বেলারুশীয় ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বেলারুশীয়
беларуская мова
BGN/PCGN: byelaruskaya mova
দেশোদ্ভব বেলারুশ, পোল্যান্ড, এবং আরও ১৪টি দেশে
নৃতাত্ত্বিক Belarusians
দেশীয় ভাষাভাষী ৯.১ মিলিয়ন (২০০১)  (তারিখ হারিয়ে গিয়েছে)
ভাষা পরিবার
লিখন পদ্ধতি সিরিলীয়, লাতিন
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা
সরকারি ভাষা  বেলারুশ
 পোল্যান্ড (in Gmina Orla, Gmina Narewka, Gmina Czyże, Gmina Hajnówka and town of Hajnówka)[১]
সংখ্যালঘু ভাষায় স্বীকৃত  ইউক্রেন[২]
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেলারুশ জাতীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-১ be
আইএসও ৬৩৯-২ bel
আইএসও ৬৩৯-৩ bel
লিঙ্গুয়াস্ফেরা 53-AAA-eb < 53-AAA-e
(বিভিন্ন ধরণের:
53-AAA-eba to 53-AAA-ebg)
Belarusian lang.png
বেলারুশীয়-ভাষাভাষী বিশ্ব কিংবদন্তি: গাঢ় নীল - এলাকা, যেখানে প্রধানত বেলারুশীয় ভাষা ব্যবহৃত হয়[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বেলারুশীয় ভাষা (বেলারুশীয় ভাষায়: беларуская мова ব্‌য়েলারুস্কায়া মোভ়া) ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের স্লাভীয় শাখার পূর্ব স্লাভীয় দলের অন্তর্গত একটি ভাষা। বিয়েল অর্থ সাদা এবং রুস অর্থ রাশিয়া। ইউক্রেনীয় ভাষা ও রুশ ভাষা এই ভাষার নিকটতম প্রতিবেশী ভাষা। এথ্‌নোলগ অনুসারে বেলারুশে প্রায় ৬৭ লক্ষ লোক বেলারুশীয় ভাষায় কথা বলেন। এছাড়াও ভাষাটি রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাক্তন প্রজাতন্ত্রগুলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতে প্রচলিত। ধারণা করা হয় যে সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি লোক বেলারুশীয় ভাষায় কথা বলেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৪শ শতকের প্রারম্ভে বর্তমান বেলারুশ ও পোল্যান্ডের কিছু অংশ লিথুনিয়ার ডিউকের রাজত্বের অংশ ছিল। সেই সময়, প্রাচীন গির্জা স্লাভোনীয় ভাষার উপর ভিত্তিতে বেলারশীয় ভাষার একটি প্রাচীন রূপ গড়ে ওঠে এবং এটি ধর্মীয় রচনাবলিতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ১৫৬৯ সালে পোল্যান্ড লিথুয়ানিয়ার ডিউককে পরাস্ত করে এবং পোলীয় ভাষা অঞ্চলটির প্রধান ভাষায় পরিণত হয়। ১৬৯৬ সালে বেলারুশীয় ভাষার ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। ১৮শ শতকের শেষ দিকে যখন রুশেরা বেলারুশের দখল নেয়, তখনও বেলারুশীয় ভাষার উপর দমন অব্যাহত থাকে এবং সমগ্র বেলারুশে রুশ ভাষা প্রচলিত হয়। তবে এ সত্ত্বেও এই পর্বে কিছু বেলারুশীয় সাহিত্য প্রকাশ পেতে থাকে। ১৮শ ও ১৯শ শতকে বেলারুশীয় ভাষাকে রুশ ভাষার একটি উপভাষা হিসেবে গণ্য করা হত। আর পণ্ডিতেরা বেলারুশীয়কে পোলীয়, রুশ ও ইউক্রেনীয় ভাষার একটি মিশ্র ভাষা হিসেবে গণ্য করতেন। বেলারুশীয় ভাষার এসময় কোন সরকারী মর্যাদা ছিল না, এবং দেশটির অভিজাত শ্রেণী পোলীয় ও রুশ ভাষা ব্যবহার করতেন। তবে শীঘ্রই বেলারুশীয় ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে বিতর্ক শুরু হয়। ভাষাটির জন্য আলাদা বর্ণমালা প্রণয়ন, শিক্ষাক্ষেত্রে এটির ব্যবহার, এবং ভাষাটি থেকে রুশ ও পোলীয় শব্দ বহিস্কারের ব্যাপারে বিতর্ক চলতে থাকে। ১৯৩৩ সালে স্তালিন বিশুদ্ধ বেলারুশীয় ভাষার সমর্থকদের জাতীয়তাবাদী বলে আক্রমণ করেন।

