জাপান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(জাপানের ভাষা থেকে ঘুরে এসেছে)
日本国
নিপ্পন্-ককু বা নিহন্-ককু
জাপান
পতাকা ইম্পেরিয়াল সীল
জাতীয় সঙ্গীত
কিমি গা ইয়ো  (君が代)
সাম্রাজ্যের রাজত্ব

জাপান সরকারের সীল
  • জাপানসরকারের সীল
রাজধানী
(ও বৃহত্তম নগরী)
তৌক্যৌ (টোকিও)
৩৫°৪১′ উত্তর ১৩৯°৪৬′ পূর্ব / ৩৫.৬৮৩° উত্তর ১৩৯.৭৬৭° পূর্ব / 35.683; 139.767
রাষ্ট্রীয় ভাষাসমূহ জাপানি
সরকার সাংবিধানিক রাজতন্ত্র
 -  সম্রাট আকিহিতো
 -  প্রধানমন্ত্রী শিনযো আবে (LDP)
গঠন
 -  জাতীয় ভিত্তি দিন ফেব্রুয়ারি ১১, ৬৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ 
 -  মেইজি সংবিধান নভেম্বর ২৯ ১৮৯০ 
 -  বর্তমান সংবিধান মে ৩ ১৯৪৭ 
 -  সান ফ্রান্সিস্কো চুক্তি এপ্রিল ২৮ ১৯৫২ 
আয়তন
 -  মোট ৩৭৭,৮৭৩ বর্গকিমি (৬২তম)
 বর্গমাইল 
 -  জলভাগ (%) ০.৮
জনসংখ্যা
 -  ২০০৭ আনুমানিক ১২৭,৪৩৩,৪৯৪ (১০ম)
 -  ২০০৪ আদমশুমারি ১২৭,৩৩৩,০০২ 
 -  ঘনত্ব ৩৩৭ /বর্গ কিমি (৩০তম)
 /বর্গমাইল
জিডিপি (পিপিপি) ২০০৬ আনুমানিক
 -  মোট $৪.২২০ ট্রিলিয়ন (৩য়)
 -  মাথাপিছু $৩৩,১০০ (১২তম)
জিডিপি (নামমাত্র) ২০০৬ আনুমানিক
 -  মোট $৪.৯১১ ট্রিলিয়ন (২য়)
 -  মাথাপিছু $৩৮,৩৪১ (১৪তম)
এইচডিআই (২০১৪) বৃদ্ধি ০.৮৯০ (অতিউচ্চ) (১৭)
মুদ্রা এন (ইয়েন) (¥/円) (JPY)
সময় স্থান জাপান মান সময় (ইউটিসি+৯)
 -  গ্রীষ্মকালীন (ডিএসটি) পর্যবেক্ষণ করা হয়নি (ইউটিসি)
ইন্টারনেট টিএলডি .jp
কলিং কোড +৮১

জাপান (জাপানি: 日本 নিপ্পন) এশিয়া মহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। দেশটি এশিয়া মহাদেশের পূর্ব উপকূলের কাছে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ দ্বীপ নিয়ে জাপান গঠিত। চারটি প্রধান দ্বীপ হল হনশু, হোক্কাইদো, কিয়ুশু এবং শিকোকু। এছাড়াও এখানে আরও অনেক ছোট ছোট দ্বীপ আছে। জাপানিরা জাপানি ভাষায় তাদের দেশকে নিহোং বা নিপ্পোং বলে ডাকে, যার অর্থ "সূর্যের উৎস"। জাপান চীনা সাম্রাজ্যগুলির পূর্বে অবস্থিত বলে এরকম নাম করা হয়েছিল। ইংরেজিতে জাপানকে অনেক সময় "land of the rising sun" অর্থাৎ সূর্যোদয়ের দেশ বলা হয়। টোকিও (জাপানি: 東京 তৌক্যৌ) জাপানের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

এশিয়ার মূল ভূখন্ডের মধ্যে কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের সবচেয়ে কাছে, মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে, অবস্থিত। অন্য কোন দেশের সাথে জাপানের স্থলসীমান্ত নেই। কাছেই রয়েছে পূর্ব রাশিয়া, যা ওখটস্ক সাগর ও জাপান সাগরের অপর পারে অবস্থিত। দক্ষিণ কোরিয়াউত্তর কোরিয়া কোরিয়া প্রণালী ও জাপান সাগরের অপর পারে এবং দক্ষিণ-পূর্বে পূর্ব চীন সাগরের অপর প্রান্তে তাইওয়ানচীনা মূল ভূখণ্ড অবস্থিত।

