বিষয়বস্তুতে চলুন

দুর্গা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Durga থেকে পুনর্নির্দেশিত)
দুর্গা
শক্তি এবং সুরক্ষার দেবী
মানভূমে পাওয়া দেবী দুর্গার প্রস্তর মূর্তি, ভারতীয় জাদুঘরে (কলকাতা) রক্ষিত
অন্যান্য নামআদি শক্তি, মহিষাসুর মর্দিনী, ভগবতী, ভবানী, জগদম্বা
দেবনাগরীदुर्गा
অন্তর্ভুক্তিমহাদেবী, আদ্যাশক্তি, পার্বতী, মহাকালী
আবাসমণিদ্বীপ, কৈলাস
মন্ত্র"সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে,
শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরি নারায়নী নমস্তুতে"
অস্ত্রত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, গদা, শঙ্খ, শক্তি, ঢাল বা খেটে, বাণ এবং ধনুক, ঘণ্টা, পরশু, নাগপাশ
দিবসশুক্রবার
বাহনসিংহ (কেশরী)
গ্রন্থসমূহদেবীভাগবত পুরাণ, দেবীমাহাত্ম্যম্, কালিকা পুরাণ, শাক্ত উপনিষদ, তন্ত্র
লিঙ্গনারী
উৎসবদুর্গা পূজা, দুর্গা অষ্টমী, নবরাত্রি, বিজয়াদশমী, বাথুকাম্মা, তীজ, কালী পূজা
ব্যক্তিগত তথ্য
সহোদরবিষ্ণু[১]
সঙ্গীশিব
সন্তানলক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক
দুর্গা
শব্দের অনুবাদসমূহ
বাংলাদুর্গা
সংস্কৃতदुर्गा
গুজরাটিદુર્ગા
হিন্দিदुर्गा
ভোজপুরি𑂠𑂴𑂩𑂳𑂏𑂰 (দুরুগা)
কন্নড়ದುರ್ಗಾ
মালয়ালমദുർഗ
মারাঠিदुर्गा
নেপালিदुर्गा
ওড়িয়াଦୁର୍ଗା
পাঞ্জাবিਦੁਰਗਾ
তামিলதுர்க்கை (তুর্ক্কই)
তেলুগুదుర్గ
হিন্দুধর্মের প্রবেশদ্বার

দুর্গা (সংস্কৃত: दुर्गा; অর্থাৎ "যিনি দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করেন"; এবং "যে দেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন")[২] হলেন হিন্দু দেবী পার্বতীর এক উগ্র রূপ। হিন্দু সংস্কৃতিতে তিনি জনপ্রিয় এক দেবী। তাঁকে আদ্যাশক্তির রণরঙ্গিনী এক মহাদেবীর রূপ বলে মান্য করেন। তিনি চণ্ডিকা, যোগমায়া, চামুন্ডা, অম্বিকা, কালী, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহন্ত্রী, নারায়ণী, তারা, মহামায়া, কাত্যায়নী, দাক্ষায়ণী, অদ্রিজা, নগনন্দিনী, সিংহবাহিনী, শারদা, আনন্দময়ী ইত্যাদি নামেও পরিচিতা। দুর্গার বাহুসংখ্যা অনেক। তার শতভুজা, সহস্রভুজা, ত্রিংশতিভুজা, বিংশতিভুজা, অষ্টাদশভুজা, ষোড়শভুজা, দশভুজা, অষ্টভুজা ও চতুর্ভুজা মূর্তির উল্লেখ পুরাণ গ্রন্থাদিতে পাওয়া যায় বা বিভিন্ন স্থাপত্য-ভাস্কর্যে দেখা যায়। তবে দশভুজা রূপটিই সমধিক জনপ্রিয়। তার বাহন সিংহ (উত্তর ও পশ্চিমভারতে আঞ্চলিকভাবে বাঘ)। মহিষাসুরমর্দিনী-মূর্তিতে তাঁকে মহিষাসুর নামে এক অসুরকে বধরত অবস্থায় দেখা যায়। তার অনেক রূপ, যার মধ্যে কালী রূপটি অন্যতম জনপ্রিয়‌।

সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ।[৩] তিনি শিবের স্ত্রী পার্বতীর উগ্র রূপ, কার্তিক ও গণেশের জননী, এবং কালীর অন্যরূপ। বাংলা মঙ্গলকাব্য গুলোতে এবং আগমনী গানে দুর্গারূপে শিবজায়া হিমালয়দুহিতা পার্বতীর সপরিবারে পিতৃগৃহে অবস্থানের আনন্দময় দিনগুলোর (দুর্গাপূজা) এবং তার বিবাহিত জীবনের অপূর্ব বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাদেবী দেবতাদের অনুরোধে দুর্গম অসুরকে বধ করেন তাই দেবী পার্বতী দুর্গা নামে অভিহিত হন।

দুর্গার আরাধনা বাংলা (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ), আসাম, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচলিত। ভারতের অন্যত্র দুর্গাপূজা মূলত নবরাত্রি ব্রত রূপে উদযাপিত হয়। ভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গা দেবী ভিন্ন ভিন্ন নামে পূজিতা হন। দাক্ষিণাত্য এবং কাশ্মীরে অম্বিকা ও অম্বা নামে, গুজরাটে হিঙ্গলা ও রুদ্রাণী নামে, কান্যকুব্জে কল্যাণী নামে, কুমারিকা প্রদেশে কন্যাকুমারী নামে দেবী পূজিতা হন।[৪] বছরে দুইবার দুর্গোৎসবের প্রথা রয়েছে – আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে শারদীয়া এবং চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বাসন্তী দুর্গাপূজা। সম্ভবত খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় দুর্গোৎসব প্রবর্তিত হয়। জনশ্রুতি আছে, রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম সাড়ম্বরে শারদীয়া দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন এবং তারপর নেত্রকোণা জেলার, মেন্দিপুর গ্রামের মঠবাড়িতে দূর্গা পূজার সূচনা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় যেমন ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দির, দিনাজপুরের কান্তাজিউ মন্দির ইত্যাদি‌।

দুর্গা নামের উৎপত্তি

[সম্পাদনা]
মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা, কালীঘাট পটচিত্র, ১৮৮০

দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে হিরণ্যাক্ষ পুত্র রুরুর বংশধর দুর্গম সমুদ্র মন্থনকালীন অসুরদের বঞ্চনা তথা তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ কামনায় ব্রহ্মার তপস্যা করে। সেই কঠোর সাধনায় সন্তুষ্ট ব্রহ্মার কাছে দুর্গম এই বর প্রার্থনা করে যে তাকে এমন এক নারী বধ করবেন যিনি অনাবদ্ধকে আবদ্ধ করতে পটিয়সী। বরলাভের অহংকারে মত্ত দুর্গম এর পর শুরু করে চরম বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায়। তার অত্যাচার আর ধ্বংসলীলায় ত্রিভুবন বিধ্বস্ত। ক্ষমতা আর বিজয়গর্বে মত্ত অসুর এবার চতুর্বেদকে হস্তগত করলে সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষায় দেবী মহামায়া এক দশভুজারূপী মঙ্গলময়ী দেবী রূপে আবির্ভূতা হন আর দুর্গমাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করেন। বিন্ধ্যাচলে ১০ দিন ব্যাপী ঘোরযুদ্ধে দেবী ও তার অংশোদ্ভূতা গুহ্যকালী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরা, ভৈরবী প্রভৃতি দেবীগণ দুর্গমাসুরের কোটি সৈন্যকে নিধন করেন। এরপর দেবী দুর্গমাসুরকে সুতীক্ষ্ণ শূলের আঘাতে বধ করেন এবং চতুর্বেদ ও সকল মন্ত্র উদ্ধার করেন। দেবী তাই সর্বমন্ত্রময়ী। ক্ষমাশীলা পরমাজননী দেবী এরপর অনুতাপদগ্ধ দুর্গমাসুরকে অদ্বৈত ব্রহ্মের জ্ঞান প্রদান করে মোক্ষলাভ করান। দেবী দুর্গা স্বয়ং সচ্চিদানন্দময়ী পরব্রহ্মস্বরূপা আদ্যাশক্তি মহামায়া। যে সময় বা কাল সৃষ্টিতে একমাত্র আবদ্ধ নয়,যে কাল চিরন্তন সত্য, সেই কালকে পিষ্ট করেন মহাকাল শিব আর মহাকালকে পদতলে রেখেছেন দেবী মহামায়া। তিনি পরমাপ্রকৃতি; দেবী ভিন্ন শিব কেবল জড় বস্তু, দেবীর শক্তিতেই ব্রহ্মা সৃজন, বিষ্ণু পালন এবং রুদ্র সংহার করেন। মহিষাসুরমর্দিনী চণ্ডী ও দুর্গতিনাশিনী দুর্গাকে এক অভেদ মূর্তিকল্পে প্রতিষ্ঠিতা।

দেবী দুর্গার পূজায় দেবী-মাহাত্ম্য বা চণ্ডীপাঠে পাঠ করা হয় ঋগ্‌বেদের বাকসূক্ত, যা ‘দেবীসূক্ত’ নামে খ্যাত।[৫] এটি ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৫তম সূক্ত। বাক্‌সূক্ত/দেবীসূক্ত-

আমি রুদ্রগণ ও বসুগণের সঙ্গে বিচরণ করি, আমি আদিত্যদিগের সঙ্গে এবং তাবৎ দেবতাদিগের সঙ্গে থাকি, আমি মিত্র ও বরুণ এই উভয়কে ধারণ করি, আমিই ইন্দ্র ও অগ্নি এবং দুই অশ্বিদ্বয়কে অবলম্বন করি। যে সোম আঘাত, অর্থাৎ প্রস্তর নিষ্পীড়ন দ্বারা উৎপন্ন হয়েন, আমিই তাহাকে ধারণ করি, আমি ত্বষ্টা ও পূষা ও ভগকে ধারণ করি, যে যজমান যজ্ঞসামগ্রী আয়োজনপূর্বক এবং সোমরস প্রস্তুত করিয়া দেবতাদিগকে উত্তমরূপে সন্তুষ্ট করে, আমিই তাহাকে ধন দান করি। আমি রাজ্যের অধীশ্বরী, ধন উপস্থিত করিয়াছি, জ্ঞানসম্পন্ন এবং যজ্ঞোপযোগী বস্তু সকলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এতাদৃশ আমাকে, দেবতারা নানা স্থানে সন্নিবেশিত করিয়াছেন, আমার আশ্রয়স্থান বিস্তর, আমি বিস্তর প্রাণীর মধ্যে আবিষ্ট আছি। যিনি দর্শন করেন, প্রাণধারণ করেন, কথা শ্রবণ করেন, অথবা অন্ন ভোজন করেন, তিনি আমার সহায় তাতে সেই সকল কার্য্য করেন। আমাকে যাহারা মানে না, তাহারা ক্ষয় হইয়া যায়। হে বিদ্বান্! শ্রবণ কর, আমি যাহা কহিতেছি, তাহা শ্রদ্ধার যোগ্য। দেবতারা এবং মনুষ্যরা যাঁহার শরণাগত হয়, তাহার বিষয় আমিই উপদেশ দিই। যাহাকে ইচ্ছা, আমি বলবান, অথবা স্তোতা, অথবা ঋষি, অথবা বুদ্ধিমান করিতে পারি। রুদ্র যখন স্তোত্রদ্বেষী শত্রুকে বধ করিতে উদ্যত হয়েন, তখন আমিই তাঁহার ধনু বিস্তার করিয়া দিই। লোকের জন্য আমিই যুদ্ধ করি। আমি দ্যুলোকে ও ভূলোকে আবিষ্ট হইয়া আছি।আমি পিতা, আকাশকে প্রসব করিয়াছি। সেই আকাশ এই জগতের মন্তকরূপ। সমুদ্রে জলের মধ্যে আমার স্থান। সেই স্থান হইতে সকল ভুবনে বিস্তারিত হই, আপনার উন্নত দেহদ্বারা এই দ্যুলোককে আমি স্পর্শ করি। আমিই তাবৎ ভুবন নির্মাণ করিতে করিতে বায়ুর ন্যায় বহমান হই। আমার মহিমা এতাদৃশ বৃহৎ হইয়াছে যে, দ্যুলোককেও অতিক্রম করিয়াছে, পৃথিবীকেও অতিক্রম করিয়াছে । - (ঋগ্‌বেদ, দশম মণ্ডল, ১২৫তম সূক্ত)

কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠকের দ্বিতীয় অনুবাকটি দুর্গাসূক্ত নামে খ্যাত যা দেবী দুর্গার পূজায় পাঠ করা হয় ।[৬] দুর্গাসূক্ত -

ওঁ জাতবেদসে সুনবাম সোম মরাতীয়তো নিদহাতি বেদঃ । স নঃ পর্ষদতি দুর্গাণি বিশ্বা নাবেব সিন্ধুং দুরিতাঽত্যগ্নিঃ ॥ ১॥

তামগ্নিবর্ণাং তপসা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্মফলেষু জুষ্টাম্ । দুর্গাং দেবী⁠ শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরসে নমঃ ॥ ২॥ অগ্নে ত্বং পারয়া নব্যো অস্মান্থ্স্বস্তিভিরতি দুর্গাণি বিশ্বা । পূশ্চ পৃথ্বী বহুলা ন উর্বী ভবা তোকায় তনয়ায় শংয়োঃ ॥ ৩॥

বিশ্বানি নো দুর্গহা জাতবেদঃ সিন্ধুন্ন নাবা দুরিতাঽতিপর্ষি । অগ্নে অত্রিবন্মনসা গৃণানোঽস্মাকং বোধ্যবিতা তনূনাম্ ॥ ৪॥

[৭]

তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠকে দুর্গাসূক্তের সাথে সাথে একটি দুর্গাগায়ত্রী মন্ত্রও আছে, মন্ত্রটি দুর্গাপূজায় আজও ব্যবহৃত হয়।[৮] দুর্গাগায়ত্রী মন্ত্র-

কাত্যায়নায় বিদ্মহে, কন্যাকুমারি ধীমহি। তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াৎ।।’