১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত বেলারুশ প্রজাতন্ত্রে সাক্ষরতা বাড়লেও বেলারুশীয় ভাষাভাষীদের শতকরা হার কমে যায়, কেননা এসময় দেশটিতে প্রচুর রুশ লোক প্রবেশ করে এবং স্থানীয় বেলারুশীয়রা মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। বেলারুশীয় প্রকাশনার সংখ্যাও কমে যেতে থাকে এবং রুশ প্রকাশনাগুলি সেই স্থান দখল করে। এই আমলে বেলারুশীয় ভাষার রুশীকরণেরও চেষ্টা করা হয়, যাতে পোলীয় উৎসের বেলারুশীয় শব্দগুলিকে রুশ শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।

১৯৯১ সালে বেলারুশ স্বাধীনতা লাভ করলে সরকার, গণমাধ্যম ও শিক্ষাব্যবস্থায় সক্রিয়ভাবে বেলারুশীয় ভাষার ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়। বেলারুশীয় ভাষাকে নতুন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সমস্ত গির্জার নাম ও ব্যক্তিগত নাম আইন করে বেলারুশীয় করা হয়। সরকারী কর্মচারীদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ৫ বছরের মধ্যে বেলারুশীয় ভাষা শেখা শেষ করার এবং দশ বছরের মধ্যে প্রশাসন ও শিক্ষার সর্বত্র বেলারুশীয় চালু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু এই নীতিটি বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি এবং বেলারুশ সরকার ধীরে ধীরে রুশ সরকারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে ১৯৯৫ সালে রুশ ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। বর্তমানে যদিও বেলারুশের ৭৫% লোকের মাতৃভাষা বেলারুশীয় ভাষা, তা সত্ত্বেও রুশপন্থী অভিজাতেরা বেলারুশীয় ভাষার ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করছেন এবং রুশ ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছেন।

উপভাষা[সম্পাদনা]

বেলারুশ ভাষা রুশ ও ইউক্রেনীয় ভাষার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ভাষাটির উপভাষাগুলি রাশিয়া ও ইউক্রেনের সীমান্তের কাছে গিয়ে সেখানকার রুশ ও ইউক্রেনীয় ভাষার সাথে মিলে গেছে। বেলারুশীয় ভাষাকে মূলত তিনটি উপভাষা দলে ভাগ করা হয়, এবং এগুলির সবগুলিই পরস্পর বোধগম্য। এগুলি হল উত্তর-পূর্বী, দক্ষিণ-পূর্বী এবং কেন্দ্রীয় বেলারুশীয় ভাষা। কেন্দ্রীয় উপভাষাটি আদর্শ বেলারুশীয় ভাষার ভিত্তি।

ধ্বনি ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

স্বরধ্বনি[সম্পাদনা]

বেলারুশীয় ভাষায় ৫টি স্বরধ্বনিমূল আছে: /i/, /e/, /a/, /u/, এবং /o/। কেবল শ্বাসাঘাতের সময় /o/ এবং /a/-এর পার্থক্য হয়। শ্বাসাঘাতবিহীন /o/ ধ্বনি /a/ ধ্বনিতে পরিণত হয়। /i/ এবং /e/-ও কেবল শ্বাসাঘাতযুক্ত অবস্থানে আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। শ্বাসাঘাতহীন অবস্থানে /e/ ধ্বনি /i/ শ্বনিতে পরিণত হয়।

ব্যঞ্জনধ্বনি[সম্পাদনা]

বেলারুশীয় ভাষায় ৩৮টি ব্যঞ্জন ধ্বনিমূল আছে। এদের বৈশিষ্ট্যগুলি এরকম:

  • বেশির ভাগ ব্যঞ্জনধ্বনি দুই ধরনের হয়: তালব্যীভূত এবং অ-তালব্যীভূত। তালব্যীভবনে এই পার্থক্য শব্দের অর্থে পরিবর্তন সাধন করতে পারে। ব্যঞ্জনের তালব্যীভবনের সময় জিহ্বা উপরে শক্ত তালুর দিকে উঠে যায়।
  • চারটি ঘৃষ্ট ব্যঞ্জন আছে: /ts/, /dz/, /tsh/, /dzh/.
  • আরও আছে বহু যুক্তব্যঞ্জন।

শ্বাসাঘাত[সম্পাদনা]

শ্বাসাঘাত শব্দের যেকোন সিলেবলে ঘটতে পারে।

ব্যাকরণ[সম্পাদনা]

বেলারুশীয় ভাষার ব্যাকরণের সাথে রুশ ও ইউক্রেনীয় ব্যাকরণের অনেক মিল আছে।

বিশেষ্য[সম্পাদনা]

বেলারুশীয় বিশেষ্যের নিচের বৈশিষ্ট্যগুলি বিদ্যমান:

