায়িকা চরিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নদী থেকে সাগরে, যেখানে তার বিপরীতে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। ১৯৮০ সালে তরুণ মজুমদার এর দাদার কীর্তি ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৮১ সালে মনু সেনের সুবর্ণগোলক ছবিতেও তিনি মহুয়া রায়চৌধুরীর ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপরেই আসে অপর্ণা সেনের কালজয়ী ৩৬ চৌরঙ্গী লেন ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ। শশী কাপুরের প্রযোজনায় এই ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু এরপরেও এই চলচ্চিত্রের সুবাদেই মুম্বাইয়ের মিডিয়া মহলে তার অভিনয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পরে।[৪] এরপর কনক মিশ্রর পরিচালনায় জিয়ো তো আয়সে জিয়ো (১৯৮১) ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তার হিন্দি ছবির জগতে অভিষেক হয়। এই ছবির বাণিজ্যিক সাফল্যের হাত ধরে তিনি একের পর এক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করে যান।

১৯৮২ সালে দেবশ্রী, গৌতম মুখোপাধ্যায়ের ত্রয়ী ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবির বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্যের হাত ধরে দেবশ্রী টালিগঞ্জের প্রথম সারিতে উঠে আসেন।[৪] ১৯৮৫ সালে তিনি বিজয় সিং প্রযোজিত ও পরিচালিত কভী আজনবী থে ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবিতে দেবশ্রী অভিনীত চরিত্রটি আশা নাম্নী এক নেপথ্য গায়িকার যিনি এক ক্রিকেটারের প্রেমে পরেন। এই ছবিতে তিনি তৎকালীন ক্রিকেটার সন্দীপ পাতিলের বিপরীতে অভিনয় করেন। মুম্বায়ের মিডিয়া মহলে সেই সময় এই ছবিটিকে ঘিরে তুমুল চর্চা শুরু হয়, বিশেষত গীত মেরে হোঠোকো দে গয়া কোই গানের দৃশ্যে দেবশ্রীর অপূর্ব আবেদনশীল অভিব্যক্তি প্রচার মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি  করে। স্বাভাবিকভাবেই জনমানসেও প্রত্যাশার তুমুল পারদ চড়তে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত মুক্তির পর ছবিটি প্রত্যাশা পূরন করতে ব্যর্থ হয়। এই ছবির বাণিজ্যিক ব্যর্থতা দেবশ্রীর হিন্দি ছবির পেশায় খরা ডেকে আনে।[৪] একের পর এক হিন্দি ছবি থেকে বাদ পরে যেতে থাকেন তিনি। বাংলা ছবিতে সেই সময় মহুয়া রায়চৌধুরীর অকালমৃত্যু এক শূণ্যতার জন্ম দিয়েছে। সেই বছরেই দেবশ্রী তরুণ মজুমদারের ভালোবাসা ভালোবাসা ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবির বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য তাকে মহুয়া রায়চৌধুরীর ছেড়ে যাওয়া সিংহাসন অধিকার করতে সাহায্য করে।[৪] এই ছবি তাপস-দেবশ্রী জুটির ভিত কে শক্তিশালী করে। পরবর্তীকালে অর্পণ (১৯৮৭), শঙ্খচূড় (১৯৮৮), সুরের সাথী (১৯৮৮), সুরের আকাশে (১৯৮৮), নয়নমণি (১৯৮৯), চোখের আলোয় (১৯৮৯), শুভ কামনা (১৯৯১), মায়াবিনী (১৯৯২), ফিরে পাওয়া (১৯৯৩), তবু মনে রেখো (১৯৯৩), পুত্রবধূ (১৯৯৮)— এর মতো বাণিজ্যিক সফল ছবিতে দেবশ্রী তাপস পালের বিপরীতে অভিনয় করেন।[৩]

১৯৮৮ সালে বালাজি রাজ চোপড়ার পরিচালনায় ভারতের বিখ্যাত পুরাণকাহিনী মহাভারত অবলম্বনে দূরদর্শন সম্প্রচারিত মহাভারত ধারাবাহিকে সত্যবতীর চরিত্রে অভিনয় করেন।

রাজনীতি[সম্পাদনা]