পৌরাণিক উপাখ্যান

[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ

[সম্পাদনা]
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, কৃষ্ণ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। কৃষ্ণের মূর্তি, কুমারটুলি পার্ক সর্বজনীন, কলকাতা, ২০১০।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। বিভিন্ন দেবদেবীরা কীভাবে দুর্গাপূজা করেছিলেন, তার একটি তালিকা এই পুরাণে পাওয়া যায়। বলা হয়েছে:


প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেন পরমাত্মনা।
বৃন্দাবনে চ সৃষ্ট্যাদ্যৌ গোলকে রাগমণ্ডলে।
মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা দ্বিতীয়তঃ।
ত্রিপুরপ্রেষিতেনৈব তৃতীয়ে ত্রিপুরারিণা।।
ভ্রষ্টশ্রিয়া মহেন্দ্রেন শাপাদ্দুর্বাসসঃ পুরা।
চতুর্থে পূজিতা দেবী ভক্ত্যা ভগবতী সতী।।
তদা মুনীন্দ্রৈঃ সিদ্ধেন্দ্রৈর্দেবৈশ্চ মুনিমানবৈঃ।
পূজিতা সর্ববিশ্বেষু বভূব সর্ব্বতঃ সদা।।

অর্থাৎ, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়ে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছে।[৯]


দেবীমাহাত্ম্যম্‌

[সম্পাদনা]
বৈষ্ণবী ও বারাহী দেবী শুম্ভ-নিশুম্ভের অসুরসৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধরতা, সপ্তদশ শতাব্দীর পুথিচিত্রণ

শ্রীশ্রীচণ্ডীর পাঠ দুর্গাপূজার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। দেবীমাহাত্ম্যম্ আসলে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর একটি নির্বাচিত অংশ। এতে তেরোটি অধ্যায়ে মোট সাতশোটি শ্লোক আছে। এই বইতে দুর্গাকে নিয়ে প্রচলিত তিনটি কাহিনী ও দুর্গাপূজা প্রচলনের একটি কাহিনী রয়েছে।

রাজা সুরথের গল্প

[সম্পাদনা]

রাজা সুরথের গল্পটি শ্রীশ্রীচণ্ডী-র প্রধান তিনটি কাহিনীর অবতরণিকা ও যোগসূত্র। সুরথ ছিলেন পৃথিবীর রাজা। কিন্তু একবার এক যুদ্ধে তার পরাজয় ঘটে। সুরথ মনের দুঃখে বনে চলে আসেন। বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মেধা নামে এক ঋষির আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। এমন সময় একদিন বনের মধ্যে সুরথ সমাধি নামে এক বৈশ্যের দেখা পেলেন। তার সঙ্গে কথা বলে সুরথ জানতে পারলেন, সমাধির স্ত্রী ও ছেলেরা তার সব টাকাপয়সা ও বিষয়সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাও তিনি সব সময় নিজের স্ত্রী ও ছেলদের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা চিন্তা করে শঙ্কিত হন। তাদের মনে প্রশ্ন জাগল, যারা তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, তাদের প্রতি তাদের রাগ হচ্ছে না কেন? দুজনে মেধা ঋষিকে এই কথা জিজ্ঞাসা করলে, ঋষি বললেন, পরমেশ্বরী মহামায়ার প্রভাবেই এমনটা হচ্ছে। সুরথ তাকে মহামায়ার কথা জিজ্ঞাসা করলে, তিনি একে একে তাকে তিনটি কাহিনী বলেন। এই কাহিনীগুলিই শ্রীশ্রীচণ্ডী-র মূল আলোচ্য বিষয়। মেধার গল্প শুনে সুরথ ও সমাধি নদীর তীরে তিন বছর কঠিন তপস্যা ও দুর্গাপূজা করলেন এবং শেষে দুর্গা তাদের দেখা দিয়ে সুরথকে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন এবং বৈশ্যকে তত্ত্বজ্ঞান দিলেন।[১০]

মধুকৈটভের কাহিনি

[সম্পাদনা]
মধুকৈটভ বধরত নারায়ণ, সপ্তদশ শতাব্দীর পুথিচিত্রণ

প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট কারণ-সমুদ্রে পরিণত হলে বিষ্ণু সেই সমুদ্রের উপর অনন্তনাগকে শয্যা করে যোগনিদ্রায় মগ্ন হলেন। এই সময় বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়ে বিষ্ণু নাভিপদ্মে স্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হল। ভীত হয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জাগরিত করবার জন্যে তার নয়নাশ্রিতা যোগনিদ্রার স্তব করতে লাগলেন। স্তবে সন্তুষ্টা দেবী বিষ্ণুকে জাগরিত করলে তিনি পাঁচ হাজার বছর ধরে মধু ও কৈটভের সঙ্গে মহাসংগ্রামে রত হলেন। মহামায়া শেষে ঐ দুই অসুরকে বিমোহিত করলে বিষ্ণু তাদের বধ করলেন।[১০]

মহিষাসুরের কাহিনি

[সম্পাদনা]
মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা, গুলের ঘরানার চিত্র, দ্রষ্টব্য এই চিত্রে দেবী ব্যাঘ্রবাহিনী

শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে বর্ণিত দেবী দুর্গার কাহিনিগুলির মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় মধ্যম চরিত্রে উল্লিখিত মহিষাসুর বধের কাহিনীটি। এই কাহিনী অনুসারে : পুরাকালে মহিষাসুর দেবতাদের শতবর্ষব্যাপী এক যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নিলে, বিতাড়িত দেবগণ প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাঁকে মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের সমীপে উপস্থিত হলেন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনী শ্রবণ করে তাঁরা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। সেই ক্রোধে তাঁদের মুখমণ্ডল ভীষণাকার ধারণ করল। প্রথমে বিষ্ণু ও শিব ও পরে ব্রহ্মার মুখমণ্ডল হতে এক মহাতেজ নির্গত হল। সেই সঙ্গে ইন্দ্রাদি অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হল। সু-উচ্চ হিমালয়ে স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজঃপুঞ্জ একত্রিত হয়ে কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূত হওয়ায় এই দেবী কাত্যায়নী নামে অভিহিতা হলেন। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে দেবী কাত্যায়নী আবির্ভূতা হয়েছিলেন; শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে কাত্যায়ন দেবীকে পূজা করেন এবং দশমীতে দেবী মহিষাসুর বধ করেন।[১১]]

এক এক দেবতার তেজপ্রভাবে বহুবর্ণময়ী দেবীর এক এক অঙ্গ উৎপন্ন হল - শিবের তেজে মুখমণ্ডল, যমের তেজে কেশদাম, সন্ধ্যার তেজে ভ্রূযুগল, অগ্নিতেজে ত্রিনয়ন, । প্রত্যেক দেবতা তাঁদের আয়ুধ বা অস্ত্র দেবীকে দান করলেন। হিমালয় দেবীকে তাঁর বাহনরূপে সিংহ দান করলেন। এই মহাদেবীই অষ্টাদশভুজা জয়া মহালক্ষ্মী রূপে মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন । দেবী ও তাঁর বাহনের সিংহনাদে ত্রিভুবন কম্পিত হতে লাগল।