জাপানের ভূ-প্রকৃতি পর্বতময়। দেশটির ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকাই পাহাড়ি। ঐতিহাসিকভাবে এই পর্বতগুলি জাপানের অভ্যন্তরে পরিবহনে বাধার সৃষ্টি করেছিল, জাতীয় ঐক্য ব্যহত করেছিল এবং অর্থনৈতিক উন্নতি বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন এলাকাতে সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল। তবে আধুনিক যুগে সুড়ঙ্গ, সেতু এবং বিমান পরিবহনের আবির্ভাবের ফলে পর্বতগুলি এখন আর তেমন বড় বাধা নয়। জাপানিরা বহুদিন ধরেই শিল্পে ও সাহিত্যে তাদের পর্বতগুলির সৌন্দর্যের স্তুতি গেয়ে এসেছে। বর্তমানে অনেক পার্বত্য এলাকাই জাতীয় উদ্যান আকারে সংরক্ষিত।

জাপানের বেশির ভাগ মানুষ নদীসমূহের নিম্ন অববাহিকার সমভূমি ও নিম্নভূমিতে, বা পাহাড়ের একেবারে পাদদেশের ঢালগুলিতে, কিংবা সমুদ্রের তীরে বাস করে। জাপান বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। টোকিও ও কোবে নগরীর মধ্যবর্তী নগর এলাকাটিতে জনঘনত্ব অত্যন্ত উচ্চ। জাপানের ১৭% ভূমিবিশিষ্ট এই এলাকাটিতে জাপানের মোট জনসংখ্যার ৪৫% বসবাস করেন। জাতিগতভাবে ও সংস্কৃতিগতভাবে সমগ্র জাপানে প্রায় একই ধরনের লোকের বাস। জাপানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা খুবই কম। জাপানি ভাষাই প্রধান ভাষা। বৌদ্ধ ধর্ম ও জাপানের নিজস্ব শিন্তো ধর্ম এখানকার প্রধান ধর্ম।

জাপান বিশ্বের বুকে একটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। এখানকার মানুষের গড় আয় ও জীবনযাত্রার মান বিশ্বের সর্বোচ্চগুলির একটি। অত্যন্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত উচ্চ মানের ভোগদ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে দেশটির অর্থনীতি সফলতা লাভ করেছে। জাপানে উৎপাদিত দ্রব্যের মধ্যে বিভিন্ন জাপানি ব্র‌্যান্ডের মোটরযান, ক্যামেরা, কম্পিউটার, টেলিভিশন এবং সাউন্ড সিস্টেম বিশ্বখ্যাত।

জাপানে ৭ম শতক থেকে একজন সম্রাট শাসন করে আসছেন। ১২শ শতকে শোগুন নামের সামরিক শাসকদের উদ্ভব ঘটে। শোগুনেরা ছয় শতকেরও বেশি সময় ধরে সম্রাটের সাথে ক্ষমতার অংশীদার ছিল। ১৭শ শতকের শুরুতে একটি শক্তিশালী সামরিক সরকার প্রায় সব বিদেশীর জন্য দেশটির সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। ১৯শ শতকে জাপান একটি সমৃদ্ধিশালী অর্থনীতি নিয়ে প্রবেশ করলেও প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে ছিল।

মধ্য-১৯শ শতকে জাপানের সাথে বাণিজ্য করতে আগ্রহী পশ্চিমা দেশগুলির চাপে জাপানের শোগুনদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং সম্রাটকে ক্ষমতায় বসানো হয়। ১৯শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মেইজি রাজবংশের সম্রাটদের অধীনে জাপান দ্রুত আধুনিকায়ন ও শিল্পায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। একই সাথে কোরিয়া, চীন এবং এশিয়ার অন্যান্য অংশে জাপানি সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান অক্ষশক্তিদের পক্ষে যুদ্ধ করে। জাপানের পরাজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং এতে দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানা, পরিবহন নেটওয়ার্ক, এবং নাগরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে জাপান তার উপনিবেশগুলিও হারায়। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিকভাবে জাপান দখল করে এবং এর সরকার পরিচালনা করে। সংশোধিত সংবিধান অনুসারে সম্রাটকে আলংকারিক রাষ্ট্রপ্রধান বানানো হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী এই পর্বে জাপান অত্যন্ত দ্রুত ধ্বসে পড়া অর্থনীতি ও সমাজ আবার গড়ে তোলে। ১৯৭০-এর দশকে মাঝামাঝি নাগাদ দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরও বহু দেশের সাথে অর্থকরী বাণিজ্যে লিপ্ত হয়। এভাবে আবার বিশ্বের বুকে একটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জাপানের পুনরুত্থান ঘটে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

