ব্রাজিল
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ব্রাজিল (পর্তুগিজ ভাষায়: Brasil ব্রাজ়িউ, আ-ধ্ব-ব: [bɾa'ziw]) দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং সারা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও জনবহুল রাষ্ট্র। ব্রাজিলের সরকারী নাম ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র (পর্তুগিজ ভাষায় হেপুব্লিকা ফ়েদেরাচিভ়া দু ব্রাজ়িউ, আ-ধ্ব-ব [he'publikɐ fedeɾa'tʃivɐ du bɾa'ziw])। ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় অর্ধেক এলাকা জুড়ে এবং বিষুবরেখার উত্তর থেকে মকরক্রান্তির দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। সাঁউ পাউলু ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর এবং ব্রাসিলিয়া দেশটির রাজধানী।
বিশাল এই দেশটি ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে পূর্ণ। রিউ দি জানেইরু-তে আছে গম্বুজ আকৃতির পাঁউ দি আসুকার পর্বত। দক্ষিণে আছে অসাধারণ ইগুয়াসু জলপ্রপাত। দক্ষিণ-পূর্বের মিনাশ গেরাইশ রাজ্যে আছে অদ্ভূত চুনাপাথরীয় ভূমিরূপ। দেশটিকে মূলত দুইটি প্রধান ভৌগলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়---উত্তরে আমাজন নদীর উপত্যকায় অবস্থিত ঘন আমাজন অরণ্য এবং দক্ষিণের উন্মুক্ত ব্রাজিলীয় উচ্চভূমি। ব্রাজিলের জলবায়ু মূলত ক্রান্তীয়, তবে বিষুবরেখা থেকে দূরে বা উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত এলাকাগুলির জলবায়ু তুলনামূলকভাবে মৃদু। আমাজনের অতিবৃষ্টি অরণ্য ছাড়াও এখানে পাইন অরণ্য, সাভানা তৃণভূমি ও অর্ধ-ঊষর ঝোপঝাড়ে আবৃত ভূমির দেখা মেলে। বনগুলি থেকে প্রচুর কাঠ আহরণ করা হয়। কৃষিতে নানা জাতের শস্য চাষ করা হয়, তবে এদের মধ্যে ক্রান্তীয় শস্য যেমন কফি ও চিনি প্রধান। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পরিবেশবাদীরা আমাজন অরণ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নতুন মনুষ্য বসতির বিস্তার বিশ্বের বৃহত্তম এই অতিবৃষ্টি অরণ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ব্রাজিলে বিভিন্ন জাতের লোকের বাস। আদিবাসী আমেরিকান, পর্তুগিজ বসতিস্থাপক এবং আফ্রিকান দাসদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক ব্রাজিলের জাতিসত্তাকে দিয়েছে বহুমুখী রূপ। ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র দেশ যেখানে পর্তুগিজেরা বসতি স্থাপন করে। ১৬শ শতকে পর্তুগিজদের আগমনের আগে বহু আদিবাসী আমেরিকান দেশটির সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। ১৬শ শতকের মধ্যভাগে পর্তুগিজেরা কৃষিকাজের জন্য আফ্রিকা থেকে দাস আমদানি করা শুরু করে। এই তিন জাতির লোকেদের মিশ্রণ এবং ১৮৫০-এর পরে ব্রাজিলে আগমনকারী অন্যান্য ইউরোপীয় জাতির লোকেরা ব্রাজিলের সংস্কৃতি, বিশেষ করে এর স্থাপত্য ও সঙ্গীতে এমন এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য এনেছে কেবল ব্রাজিলেই যার দেখা মেলে। ব্রাজিলের মিশ্র সংস্কৃতি ছাড়াও কিছু কিছু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্রাজিলীয়, ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আগত অ-পর্তুগিজ অভিবাসী, এবং আদিবাসী আমেরিকানদের অংশবিশেষ এখনও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও রীতিনীতি ধরে রেখেছে। তবে পর্তুগিজ সংস্কৃতির প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। পর্তুগিজ এখানকার প্রধান ভাষা এবং রোমান ক্যাথলিক প্রধান ধর্ম।
ব্রাজিলের অর্থনৈতিক উন্নতির ইতিহাস বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে। একেকটি পর্যায়ে দেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত সম্পদ কাজে লাগানো হয়। প্রথমে ব্রাজিলের কাঠ ছিল দেশটির প্রধান সম্পদ। এই কাঠের নাম থেকেই দেশটির নাম ব্রাজিল এসেছে। ১৬শ শতকের মধ্যভাগে ঔপনিবেশিকেরা উত্তর-পূর্ব উপকূলের ভাল মাটি ও ক্রান্তীয় জলবায়ুর সুযোগ নিয়ে সেখানে চিনির প্ল্যান্টেশন স্থাপন করে। ১৬৯০-এর দশকে মিনাশ গেরাইশ অঞ্চলে সোনা আবিষ্কৃত হলে সেখানে জনবসতি স্থাপনের ধুম পড়ে; এই সময় দেশের অভ্যন্তরভাগে বসতি স্থাপিত হয় এবং অর্থনীতি ও জনসংখ্যার প্রধান কেন্দ্র দেশের উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অংশে স্থানান্তরিত হয়।