মহিষাসুর সেই প্রকম্পনে ভীত হয়ে প্রথমে তাঁর সেনাদলের বীরযোদ্ধাদের পাঠাতে শুরু করলেন। দেবী ও তাঁর বাহন সিংহ প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে একে একে সকল যোদ্ধা ও অসুরসেনাকে বিনষ্ট করলেন। তখন মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধকালে মায়াবী মহিষাসুর নানা রূপ ধারণ করে দেবীকে ভীত বা বিমোহিত করার প্রচেষ্টায় রত হলেন; কিন্তু দেবী সেই সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলেন। এই বলে দেবী মহিষাসুরের উপর আরোহণ তার কণ্ঠে পা দিয়ে শূলদ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁকে বধ করলেন। অসুরসেনা হাহাকার করতে করতে পলায়ন করল এবং দেবতারা স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়ে আনন্দধ্বনি করতে লাগলেন।[১২]

কিংবদন্তি হল দেবী দুর্গা (চামুন্ডেশ্বরী) ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মহীশূর জেলার চামুন্ডি পাহাড়ের চূড়ায় মহিষাসুরকে হত্যা করেছিলেন । স্থানটিতে চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির আছে । মহীশুর এর নাম হয়েছে মহিষাসুরমর্দিনী থেকে । [১৩] নথিভুক্ত ইতিহাসে মহীশূরের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ২৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, অর্থাৎ অশোকের সময়কালে যখন তৃতীয় বৌদ্ধ সমাবর্তনের সমাপ্তিতে মহিষা মন্ডালের কাছে একটি দল পাঠানো হয়েছিল।[১৪]

শুম্ভ-নিশুম্ভের কাহিনি

[সম্পাদনা]
শুম্ভ ও নিশুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধরত দুর্গা।

শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুরভ্রাতা স্বর্গ ও দেবতাদের যজ্ঞভাগ অধিকার করে নিলে দেবগণ হিমালয়ে গিয়ে আদিদেবী মহাদেবীকে স্তব করতে লাগলেন (পঞ্চম অধ্যায়ে উল্লিখিত এই স্তবটি অপরাজিতস্তব নামে পরিচিত; এটি হিন্দুদের নিকট অতিপবিত্র ও নিত্যপাঠ্য একটি স্তবমন্ত্র; “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা” ও সমরূপ মন্ত্রগুলি এই স্তবের অন্তর্গত)। এমন সময় সেই স্থানে পার্বতী গঙ্গাস্নানে উপস্থিত হলে,দেবতাদের কষ্ট দেখে আদ্যাদেবী ইন্দ্রাদি দেবতার স্তবে প্রবুদ্ধা হয়ে তার দেহকোষ থেকে সৃষ্টি করেন এই দেবী কে আর পার্বতী এই দেবীর সাথে বীন্ধ পর্বতে যান ও বিন্ধ্ বাসিনী নামে অভিহিত হন। এই দেবী কৌশিকী নামে আখ্যাত হলেন ও শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। শুম্ভ-নিশুম্ভের চর চণ্ড ও মুণ্ড তাকে দেখতে পেয়ে নিজ প্রভুদ্বয়কে বললেন যে এমন স্ত্রীলোক আপনাদেরই ভোগ্যা হবার যোগ্য। চণ্ড-মুণ্ডের কথায় শুম্ভ-নিশুম্ভ মহাসুর সুগ্রীবকে দৌত্যকর্মে নিযুক্ত করে দেবীর নিকট প্রেরণ করলেন। সুগ্রীব দেবীর কাছে শুম্ভ-নিশুম্ভের কুপ্রস্তাব মধুরভাবে ব্যক্ত করল। দেবী মৃদু হেসে বিনীত স্বরে বললেন, যে আমাকে যুদ্ধে পরাভূত করতে পারবে, কেবলমাত্র তাকেই আমি বিবাহ করব। তুমি বরং মহাসুর শুম্ভ বা নিশুম্ভকে বল, তাঁরা যেন এখানে এসে আমাকে পরাস্ত করে শীঘ্র আমার পাণিগ্রহণ করেন। আর বিলম্বে কি প্রয়োজন?”

দেবীর কথায় কুপিত হয়ে অসুররাজ শুম্ভ তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দৈত্যসেনাপতি ধূম্রলোচনকে প্রেরণ করলেন। ধূম্রলোচনের সঙ্গে দেবীর ভয়ানক যুদ্ধ হল ও সেই যুদ্ধে ধূম্রলোচন পরাজিত ও নিহত হল। এই সংবাদ পেয়ে শুম্ভ চণ্ড-মুণ্ড ও অন্যান্য অসুরসৈন্যদের প্রেরণ করল। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দেবী নিজ দেহ থেকে দেবী কালীর সৃষ্টি করলেন। চামুণ্ডা ভীষণ যুদ্ধের পর চণ্ড-মুণ্ডকে বধ করলেন। তখন দেবী কৌশিকী তাকে চামুণ্ডা আখ্যায় ভূষিত করলেন।

চণ্ড-মুণ্ডের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সকল দৈত্যসেনাকে সুসজ্জিত করে প্রেরণ করলেন দেবীর বিরুদ্ধে। তখন তাকে সহায়তার প্রত্যেক দেবতার শক্তি রূপে দেবী পার্বতী তার এক এক অঙ্গ থেকে এক এক দেবীকে সৃষ্টি করেন । এই দেবীরা হলেন ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, নারসিংহী, ঐন্দ্রী প্রমুখ। এঁরা প্রচণ্ড যুদ্ধে দৈত্যসেনাদের পরাভূত ও নিহত করতে লাগলেন। এই সময় রক্তবীজ দৈত্য সংগ্রামস্থলে উপস্থিত হল। তার রক্ত একফোঁটা মাটিতে পড়লে তা থেকে লক্ষ লক্ষ রক্তবীজ দৈত্য সৃষ্টি হয়। এই কারণে কৌশিকী কালীর সহায়তায় রক্তবীজকে বধ করলেন। কালী রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়তে না দিয়ে নিজে পান করে নেন।

এরপর শুম্ভ আপন ভ্রাতা নিশুম্ভকে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দেবী দুর্গা নিশুম্ভকে বধ করলেন। প্রাণপ্রতিম ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে আকুল হয়ে শুম্ভ দেবীকে বলল, “তুমি গর্ব করো না, কারণ তুমি অন্যের সাহায্যে এই যুদ্ধে জয়লাভ করেছ।” তখন দেবী বললেন,

একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মামপরা। পশ্যৈতা দুষ্ট মধ্যেব বিশন্ত্যো মদ্বিভূতয়ঃ।।

-একা আমিই এ জগতে বিরাজিত। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কে আছে? রে দুষ্ট, এই সকল দেবী আমারই বিভূতি। দ্যাখ্, এরা আমার দেহে বিলীন হচ্ছে।