রাজনীতি[সম্পাদনা]

জাপানে একটি সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা বিরাজমান। জাপানের সম্রাট প্রতীকী রাষ্ট্রপ্রধান। জাপানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্থানীয় সরকারগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আছে। তবে জাপানের ৪৭টি জেলা এবং কয়েক হাজার বড় শহর, ছোট শহর গ্রামের স্থানীয় সরকারগুলি স্থানীয় বিষয়গুলির ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষমতা আছে।

প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ[সম্পাদনা]

ভূগোল[সম্পাদনা]

জাপান একটি দ্বীপময় দেশ। দেশটি এশিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে প্রসারিত হয়েছে। উত্তর থেকে দক্ষিণে চারটি মূল দ্বীপের নাম যথাক্রমে হোক্কাইদো, হনশু, শিকোকু এবং কিয়ুশু। কিয়ুশুর ৩৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ওকিনাওয়া দ্বীপ অবস্থিত। এছাড়াও দ্বীপপুঞ্জটিতে আরও প্রায় ৩০০০ ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে। জাপানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা পর্বতময়। প্রতিটি প্রধান দ্বীপের মধ্য দিয়ে একটি পর্বতশ্রেণী চলে গেছে। বিশ্বখ্যাত ফুজি পর্বত জাপানের সর্বোচ্চ পর্বত। জাপানের সমতল ভূমি খুব কম বলে অনেক পাহাড়-পর্বতের গায়েই একেবারে চূড়া পর্যন্ত চাষবাস করা হয়। জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ভূমিকম্প এলাকাতে অবস্থিত বলে দ্বীপগুলিতে প্রায়শই নিম্ন আকারের ভূকম্পন অনুভূত হয় এবং আগ্নেয় তৎপরতা দেখতে পাওয়া যায়। প্রতি শতকেই বেশ কয়েকবার বড় আকারের ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প ঘটে থাকে। জাপানে প্রচুর উষ্ণ প্রস্রবণ আছে এবং এগুলিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

জাপানের জলবায়ু অবস্থানভেদে বেশ ভিন্ন। হোক্কাইদো দ্বীপের সাপ্পোরোতে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ এবং শীতকাল দীর্ঘ ও বরফময়। কিন্তু হনশু দ্বীপের মধ্য ও পশ্চিমভাগে অবস্থিত তোকিও, নাগয়া, কিয়োতো, ওসাকা এবং কোবে শহরের শীতকাল বেশ মৃদু এবং বরফ পড়ে না বললেই চলে। কিয়ুশু দ্বীপে শীতকাল মৃদু এবং গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয়। ওকিনাওয়া দ্বীপের জলবায়ু উপ-ক্রান্তীয় ধরনের।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

জাপান একটি শিল্পোন্নত দেশ যার বাজারভিত্তিক অর্থনীতি বিশ্বের ২য় বৃহত্তম অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক খাতগুলি অত্যন্ত দক্ষ ও প্রতিযোগিতাশীল। তবে সুরক্ষিত খাত যেমন কৃষি, বিতরণ এবং বিভিন্ন সেবাতে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে কম। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত জাপান বিশ্বের সবচেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিশীল দেশগুলির একটি ছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে এসে "বুদ্বুদ অর্থনীতিতে" ধ্বস নামলে জাপানের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে ধীর হয়ে পড়ে। স্টক এবং রিয়েল এস্টেটের দাম অনেক পড়ে যায়।

শিল্পনেতা, কারিগর, সুশিক্ষিত ও পরিশ্রমী কর্মী বাহিনী, উচ্চ মাত্রায় সঞ্চয়ের প্রবণতা, উচ্চ বিনিয়োগ হার, শিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্য উন্নয়নের জন্য সরকারের জোরালো সমর্থন --- এ সব কিছু মিলে জাপান একতি পরিণত শিল্পোন্নত অর্থনীতি। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ খুব কম। কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে জাপান যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, তা অর্থনীতির জন্য কাঁচামাল ক্রয়ে ব্যবহার করা হয়।