দেবশ্রী রায় সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস দলের বিধায়ক (এমএলএ)। ২০১১ সালে তিনি রায়দিঘি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন সিপিএম এর শক্তিশালী প্রার্থী প্রাক্তন মন্ত্রী কান্তি গাঙ্গুলির সাথে এবং জয়ী হন।

ব্যাক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

দীর্ঘদিন সম্পর্কের পর ১৯৯২ সালে তিনি বিয়ে করেন বাংলা ছবির খ্যাতিমান অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় কে।[৫] ১৯৯৫ সালে তারা আলাদা হয়ে যান। ভারতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাণী মুখার্জী সম্পর্কে তার ভাগ্নি হন।[৬][৭]

তাঁর অভিনীত চলচিত্র [৮][সম্পাদনা]

  • অন্তরে বাহিরে (২০১২)
  • লাইফ ইন পার্ক স্ট্রীট (২০১২)
  • জীবন রং বেরং (২০১১)
  • ভাল মেয়ে মন্দ মেয়ে (২০১১)
  • শুকনো লঙ্কা (২০১০)
  • অন্তরবাস (২০১০)
  • হাদা ভোঁদা (২০১০)
  • অনুভব (২০০৯)
  • নরক গুলজার (২০০৯)
  • পাখি(২০০৯)
  • মহাগুরু(২০০৭)
  • টাইগার (২০০৭)
  • এমএলএ ফাটাকেস্টো (২০০৬)
  • অভিমন্যু (২০০৬)
  • তিস্তা (২০০৫)
  • যুদ্ধ (২০০৫)
  • অবৈধ (২০০২)
  • অন্তর্ঘাত (২০০২)
  • দেখা(২০০১)
  • এক যে আছে কন্যা (২০০০)
  • চাকা (২০০০)
  • জয় মা দুর্গা (২০০০)
  • অসুখ (১৯৯৯)
  • স্বামী বিবেকান্দ (১৯৯৮)
  • আজব গাঁয়ের আজব কথা (১৯৯৮)
  • বেয়াদপ (১৯৯৬)
  • লাঠি (১৯৯৫)
  • উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪)
  • মায়াবিনী (১৯৯২)
  • মমতা কি ছাওন মেইন (১৯৯০)-হিন্দি
  • অপরাহ্ণের আলো (১৯৮৯)
  • ঝঙ্কার (১৯৮৯)
  • মানাইভি রেডি (১৯৮৬)- তামিল
  • জীবন (১৯৮৬)
  • কাভি আজনাবি থি (১৯৮৫)- হিন্দি
  • ভালবাসা ভালবাসা (১৯৮৫)
  • ফুলওয়ারি (১৯৮৪)-হিন্দি
  • বিষবৃক্ষ (১৯৮৩)
  • ত্রয়ী (১৯৮২)
  • ৩৬ চৌরঙ্গী লেন (১৯৮১)-ইংলিশ
  • জিও তো অ্যায়সা জিও-হিন্দি
  • দাদার কীর্তি (১৯৮০)
  • কুহেলি(১৯৭১)

পুরস্কার[সম্পাদনা]

  • জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার -১৯৯৬ [৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Lesser Known Facts about Debasree Roy" (en-US ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৮-০১-০১ 
  2. "Nataraj Group"। সংগৃহীত ২০১৮-০১-০১ 
  3. "Rediff On The NeT, Movies: Debasree Roy profile"। সংগৃহীত ২০১৮-০১-০১ 
  4. "Ten Most Beautiful Actrsses of Bengali Cinema" (en-US ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  5. "Prosenjit the fighter"The Telegraph। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  6. Kantho, Kaler। "এক বার জানাল না রানি, ভোটেও অভিমানী দেবশ্রী | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho (বাংলা ভাষায়)। সংগৃহীত ২০১৭-০৩-২৩ 
  7. "আনন্দবাজার পত্রিকা - মুখোমুখি"। সংগৃহীত ২০১৭-০৭-৩০ 
  8. http://www.gomolo.com/debashree-roy-movies-list-popular/4125
  9. http://iffi.nic.in/Dff2011/Frm42thNFAAward.aspx?PdfName=42NFA.pdf

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]