তখন অন্যান্য সকল দেবী কৌশিকী দেহে মিলিত হয়ে গেলেন। দেবীর সঙ্গে শুম্ভের ঘোর যুদ্ধ আরম্ভ হল। যুদ্ধান্তে দেবী শুম্ভকে শূলে গ্রথিত করে বধ করলেন। দেবতারা পুনরায় স্বর্গের অধিকার ফিরে পেলেন।যুদ্ধ পরে কৌশিকী পার্বতীর দেহে বিলীন হয়ে যান। পরে দেবী পার্বতী মালভূমের রাজার মাধ্যমে নিজের এই রূপের পুজো শুরু করেন।

কালিকা পুরাণ

[সম্পাদনা]

এর ৫৭,৫৮,৫৯, ৬০, ৬১তম অধ্যায়ে দুর্গাপূজার রীতিনীতির বিস্তারিত বিবরণ বিধৃত আছে, পূজায় ব্যবহার্য্য "জটাজুটসমাযুক্তাং ...." ধ্যানমন্ত্রটির উল্লেখ আছে আর তাই এই পুরাণের আলোচনা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। বিশেষতঃ ৬০ তম অধ্যায়ে মহিষাসুর বধের কাহিনী আছে যা দেবীভাগবত,মার্কণ্ডেয় বা বামন পুরাণের কাহিনী থেকে স্বতন্ত্র।

মহিষাসুরের বিনাশ কামনায় দেবতাদের সম্মিলিত স্তুতিতে প্রসন্নচিত্ত মহামায়া ষোড়শভুজা ভদ্রকালী রূপে আবির্ভূতা হয়ে দেবতাদের কাত্যায়নের আশ্রমে যেতে আদেশ করেন। সেখানে দেবতারা আদ্যাদেবীর দর্শনলাভের আশায় যান ও ত্রিমূর্তির ( ব্রহ্মা, বিষ্ণু , মহেশ্বর) সাক্ষাৎ লাভ করেন, ক্রমে তাঁরা মহিষাসুরের অত্যাচার-উৎপীড়নের কথা তুলে ধরলে ত্রিমূর্তি কোপাবিষ্ট হন। তাঁদের ও অন্যান্য দেবতাদের ক্রোধরশ্মি সুবৃহৎ এক তেজচক্র সৃষ্টি করে, যা ক্রমে দশভুজা তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দেবী দুর্গার রূপ নেয়।

এদিকে মহিষাসুর নিশীথ দুঃস্বপ্নে দেবী ভদ্রকালীকে খড়্গাঘাতে তাঁর শিরশ্ছেদ করে রক্তপান করতে দেখেন। সন্ত্রস্ত অসুররাজ সপার্ষদে পরদিন সকালে দেবীর আরাধনা করলে দেবী মহামায়া তাঁকে ষোড়শভুজা অতসীপুষ্পবর্ণা ভদ্রকালী রূপে দর্শন দেন। মহামায়ার হাতে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তাঁর কাছেই মহিষাসুর আসুরিক মনোবৃত্তির স্খালন আর যজ্ঞভাগ লাভের বর প্রার্থনা করেন। দেবী অসুরত্ব মোচনের বর দিলেও যজ্ঞভাগের মনোবাঞ্ছাটি অপূর্ণ রাখেন, বিকল্পে দেন ত্রিলোকপূজ্য হওয়ার বর। তিনি জানান যে তাঁর মহিষাসুর বধ এক সন্ততঃ ঘটনা - যুগ-যুগান্তরে, কল্পে কল্পান্তরে যা ঘটে চলেছে। ইতোপূর্বে অঞ্জননিভা অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডা ও অতসীপুষ্পবর্ণা ষোড়শভুজা ভদ্রকালী রূপে মহিষাসুরকে তিনি বধ করেছেন আর পরবর্তীতে দশভুজা তপ্তকাঞ্চনাভা কাত্যায়নী দুর্গা রূপে তাঁকে আবারো বধ করবেন। আর এই তিনরূপে দেবীর পদলগ্ন হয়ে মহিষাসুর দেব-দানব-মানব সবার পূজা পাবেন।

প্রতিশ্রুতিমতই দেবী দশভুজারূপে অন্তিমকল্পের যুদ্ধে মহিষকে বধ করেন আর মহিষও দেবীর পদসংলগ্ন হয়ে দেবীর সাথে সাথে পূজা পেতে থাকেন। আদ্যাশক্তির আশীর্বাদে মহিষের অসুরস্বভাব মুছে যায়, চলে যায় দেবতাদের প্রতি বিদ্বেষ আর পুনর্জন্মের চক্র থেকে অব্যাহতি মেলে।

এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অবশ্য আরও দুটি প্রতিশ্রুতির আখ্যান কালিকা পুরাণের এই অধ্যায়ে বর্ণিত আছে - একটি হল রম্ভাসুরের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট মহাদেবের বরদান আর সেই অঙ্গীকারের দায়বদ্ধতা থেকে মহিষাসুর রূপে তিন কল্পে রম্ভের পুত্রত্ব স্বীকার। অন্যটি মহাদেবীর কাছে মহাদেবের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া - তিন কল্পে যোগবদ্ধ মহিষ শরীরে দেবীর পদপ্রান্তে থেকে তাঁর সাযুজ্যলাভ ও মহিষ শরীরে সিংহরূপী হরির সঙ্গে দেবীর ভারবহন।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী দ্বারা প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বের বাঘোর প্রস্তর এ দেবী পূজা হত। দুর্গা প্রাক কৃষিযুগে পূজিত হতো বনদুর্গা নামে। [১৫]।[১৬] সাড়ে চার হাজার বছরের প্রাচীন মহেঞ্জোদারোতে মহিষমেধি নামে একটি ধর্মীয় আচার ছিল। হরপ্পার সেই জনগোষ্ঠী ছিল মাতৃকা উপাসক। মহিষবলির মাধ্যমে তারা মাতৃকা দেবীকে তুষ্ট করতেন বলে ধারণা করা হয়[১৭]।[১৮]মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে ঋষি মেধসের নির্দেশে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর করলডেঙ্গার পাহাড়ে মেধস মুনির আশ্রম এ মূর্তিতে প্রথম দুর্গা পূজা করেন, যা পরবর্তীতে বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত হয়।।[১৯][২০] পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় ২৪০০ বছর আগের চন্দ্রকেতুগড় সভ্যতাতে দশপ্রহরণধারিণী মাতৃকা মূর্তি পাওয়া গেছে । সেই সময়কালে চার সহচর/সহচরী পরিবেষ্টিত যে মাতৃকার দেবীর উপাসনা হতো, তিনি মাথার খোঁপায় দশটি ক্ষুদ্র আয়ুধ ধারণ করতেন।

চন্দ্রকেতুগড় সভ্যতাতে দশপ্রহরণধারিণী দশায়ুধা মাতৃকা মূর্তি

ভারতের মথুরা অঞ্চলে ২য় শতাব্দীর 'মহিষাসুরমর্দিনী' (দুর্গা) মূর্তি পাওয়া গেছে ।এতে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে (মহিষরূপী অসুর) ত্রিশূল দ্বারা বধ করছেন।এছাড়াও রাজস্থান, গোয়া, কেরালা, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ ,ছত্তিশগড়, ঐহোল, মধ্যপ্রদেশের উদয়গিরি গুহা ,ইন্দোনেশিয়ায় (জাভা)মহিষাসুরমর্দিনী' (দুর্গা) মূর্তি পাওয়া গেছে ।