  • দুইটি বচন (একবচন ও বহুবচন), তবে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে দ্বিবচন দেখতে পাওয়া যায়।
  • তিনটি লিঙ্গ (পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং ক্লীবলিঙ্গ)
  • সাতটি কারক (কর্তা, সম্বন্ধ, সম্প্রদান, কর্ম, করণ, পূর্বসর্গীয়, এবং সম্বোধন)।
  • কর্মকারকে প্রাণীবাচক বিশেষ্যের শেষে বিশেষ বিভক্তি যুক্ত হয়।
  • বিশেষ্যের তিন ধরনের রূপভেদ।
  • কোন নির্দেশক পদ নেই। নির্দিষ্টতা-অনির্দিষ্টতা নির্দেশক সর্বনাম, পদক্রম বা সুরভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

বিশেষণ[সম্পাদনা]

বিশেষণগুলি একবচনে লিঙ্গ ও কারকভেদে রূপ পরিবর্তন করে। বহুবচনে কেবল কারকভেদে রূপভেদ হয়। বিশেষণগুলি এবং নির্দেশক ও সম্বন্ধবাচক সর্বনামগুলি বিশেষ্যের আগে বসে এবং বিশেষ্যের লিঙ্গ, বচন ও কারকের সাথে সাযুজ্য বজায় রাখে।

ক্রিয়া[সম্পাদনা]

বেলারুশীয় ক্রিয়াগুলির নিচের বৈশিষ্ট্যগুলি বিদ্যমান:

  • দুই ধরনের ক্রিয়ারূপভেদ
  • তিনটি পুরুষ
  • দুইটি বচন
  • তিনটি লিঙ্গ (কেবল অতীত কালে)
  • তিনটি কাল (বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ)
  • দুইটি প্রকার (সমাপিকা ও অসমাপিকা)
  • চারটি ভাব (নির্দেশমূলক, আদেশমূলক, সাপেক্ষ, অনুকল্পমূলক)
  • তিনটি বাচ্য (কর্তৃবাচ্য, মধ্যবাচ্য এবং কর্মবাচ্য)

ক্রিয়াগুলি কর্তার সাথে পুরুষ, বচন ও লিঙ্গে (অতীতকালে) সাযুজ্য রক্ষা করে। রুশ ও ইউক্রেনীয় ভাষার মত বেলারুশীয় ভাষাতেও সমাপ্তিবাচক ক্রিয়াগুলি উপসর্গ যোগ করে গঠন করা হয়।

গতিসংক্রান্ত ক্রিয়াগুলি বিশেষ শ্রেণীর ক্রিয়া। এই ক্রিয়াগুলিতে জটিল নিয়ম মেনে দিক ও প্রকার নির্দেশকারী বিশেষ উপসর্গ ও প্রত্যয় যুক্ত হয়।

পদক্রম[সম্পাদনা]

বেলারুশীয় ভাষাট স্বাভাবিক পদক্রম হল কর্তা-ক্রিয়া-কর্ম। তবে বিভক্তির কারণে পদগুলির ভূমিকা স্পষ্ট হওয়ায় অন্যান্য পদক্রমও সম্ভব। রুশ ও ইউক্রেনীয় ভাষার মত বেলারুশীয় ভাষাও টপিক-নির্ভর ভাষা। অর্থাৎ পদক্রম কীরকম হবে তা নির্ভর করে টপিক ও কমেন্টের উপর। টপিক অংশটি কমেন্ট অংশের আগে বসে।

শব্দভাণ্ডার[সম্পাদনা]

আধুনিক বেলারুশীয় শব্দভাণ্ডারের দুই-তৃতীয়াংশ অন্যান্য স্লাভীয় ভাষার সাথে সাধারণ শব্দমূল থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। বাকী শব্দগুলি মূলত লাতিন ও গ্রিক থেকে ধার করা। পরবর্তীতে পোলীয়, ফরাসি ও রুশ ভাষা থেকেও শব্দ ধার করা হয়। সাম্প্রতিককালে ইংরেজি থেকেই মূলত শব্দ ধার করা হয়।

লিখন পদ্ধতি[সম্পাদনা]

ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়েই বেলারুশীয় লিখন পদ্ধতি দুইটি লিপির যুদ্ধক্ষেত্র ছিল: লাতিন বর্ণমালা ও সিরিলীয় বর্ণমালা।

১৩শ শতক থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত বেলারুশ লিথুয়ানিয়ার ডিউকের শাসনাধীন ছিল। এসময় বেলারুশীয় ভাষা সিরিলীয় লিপিতে লেখা হত। ১৬শ শতকে লাতিন বর্ণমালা গ্রহণ করা হয় এবং ১৬৪২ সালে যে প্রথম বই ছাপানো হয়, তা ছিল লাতিন হরফে ছাপানো। ১৯শ শতকের শেষের দিকে লাতিন হরফে লেখা বেলারুশীয় ভাষা সাহিত্যিক ভাষায় পরিণত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত দুইটি লিপিই পাশাপাশি ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৯১ সালে বেলারুশ সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করলে আবার লাতিন লিপি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এখন পর্যন্ত কোন আদর্শ লিপিব্যবস্থার ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছানো যায়নি।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]