আঞ্জুমান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আঞ্জুমান হচ্ছে অবিভক্ত বাংলায় বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত সংগঠন। ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে উনিশ শতকে মুসলমানদের মধ্যে সভা-সমিতি গঠন করার প্রবণতা দেখা দেয়। বাংলার মুসলিম সমাজের অগ্রসর অংশ এগুলি গঠন করে ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি বিষয়ক নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের উন্নতির চেষ্টা করে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

উনিশ শতকের শুরুর দিকে রামমোহন রায় কলকাতায় প্রথম আত্মীয় সভা (১৮১৫) নামে একটি ধর্মীয়-সামাজিক সভা গঠন করেন। এরপর কলকাতাতে স্থাপিত হয় গৌড়ীয় সমাজ (১৮২৩), অ্যাকাডেমিক সভা (১৮২৮), ব্রাহ্ম সমাজ (১৮২৯), ল্যান্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (১৮৩১), তত্ত্ববোধিনী সভা (১৮৪২) ইত্যাদি। ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিমূলক এসব সংগঠন কলকাতার হিন্দু সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, জমিদার ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা পরিচালনা করতেন। এগুলিতে মুসলমানদের সেরকম অংশগ্রহণ ছিল না।

১৮৫৫ সালের ৮ মে কলকাতায় প্রথম মুসলিম সংগঠন আঞ্জুমানে ইসলামী স্থাপিত হয়। কলকাতা আদালতের কাজী-উল-কুজ্জত ফজলুর রহমান এর সভাপতি এবং মুহম্মদ মজহার সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া কার্যনির্বাহী কমিটিতে ছিলেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবদুল লতিফ, দূরবীণ-এর সম্পাদক আবদুর রউফ ও অন্যান্য শিক্ষিত ব্যক্তি। ১৮৫৬ সালের নিউ ক্যালকাটা ডাইরেক্টরি (পার্ট-৬) থেকে জানা যায়, আঞ্জুমানের কার্যনির্বাহি কমিটিতে ১ জন সভাপতি, ২ জন সহ-সভাপতি, ১ জন সম্পাদক ও ১৪ জন সদস্য ছিলেন। তাঁরা অধিকাংশই মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রাপ্ত। আঞ্জুমানে ইসলামি-র গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমানের মধ্যে ঐক্য বিধান ও তাদের কল্যাণ সাধন করা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মুসলমান প্রজার মধ্যে সংহতি গড়ে তোলা, ইসলাম ধর্মের উৎকর্ষ সাধন ও প্রচারে সচেষ্ট হওয়া ইত্যাদি। গঠনতন্ত্রে আরও বলা হয় যে, ভারতবর্ষের মুসলমানরা সরকারের কাছে বিধিসম্মত উপায়ে আবেদন করবে এবং বিদ্রোহমূলক এমন কিছু করবে না যাতে সরকারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে আঞ্জুমানে ইসলামী ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব সমর্থন তো করেই নি, বরং সভার আয়োজন করে এর বিরোধিতা করে। সমকালের অপর সংগঠন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনও (১৮৫১) সিপাহি বিপ্লবের বিরোধিতা করে। বিদ্রোহ শেষ হলে আঞ্জুমানের পক্ষ থেকে ১৮৫৮ সালের ১৪ নভেম্বর মহারানী ভিক্টোরিয়াকে একটি অভিনন্দনবাণী প্রেরণ করা হয়।

আঞ্জুমানের মাসিক সভা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল। সভায় উর্দু ও ফারসি ভাষায় প্রবন্ধাদি পাঠ ও আলোচনা হতো। সভার কার্যবিবরণী লেখা হতো ফারসিতে। খ্রিস্টান মিশনারিরা ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করত, সেসবের পাল্টা জবাবে প্রবন্ধ লিখে আঞ্জুমানের সভায় পাঠ করা হতো এবং পরে দূরবীণ পত্রিকায় ছাপানো হতো।

আঞ্জুমানে ইসলামী দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। ১৮৬৩ সালে আবদুল লতিফ কর্তৃক মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি গঠিত হওয়ার আগেই আঞ্জুমানের কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়ে। সম্ভবত নেতৃত্বের দুর্বলতা এর প্রধান কারণ ছিল। আবদুল লতিফ আঞ্জুমানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। সংগঠন হিসেবে আঞ্জুমানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো: কলকাতার শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রথম স্বসমাজের স্বার্থে একত্রে মিলিত হয়ে সোচ্চার হতে পেরেছিল।

কলকাতার আঞ্জুমানে ইসলামী লোপ পেলেও বাংলার মফস্বল শহরগুলিতে বিভিন্ন সময়ে আঞ্জুমানে ইসলাম, আঞ্জুমানে ইসলামিয়া নামে বহুসংখ্যক সমিতি স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠার কাল অনুসারে স্থান-ভিত্তিতে সাজিয়ে সমিতিগুলিকে এভাবে উল্লেখ করা যায়: ময়মনসিংহ (১৮৭৫), চট্টগ্রাম (১৮৮০), নোয়াখালী (১৮৮৫), রংপুর (১৮৮৭), কুমিল্লা (১৮৮৭), ফরিদপুর (১৮৯২), জলপাইগুড়ি (১৮৯২), শ্রীহট্ট (১৮৯৪), দিনাজপুর (১৮৯৪), সিরাজগঞ্জ (১৮৯৮), পাবনা (১৯০৫), দার্জিলিং (১৯০৯) ইত্যাদি। এ ছাড়া ঢাকা, পান্ডুয়া (হুগলি), বীরভূম, নাটোর, বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া প্রভৃতি অঞ্চলে আঞ্জুমানে ইসলামিয়া গড়ে ওঠে। বাংলা সরকার প্রণীত সংশোধিত সমিতি-তালিকা (১৯২৩) থেকে জানা যায় যে, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফরিদপুর, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর এবং পাবনার আঞ্জুমানে ইসলামিয়া সরকারের স্বীকৃতি লাভ করে। তালিকায় ওই সময় আঞ্জুমানগুলির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, কার্যকর পরিষদের কর্মকর্তা, সদস্য-সংখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। কোনো কোনো আঞ্জুমান কলকাতার সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৮) এবং উত্তর প্রদেশের ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশনের (১৮৮৮) সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করত। সিরাজগঞ্জের আঞ্জুমান প্রথমটির সঙ্গে এবং ময়মনসিংহ ও রংপুরের আঞ্জুমান দ্বিতীয়টির সঙ্গে জাতীয় বিষয়ে সমর্থন জানিয়ে চিঠিপত্রও আদান-প্রদান করেছিল।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট-এর আওতায় নিবন্ধিত একটি সেবামূলক, অমুনাফামুখী ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। [১] একজন সুরাটি ব্যবসায়ী শেঠ ইব্রাহিম মুহাম্মদ ডুপ্লে কর্তৃক ১৯০৫ সালে কলকাতায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান ও অন্যান্যদের বেওয়ারিশ লাশ সংগ্রহ ও দাফন করা। দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭), আঞ্জুমান-এর অফিস ঢাকায় স্থাপন করা হয় ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। [২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]