জাপানের অর্থনীতি ভবিষ্যতে ভাল থাকার সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৯০-এর দশকে এসে প্রথমবারের মত জাপান অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্থবির একটি পর্যায়ে প্রবেশ করে, যে সময় প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে গড়ে মাত্র ১%। ২০০০ সালের পর থেকে এর কিছুটা উন্নতি হওয়া শুরু হয়েছে। ২০০৭ সালে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২%-এর কিছু বেশি।

জাপানের মাত্র ১৫% ভূমি আবাদযোগ্য। কৃষিখাত সরকার থেকে প্রচুর ভর্তুকি পায়। প্রতি হেক্টর জমিতে জাপানের কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বিশ্বের সর্বোচ্চগুলির একটি। জাপান তার নিজের কৃষিজমি ব্যবহার করে কৃষিতে প্রায় ৪০% স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এর মধ্যে ধানের উৎপাদন দেশের চাহিদা মিটিয়ে খানিকটা উদ্বৃত্ত থেকে যায়। কিন্তু গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ইত্যাদি বিপুল পরিমাণে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এগুলি আসে। জাপান তাই মার্কিন কৃষি রপ্তানির প্রধানতম বাজার।

জ্বালানিশক্তির জন্য জাপান বিদেশের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ১৯৭০-এর তেল সংকটের পর থেকে জাপান পেট্রোলিয়ামের পরিবর্তে শক্তির অন্য উৎস ব্যবহারের পদক্ষেপ নিয়েছে। বর্তমানে জাপানের মাত্র অর্ধেক পরিমাণ শক্তি পেট্রোলিয়ামজাত তেল থেকে আসে। অন্য জ্বালানির মধ্যে আছে কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, নিউক্লীয় শক্তি, এবং জলবিদ্যুৎ। বর্তমানে জাপান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তি-সাশ্রয়ী উন্নত অর্থনীতিগুলির একটি।

জাপানে সোনা, ম্যাগনেসিয়াম ও রূপার মজুদ দেশের বর্তমান শিল্প চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু জাপান আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত অনেক খনিজের জন্য জাপান বিদেশের উপর নির্ভরশীল। লোহার আকরিক, কোক কয়লা, তামা, বক্সাইট এবং বহু বনজ দ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

জাপানের শ্রমিকসংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৭০ লক্ষ। এদের মধ্যে ৪০%-ই নারী। প্রায় ১ কোটি শ্রমিক কোন না কোন শ্রমিক সঙ্ঘের সাথে জড়িত।

যানবাহন[সম্পাদনা]

টোকিও স্টেশনে শিনকানসেন, জাপানের দ্রুততম এবং বিশ্বের অন্যতম দ্রুত ট্রেন।

জাপানের পরিবহন ব্যবস্থা অত্যাধুনিক এবং পরিবহন অবকাঠামো ব্যয়বহুল। জাপানে সড়ক নির্মাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়।[১] সমগ্র দেশব্যাপী বিস্তৃত ১.২ মিলিয়ন কিলোমিটারের পাকারাস্তা জাপানের প্রধান পরিবহন ব্যবস্থা।[২] জাপানেরবামহাতি ট্রাফিক পদ্ধতি প্রচলিত। বড় শহরে যাতায়াতের জন্য নির্মিত সড়কসমূহ ব্যবহারের জন্য সাধারণত টোল নেয়া হয়।

জাপানে বেশ কয়েকটি রেলওয়ে কোম্পানি রয়েছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগীতা বিদ্যমান। এসব রেল কোম্পানির মধ্যে জাপান রেলওয়েস গ্রুপ, কিনটেটসু কর্পোড়েশন, সেইবু রেলওয়ে, কেইও কর্পোরেশন উল্লেখযোগ্য। এসব কোম্পানি রেল পরিবহনকে আকর্ষণীয় করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে; যেমন- রেল স্টেশনে খুচরা দোকান স্থাপন। প্রায় ২৫০ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত শিনকানসেন জাপানের প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করেছে। এছাড়া অন্যান্য রেল কোম্পানিও সময়ানুবর্তিতার জন্য সুপরিচিত।

জাপানে ১৭৩টি বিমানবন্দর রয়েছে। সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হল হানেদা বিমানবন্দর, এটি এশিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমানবন্দর। জাপানের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলনারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অন্যান্য বড় বিমানবন্দরের মধ্যে রয়েছে কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শুবু সেন্ট্রেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। জাপানের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দর হলনাগোয়া বন্দর

জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

১৯৫০ সালের পর থেকে জাপানের জন্ম ও মৃত্যহার

২০০৮ সালে জাপানের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ[৩], ফলে জাপান বিশ্বের ১০ম জনবহুল দেশ। ১৯শ শতকের শেষ দিকে এবং ২০শ শতকের শুরুর দিকে জাপানে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। তবে সম্প্রতি জন্মহারের পতন এবং বিদেশ থেকে নীট অভিবাসন মোটামুটি শূন্যের কোঠায় হওয়াতে অতি সম্প্রতি, ২০০৫ সাল থেকে, জাপানের জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। জাপানের জনগণ জাতিগতভাবে একই রকম, এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি এবং গড় আয়ু ৮১ বছরের কিছু বেশি, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চগুলির একটি।[৪] ২০২৫ সাল নাগাদ ৬৫ থেকে ৮৫ বছর বয়সবিশিষ্ট নাগরিকের অংশ ৬% থেকে ১৫%-এ উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপান মূলত একটি নগরভিত্তিক রাষ্ট্র। মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% কৃষিকাজে নিয়োজিত। বহু কৃষক কৃষিকাজের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী শরহগুলিতে অতিরিক্ত কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শহুরে জনসংখ্যার প্রায় ৮ কোটি হনশু দ্বীপের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে এবং কিয়ুশু দ্বীপের উত্তরাংশে বসবাস করে। সবচেয়ে জনবহুল শহরগুলির মধ্যে আছে টোকিও মহানগর এলাকা (জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ), ইয়োকোহামা (৩৬ লক্ষ), ওসাকা (২৬ লক্ষ), নাগয়া (২২ লক্ষ), সাপ্পোরো (১৮ লক্ষ), কিয়োতো (১৫ লক্ষ), কোবে (১৫ লক্ষ), কাওয়াসাকি (১৪ লক্ষ), ফুকুওকা (১৪ লক্ষ) এবং সাইতামা (১২ লক্ষ)। জাপানের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলিতে সরু ঘিঞ্জি রাস্তা, জনাকীর্ণতা, বায়ু দূষণ এবং কিশোর অপরাধ প্রধান সমস্যা। জাপানি ভাষা জাপানের সরকারী ভাষা। এই ভাষাতে জাপানের প্রায় ৯৮% লোক কথা বলেন। এছাড়াও জাপানে স্বল্পসংখ্যক লোক (প্রায় ৭ লক্ষ) কোরীয় ভাষাতে কথা বলেন। জাপানের অধীনস্থ রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জে রিউকিউয়ান ভাষাসমূহ প্রচলিত; এগুলিতে প্রায় ৯ লক্ষ লোক কথা বলেন।

সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

জাপানিরা অনবরত বিদেশি সংস্কৃতি গ্রহণ করে, সেই সংগে জন্মায় তাদের নিজেদের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। খ্রিস্ট-পূর্ব চতুর্থ শতাব্দি থেকে খ্রিস্ট-পূর্ব নবম শতাব্দি পর্যন্ত খেয়ার মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার সংস্কৃতি জাপানে প্রবেশ করে। পরে সুই রাজবংশ ও থাং রাজবংশের ফলে চীনা সংস্কৃতি জাপানে প্রবেশ করে। এরপর দশম শতাব্দিতে জাপান ও অন্যান্য পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের সাথে যোগাযোগ কম হওয়ার কারণে জাপানে আসে তাদের নিজস্ব স্টাইলের সংস্কৃতি। ষোড়শ শতাব্দির মধ্যভাগে ইউরোপের সংস্কৃতি জাপানে প্রবেশ করে তাদের সংস্কৃতির বিরাট পতন ঘটিয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দির পরে এডো যুগে পুণরায় আস্তে আস্তে জাপানের সংস্কৃতির উন্নয়ন হতে শুরু করে। মেইজি যুগে জাপানে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রবেশ করে জাপানের সংস্কৃতির বিরাট পরিবর্তন আসে। যেমন: ক্রীড়া, চলচ্চিত্র ইত্যাদি। কিন্তু ১৯২০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর মার্কিন সংস্কৃতির প্রভাবে জাপানিদের সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এতে করে জাপানিদের নিজস্ব প্রাচীন সংস্কৃতির মান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল। জাপানি অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন হয়েছে আর এর পিছনে জাপানি অ্যানিমে এবং ইলেকট্রনিক গেম্‌সের বিরাট অবদান রয়েছে কারণ জাপানি অ্যানিমে এবং ইলেকট্রনিক গেম্‌স বিদেশের বাজারে খুব ভালো চলেছে। বর্তমানে জাপানে রয়েছে ১৪টি বিশ্ব ঐতিহ্য, তারমধ্যে ১১টি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অবশিষ্ট ৩টি হচ্ছে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।[৫]