ভারতের মথুরার ২য় শতাব্দীর 'মহিষাসুরমর্দিনী' (দুর্গা) মূর্তি পাওয়া যাতে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে (মহিষরূপী অসুর) বধ করছেন।

পালযুগে ও সেনযুগে দুর্গাপুজোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পালযুগের দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা মূর্তি, একাদশ শতক। এটির বর্তমান অবস্থান ডালাস মিউজিয়াম অভ আর্ট

নানা রূপে দেবী

[সম্পাদনা]

ঋগ্বেদোক্ত দেবীসূক্তকে দেবী দুর্গার সূক্ত হিসাবেই মান্যতা দেওয়া হয়। দেবী দুর্গা এই জগৎসংসারে বিরাজ করেন। তার জন্ম হয়না, আবির্ভাব ঘটে। দুর্গা সপ্তশতী তে বর্ণিত আছে, যে মহাশক্তি ব্রহ্মার ব্রহ্মত্ব, শিবের শিবত্ব, বিষ্ণুর বিষ্ণুত্ব প্রদান করেছেন, সেই দেবী দেবতাদের সমষ্টিভূত তেজপুঞ্জ থেকে স্বরূপ ধারণ করেন। দুর্গার বিশেষ আলোচনা ও পূজাবিধি তন্ত্র ও পুরাণেই প্রচলিত। যেসকল পুরাণ ও উপপুরাণে দুর্গা বা দেবী সংক্রান্ত আলোচনা রয়েছে সেগুলো হল: মৎস্যপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবীপুরাণ, বামনপুরাণ, কালিকাপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, বরাহপুরাণ, শিবপুরাণ ও দেবী ভাগবত। তিনি জয়দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, গন্ধেশ্বরী, বনদুর্গা, চণ্ডী, নারায়ণী, কালী, গৌরী, উমা, মহাদুর্গা, অগ্নিদুর্গা, শূলিনী দুর্গা, সিন্ধুদুর্গা, মূলা দুর্গা, মহামায়া, মহিষমর্দিনী, চামুণ্ডা প্রভৃতি নামে ও রূপেও পূজিতা হন। তিনিই জগদীশ্বরী, আপন মহিমায় দ্যাবাপৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন প্রতিটি কণায়। তিনি ঘটন-অঘটন পটিয়সী, দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। তিনিই জগতকে চালান ও প্রতিপালন করেন জগদ্ধাত্রী রূপে, আবার প্রলয়কালে তিনিই কালিকা রূপে জগৎকে গ্রাস করেন। বঙ্গ দেশে এবং উৎকলে এই দেবীকে নবপত্রিকার মাধ্যমে নয়টি রূপকে পূজা করা হয়। যা অনেকাংশে কলা বউ নামে পরিচিত। যদিও কলা বউটা লোক ভাষায় পরিচিত যার কোন পুরাণগত ব্যাখ্যা নেই।

চন্দনকাঠের দুর্গা মূর্তি, মুর্শিদাবাদ থেকে প্রাপ্ত, বর্তমানে ভারতীয় জাদুঘর, কলকাতায় রক্ষিত আছে

দেবী দুর্গা শাক্তমতে সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবী, বৈষ্ণব মতে তাকে ভগবান বিষ্ণুর অনন্ত মায়া হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয় এবং শৈবমতে দুর্গাকে শিবের অর্ধাঙ্গিনী পার্বতী। বৈদিক সাহিত্যে দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। কেনোপনিষদে বর্ণিত উমা(পার্বতী) হৈমবতীকে দুর্গা হিসাবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণের যোগমায়াকে দুর্গার একটি স্বরূপ আখ্যা দেওয়া হয়েছে যিনি হরির সহায়িকা শক্তি তথা শিবভক্তি প্রদায়িনী। এইগুলো ছাড়াও দুর্গাদেবীর বর্ণনা মহাভারতের বিরাট পর্ব ও অন্যান্য পুরাণে পাওয়া যায়। দেবী দুর্গার ভিন্ন ভিন্ন অবতার সমূহ হল: কালিকা, নন্দা, ভ্রামরী, শাকম্ভরী, রক্তদন্তিকা, কৌশিকী, ভীমা, উগ্রচণ্ডা, ভদ্রকালী, কাত্যায়নী, শান্তা দুর্গা, অজিতা, অপরাজিতা ইত্যাদি।

সাঁওতালদের বয়ান

[সম্পাদনা]
মহীশূর, কর্নাটক, ভারতে দানব মহিষাসুরের মূর্তি

সাঁওতালরা তাদের বয়ানে দুর্গাকে খলনায়িকা হিসেবে বিবেচনা করে থাকে এবং এর বিপরীতে তারা হুদুর দুর্গা নামে মহিষাসুরপূজা করে থাকে।[২১][২২] হুদুর দুর্গা হল খেরওয়াল সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর উপাস্য দেবতা, যাকে সাওতালরা মহিষাসুর বলে দাবি করে থাকে।[২১] অনেকের মতে, এটি সম্পূর্ণ রূপেই গল্পকথা এবং এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তাদের মতে, হুজুর দুর্গার গল্প আদতে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট এবং দেবপক্ষ ও অসুরপক্ষের সংগ্রামকে আর্য ও অনার্য দ্বন্দ্ব বলে দাগিয়ে দেওয়ার একটি ভিত্তিহীন প্রয়াস। [২৩] এই বর্ননার বিরোধীগণ এই বিষয়টিকে মূলনিবাসী তত্ত্ব ও এই ঘটনার সমর্থনকারী, বিশেষ করে এ ঘটনার সমর্থনকারী সাওতালদের মূলনিবাসীতাত্ত্বিক বলে অভিহিত করে থাকে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের খেরওয়াল সাঁওতাল ও অসুর নামক আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতে, হুদুর দুর্গা ছিলেন তাদের সহস্র বছরের পুরনো পূর্বপুরুষ, চাইচাম্পা নামক গ্রামের রাজা। তিনি অত্যন্ত বলশালী ও ক্ষমতাধর রাজা ছিলেন। আর্যরা ভারতে আসার পর কোনমতেই তাকে পরাজিত করতে পারছিল না। তখন তারা বিভিন্নভাবে রাজাকে মারার উপায় ভাবতে লাগল। তারা জানতে পারল রাজা অত্যন্ত নারীবৎসল এবং তাদের সমাজেও নারীদের অত্যন্ত উঁচু চোখে দেখা হয়। তাই আর্যগণ রাজাকে হত্যা করার জন্য গুপ্তচর হিসেবে এক গৌরবর্ণের রূপবতী নারীকে পাঠাল, কোন কোন বর্ণনামতে, উক্ত নারী গণিকা পেশাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত ছিল। আর্যগণ রাজার কাছে উক্ত নারীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিল এবং রাজাও নারীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হলেন। বিয়ের পর নয়দিন রাজা উক্ত নারীর সাথে রাত্রি যাপন করেন এবং নবম দিনে উক্ত নারী রাজাকে হত্যা করে। রাজার মৃত্যুর খবর শুনে আর্যগণ রাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে রাজ্যে আক্রমণ করে এবং রাজ্যের পুরুষগণ তাদের ধর্মগুরুর পরামর্শ অনুসারে সরস্বতী নদীতে স্নান করে নারীদের বেশ ধারণ করে দাসাই নৃত্য করতে করতে রাজ্য থেকে পালিয়ে যায়। উক্ত ঘটনার নারীকেই আর্যগণ বা হিন্দুগণ দেবী দুর্গা হিসেবে এবং রাজাকে মহিষাসুর হিসেবে অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করে তাদের ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ করেছে বলে সাঁওতালগণ দাবি করে থাকে, এবং তাদের আরও দাবি তাদের রাজা হুদুর দুর্গার নামই উক্ত নারীর নাম হিসেবে ভুলভাবে বর্ণিত হয়েছে। দুর্গাপূজার সময় তারা দুর্গাকে পূজা না করে মহিষাসুর পূজা করে থাকে এবং নারীদের বেশ ধরে পথে পথে দাসাই নৃত্য করে শোক পালন করে থাকে।[২৪][২৫][২৬] আর অনেকের দাবিমতে, উক্ত নারী গণিকা হওয়ার কারণে হিন্দুগণ দুর্গা পূজায় দুর্গার প্রতিমা তৈরি করতে গোমূত্র, গঙ্গাজল, গোবরের সঙ্গে গণিকালয়ের (পতিতালয়ের) মাটি ব্যবহার করে।

ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে

[সম্পাদনা]
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেবী দুর্গা, বাম থেকে: ৭ম-৮ম শতাব্দীর কম্বোডিয়া, ১০ম-১১দশ শতকের ভিয়েতনাম, ৮ম-৯ম শতাব্দীর ইন্দোনেশিয়া।

জাপানি দুর্গা বা “জুনতেই ক্যানন (Juntei Kannon)” ১৮ হাতের দুর্গা রূপ। মহাযান পরিব্রাজকদের হাত ধরে দেবীর এই রূপ জাপানে পৌঁছায় ৭০০ শতাব্দীর কাছাকাছি। ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। আর্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবতাদের। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের, তারা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রূপে। সিন্ধু সভ্যতায় তথা ব্যবিলনীয় সভ্যতায় উল্লেখ পাওয়া যায় এই মাতৃ পূজার। মাতৃপূজাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির আদি পর্ব থেকে শুরু সিংহবাহিনী দেবীর পূজা। মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় খোঁজ পাওয়া যায় সিংহবাহিনী দেবী ইনান্না-র। কুশান সম্রাট কনিষ্কের মুদ্রাতেও খোঁজ পাওয়া যায় সিংহবাহিনী দেবী নানা-র। তুর্কমেনিস্তান ও আফগানিস্তানে প্রচলিত ছিল এই দেবীর মাহাত্ম্য। এখনও দেবী চণ্ডী “বিবি নানা” হিসেবে এইসব অঞ্চলে পূজিত হন।

শাক্ত ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ হয় খ্রিষ্টীয় ৪০০ – ৫০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। খ্রিষ্টীয় ৪০০ অব্দে রচিত হয় শাক্ত মহাপুরাণের অন্যতম গ্রন্থ দেবীমাহাত্ম্যম্।  এই সময়েই মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১-৯৩ অধ্যায়গুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় এই গ্রন্থ। দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থেই প্রথম বিভিন্ন নারী দেবতা সংক্রান্ত নানান পুরাণ-কথা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক উপাদানগুলি একত্রিত করা হয়। দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থে বৈদিক পুরুষতান্ত্রিক দেবমণ্ডলীর সঙ্গে সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব নবম অব্দ থেকে বিদ্যমান নৃতাত্ত্বিক মাতৃপূজাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির এক সম্মিলনের প্রয়াস লক্ষিত হয়। এর পরবর্তী হাজার বছর এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। মহাযান বৌদ্ধধর্মের হাত ধরে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশ, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, তিব্বত, ভুটান, মালয়েশিয়া ও মঙ্গোলিয়ায়। কম্বোডিয়া আর ইন্দোনেশিয়া দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য পূজিত হতে শুরু করে হিন্দু ধর্মের প্রসারের সাথে। অ্যাংকর যুগের (১০১০ শতাব্দের) পূর্বে কম্বোডিয়ায় মহিষাসুরমর্দিনীর পূজার প্রচলন ছড়িয়ে পরে হিন্দুধর্মের হাত ধরে। এই সময়ের যে দুর্গা মূর্তিগুলি কম্বোডিয়া থেকে উদ্ধার হয়েছে, অধিকাংশ চতুর্ভুজা এবং মহিষাসুরমর্দিনী। মূর্তিগুলির বৈশিষ্ট্যাবলি যে এখানে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা বিষ্ণুর মতো চতুর্ভুজা এবং শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম ধারণকারী।

জাভা ও ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য অংশ থেকে উদ্ধার হয়েছে অনেক মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তির প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। এই মূর্তিগুলো মধ্যে প্রাচীনতম তারিখ অনুমান অষ্টম শতাব্দীর। ইন্দোনেশিয়ার সেন্ট্রাল জাভাতে রয়েছে নবম শতাব্দীর বিখ্যাত হিন্দু মন্দির প্রাম্বানান। এই মন্দিরে রয়েছে এক জগৎ বিখ্যাত মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি। এটি একটি ইউনেস্কো-স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, ইন্দোনেশিয়ায় বৃহত্তম হিন্দু মন্দির, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় মন্দির প্রাঙ্গণ। ১৫শ থেকে ১৬শ শতাব্দীর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইসলামের আগমনের পর দুর্গার আরাধনা পাড়ি জমায় আরও পূর্বদিকে হিন্দু বালিতে।

দুর্গাপূজা

[সম্পাদনা]
মা দুর্গা
মা দুর্গা

দুর্গাপূজা হল শক্তির অধিষ্ঠাত্রী পার্বতীদেবীর দুর্গা রূপের উপাসনার উৎসব। দুর্গাপূজা শরৎ (আশ্বিন) এবং বসন্ত (চৈত্র) ঋতুর শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অনুযায়ী, দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন হয়েছিল বসন্ত ঋতুতে রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি কর্তৃক। দেবী ভাগবত ও কালিকাপুরাণে উল্লেখ আছে, শরৎকালে শ্রীরামচন্দ্র দেবী পার্বতীর দুর্গতিনাশিনী দুর্গা রূপের পূজা করেছিলেন রাবণ বধের নিমিত্তে; এজন্য একে, ‘অকালবোধন’ও বলা হয়ে থাকে।

পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ডে দুর্গাপূজা বহুলভাবে উদ্‌যাপন করা হয়; উত্তর ভারতে এটি নবরাত্রি হিসাবে পালন করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের একাধিক রাষ্ট্র দুর্গাপূজা পালন করে এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরাও সকলে দুর্গাপূজা পালন করে। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন তথা ষষ্ঠীর থেকে আরম্ভ করে দশমী পর্যন্ত হয়ে থাকে এই দুর্গোৎসব। এই পাঁচ দিন যথাক্রমে দুর্গা ষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। এই পক্ষটিকে দেবীপক্ষ নামেও জানা যায়। পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন এই দেবীপক্ষের সূচনা হয়, একে মহালয়াও বলা হয়ে থাকে; আর পূর্ণিমার দিনটিকে লক্ষ্মী পূজার দিন হিসাবে গণ্য করা হয় ।

