ওলাইচণ্ডী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ওলাইচণ্ডী হলেন একজন হিন্দু লৌকিক দেবী। ইনি ওলাদেবী, ওলাবিবি বা বিবিমা নামেও পরিচিত। ইনি কলেরার দেবী এবং অসুর ময়ের পত্নী। বঙ্গ (অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য) অঞ্চলের অধিবাসীরা ওলাইচণ্ডীর পূজা করে। উক্ত অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বীর কাছেই এই দেবী সম্মানীয়া। সাধারণত বাংলায় তাঁর ছয় বোন বনদেবী/বনবিবি (কলেরার দেবী), আজগাইবিবি, ঝোলাইবিবিআসানবিবির সঙ্গে তাঁর পূজা হয়।[১] কোনো কোনো আধুনিক গবেষকের মতে ‘সাতবিবি’ নামে পরিচিত এই সাত দেবী আসলে হিন্দু সপ্তমাতৃকার (ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী ও অন্যান্য) রূপান্তর। তবে সপ্তমাতৃকা ও সাতবিবির মধ্যে প্রায় কোনো সাদৃশ্য নেই বললেই চলে। ভারতে সাত দেবীর পূজা যে সুপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে, তার প্রমাণ অধুনা পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশের অন্তর্গত সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদাড়ো শহরের টেরাকোটা সিলমোহরে দেখা যায়। এই সিলমোহরে সাতজন নারীকে একসঙ্গে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায়।

ওলাইচণ্ডী বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত।[১][২][৩]

দেবী[সম্পাদনা]

লোক বিশ্বাস অনুসারে, ওলাইচণ্ডী ময়াসুরের পত্নী। ময়াসুর হিন্দু পুরাণের অসুর, দানব, রাক্ষসদৈত্যদের রাজা ও স্থপতি।[১] ভক্তেরা তাঁকে কলেরার হাত থেকে ত্রাণকর্ত্রী দেবী মনে করেন। রোগ ও মহামারীতে আক্রান্ত অঞ্চলে তাঁর পূজা হয়।[১] বাংলায় কলেরাকে বলা হয় ‘ওলাওঠা’। সেই থেকেই এই দেবীর নাম ‘ওলাইচণ্ডী’।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ওলাইচণ্ডীকে লক্ষ্মীসরস্বতীর মিলিত মূর্তি মনে করে। তাঁর গায়ের রং গাঢ় হলুদ। তিনি নীল শাড়ি ও গয়না পরে থাকেন। মূর্তিতে তাঁর কোলে একটি শিশুকে দেখা যায়।[১] মুসলমানরা তাঁকে ‘ওলাবিবি’ বা ‘বিবিমা’ বলে। এই নামটি এসেছে বিবির গান আখ্যান থেকে। এই আখ্যান অনুসারে, তিনি এক কুমারী মুসলমান রাজকন্যার সন্তান। তিনি অলৌকিক উপায়ে অদৃশ্য হয়ে যান এবং পরে দেবী রূপে আবির্ভূত হন। তাঁর আবির্ভাবের কারণ ছিল তাঁর দাদামশাইয়ের (‘বাদশা’) ও রাজ্যের মন্ত্রীদের সন্তানদের আরোগ্য দান।[৩] তাঁর মাথায় থাকে মস্তকাবরণী, গলায় গলবস্ত্র ও গয়না। পায়ে তিনি নাগরার জুতো ও মাঝে মাঝে মোজা পরেন। এক হাতে তিনি একটি জাদুদণ্ড ধরে থাকেন। এই দণ্ডের মাধ্যমে তিনি তাঁর ভক্তদের রোগ দূর করেন।[১]

সামাজিক প্রভাব[সম্পাদনা]

ওলাইচণ্ডী বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, তিনি হিন্দু দিব্য জননী ধারণার সঙ্গে একেশ্বরবাদী ইসলামিক আল্লাহ্‌-ধারণার মিশ্রণ।[২] সম্ভবত ১৯শ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে কলেরার দেবী রূপে ওলাইচণ্ডীর পূজা শুরু হয়।[৪] ওলাইচণ্ডীর গুরুত্ব সাম্প্রদায়িক ও বর্ণব্যবস্থার সীমারেখাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।[১] যদিও আধুনিক যুগে কলেরার চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হয়ে পড়ায় ওলাইচণ্ডীর পূজাও সীমিত হয়ে এসেছে।[১]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Oladevi - Banglapedia
  2. Islam in Bangladesh
  3. Ralph W. Nicholas. Fruits of Worship: Practical Religion in Bengal. Page 205. Orient Longman, 2003. আইএসবিএন ৮১-৮০২৮-০০৬-৩
  4. The Cool Goddess