ধর্ম[সম্পাদনা]

জাপানের তোশোদাইজির বৌদ্ধ মন্দির

জাপানের প্রধান দুইটি ধর্ম হলো শিন্তো ধর্মবৌদ্ধ ধর্ম। প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের প্রাচীন উপাসনার বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী শিন্তো ধর্মের ভিত্তি। শিন্তো ধর্মে মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে কিছু বলা নেই বলে বৌদ্ধ ধর্ম ও শিন্তো ধর্ম বহু যুগ ধরে জাপানে সহাবস্থান করেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিন্তো উপাসনালয় এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলি প্রশাসনিকভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানেও বহু জাপানি দুই ধর্মই সমানভাবে অনুসরণ করে। শিন্তো ধর্ম ১৬শ থেকে ১৯শ শতকে বিস্তার লাভ করে।

মেইজি পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় জাপানি নেতারা শিন্তো ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এটিকে সরকারীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে জাপানিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমী অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ব্যবহার করেন। জাপানের সম্রাটকে ইশ্বরের অবতার মনে করা হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিন্তো ধর্মের জন্য সরকারী পৃষ্ঠপোষোকতা বন্ধ হয়ে যায় এবং সম্রাট দেবত্ব বিসর্জন দেন। বর্তমান জাপানিদের জীবনে শিন্তো ধর্মের কোন কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেই। স্বল্প সংখ্যক অনুসারী বিভিন্ন শিন্তো উপাসনালয়গুলিতে যান। ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় উপাসনালয়গুলিতে অনেক পর্যটকেরাও বেড়াতে আসেন। এগুলিতে বহু বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় এবং জন্মের পর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিশুদের এখানে নিয়ে আসা হয়। প্রতি বছর এগুলিকে কেন্দ্র করে অনেক উৎসব হয়। জাপানের অনেক বাসাতে শিন্তো দেবদেবীদের পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত একটি তাক বা স্থান থাকে।

৬ষ্ঠ শতকে জাপানে প্রথম বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন হয় এবং এর পরের প্রায় ১০ শতক ধরে এটি জাপানের বুদ্ধিবৃত্তিক, শৈল্পিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। জাপানের বেশির ভাগ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দায়িত্বে থাকেন বৌদ্ধ পুরোহিতেরা। বহু জাপানি পূর্বপুরুষদের স্মরণে বৌদ্ধ মন্দিরে যায়।

৬ষ্ঠ ও ৯ম শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীন থেকে কনফুসিয়াসবাদের আগমন ঘটে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের তুলনায় এর গুরুত্ব ছিল কম। ১৯শ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত এটি জাপানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিরাজমান ছিল এবং আজও জাপানি চিন্তাধারা ও মূল্যবোধে কনফুসিয়াসের দর্শনের বড় প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

১৫৪৯ সালে জাপানে খ্রিস্টধর্মের আগমন ঘটে এবং এক শতাব্দী পরে এটিকে সরকার নিষিদ্ধ করে দেন। পরে ১৯শ শতকের শেষভাগে এসে এটি আবার জাপানে উপস্থাপিত হয় এবং খুব ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে। বর্তমানে জাপানে প্রায় ৩০ লক্ষ খ্রিস্টান বাস করে।

বর্তমানে অনেক জাপানি বেশ কিছু নতুন নতুন ধর্মের বা বিশ্বাস ব্যবস্থার অনুসারী হওয়া শুরু করেছে, যেগুলি শিন্তো, বৌদ্ধধর্ম, স্থানীয় কুসংস্কার থেকে ধারণা ধার নিয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের সামাজিক চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠেছে। এরকম নতুন ধর্মের সংখ্যা কয়েকশ'র মত। এগুলি সব মিলিয়ে কোটি কোটি জাপানি অনুসরণ করে থাকে।

ক্রীড়া[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Japan's Road to Deep Deficit Is Paved With Public Works, Times in 1997
  2. Chapter 9 Transport, Statistical Handbook of Japan
  3. [১] Japan Statistics Bureau, accessed 26 October 2008. According to this source, the final estimate for May 1, 2008 was 127,662,000 and the provisional estimates for October 1, 2008 was 127,771,000
  4. CIA - The World Factbook - Rank Order- Life expectancy at birth
  5. The Anime Biz - By Ian Rowley, with Hiroko Tashiro, Chester Dawson, and Moon Ihlwan, BusinessWeek, June 27 2005.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]