ঢাকার একটি মন্দিরে দেবী দুর্গার প্রতিমা।

নাম ব্যুৎপত্তি

[সম্পাদনা]

হিন্দুশাস্ত্রে "দুর্গা" শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:


দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।

উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।

ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।।[২৭]


অর্থাৎ, "দ" অক্ষরটি দৈত্য বিনাশ করে, উ-কার বিঘ্ন নাশ করে, রেফ রোগ নাশ করে, "গ" অক্ষরটি পাপ নাশ করে এবং অ-কার শত্রু নাশ করে। এর অর্থ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা।" অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম বলেছে, "দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা"। অর্থাৎ, যিনি দুর্গ নামে অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনি সব সময় দুর্গা নামে পরিচিত।[২৮] দেবী পার্বতী দেবগণের অনুরোধে ও শিবের আদেশে এক উগ্র রূপ ধারণ করে দুর্গম অসুর কে বধ করেন তাই তিনি দুর্গা নামে অভিহিত হন।

প্রভাব

[সম্পাদনা]

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বন্দে মাতরম গানের পিছনে অনুপ্রেরণা দেবী হিসেবে দুর্গা, পরে ভারতের সরকারি জাতীয় গান। দুর্গা ভারতীয় জাতীয়তাবাদে উপস্থিত যেখানে ভারত মাতা অর্থাৎ ভারত মাতাকে দুর্গার একটি রূপ হিসাবে দেখা হয়। এটি সম্পূর্ণরূপে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ভারতীয়দের জন্য মা এবং রক্ষক হিসাবে দুর্গার প্রাচীন আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি পপ সংস্কৃতি এবং জয় সন্তোষী মা- এর মতো ব্লকবাস্টার বলিউড সিনেমায় উপস্থিত রয়েছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী হিন্দুস্তানি বাক্যাংশ ব্যবহার করে যেমন "দুর্গা মাতা কি জয়!" এবং " কালীমাতা কি জয়!"। যে কোনও মহিলা যে ভাল এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই করার জন্য একটি কারণ গ্রহণ করে তার মধ্যে দুর্গার আত্মা রয়েছে বলে বলা হয়।[২৯][৩০]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

পাদটীকা

[সম্পাদনা]
  1. ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; "G" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  2. ↑ বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, প্রথম ভাগ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৮৬
  3. ↑ পৌরাণিকা, প্রথম খণ্ড, অমলকুমার মুখোপাধ্যায়, ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০১
  4. ↑ দেবী দুর্গা: স্বামী অভেদানন্দ, শ্রী রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ,২০১৩,ISBN 81-88446-62-9, পৃঃ ৫
  5. ↑ "দেবী দুর্গার সূক্তের মন্ত্রদ্রষ্টা যে নারী: অম্ভৃণি"। আজকের পত্রিকা। ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  6. ↑ "বৈদিককাল থেকেই পূজিতা দেবী দুর্গা"। dhakapost.com। ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  7. ↑ "বৈদিককাল থেকেই পূজিতা দেবী দুর্গা"। dhakapost.com। ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  8. ↑ "বৈদিককাল থেকেই পূজিতা দেবী দুর্গা"। dhakapost.com। ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  9. ↑ প্রবন্ধ শব্দাঞ্জলিতে দুর্গাপূজা, হরিপদ ভৌমিক, নতুন বাংলার মুখ পত্রিকা, আশ্বিন ১৪১৪, অক্টোবর ২০০৭, পৃ. ১৬৩ দ্রঃ
  10. 1 2 শ্রীশ্রীচণ্ডী, প্রথম অধ্যায়
  11. ↑ শ্রীশ্রীচণ্ডী, অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ স্বামী জগদীশ্বরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৬২ সংস্করণের ১০৭ পৃষ্ঠার পাদটীকাটি দ্রষ্টব্য
  12. ↑ শ্রীশ্রীচণ্ডী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়
  13. ↑ "Mysuru name"। mysore.org.uk। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জানুয়ারি ২০১৬।
  14. ↑ "DISTRICT CENSUS HANDBOOK MYSORE" (পিডিএফ)। Census of India 2011 KARNATAKA। SERIES-৩০ PART XII-B: ৮। ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ৩১ জানুয়ারি ২০১৬।
  15. ↑ "দেবী দুর্গা ও দুর্গা পূজা : শাস্ত্রীয় আখ্যান ও ইতিহাস"। banglatribune.com।
  16. ↑ "An antiquity which is 5000 years old: The Mother Goddess worship in India"। timesofindia। ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  17. ↑ "দেবী দুর্গা ও দুর্গা পূজা : শাস্ত্রীয় আখ্যান ও ইতিহাস"। banglatribune.com।
  18. ↑ "An antiquity which is 5000 years old: The Mother Goddess worship in India"। timesofindia। ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  19. ↑ মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৯২/১১-১২। পৃ. ১৯৬।
  20. ↑ "মেধস আশ্রম, যেখান জড়িয়ে বাসন্তী পূজার ইতিহাস"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  21. 1 2 "দুর্গাপূজার সময়ে যেভাবে শোক পালন করেন 'মহিষাসুরের বংশধরেরা'"। BBC News বাংলা। ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১০ মার্চ ২০২১।
  22. ↑ "Not Durga Puja! It's Mahishasura's martyrdom that these tribals observe"। The New Indian Express (ইংরেজি ভাষায়)। ৮ অক্টোবর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৯ মার্চ ২০২১।
  23. ↑ "অসুরপূজা নিয়ে ঘোর বিতর্ক; দুর্গা-মহিষ দ্বন্দ্ব সম্পর্কে কী কী বলে আবহমান সংস্কৃতি?"।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  24. ↑ "Myth against myth"। Dhaka Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২ অক্টোবর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৯ মার্চ ২০২১।
  25. ↑ "For The Asurs of Bengal, Durga Puja Is The Time To Celebrate The 'Demon God' Durga Slayed"। ScoopWhoop (ইংরেজি ভাষায়)। ৭ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ জুলাই ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৯ মার্চ ২০২১।
  26. ↑ Chattopadhyay, Arunava (সেপ্টেম্বর ২০১৮)। DURGA: Ekti Obolokon। Atmajaa Publishers। পৃ. ৪৮, ৪৯। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০২১।
  27. ↑ পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪ থেকে উদ্ধৃত
  28. ↑ শব্দকল্পদ্রুম ৩।১৬৬৬; পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪
  29. ↑ Sabyasachi Bhattacharya (২০০৩)। Vande Mataram, the Biography of a Song। Penguin। পৃ. ৫, ৯০–৯৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৪-৩০৩০৫৫-৩। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।
  30. ↑ Sumathi Ramaswamy (২০০৯)। The Goddess and the Nation: Mapping Mother India। Duke University Press। পৃ. ১০৬–১০৮। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮২২৩-৯১৫৩-১।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
বাংলা/সংস্কৃত
ইংরেজি

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]