১৮শ শতকের শেষে সোনার মজুদ ফুরিয়ে গেলে খানিক বিরতি দিয়ে ব্রাজিলের অর্থনীতির পরবর্তী, এবং এ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শুরু হয়। ১৮শ শতকের মধ্যভাগ থেকে ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত কফি উৎপাদন ছিল ব্রাজিলের অর্থনীতির প্রধান শিল্প। বিশেষত সাঁউ পাউলু শহর এলাকায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরভাগে যাবার জন্য রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ১৯৪০-এর দশকের পর থেকে ব্রাজিলের সরকার শিল্পায়নের উপর এবং অর্থনীতির বৈচিত্র্যায়নে জোর দিয়েছে। বর্তমানে ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম শিল্পোন্নত আধুনিক রাষ্ট্র এবং এর বেশির ভাগ জনগণ শহরে বাস করে। ক্রান্তীয় শস্য এবং খনিজ পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি দ্রব্য হলেও শিল্প কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ভূমিকা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ব্রাজিলের অর্থনীতি বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম।
ব্রাজিলের একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ব্রাজিলের অতীত প্ল্যান্টেশনভিত্তিক সমাজের বৈষম্য আজও রয়ে গেছে। ধনী অভিজাতদের একটি ক্ষুদ্র শ্রেণী দেশের বেশির ভাগ ভূমি ও সম্পদের মালিক। জনসংখ্যার অধিকাংশই, বিশেষ করে গ্রামীন এলাকার লোকেরা, দরিদ্র। বড় শহরগুলির আশে পাশে কর্মসন্ধানী শহরাগত মানুষের বিরাট বস্তি গড়ে উঠেছে।
১৯৬০-এর দশকে দেশের বেশির ভাগ লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করত। কিন্তু বর্তমানে এর উল্টোটা সত্যি। ৮৩% লোকই বর্তমানে শহর এলাকায় বাস করেন। ২০০৩ সালে ব্রাজিলে প্রায় ১৫ কোটি লোক শহরে বাস করতেন।
১৫০০ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল একটি পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। ১৮২২ সালে এটি স্বাধীনতা অর্জন করে। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় অনেক শান্তিপূর্ণভাবে উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ব্রাজিলের উত্তরণ ঘটে। এসময় দেশে কোন রক্তপাত বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেনি। স্বাধীন হবার পর একজন সম্রাট ব্রাজিল শাসন করতেন। ১৮৮৮ সালে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৮৯ সালে সামরিক অফিসারেরা রক্তপাতহীন কু-এর মাধ্যমে সম্রাটকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে ব্রাজিলে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপন করেন।
১৯৩০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির জমিদারেরা দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই বছর ব্রাজিলে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে যার ফলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সামরিক স্বৈরশাসকেরা ব্রাজিল শাসন করেন। ১৯৪৫ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সালে অর্থনৈতিক সমস্যা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের রেশ ধরে আরেকটি সামরিক কু ঘটে। এই সামরিক জান্তাটি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল শাসন করে। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এই সরকার বিরোধীদের উপর বেশ নিপীড়ন চালায়। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে জান্তাটি কঠোরতা হ্রাস করে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগোতে থাকে। তখন থেকে ব্রাজিল দেশে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি স্থাপন করার প্রচেষ্টায় রত।
সূচিপত্র |
[সম্পাদনা] ইতিহাস
[সম্পাদনা] রাজনীতি
[সম্পাদনা] প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ
[সম্পাদনা] ভূগোল
দক্ষিণ আমেরিকার এক বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অবস্থিত ব্রাজিল।
[সম্পাদনা] অর্থনীতি
[সম্পাদনা] জনসংখ্যা
[সম্পাদনা] সংস্কৃতি
[সম্পাদনা] আরও দেখুন
|
|
|---|
| ইতিহাস • প্রশাসনিক অঞ্চল • ভূগোল • অর্থনীতি • রাজনীতি • সরকার ব্যবস্থা • জনসংখ্যার পরিসংখ্যান • সংস্কৃতি • পরিবহন ব্যবস্থা • পর্যটন • সামরিক বাহিনী • ভাষা • ধর্মবিশ্বাস • সংবাদপত্র • বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ • জাতীয় পতাকা • জাতীয় সঙ্গীত • শহর • শিল্পকলা |
|
|
|
|---|---|
| সার্বভৌম রাষ্ট্র | আর্জেন্টিনা • বলিভিয়া • ব্রাজিল • চিলি • কলম্বিয়া • ইকুয়েডর • গায়ানা • পানামা* • প্যারাগুয়ে • পেরু • সুরিনাম • ত্রিনিদাদ ও টোবাগো* • উরুগুয়ে • ভেনেজুয়েলা |
| অধীনস্থ এলাকা | আরুবা (নেদারল্যান্ড্স)* • ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (যুক্তরাজ্য) • ফরাসি গায়ানা • নেদারল্যান্ড্স অ্যান্টিলেস* • দক্ষিণ জর্জিয়া ও দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জ (যুক্তরাজ্য) |
| *উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, দুই মহাদেশেরই অংশ বলে ধরা হয়। | |

